১৯৮৬ সালের ঘটনা।
তখন গুলিস্তানে বিআরটিসির নারায়নগঞ্জের বাসস্টান্ডটা ছিলো সবচেয়ে জমজমাট জায়গা। অন্যকোন বাস গুলিস্তানে আসতো না। সেই বাসস্টান্ডের ঢোকার মুখে একটা ভিক্ষুক সমগ্র শরীরের চটমুড়ে শুয়ে থাকতো। ওর মুখটা শুধু দেখা যেত। শরীরের অর্ধেকটা অনেক সময় ড্রেনের পানিতে চুবানো থাকতো। ভনভন করতো মাছি। ভয়াবহ দৃশ্য। যে কেউ দৃশ্যটা দেখে আবেগপ্রবন হয়ে যাবার সম্ভাবনা ছিলো।
আমি ছিলাম প্রায় ডেইলি প্যাসেঞ্জার। প্রতিদিনই লোকটিকে দেখতাম একই ভঙ্গীতে পড়ে আছে। প্রায়ই পকেটে হাত দিয়ে যা খুচরো পেতাম - দিয়ে দিতাম। মাঝে মধ্যে এক-দুই টাকাও দিতাম। এখানে বলে রাখা ভালো - গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ি বাসভাড়া ছিলো ৭৫ পয়সা মাত্র।
একদিন হরতালে পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হলো - তাই হরতালের ভিতরেই হেঁটে নারিন্দা রওয়ানা দিলাম। সাথে আরেক বন্ধু।
হাঁটতে হাঁটতে আগামসীহ লেনে পর্যন্ত আসার পর মনে হলো একটা বিড়ি টানলে মন্দ হয় না। তার আগে এক কাপ চায়ের আশায় গলির ভিতরের একটা টং এর দোকানে ঢুকে বসে পড়লাম। চায়ের জন্যে অপেক্ষা করার সময় চোখটা গেল সামনের লোকটা দিকে। মনে হচ্ছিলো লোকটিকে খুবই চেনা। কিন্তু প্রথম দিকে চিনতে কষ্ট হলেও - পরে ঠিকই চিনলাম - এই লোকটিই চট পেঁচিয়ে গুলিস্তানে ভিক্ষা করে। কোথায় ওর চটের পোষাক আর কোথায় আজ পরিষ্কার সাদা পাঞ্জাবী!
টেবিল বদলে ওদের টেবিলে গিয়ে বসে হ্যান্ডসেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম - কেমন আছেন, আজ কাজে কামে যান নাই কেন?
- জ্বী, আইজতো হরতাল।
- আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?
- না, ঠিক চিনলাম না।
- না চিনারই কথা। কত মানুষকে চিনবেন। আর চিনেই বা দরকার কি! কতমানুষ আপনেরে ভিক্ষা দেয়।
লোকটি প্রথমদিকে বোকা হয়ে গেলেও দ্রুত বুঝে গেল আমি আসলে কি বলছি। হঠাৎ করে লাফ দিয়ে চেয়ার উপরে উঠে স্বল্প উঁচু বেড়ার উপর দিয়ে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়েই দৌড়।
বন্ধুসহ বাকী সবাই জানতে চাইলো - লোকটি এই ব্যবহার করেছে কেন?
ঘটনা খুলে বলার পর সবাই বরলো - ওরে মাইর দিলেন না কেন?
আমিএ ভাবলাম - আসলেই মাইর দিলাম না কেন? মাইর দিলেই কি এই সমস্যার সমাধান হবে।
এর পর থেকে কোন ভিক্ষুককেই ভিক্ষা দেইনি।কারন ভিক্ষা দেওয়া মানেই একজন মানব সন্তানকে করুনা করা - যা করার অধিকার বা ধৃষ্টতা আমার নেই। ভিক্ষা দিয়ে সমাজে একদল কর্মবিমুখ মানুষ তৈরী করার চেয়ে কয়েক বছরের সকল ভিক্ষার অর্থ যদি একজন মানুষকে দিয়ে কর্মের সংস্থান করা যায় তাই ভাল হয় - সেই বিবেচনায় কাজ করি।
(২)
বিপন্নকে অর্থ সাহায্য দিয়ে হয়তো সাময়িক সমাধান হয় - কিন্তু প্রকৃত অর্থে একটা সামাজিক কাঠামো তৈরী করে বিপন্ন মানুষকে সেই কাঠামোর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার একটা স্থায়ী ব্যবস্থার চিন্তা করা উত্তম মনে করি। একজন বিপদাপন্ন মানুষের সাহায্যের জন্যে একটা লাশের অংসলগ্ন রঙ্গিন ছবি প্রদর্শনও কিন্তু সেই মৃত মানুষটাকে অপমান করা হয়। জীবিত থাকলে কি সেই মানুষটি এইরকম ছবি ছাপানোর সুযোগ দিতো? এই প্রশ্নটি কি আমরা নিজেদের করতে পারি না?
মারাত্বক ছবি প্রদর্শন করে বিবেককে নাড়া দেওয়ার চিন্তা অনেকেই করে। কথা হলো যারা এই অমাবিক কাজটা করেছে ওদের বিবেক নড়ে কি - নাকি যারা এই ধরনের কুকর্মের বিরোধী তাদের উপর একটা মানসিক চাপ তৈরী হয়। সেই চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি হয়তো মিলে সামান্য কিছু টাকা ওয়ালেট থেকে বের করে দিয়ে। কিন্তু আরেকজন যে এই ধরনের নির্মমতার শিকার হবে না - এই নিশ্চয়তার আশা কি করতে পারে।
তাই - সবাইকে অনুরোধ করবো - সাহায্য চাওয়ার আশায় এমন কিছু করবেন না - যাতে সমাজের সবাই এই ধরনের অরুচিকর দৃশ্যে অভ্যস্থ হযে যায়। বরঞ্চ একটা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে সকলের কাছে আহ্বান করুন।
প্রসংগক্রমে একটা কথা বলা দরকার - দীর্ঘদিন কানাডায় আছি - এখনেও অনেক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘঠে - সড়ক দূর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যায় - খুন হয়। এই খবরও কিছু টিভি চ্যানেল দিনরাত প্রচার করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা লাশের ছবি টিভিতে দেখিনি। সেই কারনেই হয়তো বাংলাদেশের টিভির খবর বা ব্লগের বিকৃত ছবিগুলো সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার জন্যে।
আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি - মানুষের করুন পরিনতি নিয়ে কঠিন সাহিত্যের ভাষা চর্চার লোভ পরিত্যাগ করা জরুরী। বস্তুত মানুষ যে কত নির্মম আর নিষ্টুর তা আলাদা করে দেখানো দরকার আছে কি? ১৯৭১ সালের যুদ্ধের দিনগুলোর ছবি বা আজকের ইরাকে ছবি দেখলেই কি বুঝা যায়।
শেষ কথা হলো মানুষের কষ্ট - দুর্দশা আর অসহায়ত্ব বুঝার জন্যে একটা বাক্যই যেখানে যদি যথেষ্ঠ হয় না - বিভৎস রঙ্গিন ছবি প্রদর্শন করা প্রয়োজন হয় - সেই সমাজে মুলত কোন বিবেক কাজ করে না। দয়া করে মানুষকে উপলদ্ধির চর্চার সুযোগ দিন।
ভিক্ষা নয় - সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে সহায়তার কথা বলুন।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:২৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



