মওদুদ আহমেদের পাকিস্তানী এবং রাজাকারদের পক্ষে দালালীর ঘটনা কি নতুন ঘটনা? উত্তর হলো "না"। দীর্ঘদিন ধরে উনি দালালী করছেন - হয় সামরিক শাসকের বা রাজাকার এবং পাকিস্তানীদের ।
মওদুদের রাজাকার এবং পাকিস্তানীদের পক্ষে দালালীর ইতিহাসে যাওয়ার আগে একটু পরিচয়ের ভুমিকা দরকার।
ছাত্রজীবনে আইউব খানের এনএসএফ এর সাথে জড়িত ১৯৬৯ সালে ব্যারিষ্টারী পাশ করে দেশে ফেরার পর কবি জসীমউদ্দিন (যিনি উনার শশুড়)সহ বঙ্গবন্ধু সাথে দেখা করলে তাকে ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেন। সেই সুবাদে স্বাধীনবাংলা বেতারে কাজ করেন মওদুদ। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু তাকে পোস্টমাস্টার জেনারেল পদে বসায়। সেখানে বসে বিরাট দূর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে মওদুদ - জার্মান থেকে ডাকটিকিট এবং খাম ছাপানোর মান এতো খারাপ হয়েছিলো যে - মানুষ বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ ডাকটিকিটের উপর থু থু দেওয়ার মতো কৌতুক করা শুরু করে। ফলে তার পদ চলে যায় এবং মামলাও হয়। এদিকে তার গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগের বিষয়টা অনেকে জানার ফলে ১৯৭৩ সালে এমপি নমিনেশন পেতে ব্যর্থ হয়ে বাকী জীবনের জন্যে আওয়ামীলীগের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে। জেনারেল জিয়ার মন্ত্রী সভায় জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দূর্নীতির দায়ে আরেকবার পদ হারান। এরশাদ ক্ষমতা এলে দূর্নীতির অভিযোগে জেলে গেলেও উনার স্ত্রীর এরশাদের সাথে লন্ডন সফলের সময় মুক্তি পায় মওদুদ। পরে জেনারেল এরশাদের মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী পরে উপ-রাস্ট্রপতি পদ পর্যণ্ত চলে যায়। যেদিন এরশাদের পতনে সারাদেশ উন্মুখ ছিলো - সেদিন মওদুদ টিভিতে এরশাদের পদত্যাগ কেন অসাংবিধানিক হবে তা ব্যাখ্যা করছিলো বিটিভিতে। পরে নিজের এলাকা থেকে নির্বাচিত না হতে পেরে এরশাদের ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচনে এমপি হয় । অবশেষে বিএনপিতে যোগ দিয়েও সে তার অগ্রগতি ধরে রাখে - স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে দলে নীতিনির্ধারন করছে এই ধূর্ত আইনজীবি।
মওদুদ আহমেদ স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগ করে এবং তাদের পক্ষে কাজ করতে থাকে। মওদুদ আহমেদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতার সম্পর্কে একটা সুষ্পষ্ঠ অভিযোগ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেনের ছেলে সেলিম আর নুরের কাছ থেকে (মুক্তধারা ডট কম)
(২)
মুক্তিযুদ্ধের পরপর দালাল এবং রাজাকারদের একটা অংশ পাকিস্থানে অবস্থান নেয়। তাদের সম্পদ এবং বাড়ীঘরকে সরকার শত্রু সম্পত্তি ঘোষনা করে এবং মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে বন্ধোবস্ত দেয়। এমনই একটা বাড়ীর মালিক ছিলেন আইয়ুব খানের সময়কার মহিলা সংসদ সদস্য ডলি আজাদ - যিনি গোলাম আজম এবং অন্যান্যদের সাথে নাগরিত্ব হারান। ইস্কাটনের ১৯ নং বাড়ীটি শত্রুসম্পত্তি হিসাবে রাজাকারদের হাতে ১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বরে শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেন এবং ১৯৭১ সালের ১৪ ই ডিসেম্বর রাজাকারদের হাতে শহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিতের শিক্ষক ড. আবুল কালাম আজাদের পরিবারবর্গকে সরকারী ভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় ১৯৭২ সালে।
জেনারেল জিয়ার শাসনামলে মওদুদ আহমদ বেশ কয়েকবার পাকিস্থান সফর করেন এবং পাকিস্থানে নির্বাসিত নাগরিকত্ব হারানো দালালদের সাথে তাদের দেশে বসবাসকারী পরিবারবর্গের যোগাযোগ এবং ভুয়া দলিলপত্র আদানপ্রদানের মাধ্যমে শত্রুসম্পত্তি হিসাবে ঘোষিত সম্পদসমূহ ফেরত প্রদানের পক্ষে কাজ শুরু করেন। উনি তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পেতেও আইনী পরামর্শ দেন। ম্ওদুদের প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ সরকার ইস্কাটনের ১৯ নং বাড়িটি নিয়ে একটা বেকায়দায় অবস্থায় পড়ে যায়। কারন ভুয়া দলিলের মাধ্যমে দালালদের বাংলাদেশে বসবাসরত স্বজনকে মালিক হিসাবে দেখিয়ে কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। অন্যদিকে সরকারপক্ষের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতাসৃষ্টি করে মামলাগুলোতে সরকারী পক্ষকে হারানো হয়। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় জিয়ার শাসনামলে এবং এরশাদের সময়ে চলতে থাকে। মওদুদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় অনেক বাড়ী এবং সম্পত্তি সরকার ভুয়া মালিকদের ফেরত দিয়ে দিলে তারা তা বিক্রয় করে পাকিস্থানে অর্থ পাচার করে।
বিশেষ করে ডলি আজাদের সম্পত্তির বিষয়ে জিয়া/ সাত্তারের শাসনামলে ড. আজাদ এবং সিরাজুদ্দিনের পরিবারকে নোটিশ দিলে ড. কামাল হোসেন এগিয়ে আসেন আইনী সহায়তা দিতে। কিন্তু সেই পর্যায়ে আসে এরশাদের সামরিক শাসন।
সামরিক শাসনের অধীনে কোর্টের কার্যক্রম বন্ধ থাকার সময় সরকারের প্রশাসন যন্ত্র দুইঘন্টার নোটিশে দুই প্লাটুন পুলিশের সহায়তায় বাংলাদেশের জন্যে শহীদ দুই পরিবারের ৮ জন সদস্যকে বাড়ী থেকে বের করে দেয়। এই বিষয়ে উপর সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় মওদুদ আহমদ এবং পাকিস্থান পলাতক দালালদের সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে শহীদ পরিবারকে গৃহছাড়া করা সম্পর্কে একটা প্রতিবেদনে মওদুদের যোগসাজশের তথ্য প্রকাশিত হয়।
(৩)
দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের - দুর্ভাগ্য জাতীয়তাবাদী রাজনীতির - দুর্ভাগ্য আমাদের যুব সমাজের - মওদুদ আহমেদ ব্যক্তিগত এজেন্ডাকে দলের রাজনীতির মুল ধারায় এনে তা চাপিয়ে দিলেও জাতীয়তাবাদী তরুনরা তাকে সহ্য করে যাচ্ছে। তাকেই অনুসরন করে গড়ে উঠছে একদল রাজনৈতিক কর্মী বাহিনী যারা শুধু অন্ধের মতো কারো বিরোধীতেই রাজনীতির মুল মন্ত্র মনে করে। এরা বুঝতেও পারছে না যে - মওদুদের মতো একজন পাকিস্তানে দালাল এবং ধূর্ত আইনজীবির হাতে স্টিয়ারিং দিয়ে দিলে তাদের রাজনীতি কোথায় চলে যাবে। এই মওদুদ কারো বন্ধু না - সে নিজের এজেন্ডাকে বাস্তবায়নের জন্যে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের উপর ভর করে থাকে। মওদুদের ইংরেজী লেখা বইগুলোতে যে ভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসা করেছে - তাতে একদিন হয়তো তাকে আওয়ামী মঞ্চে দেখা গেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।
নষ্ট রাজনীতির নেতৃত্বের দেউলিয়াত্বের সুযোগে ধূর্ত, ষড়যন্ত্রকারী একজন নীতিহীন মওদুদ বাংলাদেশের বড় একটা রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রন করে - কথাটা ভাবতেও লজ্জা হয়।
(একই সাথে সদালাপে প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১১ ভোর ৫:২৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



