somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

সেইদিন থেকে ভিক্ষা দেওয়া বন্ধ করেছি - তবে সহায়তা করার পক্ষে।

১১ ই নভেম্বর, ২০০৮ রাত ৩:৩৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

১৯৮৬ সালের ঘটনা।

তখন গুলিস্তানে বিআরটিসির নারায়নগঞ্জের বাসস্টান্ডটা ছিলো সবচেয়ে জমজমাট জায়গা। অন্যকোন বাস গুলিস্তানে আসতো না। সেই বাসস্টান্ডের ঢোকার মুখে একটা ভিক্ষুক সমগ্র শরীরের চটমুড়ে শুয়ে থাকতো। ওর মুখটা শুধু দেখা যেত। শরীরের অর্ধেকটা অনেক সময় ড্রেনের পানিতে চুবানো থাকতো। ভনভন করতো মাছি। ভয়াবহ দৃশ্য। যে কেউ দৃশ্যটা দেখে আবেগপ্রবন হয়ে যাবার সম্ভাবনা ছিলো।

আমি ছিলাম প্রায় ডেইলি প‌্যাসেঞ্জার। প্রতিদিনই লোকটিকে দেখতাম একই ভঙ্গীতে পড়ে আছে। প্রায়ই পকেটে হাত দিয়ে যা খুচরো পেতাম - দিয়ে দিতাম। মাঝে মধ্যে এক-দুই টাকাও দিতাম। এখানে বলে রাখা ভালো - গুলিস্তান থেকে যাত্রাবাড়ি বাসভাড়া ছিলো ৭৫ পয়সা মাত্র।

একদিন হরতালে পরিস্থিতি অবনতি হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় অনির্দিষ্ট কালের জন্যে বন্ধ করে দেওয়া হলো - তাই হরতালের ভিতরেই হেঁটে নারিন্দা রওয়ানা দিলাম। সাথে আরেক বন্ধু।

হাঁটতে হাঁটতে আগামসীহ লেনে পর্যন্ত আসার পর মনে হলো একটা বিড়ি টানলে মন্দ হয় না। তার আগে এক কাপ চায়ের আশায় গলির ভিতরের একটা টং এর দোকানে ঢুকে বসে পড়লাম। চায়ের জন্যে অপেক্ষা করার সময় চোখটা গেল সামনের লোকটা দিকে। মনে হচ্ছিলো লোকটিকে খুবই চেনা। কিন্তু প্রথম দিকে চিনতে কষ্ট হলেও - পরে ঠিকই চিনলাম - এই লোকটিই চট পেঁচিয়ে গুলিস্তানে ভিক্ষা করে। কোথায় ওর চটের পোষাক আর কোথায় আজ পরিষ্কার সাদা পাঞ্জাবী!

টেবিল বদলে ওদের টেবিলে গিয়ে বসে হ্যান্ডসেক করার জন্যে হাত বাড়িয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম - কেমন আছেন, আজ কাজে কামে যান নাই কেন?

- জ্বী, আইজতো হরতাল।

- আপনি কি আমাকে চিনতে পারছেন?

- না, ঠিক চিনলাম না।

- না চিনারই কথা। কত মানুষকে চিনবেন। আর চিনেই বা দরকার কি! কতমানুষ আপনেরে ভিক্ষা দেয়।

লোকটি প্রথমদিকে বোকা হয়ে গেলেও দ্রুত বুঝে গেল আমি আসলে কি বলছি। হঠাৎ করে লাফ দিয়ে চেয়ার উপরে উঠে স্বল্প উঁচু বেড়ার উপর দিয়ে লাফ দিয়ে রাস্তায় পড়েই দৌড়।

বন্ধুসহ বাকী সবাই জানতে চাইলো - লোকটি এই ব্যবহার করেছে কেন?

ঘটনা খুলে বলার পর সবাই বরলো - ওরে মাইর দিলেন না কেন?

আমিএ ভাবলাম - আসলেই মাইর দিলাম না কেন? মাইর দিলেই কি এই সমস্যার সমাধান হবে।

এর পর থেকে কোন ভিক্ষুককেই ভিক্ষা দেইনি।কারন ভিক্ষা দেওয়া মানেই একজন মানব সন্তানকে করুনা করা - যা করার অধিকার বা ধৃষ্টতা আমার নেই। ভিক্ষা দিয়ে সমাজে একদল কর্মবিমুখ মানুষ তৈরী করার চেয়ে কয়েক বছরের সকল ভিক্ষার অর্থ যদি একজন মানুষকে দিয়ে কর্মের সংস্থান করা যায় তাই ভাল হয় - সেই বিবেচনায় কাজ করি।

(২)

বিপন্নকে অর্থ সাহায্য দিয়ে হয়তো সাময়িক সমাধান হয় - কিন্তু প্রকৃত অর্থে একটা সামাজিক কাঠামো তৈরী করে বিপন্ন মানুষকে সেই কাঠামোর মাধ্যমে সহায়তা দেওয়ার একটা স্থায়ী ব্যবস্থার চিন্তা করা উত্তম মনে করি। একজন বিপদাপন্ন মানুষের সাহায্যের জন্যে একটা লাশের অংসলগ্ন রঙ্গিন ছবি প্রদর্শনও কিন্তু সেই মৃত মানুষটাকে অপমান করা হয়। জীবিত থাকলে কি সেই মানুষটি এইরকম ছবি ছাপানোর সুযোগ দিতো? এই প্রশ্নটি কি আমরা নিজেদের করতে পারি না?

