আমার প্রিয় পোস্ট

যুদ্ধাপরাধীর বিচার ও জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধ করার দাবী করছি

হঠকারিতার চরম মূল্য -ফিরে দেখা : ৭ নভেম্বর

০৭ ই নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ৯:১৭

শেয়ারঃ
0 0 0


কর্নেল শাফায়াত জামিল (অব.)

৬ নভেম্বর বিকেলে খবর পেলাম ক্যান্টনমেন্টে ‘বিপ্লবী সৈনিক সংস্থা’ নামে একটি সংগঠনের উস্কানিমূলক লিফলেট ছড়ানো হয়েছে। এ ধরনের কোনো সংগঠনের অস্তিত্বের কথা সেদিনই প্রথম জানি আমরা। আগে কখনো এ সম্বন্ধে কোনো তথ্য আমাদের সরবরাহ করা হয়নি। এটা সামরিক গোয়েন্দা বিভাগের ব্যর্থতা বা তারা সেটা গোপন রেখেছিল। যাই হোক, শুনলাম, ক্যান্টনমেন্টে সৈনিকদের মধ্যে চাপা উত্তেজনা বিরাজ করছে। অফিসারদের বির"দ্ধে কথাবার্তা চলছে তাদের মধ্যে। সেনা প্রধান খালেদ মোশাররফ সৈনিকদের উত্তেজনা প্রশমিত করতে সন্ধ্যার দিকে ট্যাঙ্ক রেজিমেন্টে গেলেন। আমিও ছিলাম তার সঙ্গে। সৈনিকদেরকে তিনি ধৈর্যশীল হওয়ার পরামর্শ দিয়ে তাদের বির"দ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হবে না বলে অঙ্গীকার ব্যক্ত করলেন। ট্যাঙ্ক রেজিমেন্ট থেকে ফিরে সেনাসদরে বৈঠক করলেন খালেদ। সৈনিকদের সমস্ত অস্ত্র অস্ত্রাগারে জমা করার নির্দেশ দিলেন তিনি। বললেন, পরদিন থেকে সৈনিকদের স্বাভাবিক ট্রেনিং শুর" হবে। সব দিক থেকে স্বাভাবিকতা ফিরিয়ে আনার তাগিদ দিলেন তিনি। ঐ বৈঠকের পরপরই আমি সেনাপ্রধানের নির্দেশ অনুযায়ী ব্রিগেড হেড কোয়ার্টারে গিয়ে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিলাম। রাত ১০টার দিকে খালেদ মোশাররফের ফোন পেলাম। ফোনে তিনি আমাকে বঙ্গভবনে যেতে বললেন। বঙ্গভবনে যাওয়ার জন্য গাড়িতে উঠছি, তখন ব্রিগেড মেজর হাফিজ আমাকে বললো, ‘স্যার একটা জর"রি কথা আছে।’ হাফিজ জানালো, প্রথম বেঙ্গলের একজন প্রবীণ জেসিও বলেছে, ঐদিন রাত বারোটায় সিপাইরা বিদ্রোহ করবে। জাসদ এবং সৈনিক সংস্থার আহ্বানেই তারা এটা করবে। খালেদ ও আমাকে মেরে ফেলার নির্দেশও সৈনিকদের দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে জেসিওটি। ঐ জেসিও, যিনি একজন সুবেদার ছিলেন, বলেছেন, আমাদেরকে এ কথা জানিয়ে সতর্ক করে দিতে।
এগারাটার দিকে আমি বঙ্গভবনে পৌঁছুলাম। দুই বাহিনী (বিমান ও নৌ) প্রধানকে সেখানে দেখলাম। খালেদ তখনো আসেননি। তিনি এলেন ২০/২৫ মিনিট পর। শুনলাম, একটি দৈনিকের সম্পাদক তার বাড়িতে যাওয়ায় আটকে পড়েছিলেন খালেদ। পরে জেনেছি, ৩ থেকে ৭ নভেম্বর পর্যন্ত দুজন বিশিষ্ট সম্পাদক (এক সময় যাদের বির"দ্ধে পশ্চিমী গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ছিল) প্রায়শই খালেদ মোশাররফের বাড়িতে যেতেন এবং পরামর্শের নামে তার মূল্যবান সময় নষ্ট করতেন। ৬ নভেম্বর রাতেও আমরা যখন বঙ্গভবনে অপেক্ষা করছি, এই দুই সম্পাদকের একজন তখন তার বাড়িতে অবস্থান করছিলেন। মজার ব্যাপার হলো, ৭ নভেম্বরের পর ঐ দুই সম্পাদকের কাগজেই খালেদ ও তার সহকর্মীদের ‘র"শ ভারতের দালাল’ বলে চিহ্নিত করে অশালীনভাবে বিষোদগার করা হতে থাকে।
