রাজনীতিতে ব্রাকেট বন্দী হওয়ার শুরু হয় ১৯৭২ সালেই। বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের জন্যে একদল হটকারীর নেতৃত্বে উদ্দীপত তরুনদের নিয়ে যখন জাসদের জন্ম হলো - তখন ছাত্রলীগও দুইভাগে ভাগ হয়ে যায়। প্রচলিত ভাষায় যদিও একদলকে জাসদ ছাত্রলীগ আর মুজিববাদী ছাত্রলীগ বলা হতো - কিন্তু এদের কেউই তাদের মৌলিকত্বের দাবী ছাড়তে রাজী না হওয়ায় সাধারন মানুষের আলাদা করতে অসুবিধা হতো - কে কোনটা। সেই অসুবিধা বিবেচনা করে সংবাদপত্রগুলো শুরু করলো ছাত্রলীগ (...) হিসাবে লেখা। সেই ব্রাকেটের ভিতরে সভাপতি আর সাধারন সম্পাদকে নাম বা নামের প্রথম বর্ন থাকতো)।
মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির সূচনা করতেই বাংলাদেশের প্রায় সব দলই ( কমিউনিস্ট পার্টি ছাড়া) ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যায়। তখন শুরু হয় ব্রাকেটের ছড়াছড়ি। একসময় আওয়ামীলীগ (মালেক), আওয়ামীলীগ (মহিউদ্দিন), আওয়ামীলীগ (ফরিদগাজী) আর আওয়ামীলীগ( মিজান) নামে চারটা অংশ ছিলো। জাসদ ভেঙ্গে জাসদ (রব) আর জাসদ (শাহজাহান সিরাজ) পরে জাসদ থেকে বেড়িয়ে কয়েকজন বাসদ গঠন করে যা অচিরেই ভাঙ্গনে মুখে পড়ে বাসদ (খালেকুজ্জামান) আর বাসদ(মাহবুবুল হক) হয়ে যায়।
ভাসানী ন্যাপ ভেঙ্গে (নাসের) আর (মসিউর রহমান), সাম্যবাদী দল হয় সাম্যবাদী( তোয়াহা) আর সাম্যবাদী (দীলিপ বড়ুয়া)।
বলা দরকার যে এই ভাংগনের খেলা সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ হয় বামপন্থীরা। এদের কার্যকলাপে নিজেদের মধ্যে ঐক্য ধরে রাখার চেয়ে যে ভাঙ্গনেই বেশী উৎসাহী ছিলো। এদের মধ্যে একটা কথা প্রচলিত ছিলো - ভাঙ্গনেই শক্তি - পদার্থ ভেঙ্গে অনু আর অনু ভেঙ্গে যখন পরমানু পর্যায়ে যায় - তখন শক্তির আসল রূপ দেখা যায়। বিপুল বিক্রমে দলগুলো হল ভাড়া করে সন্মেলন করে বহিষ্কার আর পাল্টা বহিষ্কারের মধ্য দিয়ে এই ভাঙ্গনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতো। সবাই দাবী করতো তারাই আসল।
ব্যাকেটবন্দী রাজনীতির দূর্বল আর জনবিচ্ছিন্নতার বিপরীতে জিয়াউর রহমান জাতীয়তাবাদী দল গঠন আর সংগঠিত করেন। এক পর্যায়ে এই দলটিও ভাঙ্গন থেকে মুক্তি পায়নি।
মুলত লে জে হোমো এরশাদের ক্ষমতাগ্রহন আর বিএনপিকে ভেঙ্গে বিএনপি (হুদা-মতিন), বিএনপি (ছাত্তার) আর বিএনপি (নীলু) তৈরীর মাধ্যমে ব্রাকেটবন্দী রাজনীতির সমাপ্তির সুচনা করেন।
তারপরের যুগ হলো জোটবন্দী রাজনীতি। ব্রাকেটবন্দী রাজনীতির পিছনে ছিলো ক্ষমতা আর অর্থের হাতছানি। বস্তুত ব্যক্তিগত লাভের আশায় রাজনীতিবিদরা দল ভেঙ্গে নতুন দল - কেউ ভগ্নাংশ নিয়ে সরকারী দলে যোগ দিতো আর কেউবা নতুন নামে সরকারী দলের দালালীতে নিয়োজিত হতো। সেখানে প্রকৃতপক্ষে আদর্শ বা জনগনের বিষয়টা অর্থহীন ছিলো।
জোটবন্দী রাজনীতির ক্ষেত্রেও তেমনি শুধু মাত্র ক্ষমতায় যাওয়া যোগ অংকটাই আসল। এখানে সহজেই মুক্তিযুদ্ধা সাদেক হোসেন খোকা আর আল্ বদর নিজামী যেমন একই টেবিলে বসে পা দোলায় - তেমনি আব্দুল জলিল আর কাজী জাফর একই সুরে কথা কয়। আদর্শ আর ইতিহাসের দিকে এরা ভুলে তাকায় না।
(২)
