কেন এই কথাটা বলছি তা ব্যাখ্যা করছি। তারপর ফিলিস্থীনের ভিতরের সুবিধাবাদী দালালদের কথাটাও একটু বলা যাবে।
একটা দেশের মুক্তিসংগ্রাম যত দীর্ঘায়িত হবে - সেই দেশের মানুষের মধ্যে বিভক্তি বাড়তে থাকবে। প্যালেস্টাইনের ক্ষেত্রে তাই হয়েছে। শুরুর দিকে সবাই সহিংস পন্থায় দেশমুক্ত করার বিষয়ে একমত ছিলো। সেই সময় লায়লা খালেদের মতো সাহসী মানুষের নানান কর্মকান্ড আর অলিম্পিক ভিলেজে ইসরায়েরী এথলেটদের হত্যার মাধ্যমে সমগ্র বিশ্বকে কাঁপিয়ে দিলেও কার্যত তা সন্ত্রাসবাদ হিসাবে বিশ্বে পরিচিত লাভ করে।
পরে ইয়াসির আরাফাতের নেতৃত্বে ফিলিস্থীনের বিভিন্ন সংগঠন একত্রিত হয়ে পিএলও মাধ্যমে নিয়তান্ত্রিক আন্দোলের পথে চলে যায়। বিশ্ব দেখলো গনআন্দোলন - ইন্তিফাদা - ইসরায়েলের ট্যাংকের সামনে মিছিল আর শান্তিপূর্ন বিক্ষোভ - গুলির জবাবে ঢিল।
কিন্তু সহিংস সংগ্রাম থেকে অহিংস সংগ্রামে ফিরে যাওয়া সহজ নয়। সেইটা দেখেছি ভারতে - গান্ধী পারেন নি - শেখ মুজিবও পারেননি।
ইন্তেফাদার সময় বিশ্বের অনেক দেশ ফিলিস্থীনের প্রতি নমনীয় হয়। এরা সমর্থন দিতে থাকে - আর্থিক সহায়তার পরিমান বেড়ে যায় অনেক। সেই সময় জন্ম হয় সুবিধাবাদী শ্রেনীর। এরা জনগনের অর্থ লুটপাট করে নিজেদের বিলাসী জীবন যাপন আর বিদেশে আয়েসী জীবন শুরু করে। রবার্ট ফিস্কের একটা লেখায় দেখছিলাম - ইসরায়েলী বিমান হামলায় বিধ্বস্থ এক পিএলও নেতার বাড়ি পরিদর্শন কালে সাংবাদিকরা বাথরুমের স্বর্ণের ফিটিংনস দেখে অবাক হয়েছিলো। সেখানে লক্ষ লক্ষ মানুষ প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে রিফিউজী ক্যাম্পে থাকে আর জাতি সংঘের পাঠানো সাহায্যের উপর নির্ভরশীল - সেখানে পিএলও - বিশেষ করে ফাতাহ নেতাদের প্যারিস লন্ডনে বিলাশবহুল জীবন বিশ্বকে একটা ভুল সংকেত দেয়।
২০০৬ সালের নির্বাচনে ফিলিস্থীনের জনগন তাদের ভোটাধিকারে সুযোগটা কাজে লাগিয়ে ফাতাহর চেপে বসা নেত্বুতকে বিদায় দেয়। ১৯৯৬ সালে অনুষ্ঠেয় নির্বাচনটি বিভিন্ন করে দশ বছর পর অনুষ্ঠিত হয় - আর তাতে ১৩২ সিটের পার্লামেন্টে ৮৬ আসন পেয়ে হামাস বিজয়ী হয়। বলাই বাহুল্য হামাসের বিষয়ে ইসরায়েল আর ফাতাহ একই মনোভাব পোষন করে। ভোট দিলো প্যালেস্টাইনী জনগন আর নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিতে অস্বীকার করলো বুশ আর ইসরায়েল। একদিকে গনতন্ত্র প্রতিষ্ঠান জন্যে ইরাকে লক্ষ মানুষ মারা হলো - অন্যদিকে নির্বাচনের ফলাফল নিজেদের মতো না হওয়া তা মেনে নিতে অস্বীকার করার মাধ্যমে আমেরিকা আর ইসরায়েল তাদের চল্ডাল নীতির বহি:ট্রকাশ ঘঠালো।
এর পরই শুরু হলো ফাতাহর ইসরায়েল মুখী চলা। ফাতাহ তাদের শক্তি বৃদ্ধির জণ্যে মিশর থেকে প্রশিক্ষন দিয়ে তাদের সমর্থক মিলিশিয়া তৈরী করলো। তারপর ইসরায়েলের সহায়তায় হামাসকে পশ্চিমতীর থেকে বিতারিত করে গাজায় অবরুদ্ধ করলো। তারপরের ঘটনা দেখলাম আমরা সবাই - ইসরায়েল গাজায় নির্মম আক্রম চালালো হামাস নিধনের জন্যে।
লক্ষ্যনীয় যে, জনগনের ভোটে নির্বঅচিত হামাসকে তারিয়ে দিয়ে ফাতাহ সরকার দখল করে নিজেদের প্যালেস্টাইনের প্রতিনিধি হিসাবে বিশ্বের কাছে উপস্থাপন করছে - তা আমেরিকা আর ইসরায়েল মেনে নিয়েছে। বিনিময়ে ফাতাহ নেতারা নিজেদের স্বাভাবিক জীবন অব্যহত রেখেছে।
