বিদেশ বিভুইএ থাকলে আরেকটা রোগে মানুষকে পেয়ে বসে। দেশের সব কিছুই মনে হয় অমৃতসম। দেশে থাকতে আমার খাবার টেবিলের নিষিদ্ধ আইটেমগুলো যেমন মুলা, শুটকী আর বেগুন যখন প্রবাসে নিজ হস্তে রন্ধন করে অমৃত মনে করে উপভোগ করেছি - তখন থেকেই এই রোগটা সম্পর্কে সচেতন হলাম। কিন্তু এই রোগের কোন চিকিতসা না পেয়ে - অবিরত দেশীয় খাবারের দিকে ঝুঁকে পড়ে বাংলাদেশী গ্রোসারী মালিকদের ব্যাংক একাউন্টকে সবল করছি। এখন চোখ বন্ধ করলেই দেখি - রাজবাড়ীর রেলগেটের কাছের ময়রার চমচম ( যদি সুযোগ থাকতো সেই ময়রাকে মিস্টির উপর নবেল জাতীয় কিছু একটা দিতাম), পোড়াবাড়ীর গরম গরম চমচম, মুক্তারপুরের ফেরী ঘাটের দৈ ( ব্রীজ হবার পর মনে হয় সেই দৈ বিবর্তনের ধারা অনুসরন করে বিলীন হয়ে যাবে) কিংবা মুন্সীগঞ্জের চিত্ত ঘোষের টিনের কোয়ার্টার প্লেটে এক স্লাইস দৈ'র উপরে ফেলে দেওয়া একটা ছোট্ট রসগোল্লার কথা।
ঘটনা হলো - কানাডায় দৈ পাওয়া যায়, যাকে ইয়োগার্ড নামে অভিহিত করা হয় - যা আবার কফি, স্ট্রবেরী বা চেরীসহ অন্যান্য গন্ধযুক্ত অবস্থায় পাওয়া যায়। নিরপেক্ষ গন্ধহীন দৈ পাওয়া যায় - টক দৈ- যাতে স্নেহ জাতীয় পদার্থেরও রকম ফের থাকে। সেগুলো অবশ্য চিনি মিশিয়ে খাওয়া যায়। তবে কোন ভাবেই তা মিস্টি আর দৈ এর দৈত স্বাদের কাছেও যেতে পারেনা।
দৈ নিয়ে আমার এই সুকঠিন আর বিশাল গবেষনা কর্মের কথা যখন গিন্নীর গোচরীভুত হলো - সে কঠিন চিন্তামগ্ন হয়ে গেল। ইতিউতি করে খুঁজতে লাগলো - দৈ'র রেসিপি। দৈএর রন্ধ প্রনালী পাওয়া গেল রান্নার বিখ্যাত বই এ। কিন্তু যখন খাবার টেবিলে এসে হাজির হলো সেই গৃহে তৈরী দৈ - দেখে মনে হলো দৈ আর মাঠার মাঝামাঝি কোন কিছু একটা হয়েছে। আর দেখতে যা হয়েছে - তা যাদের বাসায় ছোট বাচ্চা আছে তারা সহজেই অনুমান করতে পারবেন।
দৈ তৈরীর প্রক্রিয়া এমন ভাবে ভেস্তে যাওয়ায় গিন্নী খুবই মনোক্ষুন্ন হলো। সে সম্ভাব্য সকল বিশিষ্ঠ রাধুনীর ঘরে ফোনে ধর্ণা দিতে লাগলো। অবশেষে একজন বেশ আত্নবিশ্বাসের সাথে জানালেন - উনি প্রায় বগুড়ার দৈ এর কোয়ালিটি সম্পন্ন দৈ বানিয়ে সবাইকে খাওয়াবেন। একটা দিনও ধার্য্য হলো সেই দৈ খেতে যাবার। কিন্তু অনিবার্য কারনবসতঃ সেই দিনের কর্মসূচী বাতিল হয়ে গেল।
গিন্নী কিন্তু নাছোড় বান্দা - সে লেগেই থাকলো দৈ বানানোর বিশেষ রেসিপিটি জানার জন্যে।
অবশেষে একদিন আমাদের বাসায় দাওয়াত দিয়ে আনা হলো সেই বিশেষ দৈ প্রস্তুতকারককে। উনি এসে যেভাবে বুয়া বিষয়ক গল্প শুরু করলেন - তাতে কিছুটা হতাশ হলেও অনেকসময় ছাইএর নীচে আগুন থাকে বিবেচনায় উনার কথা মনোযোগ দিয়ে শুনার চেষ্টা করলাম। অনেক আলাপ আলোচনার পর দৈ এর রেসিপি নিয়ে কথা শুরু হলো। ভদ্রমহিলা বলছেন -
দৈ বানানোর জন্যে প্রথমে বুয়াকে দেশে (মানে গ্রামের বাড়ী) পাঠিয়ে দিতাম খাঁটি দুধ সংগ্রহ করার জন্যে।
তারপর বুয়াকে সব কাজ বাদ দিয়ে দুধ জ্বাল দিতে বলতাম।
মাঝে মধ্যে গিয়ে রান্নাঘরে গিয়ে দেখে আসতাম - বুয়া অমনোযোগী হচ্ছে কিনা বা দুধে পোড়া লাগলো কিনা।
দুধ যখন ঘন হয়ে আসতো তখন বুয়াকে বলতাম দুধটা ঠান্ডা করতে।
এর মধ্যে ভাল দই এর দোকান থেকে দৈ কিনে আনাতাম।
তারপর বুয়াকে বলতাম দৈ বসিয়ে দিতে।
রাতে বুয়াকে রান্নাঘরে ঘুমাতে বলতাম যাতে দৈ এর পাতিলে নাড়াচাড়া না হয়ে যায়।
ভোরে উঠে বুয়াকে বলতাম দৈ ফ্রীজে ঢুকিয়ে রাখতে।
রাতে মেহমানরা আসলে সেই দৈ আমি সুন্দর করে কেটে কেটে পরিবেশন করতাম।
সব শুনে গিন্নী দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো - সবইতো বুঝলাম, কিন্তু রেসিপির বুয়াটা পাবো কোথায়?
( এই মারাত্বক রেসিপিটা বিষাক্ত মানুষকে উতসর্গ করা হইল)
প্রবাস জীবনে - ৩ (নেকু দৈ রেসিপি)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
৫৩টি মন্তব্য ১৭টি উত্তর
পূর্বের ৫০টি মন্তব্য দেখুন
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।