জোটবন্দী রাজনীতির বিষয়ে কথা বলা আগে দুই জোটে বিভক্ত বাংলাদেশের দুই নিউক্লিয়াস নিয়ে কিছু বলা দরকার। ১৯৮১ আর ১৯৮৩ সালে রাজনীতিতে যখন চরম অনিশ্চয়তা - বেঁচাকেনা হাটে যখন রাজনীতিবিদগন নিজেদের বিলিয়ে দিচ্ছেন ব্যাকেট বন্দী সংস্কৃতিতে। তখন দুইজন বুদ্ধিমান লোক এগিয়ে এলেন রাজনীতিতে ঐক্যের ফর্মুলা নিয়ে। একজন হলেন ড. কামাল হোসেন - যিনি শেখ হাসিনাকে আওয়ামীলীগের সভানেত্রী নির্বাচিত হতে মুল ভুমিকা রাখেন আর একজন হলেন মুক্তিযুদ্ধের বিরোধীতা করা স্বত্বেও যিনি স্বাধীনতার ঘোষক জিয়ার মন্ত্রীসভার প্রধান মন্ত্রী ছিলেন - শাহ আজিজুর রহমান - যিনি বেগম খালেদা জিয়াকে বিএনপির চেয়ারপার্সন নির্বাচিত করতে মুল ভুমিকা রাখেন। একজন নিহত প্রেসিডেন্টের নির্বাসিত কন্যা আরেকজন নিহত প্রেসিডেন্টের গৃহীনি - যাদের কোন রাজনৈতিক পূর্বভিজ্ঞতা না থাকায় প্রথমদিকে রাজী হননি এতো বড় দায়িত্ব নিতে। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহনের পর পৃথিবী যেমন সূর্যের চারিদিকে ঘুরে তেমনি বাংলাদেশের রাজনীতি আবর্তিত হতে লাগলো এই দুইজন অনভিজ্ঞ কিন্তু প্রবলভাবে ক্ষমতার অধিকারী মহিলাকে ঘিরে। ধীরে ধীরে শুকিয়ে গেল শতধাবিভক্ত ব্যাকেটবন্ধী রাজনৈতিক দলগুলো। তারপরও যারা রয়ে গেল - তারা শুধু মাত্র যোগ অংকের বলে জোটবদ্ধ হলো। আজকের আলোচিত প্রধান দৃই জোটের বাইরেও অনেক জোটের জন্ম হয়েছে - মৃত্যুও হয়েছে।
(৩)
মানুষ যদিও ব্রাকেট বন্দী রাজনৈতিক সংস্কুতি থেকে মুক্তি পেল - কিন্তু জিম্মি হয়ে গেল দুইজন প্রবল ক্ষমতাশালী মহিলার কাছে। এদের মুল ক্ষমতা হলো আবেগ প্রবন একদল অন্ধ সমর্থক যারা নিজেদের জীবকেও তুচ্ছ করে নেত্রীকে দেবতার আসনে বসাতে কুষ্ঠিত নয়। এদের কাছে নেত্রীর কাজ হলো ঐশী আদেশ - সেই সুযোগে তস্কররাও তাদের সকল অপকর্ম করে নেত্রীদের আশ্রয়ে নিরাপদ।
গনতন্ত্র হারানো দেশের দুই নেত্রীর স্বৈরতান্ত্রিক সংস্কৃতির সুবাদে জোটবন্দী রাজনীতে মানুষ এখন অলোচনা করছে - কে কত ভাগ বোট পাবে বা কার জোটে কত খারাপ মানুষরে সমাবেশ ঘটেছে।
নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলোর কাজ হলো নির্বাচকদের কাছে তাদের কর্মসূচী তুলে ধরা আর নির্বাচকগন বিবেচনা করবে কোন দল তাদের বিবেচনায় দক্ষতার সাথে দেশকে ৫ বছরের জন্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নের দিকে নিয়ে যাবে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সমস্যাগুলো যেমন বেকারত্ব, শিক্ষা আর চিকিৎসা খাতে তাদের পরিকল্পনা কি। এরা দেশকে ২০১৫ সালে কেমন দেখতে চায়। কিন্তু দূর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য - আমরা আলোচনা করছি কোন জোট কতটা খারাপ - যেদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্মগ্রন্থের নির্দেশ হলো "তোমরা পরষ্পরের মধ্যে সৎকাজের প্রতিযোগিতা করো" ভুলে গিয়ে দেশের মানুষ শুধু অসৎকাজের তুলনায় নিজের পছন্দের জোটকে এগিয়ে রাখতে ব্যস্ত।
ব্রাকেটবন্দী রাজনীতি থেকে বের হতে গিয়ে দুই নেত্রীর কবলে পড়ে বাংলাদেশ যে জোটবন্দী রাজনীতির সংস্কৃতিতে ডুবেছে - তার থেকে সবচেয়ে বেশী লাভবান হয়েছে নীতি আদর্শহীন রাজনীতিক, লুটেরা ব্যবসায়ী, রাজাকার আলবদর আর পতিত স্বৈরশাসকের দোসররা। অন্যদিকে দেশ আর জাতি পেয়েছে চরম অব্যবস্থাপনা, জংগীবাদ, দূর্নীতিতে ৫ বার চ্যাম্পিয়ানশীপ আর চরম নেতীবাচক গনতন্ত্রহীন রাজনীতি।
এই আত্নবিনাসী জোটবন্দী অবস্থা থেকে বাংলাদেশ যেন দ্রুত মুক্তি পায় - যেন দ্রুতই বাংলাদেশের গনতান্ত্রিক আর মানবিক সমাজব্যবস্থার লক্ষ্যে নৈতিকতার উপর প্রতিষ্ঠিত দুরদর্শী রাজনৈতিক সংস্কৃতি চালু হয় - সেই কামনা করছি।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