যাই হোক, খালেদ আমাকে ডেকেছিলেন একটা মধ্যস্থতার জন্য। সামরিক আইন প্রশাসকদের বিন্যাস কিভাবে হবে, তা নিয়ে অন্য দুই বাহিনী প্রধানের সঙ্গে তার মতভেদ দেখা দিয়েছিল। উল্লেখ্য, ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানের অব্যবহিত পরপরই মোশতাক সামরিক আইন জারি করেন এবং নিজে চিফ মার্শাল ল অ্যাডমিনিস্ট্রেটর হন। সেই সঙ্গে স্থগিত করেন সংবিধানের কার্যকারিতা।
তো, খালেদ বলছিলেন যে সিএমএলএ বা প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হওয়া উচিত সেনাপ্রধানেরই। কারণ সশস্ত্র বাহিনী কিছু করলে তার দায়দায়িত্ব সেনাপ্রধানের ওপরই বর্তায়। অন্য দুই প্রধানের দাবি মতো প্রেসিডেন্ট সিএমএলএ এবং তিনজন (সেনা, বিমান ও নৌপ্রধান) ডিসিএমএলএ হলে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সমস্যা হতে পারে। অন্য দুই প্রধান সেনাপ্রধানের অভিমতের বির"দ্ধে অবস্থান নিলে সেনাপ্রধান সংখ্যাগরিষ্ঠতার প্রশ্নে নাজুক অবস্থায় পড়বেন, এ ভাবনাও হয়তো খালেদের মধ্যে ছিল। কথাবার্তার এক পর্যায়ে খালেদকে আমি ক্যান্টনমেন্টের পরিস্থিতির কথা বললাম। আমাদের যে হত্যার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, তাও জানালাম। তিনি বিশেষ গ্রাহ্য করলেন না আমার কথা। আমাদের কথাবার্তার মাঝপথেই বারোটার দিকে ক্যান্টনমেন্ট থেকে ফোন এলো। ফোনে বলা হলো, সিপাইদের ‘বিপ্লব’ শুর" হয়ে গেছে। তারা এলোপাতাড়ি গুলি ছুড়ছে। এ কথা শোনার পর খালেদ মিটিং ভেঙে দিলেন। খালেদের সঙ্গে বঙ্গভবনে এসেছিলেন রংপুরের ব্রিগেড কমান্ডার কর্নেল হুদা ও চট্টগ্রামের একটি ব্যাটালিয়নের কমান্ডার লে. কর্নেল হায়দার। হায়দার খুব সম্ভবত ছুটিতে ছিলেন এবং ঘটনাচক্রেই খালেদের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় তার।
মিটিং ভেঙে দিয়ে হুদা ও হায়দারকে নিয়ে চলে গেলেন খালেদ মোশাররফ। অন্য দুই চিফও চলে গেলেন। তবে খালেদ আমাকে বললেন বঙ্গভবনেই থাকতে। তিনি নিজে প্রথমে যান মোহাম্মদপুরে কোনো এক আত্মীয়ের বাড়িতে। সেখান থেকে তারা যান রংপুর ব্রিগেড থেকে আসা দশম বেঙ্গলের অবস্থানস্থল শেরেবাংলা নগরে। রাত বারোটার পর সিপাইরা ফিল্ড রেজিমেন্টের মেজর মহিউদ্দিনের নেতৃত্বে জিয়াকে মুক্ত করে ফিল্ড রেজিমেন্টে নিয়ে আসে। এই মেজর মহিউদ্দিনই ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে হত্যার জন্য একটি আর্টিলারি গান থেকে ৩২ নম্বরের বাড়িতে গোলা ছুড়েছিল। শেষ রাতের দিকে দশম বেঙ্গলের অবস্থানে যান খালেদ। পরদিন সকালে ঐ ব্যাটালিয়নে নাশতাও করেন তিনি। বেলা এগারোটার দিকে এলো সেই মর্মান্তিক মুহূর্তটি। ফিল্ড রেজিমেন্টে অবস্থানরত কোনো একজন অফিসারের নির্দেশে দশম বেঙ্গলের কয়েকজন অফিসার অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় খালেদ ও তার দুই সঙ্গীকে গুলি ও বেয়নেট চার্জ করে হত্যা করে। এই হত্যাকাণ্ডের বিচার হয়নি আজো। সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হলে ৬ নভেম্বর দিবাগত রাত বারোটার পর ফিল্ড রেজিমেন্টে সদ্যমুক্ত জিয়ার আশপাশে অবস্থানরত অফিসারদের অনেকেই অভিযুক্ত হবেন এ দেশের ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম সেনানায়ক ও বীর মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মোশাররফকে হত্যার দায়ে। তথাকথিত সিপাহি বিপ্লবের অন্যতম নায়ক কর্নেল তাহের এবং তৎকালীন জাসদ নেতৃবৃন্দও এর দায় এড়াতে পারবেন না।
‘অফিসারদের রক্ত চাই’ : আগেই বলেছি ৬ নভেম্বর রাতে খালেদ মোশাররফ চলে যাওয়ার পরও আমি বঙ্গভবনে থেকে যাই তারই নির্দেশে। খালেদের সঙ্গে আর যোগাযোগ হয়নি আমার। তারপর তো ‘সিপাহি বিপ্লব’ ঘটে গেলো। রাত তিনটার দিকে জিয়া ফোন করলেন আমাকে। বললেন, 'ঋড়ৎমরাব ধহফ ভড়ৎমবঃ ষবঃ’ং ঁহরঃব ঃযব অৎসু.’ আমি রূঢ়ভাবেই বলি, ‘আপনি সৈনিকদের দিয়ে বিদ্রোহ করিয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারবেন না, ‘আপনি বাঘের পিঠে সওয়ার হয়েছেন, আর নামতে পারবেন না। যা করার আপনি অফিসারদের নিয়ে করতে পারতেন, সৈনিকদের নিয়ে কেন?’ সেনাবাহিনীর মধ্যে হিংসা ও বিভেদের রাজনীতি ঢোকানো হয়েছে বলেও ক্ষোভ প্রকাশ করি আমি। এই সময় একটা আশ্চর্য ব্যাপার ঘটে। জিয়ার সঙ্গে আমার কথোপকথন হচ্ছিল ইংরেজি-বাংলা মিশিয়ে। আমাদের সংলাপের যে অংশগুলো বাংলা ছিল তা সঙ্গে সঙ্গে লাইনে থাকা অন্য কেউ ইংরেজিতে ভাষান্তর করে দিচ্ছিল, যেটা আমি পরিষ্কার শুনতে পাচ্ছিলাম। আমার কোনো সন্দেহ নেই, বঙ্গভবনে টেলিফোন এক্সচেঞ্জে এমন কেউ অবস্থান করছিল যে আমাদের সংলাপ বিদেশী কোনো সূত্রের কাছে ভাষান্তর করে দিচ্ছিল। আমাদের রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা যে কতো নাজুক এর থেকেই সেটা স্পষ্ট বোঝা যায়। খোদ বঙ্গভবনের ভেতরে অবস্থান করেই কেউ সে কাজটা করছিল।
রাত সাড়ে তিনটা নাগাদ বঙ্গভবনের অদূরে ‘নারায়ে তাকবির’, ‘সিপাই সিপাই ভাই ভাই, অফিসারদের রক্ত চাই’ স্লোগান শুনলাম। সেই সঙ্গে ফাঁকা গুলির আওয়াজ। দ্বিতীয় বেঙ্গলের দুটি পদাতিক কোম্পানি তখন বঙ্গভবনের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে ছিল। এ ছাড়া ছিল রক্ষীবাহিনী থেকে সদ্য রূপান্তরিত পদাতিক ব্যাটালিয়নটির একটি কোম্পানি। এর দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল ক্যাপ্টেন দীপক। কোম্পানি কমান্ডারদের নির্দেশ দিলাম পজিশন নিতে এবং বিদ্রোহী সৈনিক সংস্থার সদস্যরা গুলি করলে তাদের প্রতিরোধ করতে। ১৫/২০ মিনিট পর গুলি ও স্লোগান আরো তীব্র এবং নিকটতর হয়ে উঠলো।
