(পৃথিবীর সকল মায়ের জন্যে সন্মান আর ভালবাসা কামনায়)
মাদার্স ডে নিয়ে পশ্চিমে বেশ একটা আবেগী ভাবধারা কাজ করে। হয়তো কেউ অনেকদিন মার সাথে দেখা করেনি - সেইদিন ফুল আর কেক নিয়ে মাকে দেখতে গেল। কঠিন পুঁজিবাদী সমাজের জীবনযুদ্ধে ব্যস্ত মানুষেরা যে একদিন সময় করে মার কথা স্মরন করে - এটাইবা কম কিসের?
আসলে বিষয়টা যতটা না হৈ চৈ - তার চেয়ে বেশী হলো বানিজ্যিক। এখানকার রিটেইল চেইনগুলো - যেমন ওয়ালমর্ট, জেলার্স বা কেমার্ট সারা বছরই কিছু না কিছু উপলক্ষ খোঁজে। তখন তাদের বিরাট স্টোরে একটা অংশে সেই দিবসের পণ্য দিয়ে ভরে ফেলে। যেমন - ইস্টারের সময় দেখা যায় বানির টকলেট, ফেব্রুয়ারী মাসে থাকে লাল রংগের গিফট আইটেম আর চকলেট আর ক্রীসমাসের কথা না হয় নাই বললাম। নভেম্বর থেকে স্টোরগুলো লাল-সবুজের ভড়ে যায়।
মাদার্স ডে তেমনি একটা দিন। মার জন্যে গিফট নিয়ে সন্তান মাকে দেখতে যাবে। মায়েরা অপেক্ষা করে বসে থাকে ওল্ড হোমে - কখন আসবে তার প্রিয় সন্তান। আর সন্তানকে পরদিন সমাজে মুখ রক্ষার জন্যে হলেও বলতে মা'র জন্যে একটা গিফট দিয়ে আসতে হয়।
(২)
এই ধরনের একটা দিনে একবার আমরা একটা দারুন মজা করেছিলাম। সেইবার আমার মা এসেছিলেন কানাডা বেড়াতে। মা'র বয়স তখন ৮০ এর বেশী। কিন্তু পড়াশুনা করার চিরাচরিত অভ্যাসটা ছাড়েননি। উনি আমাদের সপ্তাহ খানেক আগে মনে করিয়ে দিলেন - আগামী রোববার "বিশ্ব মা দিবস"। প্রথম বুঝিনি উনি বিশ্ব মা দিবস বলতে কি বুঝাচ্ছেন। পরে বুঝেছি - উনি আসলে "মাদার্স ডে"র কথা বলছেন।
মজার ঘটনা হলো - মা আসার পর থেকেই ক্রমাগত কানাডা সম্পর্কে অভিযোগ করে যাচ্ছিলেন। এই দেশের পানিতে গন্ধ, মাছ খাওয়া যায় না, চাল (বাসমতি) এতো বড় কেন, ইত্যাদি ইত্যাদি। আসার পর থেকেই একই ভাবে অভিযোগ চলছিলো - পরে জানতে পেরেছি - আমার ছোট ভাইএরা মাকে আসার সময় বলেছে - উনাকে আমি কানাডায় রেখে দেব। এখন উনি আমাকেসহ দেশে ফিরে যাবেন - সেইভাবেই প্রতিটি বিষয়ে নেতিবাচক মনোভাব জানিয়ে যখন কোন সুবিধা করতে পারলেন না - তখন দেশের মাটিকে উনার কবর হওয়াটা যে উনার শেষ ইচ্ছা সেইটাও জানিয়ে দিলেন।
আর এদিকে আমরাও কম যাইনা। একটার পর একটা ঘটনা ঘটিয়ে মাকে ব্যস্ত রাখার চেষ্টা করেই চলছি। এই অবস্থায় মাদার্স ডে নিয়ে গিন্নী একটা পরিকল্পনা করে ফেললো।
গোপনে বন্ধুবান্ধবদের পরিবারসহ দাওয়া দিয়ে রাখা হলো। আর এই বিল্ডিং এ থাকা আরেকটা পরিবারকে দিয়ে পরিকল্পনার অংশ হিসাবে মাকে বিকালে চায়ের দাওয়াত দেওয়ানো হলো। সমস্যা হলো মা কোন ভাবেই একা সেখানে যাবেন না। সেই পরিবারের একটা মেয়ে এসে অনেক অনেক কষ্ট করে মাকে নিয়ে গেল। তখন দ্রুত বাসার ভিতরটা সাজানো হলো। বেশ সুন্দর করে সবাই মিলে সাজালো। মেহমানদের অনেকে মার বাসা থেকে বেরুনোর জন্যে গাড়ীতে অপেক্ষাও করছিলো। এক ঘন্টার মধ্যে সবই তৈরী। খাবার অর্ডার দেওয়া ছিলো ইন্ডিয়ান রেস্টুরেন্টে আর অনেকে খাবার তৈরী করেও নিয়ে এসেছিলো মার জন্যে। যখন আসর জমজমাট তখন সবাই মিলে মায়ের জন্যে অপেক্ষা করার পালা। সেই দৃশ্যটা দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো বটে - মনে হচ্ছিলো স্বজন ছেড়ে হাজার মাইল দুরে বসবাস করা এই প্রবাসী মানুষগুলো সত্যই নিজের মায়ে জন্যেই অপেক্ষা করছে।
