ব্লগার "বাফড়া" কয়েকবার মনে করিয়ে দিয়েছেন - আমার পোস্টের সংখ্যা ৬০০ হয়ে যাচ্ছে। ৬০০ সংখ্যাটি কি বিশেষ কোন গুরুত্ব বহন করে? ৫০, ১০০ তারপর ৫০০ - এগুলোকে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। কিন্তু ৬০০ কেন গুরুত্বপূর্ন হবে?
আর "বাফড়া"ই বা কে? কেন তার কথাটার গুরুত্ব দিতে হবে?
আমি সত্যই বাফড়া নিকের আড়ালের মানুষটাকে চিনি না - মনে হয় উনিও আমাকে চিনেন না। তাইলে আমরা কেন পরষ্পরকে গুরুত্ব দিচ্ছি?
এখানে হলো ব্লগিং করার নেশার কারনটা জানা যায়। আমরা একই ভাষায় কথা বলি - একই ভাষায় ভাবের আদানপ্রদান করি। আর সেখান থেকেই ভার্চুয়াল বাফড়া হয়ে উঠে মূর্তিমান একজন মানুষ। যার একটা একটা মানবিক অবয়ব আমার সামনে ভেসে উঠে। যিনি ব্যক্তিজীবনে হয়তো দারুন সংবেদশীল মানুষ। যার সংবেদশীলতা কিবোর্ড - মনিটর হয়ে আমাকে ছুঁয়ে যায়। আমি আমার প্রবাস জীবনে একজন বন্ধুর ষ্পর্শ অনুভব করি।
শুধু বাফড়াই বা কেন? শত শত ব্লগারের পদচারনায় মুখরিত ব্লগে যখন লগইন করি- অনুভব করি আমি বাংলাদেশের কোন এক লোকালয়ের মানুষের ভীড়ের ভিতর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছি। সবাই আমার স্বদেশী - স্বভাষী। আর পরিচিত জনের সাথে ভাবের আদান প্রদান করছি - কখনও বা হেসে হেসে আবার কখনও বা রেগে মেগে। ব্লগিং করার মধ্য দিয়ে আমি প্রতিদিন বাংলাদেশে বেড়াতে যাই - দেখি আমার পরিচিত কাওরান বাজার বা টিএসসি অথবা সিলেটের কোন গ্রাম। আমি নেশাষক্ত হয়ে যাই বাংলাদেশের মাটির সোঁদা গন্ধে আর মানুষের কোলাহলে।
তাই ধীরে ধীরে ব্লগ আর আমার দৈনন্দিন জীবনে এক করে ফেলি।
(২)
আমার প্রতিদিনের দেশ ভ্রমনের নেশায় মাঝে মধ্যে বাঁধা হয়ে দাড়ায় একদল কুলাঙ্গার - যার আমার মা - আমার দেশকে কলংকিত করে - তার রক্তাক্ত ইতিহাসকে মিথ্যার ধুলায় ঢেকে দিয়ে আমাদেরকে মায়ের ভিন্ন একটা চেহারা দেখায়। এরা ৭১ কে অস্বীকার করে - ৭১ এর হায়েনাদের মানুষের চেহারায় উপস্থাপনের চেষ্টা করে। আমি ক্ষিপ্ত হই - হৈ চৈ করে কিছু বলতে চাই। সেই চিৎকারই হয়তো কারো কারো কাছে লেখা মনে হয় - কিন্তু সত্য কথা বলতে কি - আমি লিখি না - আমি আমার জন্মদাত্রী মায়ের আব্রু রক্ষায় হৈ চৈ করি।
(৩)
কিভাবে ব্লগার হলাম। সেইটা একটা মজার ঘটনা। দেশে থাকতে টুকটাক লিখতাম। সেই লেখা হতো কাগজে - কলমের আচড়ে। কোন পত্রিকা অফিসের ঠিকানায় পাঠিয়ে অপেক্ষা করা। নতুবা কোন ম্যাগাজিনে ছাপিয়ে তা যত্নকরে ঘরে নিয়ে আসা। যখন দেশের বাইরে চলে আসি - তখন একটুকরো বাংলা লেখা কাগজকে মহার্ঘ মনে হতো। লেখার নেশায় অস্থির হয়ে থাকতাম। ধীরে ধীরে কম্পিউটারে বাংলার কৌশলটা রপ্ত করলাম। লেখা শুরু করলাম বিভিন্ন ফোরামে।