আশ্চর্য হয়ে গেলাম যাদেরকে প্রতিরোধের জন্য পাঠিয়েছি তারা পাল্টা গুলি করছে না দেখে। তখন আমার বোধোদয় হলো, বিদ্রোহী সিপাইদের ঐ স্লোগানে তারাও রসসড়নরষরুবফ হয়ে গেছে। তারা ওদের বির"দ্ধে কিছুই করবে না। এ ঘটনা দেখার পর আমার সঙ্গে থাকা অন্য একজন কোম্পানি কমান্ডার ক্যাপ্টেন দিদার আমাকে বললো, ‘স্যার, চলুন আমরা বেরিয়ে গিয়ে ক্যান্টনমেন্টে ঢোকার চেষ্টা করি।’ ওদিকে ফায়ারিং ও স্লোগান তখন একেবারে সামনে এসে গেলো। উপায়ান্তর না দেখে দিদার ও কয়েকজন সৈনিককে নিয়ে আমি বঙ্গভবনের পেছনের পাঁচিল টপকে বেরিয়ে এলাম। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এ সময় আমার পা ভেঙে যায়। যাই হোক, বাইরে থাকা একটি সামরিক ডজ গাড়িতে উঠলাম সবাই। এই অবস্থায় ক্যান্টনমেন্টে যাওয়া সমীচীন মনে হলো না। আমার তখন জর"রি ভিত্তিতে চিকিৎসার প্রয়োজন ছিল। ভেবে দেখলাম কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট এখনো শান্ত। তাই সেই অভিমুখেই রওনা হলাম। সেখানে গিয়ে সিএমএইচ-এ চিকিৎসা নেওয়া যাবে। মেঘনা ফেরিঘাটে পৌঁছে মনে হলো কুমিল্লা যাওয়াটাও ঠিক হবে না। এতোক্ষণে সেখানকার পরিস্থিতিও হয়তো পাল্টে গেছে। সঙ্গী সৈনিকদের ফেরত পাঠিয়ে আমি ও দিদার নৌকায় করে মুন্সিগঞ্জ অভিমুখে রওনা হলাম। উল্লেখ্য, মেঘনা ফেরিঘাটে কর্মরত বিআইডব্লুটিসির কর্মচারীদের কাছ থেকে আমরা সাধারণ শার্ট আর লুঙ্গি নিয়ে ইউনিফরম ছেড়ে সেগুলো পরে নিই। নৌকায় ঘণ্টা দুয়েক চলার পর দেখলাম মুন্সিগঞ্জের এসডিও একটা লঞ্চ নিয়ে নারায়ণগঞ্জে যাচ্ছেন। আমি তার কাছে নিজের পরিচয় দিয়ে আমার চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তার কথা বললাম। ক্যাপ্টেন দিদারের পরিচয় গোপন করে তাকে পরিচয় করিয়ে দিলাম আমাকে সাহায্য করা এক বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র হিসেবে। এসডিও আমাকে সঙ্গে করে নারায়ণগঞ্জ থানায় নিয়ে গেলেন। সেখানে পুলিশি হেফাজতে রাখা হলো আমাকে। আর দিদার জনতার সঙ্গে মিশে গেলো। নারায়ণগঞ্জ থানা থেকে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে জিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ করলাম। জিয়ার পক্ষে মীর শওকত আমাকে বললেন, ‘তুমি ওখানেই থাকো। আমি লে. কর্নেল আমিনুল হককে পাঠাচ্ছি। সে তোমাকে নিয়ে আসবে।’ ঘণ্টা দুয়েক পর আমিনুল হক এলো। তার সঙ্গে ২/৩টি গাড়িতে চতুর্থ বেঙ্গলের কিছু সৈন্য। ঢাকার উদ্দেশে রওনা হলাম আমরা। ঢাকা পৌঁছে আমাকে সিএমএইচ-এ ভর্তি করা হলো। এখানে এসেই শুনি খালেদ, হায়দার ও হুদার নির্মম হত্যাকাণ্ডের খবর। পরে শুনি মুক্তি পেয়ে দ্বিতীয় ফিল্ড রেজিমেন্টে আসার পর জিয়া নিজে বলেছিলেন, 'ঞযবৎব ংযড়ঁষফ নব হড় নষড়ড়ফংযবফ. ঘড় ৎবঃৎরনঁঃরড়হ. ঘড়নড়ফু রিষষ নব ঢ়ঁহরংযবফ রিঃযড়ঁঃ ঢ়ড়ৎঢ়বৎ ঃৎরধষ.’ অথচ জিয়ার নির্দেশ উপেক্ষা করে এবং যাবতীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে ঠাণ্ডা মাথায় হত্যা করা হয় সেনাবাহিনী তথা মুক্তিযুদ্ধের তিন বীর সেনানীকে।
