টেলিফোন পেয়ে বঙ্গবন্ধুকে রক্ষা করতে আসেননি কোনো রাজনীতিবিদ। এগিয়ে আসেন একজন সেনা কর্মকর্তা। নাম কর্নেল জামিল। রাষ্ট্রপতির সামরিক সচিব। ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের বাড়িতে খুনিদের হামলার পর বঙ্গবন্ধু টেলিফোন করেন তার রাজনৈতিক সহকর্মীদের। এরপর সেনাপ্রধান, পুলিশের আইজি, বিডিআরের ডিজিসহ আরো কয়েকজন সামরিক, বেসামরিক কর্মকর্তাকে। টেলিফোনে তিনজন নেতা বঙ্গবন্ধুকে জানান, তারা আসছেন। কেউই কথা রাখেননি। কথা রেখেছেন একজনই। কর্নেল জামিল ব্যক্তিগত লাল প্রাইভেট কার নিয়ে উড়ে আসেন। সৈন্যরা তাকে বাধা দেয়। তিনি হৈ চৈ করেন এবং সৈন্যদের গালাগাল করে ৩২ নম্বরের দিকে অগ্রসর হন। সৈন্যরা বলল, আমরা গুলি করব। তিনি বলেন, গুলি করো। এভাবেই জীবন বিসর্জন দেন তিনি।
রক্ষীবাহিনী পরদিন সকালে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারত। কিন্তু তারা কিছুই করেনি। রক্ষীবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা বলেন, বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর রক্ষীবাহিনী পাল্টা ব্যবস্থা নিতে চেয়েছিল। কিন্তু রক্ষীবাহিনীর দায়িত্বপ্রাপ্ত রাজনৈতিক নেতারা কোনো সিদ্ধান্ত দিতে পারেননি। তারা ব্যস্ত ছিলেন নিজেদের রক্ষা করতে। রক্ষীবাহিনীর প্রধান ব্রিগেডিয়ার নূরুজ্জামান ছিলেন লন্ডনে। দায়িত্বে ছিলেন কর্নেল সাবেহ উদ্দিন। ১৫ আগস্ট সকালে কর্নেল সাবেহ উদ্দিনকে সারেন্ডার করার অনুরোধ জানান খালেদ মোশাররফ। রক্ষীবাহিনীর দুই উপপরিচালক কর্নেল সরোয়ার মোল্লা এবং কর্নেল শহীদ সকালে পুরাতন বিমানবন্দরের ক্যাম্পে জরুরি বৈঠকে বসেন। গোলাবিহীন ট্যাংক নিয়ে তাদের সামনে হাজির কর্নেল ফারুক। ঘোষণা দেন রক্ষীবাহিনীকে সামরিক বাহিনীতে ফিরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এরপর কেউ বাড়াবাড়ি করলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রক্ষীবাহিনী চুপসে যায়।
লে. কর্নেল হামিদ তার তিনটি সেনা অভ্যুত্থান গ্রন্থে ১৫ আগস্ট রাতে জিয়াউর রহমানের ভূমিকাকে রহস্যজনক মনে করেন। একই সঙ্গে ঘটনার পর খালেদ মোশাররফ, সাফায়েত জামিলের ভূমিকাও তার কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। জেনারেল সফিউল্লাহ ছিলেন অসহায়। বঙ্গবন্ধুর টেলিফোন পেয়ে ৪৬ ডিভিশনে বারবার ফোন করে, খালেদ মোশাররফকে পাঠিয়ে সেনাপ্রধান কোনো সাড়া পাননি। বরং ১৫ আগস্ট সকালে মেজর ডালিম আর্মি হেড কোয়ার্টার থেকে জেনারেল সফিউল্লাকে হাইজ্যাক করে নিয়ে যান মেজর ডালিম। কেউই ডালিমকে বাধা দেননি। এভাবে আর্মি চিফকে হাইজ্যাক করা ইতিহাসে নজিরবিহীন। মোশতাকের শপথের আগেই বেতার ভাষণে সেনাপ্রধান সফিউল্লাহ, বিমান প্রধান এ কে খন্দকার এবং নৌপ্রধান এ এইচ খান, পুলিশের আইজি, বিডিআরের ডিজি আনুগত্য প্রকাশ করেন খুনিদের প্রতি।