মারাত্বক ছবি প্রদর্শন করে বিবেককে নাড়া দেওয়ার চিন্তা অনেকেই করে। কথা হলো যারা এই অমাবিক কাজটা করেছে ওদের বিবেক নড়ে কি - নাকি যারা এই ধরনের কুকর্মের বিরোধী তাদের উপর একটা মানসিক চাপ তৈরী হয়। সেই চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি হয়তো মিলে সামান্য কিছু টাকা ওয়ালেট থেকে বের করে দিয়ে। কিন্তু আরেকজন যে এই ধরনের নির্মমতার শিকার হবে না - এই নিশ্চয়তার আশা কি করতে পারে।

তাই - সবাইকে অনুরোধ করবো - সাহায্য চাওয়ার আশায় এমন কিছু করবেন না - যাতে সমাজের সবাই এই ধরনের অরুচিকর দৃশ্যে অভ্যস্থ হযে যায়। বরঞ্চ একটা সুস্পষ্ট পরিকল্পনা করে সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্যে সকলের কাছে আহ্বান করুন।

প্রসংগক্রমে একটা কথা বলা দরকার - দীর্ঘদিন কানাডায় আছি - এখনেও অনেক হৃদয় বিদারক ঘটনা ঘঠে - সড়ক দূর্ঘটনায় প্রতিদিন মানুষ মারা যায় - খুন হয়। এই খবরও কিছু টিভি চ্যানেল দিনরাত প্রচার করে। কিন্তু আজ পর্যন্ত একটা লাশের ছবি টিভিতে দেখিনি। সেই কারনেই হয়তো বাংলাদেশের টিভির খবর বা ব্লগের বিকৃত ছবিগুলো সহ্য করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে আমার জন্যে।

আমি দৃঢ় ভাবে বিশ্বাস করি - মানুষের করুন পরিনতি নিয়ে কঠিন সাহিত্যের ভাষা চর্চার লোভ পরিত্যাগ করা জরুরী। বস্তুত মানুষ যে কত নির্মম আর নিষ্টুর তা আলাদা করে দেখানো দরকার আছে কি? ১৯৭১ সালের যুদ্ধের দিনগুলোর ছবি বা আজকের ইরাকে ছবি দেখলেই কি বুঝা যায়।

শেষ কথা হলো মানুষের কষ্ট - দুর্দশা আর অসহায়ত্ব বুঝার জন্যে একটা বাক্যই যেখানে যদি যথেষ্ঠ হয় না - বিভৎস রঙ্গিন ছবি প্রদর্শন করা প্রয়োজন হয় - সেই সমাজে মুলত কোন বিবেক কাজ করে না। দয়া করে মানুষকে উপলদ্ধির চর্চার সুযোগ দিন।

ভিক্ষা নয় - সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার ভিত্তিতে সহায়তার কথা বলুন।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই নভেম্বর, ২০০৮ ভোর ৫:২৩
২০টি মন্তব্য ১২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

বিলিয়নিয়ার রবিন খুদা ও আমাদের জাতীয় অগ্রাধিকার

লিখেছেন জুয়েল তাজিম, ০৯ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৩:৩০

বাংলাদেশে এখন সবচেয়ে জরুরি বিষয় কী?

কর্মসংস্থান? না।

বিনিয়োগ? না।

ডলার সংকট? না।

গার্মেন্টস খাতে ছাঁটাই? না।

ব্যাংকিং খাতের আস্থা সংকট? না।

সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো— কোনো অনুষ্ঠানে জুলাই চেতনা কত মিলিলিটার ঢুকেছে, কে কতবার উচ্চারণ... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

পণ্ডশ্রম

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১০ ই জুন, ২০২৬ রাত ১২:৩৪



এই নিয়েছে ঐ নিল যাঃ! কান নিয়েছে চিলে,

চিলের পিছে মরছি ঘুরে আমরা সবাই মিলে।

কানের খোঁজে ছুটছি মাঠে, কাটছি সাঁতার বিলে,

আকাশ থেকে চিলটাকে আজ ফেলব পেড়ে ঢিলে।

দিন-দুপুরে জ্যান্ত আহা, কানটা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×