গত পরশু জাতীয় সংসদে প্রশ্নোত্তর পর্বে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে নিয়োজিত মাননীয় মন্ত্রী জানান যে, এক সন্তানের দম্পতিদের বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা সরকারের নেই । দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা নিয়ে ভাবেন এমন লোকদের জন্য মাননীয় মন্ত্রীর এ উক্তি নিঃসন্দেহে হতাশার। প্রযুক্তির অগ্রগতি যতই হোক, খাদ্যশস্যের উৎপাদন যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, কর্মক্ষেত্রের সুযোগ যতই বৃদ্ধি পাক না কেন, জনসংখ্যা বৃদ্ধির লাগামকে টেনে ধরতে পারলে সবকিছু একসময়ে ব্যর্থ হয়ে যাবে। কিন্তু ক্ষমা চেয়েই বলতে হয় আমাদের সদাশয় সরকার বাহাদুরের কর্তাব্যক্তিদের এ বিষয়ে কোন উদ্বেগ বা চিন্তা আছে বলে মনে হয়না।
এক সন্তানের দম্পতিদের বিশেষ পুরস্কার দেওয়ার ব্যবস্থাটি হয়তো সরকারের প্রণোদনার অংশ হতে পারে। এতে হয়তো সরকারের কিছু আর্থিক ব্যয় হতে পারে। তবে অবস্থার প্রেক্ষিতে মনে হয় সরকারের কাছে এ ব্যয়ের চেয়ে মন্ত্রী/এম.পিদের জন্য শু্ল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির বিষয়টি অধিক গুরুত্বপূর্ণ। এ বিবেচনায় সরকারের আর্থিক ব্যয়ের সম্ভাবনা নেই অথচ আইনের কিছুটা পরিবর্তন ঘটিয়ে যারা স্ব-ইচ্ছায়/প্রয়োজনে নিজেদের পরিবাকে ছোট রাখতে চান তাদের উৎসাহ বা সুবিধা প্রদানের প্রয়াস নিতে পারেন। তবে এক্ষেত্রেও একটা সংশয়ই কাজ করে যে, মোল্লাতন্ত্রের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করার মতো সাহস আমাদের সরকার বাহাদুরের আছে কিনা।
শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য নিরসন এবং যৌক্তিক প্রণোদনার কারণে আজকাল মেয়ে আর ছেলের ব্যবধান অনেক কমেছে। অনেক পরিবার পাবেন, যেখানে মেয়েরা ছেলেদের চেয়ে রোজগারের দায়িত্বটি আরো ভালভাবে পালন করেন। ছেলে বাবা-মার কোন খোজ নেননা কিন্তু মেয়ে গার্মেন্টেসে কাজ করে মা-বাবার দেখাশুনা করেন এমন পরিবারের সংখ্যারও কমতি নেই। শুধুমাত্র কৃষিভিত্তিক সমাজ ছাড়া অন্য কোন ক্ষেত্রেই ভবিষ্যতের নিরাপত্তার শংকায় এখন আর কেউ পুত্র সন্তানের প্রত্যাশায় অধিক সন্তান নেন না। একটি বা দুটো মেয়ে সন্তানেই সন্তুষ্ট থাকেন। তবে এই সন্তুষ্টি পুরোপুরি জটিলতামুক্ত নয়। রাষ্ট্রীয় তথা ধর্মীয় উত্তরাধিকার আইনের কারণে তাদেরকে একটা সময়ে অহেতুক ঝামেলার সম্মুখীন হতে হয়।
মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী কোন ব্যক্তির মুত্যুর পর তার সম্পত্তি তার স্ত্রী,ছেলে,মেয়েরা প্রাপ্য হন। কিন্তু কোন ব্যক্তির পুত্র সন্তান না থাকলে সে সম্পত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির কন্যা, স্ত্রীর সাথে তার ভাই এবং ভাতিজাদেরও অধিকার জন্মে। সে কারণে ঝামেলা এড়ানোর জন্যে পুত্রসন্তানবিহীন কন্যাসন্তানের বাবাকে তার জীবিত অবস্থায়ই তার সম্পত্তি কন্যাদের নামে লিখে দিতে হয়। এতে তাদের যেমন আইনী জটিলতা/খরচের সম্মুখীন হতে হয় তেমনি বৃদ্ধ বয়সে সম্বলহীন হওয়ার কারণে এক ধরণের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে হয়। শুধুমাত্র কন্যাসন্তান বা তাদের বাবা হওয়ার কারণে এ জটিলতা এক ধরণের রাষ্ট্রীয় অনাচার। এক্ষেত্রে রাষ্ট্র যদি ছেলে সন্তানের মতো করে মেয়ে সন্তানদের জন্যও একই ধরণের উত্তরাধিকার আইন বলবৎ করে তাহলে যারা ছেলে সন্তানের মোহে না থেকে শুধুমাত্র কন্যাসন্তানে মোহাবিষ্ট থাকার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দায় হতে রক্ষা করছে তাদের প্রতি সুবিচার করা হবে। এ ধরণের বৈষম্যমূলক আইনের ধারক ও বাহক হয়ে লিঙ্গসমতার শ্লোগান দেওয়া দ্বৈতাচরণ, সর্বোপরি অন্যায়।
মন্ত্রী/এম.পিদের জন্য শু্ল্কমুক্ত গাড়ি আমদানি, মন্ত্রী/এম.পি/বিচারক/আমলাদের বেতন বৃদ্ধি, সরকারি কর্মচারিদের বেতন/বয়সবৃদ্ধি সরকারের অস্তিত্বের জন্য হয়তো খুবই গুরুত্বপূর্ণ কাজ। তবে এর পাশাপাশি জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে জনগণকে উৎসাহ দেওয়া এবং এ লক্ষ্যে যাবতীয় প্রতিবন্ধকতাগুলো দূরীকরণে ভূমিকা রাখার মতো গুরুত্বহীন কাজগুলোতে একটু মনোনিবেশ করলে বা সময় ব্যয় করলে আমার মনে হয়না সরকারের অস্তিত্বে খুব একটা সংকটের সৃষ্টি হবে। বরং এ গুরুত্বহীন কাজটির মাধ্যমে রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে উপকৃত হবে।
মোদ্দাকথা হচ্ছে, যারা ছেলে সন্তানের মোহে না থেকে শুধুমাত্র কন্যাসন্তানে মোহাবিষ্ট থাকার মাধ্যমে রাষ্ট্রকে অতিরিক্ত জনসংখ্যার দায় হতে রক্ষা করছে তাদের প্রতি সুবিচার করা রাষ্ট্রের নৈতিক দায়িত্ব।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