অবশেষে সেই পরিবারটা মাকে নিয়ে হাজির হলো - দরজা খোলার সাথে সাথে সবাই এক সাথে হৈ চৈ করে উঠলো মা কিছুটা বিব্রত হলেও সামলে নেন দ্রুতই। সবাই একে একে মাকে জড়িয়ে ধরে আদর দিতে লাগলো। বড়দের পর ছোটরাও এই কাজ করলো। দারুন একটা সময় = দারুন একটা অনুভুতি। আমার মা হয়ে গেলেন সবার মা - বাচ্চারা যারা এই দেশে জন্ম ও বড় হচ্ছে ওরা অবাক হয়ে দেখছে।
মা'কে নিয়ে আসা হলো সাজানো টেবিলের সামনে - বেশ বড় একটা কেক - মোমবাতিটা কে যে জ্বালিয়ে রেখেছিলো। মা'কে ঘিরে সব বাচ্চারা হৈ চৈ করে কেক কাটলো - কেক খাওয়ানো হলো। তারপর যথারীতি গল্প আর খাবার পালা। সবাই পালাক্রমে মার পাশে বসে ছবি উঠাচ্ছে - ভিডিও করলো আমার এক ভাগ্নে পুরো ঘটনাটা। ঘড়ির কাঁটা ঘুরে যখন একটা দিবসের সমাপ্তি টেনে ভিন্ন দিবসে নিয়ে গেল - মেহমানরা ধীরে ধীরে বিদায় নিলে - আমাদের মাদার্স ডে শেষ হলো।
তারপর কয়েকমাস ছিলেন মা আমাদের সাথে। যাবার আগে বেশ কয়েবার তাড়া দিয়ে সেইদিনের ভিডিওটাকে ডিভিডি করিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন।
পরের বছর ছোটভাই এর কাছে শুনেছি - মা এই দিনে ডিভিডিটা চালিয়ে দেখেছেন আর কেঁদেছেন। আর আমি আজও সেই দিনে সেই অনুষ্টানটার কথা মনে করে কিছুক্ষন নিরব থাকি। ভাবি আমার জীবনের সবর্শেষ অবস্থানের কথা - আমি কি এই অবস।তান চেয়েছিলাম কখনও?
প্রবাস জীবনে - ৪ ( আসল মা'কে নিয়ে মাদার্স ডে পালন)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৪টি মন্তব্য ৪টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র - ভ্রাম্যমান লাইব্রেরী ভাবনা

শ্রদ্ধেয় আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ স্যাররে হাতে গড়া প্রতিষ্ঠান বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র তার জন্মলগ্ন ১৯৭৮ সাল থেকে অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে। আমার মনে পড়ে, আমি স্কুলে পড়াকালীন সময়ে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র থেকে স্কুল... ...বাকিটুকু পড়ুন
=একান্ত নিজস্ব জিনিসগুলো পর হয়ে যাচ্ছে=

যে চোখ দিয়ে দেখেছি ধরার আলো, সে চোখও দিচ্ছে ফাঁকি,
যে চোখের আলোয় দেখেছি পুকুর নদী, শুকনো উঠোন;
বৃষ্টি ভেজা দিন, দেখেছি ময়না শালিক, ঘুঘু ডাকা দুপুর
সে চোখ পর হয়ে যাচ্ছে অল্প... ...বাকিটুকু পড়ুন
রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন
দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল
আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।