হঠকারিতার চরম মূল্য : বিদ্রোহের পরিধি ক্রমশ বিভিন্ন ইউনিট-সাব ইউনিট পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছিল। নিরাপত্তাহীনতার কারণে বহু অফিসার ক্যান্টনমেন্ট ত্যাগ করেন। আমাদের অভ্যুত্থানের সঙ্গে কোনো যোগ না থাকা সত্ত্বেও একজন লেডি ডাক্তারসহ ১৩ জন অফিসারকে তথাকথিত বিপ্লবী সৈনিকেরা গুলি করে হত্যা করে। বীর মুক্তিযোদ্ধা লে. কর্নেল আবু ওসমান চৌধুরীর স্ত্রীকেও তারা হত্যা করে। জিয়াও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে হিমশিম খাচ্ছিলেন। ক্রমশ তিনি ৩ নভেম্বরের অভ্যুত্থানের পরিপ্রেক্ষিতে কথিত ভারতীয় জুজুর ভয় দেখিয়ে সিপাহিদের নিয়ন্ত্রণে আনলেন। উল্লেখ্য, তথাকথিত সিপাহি বিদ্রোহে অংশ নেওয়া এই সব সিপাহির বেশির ভাগই ছিল পাকিস্তান প্রত্যাগত। মাসখানেক হাসপাতালে থাকার পর ৭ ডিসেম্বর রিলিজ করা হলো আমাকে। তারপর পাঠানো হলো ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে প্রোটেক্টিভ কাস্টডিতে। জেলে থাকাকালে জিয়া ও তার সহযোগীরা আমার বির"দ্ধে ৭টি চার্জ তৈরি করেন, যার ৪টিই ছিল মৃত্যুদণ্ডযোগ্য অপরাধ। একটি তদন্ত আদালত গঠন করা হলো। তদন্ত আদালতের প্রেসিডেন্ট জেলেই আমার উপস্থিতিতে সাক্ষীদের সাক্ষ্যগ্রহণ করেন। লে. জেনারেল (অব.) নুর"দ্দিন খানসহ অনেকেই আমার বির"দ্ধে সাক্ষ্য দিতে আসেন। তাদের মধ্যে তৎকালীন দ্বিতীয় বেঙ্গলের সিওকে দেখে খুবই অবাক হলাম। প্রধান আসামি হিসেবে আমার পরই তার অবস্থান হওয়া উচিত ছিল। তিনি রাজসাক্ষীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়ে নিজেকে রক্ষা করেন এবং চাকরি বজায় রাখেন। মামলা অবশ্য বেশি দূর এগোয়নি।
এ সময় আরো ১২ জন সেনা অফিসার তৎকালীন গণভবনে বন্দী ছিলেন। এই মুহূর্তে যাদের নাম মনে পড়ছে তারা হলেন : কর্নেল মালেক (পরে এমপি ও মেয়র), লে. কর্নেল গাফফার (পরে এমপি ও মন্ত্রী), লে. কর্নেল জাফর ইমাম (পরে এমপি ও মন্ত্রী), মেজর আমিন, মেজর হাফিজ (পরে এমপি ও মন্ত্রী), মেজর ইকবাল (পরে এমপি ও মন্ত্রী), ক্যাপ্টেন কবির, ক্যাপ্টেন তাজ (পরে এমপি), ক্যাপ্টেন হাফিজউল্লাহ, ক্যাপ্টেন নাসির, ক্যাপ্টেন দীপক প্রমুখ। তিনজন অফিসার দেশত্যাগ করেন। এরা হলেন ব্রিগেডিয়ার নুর"জ্জামান (পরে রাষ্ট্রদূত, প্রয়াত), ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর ওসমান (পরে এমপি) ও লেফটেন্যান্ট কাদের। এ ছাড়া এয়ারফোর্সের ১২/১৩ জন অফিসারকে আটক রাখা হয়েছিল বিমানবাহিনী এলাকায়। তওয়াবের ব্যক্তিগত উদ্যোগে চটজলদি তাদের বিচার শেষ করা হয়। স্কোয়াড্রন লিডার লিয়াকতকে মৃত্যুদণ্ড এবং অন্যদের বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরে লিয়াকতের সাজা কমিয়ে দেওয়া হয় ১৪ বছরের জেল। এদিকে গণভবনে আটক সেনা কর্মকর্তাদের মধ্যে চারজনÑ মেজর হাফিজ, মেজর ইকবাল, ক্যাপ্টেন তাজ ও ক্যাপ্টেন হাফিজউল্লাহ এক পর্যায়ে পালিয়ে যায়। পালিয়ে গিয়ে তারা