গতবছর ওয়েব ব্রাউজিং করার সুবাদে সামহোয়ার খোঁজ পেয়ে রেজিষ্ট্রি করি - সেইটা করি স্বনামে। কিন্তু শুরুটা ভাল হয়নি। ২য় দিনেই মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে একটা বাজে ধরনের পোস্টে কমেন্ট করে একটা বিশ্রী গালি শুনি। কষ্ট লাগে। মনে করেছিলাম এই কাজটা আমার পোষাবে না। তিন দিন চুপচাপ দেখলাম। লগইন না করে অনেকের লেখা পড়লাম। দেখলাম একদল সুপরিকল্পিত ভাবে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বিকৃতিকে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করছে। তারমধ্যে একজন কুখ্যাত জামাতির দুইছেলে - তাদের বন্ধু আর বান্ধবীরা আছে। আর অন্যদিকে হাসান মোরশেদ, অমি রহমান পিয়াল আর আডাবাজ'রা ক্রমাগত তাদের সাথে যুক্তি তর্ক করে যাচ্ছে। একদল বিরক্ত হয়ে গালাগালির রাস্তা ধরেছে। সিদ্ধান্ত নিলাম মুক্তিযুদ্ধের কাফেলায় যোগ দেব। ভিন্ন নামে একটা নিক নিলাম - যা এখন আমার পরিচয় - এস্কিমো। এই ধরনের নিক নেবার একটা সুবিধা হলো - গালি খেলে গায়ে লাগে না। এর মধ্যে একদিন একটা পোস্ট দিলে আমি গালি খেতে শুরু করলাম - তখন জেবতিক আরিফ পরামর্শ দিলেন - ব্লগ করুন। দারুন এক মজা - ব্লগ করা গালিবাজরা বাইরে থেকে কম রেটিং করা বা মাইনাস দিতে থাকলো - আর আমি মনে আনন্দে আমার কথাগুলো বলতে থাকলাম। পেলাম প্রচুর সমর্থন - আমার মন কৃতজ্ঞতায় ভরে উঠলো।
একসময় মনে হতো - একজন নাগরিক আবশ্যিক ভাবেই তার দেশের জন্মের ইতিহাস জানবে - সেইটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ব্লগিং করতে এসে বোকা হয়ে গেলাম - অনেকে ইতিহাসের কঠিন অংশগুলো জানেনা। মনে পড়লো পাকিস্থানীদের কথা - পুরো জাতিকে শাসকগোষ্ঠী ৫০ বছর ধরে অন্ধকারে রাখতে সমর্থ হয়েছে -বাংলাদেশেও বুঝি তাই হবে। চেষ্টা করলাম ইতিহাস থেকে কিছু কিছু অংশ তুলে ধরতে - ইতিহাস বলি কেন - আমিওতো সেই সময়ের স্বাক্ষী। দেখলাম প্রচুর তরুন আর কিশোর- কিশোরী আগ্রহী হয়ে সেই লেখা পড়ছে। ভাল লাগলো।
এভাবে সময় কেটে যাচ্ছিলো। জামাত - শিবিরের ম্যানুয়াল পোষ্টানো ব্লগাররা ধীরে ধীরে পিছনে হটে গেল। অবশ্যই তার জন্যে একঝাক মেধাবী আর তুখোড় ব্লগারের কথা স্মরন করতেই হয়। এরা নানান সময়ে তাদের ক্ষোভ প্রকাশশ করতে গিয়ে ব্লগের কর্তৃপক্ষের খড়গের নীচে পড়েছে। আবার ফিরে এসেছে - তাদের শ্রম আর মেধা দিয়ে ব্লগটা রাজাকারিতা মুক্ত করতে কাজ করেছে। তাদের কাছে আমার কৃতজ্ঞতার সীমা নেই।
এই সময়ে ব্লগের ঘটনা প্রবাহে বিরক্ত হয়ে একদল চমৎকার লেখক চলে গিয়েছেন। চালু হয়েছে নতুন ব্লগ - সচলায়তন। আমিও ভেবেছি চলে যাবো - কিন্তু অদৃশ্য একটা সুতার টানে ব্লগটা ছাড়তে পারিনি। তারপর আবার একদল ব্লগার সরে গিয়ে "প্যাচালী" তৈরী করে সেখানে ঘর বেধেছে - নীতিগত কারনে সেখানে যাবার প্রয়োজন মনে করিনি। এখন আরেকটা ব্লগ তৈরী হয়েছে - "আমার ব্লগ" - সেখানেও চলে যাবো চলে যাবো করে যাওয়া হচ্ছে না। সামহোয়ারকে ছেড়ে যেতে আমার কষ্ট হচ্ছে।
কেন?