কর্নেল জামিলের মতো আরেকজন কর্মকর্তা প্রতিবাদ জানিয়ে মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসেন। তিনি কর্নেল মোমেন। মেজরদের বাড়াবাড়ি থামাতে কর্নেল নূরউদ্দিনের রুম থেকে বের হয়ে ডালিমের ট্যাংক বহরের সামনে রুখে দাঁড়ান কর্নেল মোমেন। গাড়ি থেকে নেমে তার বুকে স্টেনগান চেপে ধরেন ডালিম। অবস্থা দেখে নূরউদ্দিনের রুমে অবস্থানরত অফিসাররা পালিয়ে যান। এ ছাড়া খুনিরা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে রশি দিয়ে হাত-পা বেঁধে রাখে ব্রিগেডিয়ার মশহুরুল হক এবং কর্নেল শরিফ আজিজকে। পরে মেজর ফারুক তাদের ছেড়ে দেন। এ ছাড়া বঙ্গবন্ধুর জন্য জীবন দেন পুলিশের একজন ডিএসপি এবং কয়েকজন সৈন্য। বঙ্গবন্ধু হত্যার মূল কারণ তিনি ছিলেন নিরাপত্তাহীন।
ইতিহাসের রাখাল রাজা নিজের জন্য কোনো নিরাপত্তা রাখেননি। বাড়ির সিঁড়ির দুটি দরজাই ছিল খোলা। বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিল তাকে কোনো বাঙালি হত্যা করবে না। বাস্তবেও তাই, খুনিদের প্রথম দলটি তার ব্যক্তিত্বের কাছে ছিল অসহায়। দ্বিতীয় গ্রুপটি বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করে। প্রথম আক্রমণে আসা মেজর মহিউদ্দিন বঙ্গবন্ধুকে বারবার আত্দসমর্পণ করার অনুরোধ জানান। মহিউদ্দিনকে থামিয়ে বঙ্গবন্ধু কয়েকটি টেলিফোন করেন। পরে মেজর বজলুল হুদাকে সিঁড়িতে দেখে বঙ্গবন্ধু গর্জে উঠেন_ এই তোরা কি চাস?
মেজর হুদা জবাব দেন_ স্যার আপনাকে নিয়ে যেতে এসেছি।
বঙ্গবন্ধু আবারো গর্জে উঠেন। তোদের এত বড় সাহস? পাকিস্তান আর্মি আমাকে মারতে পারেনি। আমি জাতির পিতা। বাঙালি জাতি আমাকে ভালোবাসে। আমি তাদের ভালোবাসি।
স্যার এসব নাটকীয় কথা বন্ধ রাখুন। আমাদের সঙ্গে চলুন।
হুদার এই বক্তব্যের পর বঙ্গবন্ধু নমনীয় হন। বললেন, আমি যাব। আমার তামাক আর পাইপটা নিয়ে আসি। বঙ্গবন্ধু আবার শোয়ার কক্ষে প্রবেশ করেন। তার পেছনে মেজর হুদা ও মহিউদ্দিন। তিনি রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়িতে পা রাখতেই গুলি ছোড়ে মেজর নূর। একই সময় শেখ মনির বাড়ি থেকে অপারেশন শেষ করে আসে রিসালদার মুসলেহ উদ্দিন। কারো কারো মতে গুলি করেছে মুসলেহ উদ্দিন। আবার কারো মতে, মেজর নূরই বঙ্গবন্ধুকে গুলি করে। ইতিহাসের মহানায়কের কাছে বঙ্গভবন, গণভবন ছিল তুচ্ছ। জনগণের নেতা থাকতেন ধানমন্ডির ৩২ নম্বর সড়কের এক সাদামাটা বাড়িতে। পরতেন পাঞ্জাবি আর লুঙ্গি। একমাত্র বিলাশ ছিল পাইপ ও তামাক। সারাজীবন দেশের জন্য করেছেন। এ কারণে গুরুত্ব দেননি নিজের নিরাপত্তার বিষয়টি। নিরাপত্তা বলয়ে বাস করলে সেনাবাহিনীর বিচ্ছিন্ন কিছু লোক তাকে হত্যা করতে পারত না। বাংলাদেশ হতো না অভিভাবকহীন।
********************************
নঈম নিজাম

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