প্যালেস্টাইনে দখলের সর্বশেষ পর্যায়ে ইসরায়েল সফল ভাবে গাজা আর পশ্চিম তীরকে শুধু ভৌগলিক ভাবেই নয় - মানসিকভাবে আলাদা করতে পেছে - আর তা সম্ভব হয়েছে ফাতাহর সুবিধাবাদী আর দালাল নেতাদের সহায়তায়। যদি ৭১ এর বাংলাদেশের কথা বিবেচনা করি - দেখবো বিজয়ী মুজিবকে ক্ষমতা না দিয়ে ভুট্টো যেভাবে যুদ্ধের পর বিভক্ত পাকিস্থানের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলো - আজকের মাহমুদ আবাসকে দেখলে ঠিক ভুট্টোর কথাই মনে পড়ে।
মাহমুদ আবাস আর তার দল শুধু পশ্চিমতীরকে গাজা থেকে আলাদাই করেনি - গাজায় নিশংস হত্যাকান্ডের সময় পশ্চিমতীরের অধিবাসীদের উপর কঠোর নিয়ন্ত্রন আরোপ করেছে - যাতে সেখানে কোন বিক্ষোভও না হতে পারে। ইসরায়েলে এই আক্রমনের আগে মাহমুদ আবাসকে বেশ সক্রিয় দেখা গেছে। বিভিন্ন দেশ সফর করে নিজেকে প্যালেস্টাইনীরে প্রেসিডেন্ট হিসাবে বেশ কিছু সুযোগ সুবিধাও নিয়েছে। বিশেষ করে ভারতের মাধ্যমে তাকে কয়েকশ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেয় ইসরায়েল - বিনিময়ে গাজায় প্যালেস্টাইনী জনগনের অবর্ননীয় যুদ্ধের সময় পশ্চিম তীরকে সম্পূর্ন নীরব রেখেছে।
আমাদের মনে রাখতে হবে - জর্জ বুশ প্রেসিডেন্ট হবার পর প্যালেস্টাইনী নেতা ইয়াসির আরাফাতকে সম্পূর্ন বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয় কিন্তু তার মৃত্যুর পর মাহমুদ আবাস প্রেসিডেন্ট হবার পর তাকে হোয়ইট হাউসে ডেকে বুশ নিজের মানুষ বলে পরিচয় করিয়ে দেয়।
আজ মাহমুদ আবাস আবার জাতীয় সরকারের কথা বলছে - বিজয়ী হামাস আর পরাজিত ফাতাহ সেই সরকারের শরিক হবে। কারনটা পরিষ্কার - দূর্নীতিবাজ ফাতাহর নেতাদের বিপুল সম্পদ যা প্যারিস আর লন্ডনে জমে আছে তার নিরাপত্তাই মাহমুদ আবাসের প্রধান লক্ষ্য।
মাহুমদ আবাস গাজায় ইসরায়েলের হামলার তিন সপ্তাহ বেশ ব্যস্ত ছিলেন পাশের দেশগুলো যাতে এই যুদ্ধে না জাড়িয়ে যা তা নিশ্চিত করতেও। মুল বিষয়টা হলো হামাসকে মিশ্চিহ্ন বা দূর্বল করে ফাতাহর নিয়ন্ত্রন পুনপ্রতিষ্টা করে নেতাদের বিলাসী জীবনকে আবার আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিয়ে আসাই এই ভদ্রলোকের লক্ষ্য।
দীর্ঘমেয়াদী গেরিলা যুদ্ধ সব সময়ই মুল লক্ষ্য থেকে সরে যায়। বাংলাদেশের সর্বহারাদের ডাকাত হওয়া আর মাহমুদ আবাসদের জনগনের সম্পদ চুরি করে বিদেশে পাচার করে তার ভোগ আর রক্ষাই এখন প্যালেস্টাইনী জনগনের স্বাধীনতার চেয়ে তাদের কাছে গুরুত্পূর্ন।
কিন্তু ইতিহাসের শিক্ষা হলো - একদল মানুষ হামাগুড়ি দিয়ে বাঁচার চেয়ে নিজের পায়ের উপর ভর করে দাড়িয়ে মৃত্যবরনকে অনেক বেশী মর্যাদার বলে বিশ্বাস করে। আর এই বিশ্বাসের থেকেই জন্ম নেয় মুক্তিযুদ্ধা। এই ঘটনা বারবার ঘটেছে - ঘটেছে বাংলাদেশে - ঘটছে ইরাকে - ঘটছে প্যালেস্টাইনেও। হাজার মানুষ হত্যার মাধ্যমে হয়তো এই প্রক্রিয়াকে কিছুটা মন্থর করা যায় - কিন্তু কখনই বন্ধ করা যাকবে না।
সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে জানুয়ারি, ২০০৯ রাত ১০:২১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