কারন হয়তো - সামহোয়ারের কারিগরী সুবিধা। অনলাইনে বাংলা ভাষায় সবচেয়ে সহজে লেখার সুবিধা মনে হয় এখানেই আছে। সবচেয়ে বড় যে কারনটা - তা হলো এখানে আমি মাটির গন্ধ পাই। সমাজের বিভিন্ন শ্রেনীর মানুষের - বিভিন্ন বয়সের মানুষের - বিভিন্ন ভাবনার মানুষের ভীড়ে নিজেকে হারিয়ে ফিরে পাই স্বদেশটাকে। আমি এই লোভ সামলাবো কিভাবে?
(৪)
আমি ধীরে ধীরে ব্লগাসক্ত হয়ে পড়েছি। সব ফোরামের লেখা বাদ দিয়ে নিয়মিত ব্লগ লেখি। কারন এখানে সহজেই আমার ভাবনাকে অন্যদের সাথে ভাগাভাগি করতে পারি। বুঝতে পারি আমার ভাবনার ভুলগুলো। এতে হয়তো কখনও সখনও কোন ব্লগারের সাথে ভুল বুঝাবুঝি হয়। কিন্তু সেতো শুধু বিতর্কের খাতিরেই। কিন্তু যখন দেখি কোন ব্লগার বিতর্ককে ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিয়ে দিনের পর দিন তা বহন করে বেড়ায় - আমি কুন্ঠিত হই। ক্ষমা চাইবার সুযোগ খুজিঁ। হয়তো সব সময় সেইটা সম্ভব হয়না। একটা কথা আজ সুস্পষ্ট ভাবে বলা দরকার - দেশ আমার মা - দেশ থেকে যতদুরেই থাকি - তাতে দেশের সাথে আমার সম্পর্ক কোনভাবেই শেষ হয়ে যায় না। কেউ কেউ প্রবাসীদের দেশপ্রেম নিয়ে কটাক্ষ করেন। দেশ প্রেমের পরীক্ষায় কতো পাবো জানি না - তবে যতটুকুই ভালবাসি - সেইটুকু নিখাদ - খাঁটি। দেশ থেকে কোন কিছু পাবার নেই আমার - কোন অনুরাগ নেই - কোন অভিযোগ নেই। একন শুধু দেবার পালা - যেভাবেই হোক - সেই ঋণ শোধ করার চেষ্টা করি। তাই দেশের কোন অপমান দেখলে বিরক্ত হই - প্রতিবাদ করি। রাজাকারিতাকে দেশের শত্রু বিবেচনা করি - তাই তাদের সাথে কোন অপোষ নেই। একদম জিরো টলারেন্স। আমার এই অবস্থান হয়তো অনেকের কাছে চরমপন্থী বিবেচিত হতে পারে - কিন্তু কিছু করার নেই। কারন এটাই আমি।
(৫)
৬০০ পোস্টে কি লিখেছি। জানি না। কোন কোন পোস্ট লেখার পর দারুন ভাল লেগেছে। উপভোগ করেছি। কোন কোন পোস্ট লেখার পর পাঠকদের মন্তব্যের পর উপভোগ করেছি। কোন কোন পোস্ট লিখে বিরক্ত হয়েছি। জানি না পাঠকদের কাছে কতটা নিজের কথা পৌছাতে পেরেছি। অনেক কথাই লিখেছি - আসলে কি লিখতে পেরেছি সেই কথাটা - যা বলতে চাই - নাকি শুধু শুধু পাঠকাদের বিভ্রান্ত করেছি -
"অনেক কথা যাও যে বলি - কোন কথা না বলি"
জানি না। পাঠকরাই বিবেচনা করবেন।
সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই জুলাই, ২০০৮ সন্ধ্যা ৭:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


