ভোর বেলা
একটা মেয়ে -
বয়স বাইশ -
তারুন্যে উচ্ছল -
ঘুম থেকে উঠে দ্রুত সাজগোজ করলো।
তার সাজে ভেসে উঠলো চিরন্তর বাঙালী সংস্কৃতির চিত্র। হয়তো খোঁপায় ফুলও গুজেছিলো - কিন্তু আমরা তা দেখতে পাইনি। কারন যখন আমরা তাকে দেখেছি তখন সে রক্তাক্ত হয়ে হাসপাতালের বিছানায় কাতরাচ্ছে।
মৌমিতা চৌধুরী - ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির ছাত্রী - আর শত শত বাঙালীর সাথে এসেছিলো বাঙালী সংস্কৃতির উৎসব পহেলা বৈশাখ পালন করতে রমনার বটমুলে। সাথে ছিলো তার প্রেমিক। নিশ্চয় তারা রবীন্দ্র সংগীতের মধুর মুর্ছনায় তাদের আগামী স্বপ্নগুলো নিয়ে আলাপ করছিলো।
আচমকা একটা বোমার শব্দ সব কিছু লন্ডভন্ড করে দেয়। মৌমিতা চেণ্টা করেছিলো নিজেকে বাঁচাতে। কিন্তু ওর দৌড়ানোর পথেও ঘাতকরা বোমা পেতে রেখেছিলো। সেই বোমার আঘাতে ক্ষতবিক্ষত হয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় মৌমিতা।
যখন মৌমিতার জ্ঞান ফিরে - দেখে সে নিজেকে হাসপাতালের শয্যায়। তার দু'টো পা কেটে ফেলা হয়েছে।
মৌমিতা চৌধুরীর আক্ষেপ - "আমি জানি আমার জীবন আর আগের মতো হবে না।"
কেন?
কেন মৌমিতাকে একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়ে স্বাধীনভাবে নিজের পছন্দের একটা অনুষ্ঠানে যাবার অপরাধে তার পা হারাতে হবে?
আমাদের রাষ্ট্রযন্ত্র মৌমিতার এতটুকু নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কিভাবে ব্যর্থ হলো?
সেইদিন মৌমিতার মতো আরো শতেক জন একইভাবে আহত হয়ে এই প্রশ্ন নিয়ে বেঁচে থাকবে বাকী জীবন।
সেই স্থানে বোমাবাজীতে নিহত ১০ জন কখনই জানবেনা কেন তাদের জীবন দিতে হয়েছে - কারা তাদের প্রতি এতো ঘৃনা পোষন করে।
(২)
সেই সময়কার সরকার পুরোপরি ব্যর্থ হয়েছে। পরের সরকার এসে মামলা যতভাবে পারেন বিপথে পাঠিয়েছে। মুক্তমানের মানুষদের উপরের হামলার দায় মুক্তমুনের মানুষদের উপর চাপিয়ে মৌলবাদীদের রক্ষার সব রকমের প্রক্রিয়া চালিয়েছে। তাই মৌমিতারা কখনই তাদের উপর ঘটে যাওয়া অন্যায়ের বিচার পায়নি।
২২ শে এপ্রিল ২০০৬ এর ডেইলি স্টার জানাচ্ছে আরো ভয়াবহ খবর। খবর রমনা বটমুলের বোমা হামলার এক আসামী মিজানুর রহমান স্বাধীন - যে তৎকালীন ছাত্রদলের সোরওয়াদ্র্দী কলেজের প্রভাবশালী নেতা ছিলো - সে এখন পুলিশের এস আই হিসাবে কর্মরত। জোট সরকারের সময়ে হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে সে পুলিশে যোগ দেয়। তার ভাই মাওলানা মতিউর রহমান মাতুয়াইল মসজিদের ইমান একজন বোমা তৈরীর বিশেষজ্ঞ হিসাবে গোয়েন্দা সংস্থার কাছে পরিচিত। এই অভিযুক্ত মিজানের আরেক ভাই জসিম বটমুলের বোমা হামলার বোমা বাহক হিসাবে অভিযুক্ত।
একটা দেশে যদি বোমা হামলার অভিযুক্তরা পুলিশের কর্মকর্তা হিসাবে দায়িত্ব পালন করে - সেই দেশে মুক্তবুদ্ধির চর্চার পক্ষের মানুষের জন্যে ভয়াবহ সময় অপেক্ষা করছে - এইটা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।
তাই দেখেছি একের পর এক হামলা - টার্গেট মুক্তি বুদ্ধির মানুষ - ড. হুমায়ুন আজাদ, শামসুর রাহমান, শাহ কিবরিয়া সহ আরো বিরাট বিছিল।
বোমা হামলা করে দেশকে বিপর্যস্থ করে মৌলবাদী ঘাতকরা আর মুক্তিবুদ্ধির পক্ষের মুনতাসির মামুন আর শাহরিয়ার কবিরকে রিমান্ডে নেওয়া হয়।
এইগুলো নিশ্চয় কোন সভ্য সমাজের চিত্রের সাথে খাপ খায় না! বরঞ্চ মনে করিয়ে দেয় তালেবান শাসনাধীন আফগানিষ্তানকে - যা মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে অর্জিত বাংলাদেশে কল্পনাও করা ঠিক না।
(৩)
সামনেই আসছে পহেলা বৈশাখ। অনেকে যাবেন রমার বটমুলে। উপভোগ করবেন সংগীতের মূর্ছনা। তাদের প্রতি অনুরোধ। এক মিনিটের জন্যে নিরবতা পালন করুন - মৌমিতাদের সাথে একাত্বতা ঘোষনা করুন। বটমুলের বোমা হামলার বিচারের দাবীতে স্বোচ্চার হোউন।
এবারে পহেলা বৈশাখ হোক সকল মৌলবাদের অবসানের বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনার দিন। একটা সুখী - আধুনিক বাংলাদেশের স্বপ্নের সবচেয়ে বড় বাঁধা মৌলবাদ আর অন্ধকারের শক্তি - যারা দেশকে অতীতে টেনে নিয়ে যেতে চায় - তাদের নির্মূলের অঙ্গীকার নিয়ে বাংলাদেশ পালন করুন "পহেলা বৈশাখ"।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই এপ্রিল, ২০০৮ রাত ৩:৫৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