আশ্রয় নেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত প্রথম বেঙ্গলে, যাদের নিয়ে আমরা অভ্যুত্থান শুর" করেছিলাম। প্রথম বেঙ্গলকে ৭ নভেম্বরের পর জিয়া শাস্তিস্বরূপ ব্রাহ্মণবাড়িয়াতে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। পালিয়ে যাওয়া চারজন অফিসারকে আশ্রয়দানকারী প্রথম বেঙ্গলের বক্তব্য ছিল, ঐ অফিসাররা কোনো অপরাধ করেনি। তাদের যদি কোনো বিচার করতে হয় তবে ১৫ আগস্টের অভ্যুত্থানকারীদের বিচার আগে হতে হবে। কোনো অবস্থাতেই প্রথম বেঙ্গলকে এ অবস্থান থেকে টলানো গেলো না। চারজন অফিসারকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত সৈনিকদের কাছ থেকে সরিয়ে আনার জন্য পর্যায়ক্রমে হেলিকপ্টারে করে নেগোসিয়েশন টিম, সিজিএস মেজর জেনারেল মঞ্জুর, এমন কি সেনাপ্রধান জিয়া একাধিকবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া গেলেন। পালিয়ে যাওয়া চার অফিসার ও সৈনিকদের সঙ্গে আলাপ করলেন সিনিয়র অফিসাররা। কিš' তারা নিজেদের অবস্থানে অটল থাকলো। অপরদিকে তাদের ওপর ঊর্ধ্বতন সেনা কর্তৃপক্ষের চাপও অব্যাহত থাকে। ১৯৭৬ সালের মার্চের প্রথমদিকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সেনাদল ঢাকা অভিযানের চূড়ান্ত ঘোষণা প্রদান করে। এতে সেনাপ্রধান জিয়া ও তার সহকর্মীদের টনক নড়ে ওঠে। তারা তড়িঘড়ি এক আপস ফর্মুলা দিলেন। বলা হলো, আটক সব সেনা অফিসারকে ছেড়ে দেওয়া হবে। তবে আর্মিতে না রেখে বেশিরভাগ অফিসারকে বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। কেবল দৃষ্টান্ত হিসেবে একজন অফিসারÑ ৪৬তম ব্রিগেড কমান্ডার (অর্থাৎ আমার) বিচার করা হবে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় অবস্থানরত অফিসার ও সৈনিকেরা সেটা মানতে রাজি হলো না। তারা দাবি করলো, কোনো অফিসারের বিচার করা যাবে না এবং তাদেরকে চাকরিতে রাখতে হবে। বিক্ষুব্ধ সৈনিকরা সত্যি সত্যিই ঢাকা আসার উধ্যোগ নিলে জিয়া আবার ব্রাহ্মণবাড়িয়া যান এবং আশ্বস্ত করেন, কারো বির"দ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে না। এবার তিনি ঐ চারজন অফিসারকে নিজে সঙ্গে করে ঢাকায় নিয়ে আসেন। তবে এতো কিছুর পর ঐ চারজন অফিসার নিজেরাই আর সেনাবাহিনীতে থাকা সমীচীন মনে করেনি। অফিসার বা তাদের প্রতি সহানুভূতিশীল কেউই আর তার জন্য চাপাচাপিও করেনি। তবে জিয়া প্র

 

প্রকাশ করা হয়েছে: আমার দিনকাল  বিভাগে । বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০৯ ই নভেম্বর, ২০০৭ সকাল ৯:১৫
নরাধম বলেছেন: পুরোটা আসেনি মনে হচ্ছে। ইংরেজী অংশটাও আসেনি। একটু দেখবেন? অথবা লিংকটা দিবেন?

 

মোট সময় লেগেছে ১.৩৬৬৩ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
I think free speech is free speech no matter what, even if it does promote hatred. We also have the...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