somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিএনপির যুদ্ধাপরাধী বিচারের বিরোধীতা ও মওদুদ আহমেদের ভুমিকা

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১১ ভোর ৫:২২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আজ সকালে টিভি খুলেই খবরে দেখলাম - বিএনপি আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালাতের প্রতি অনাস্থা জানিয়ে আদালতের কার্যক্রম বন্ধে দাবী জানিয়েছে। বিষয়টা যদিও নতুন না - তারপরও অবশেষে বিএনপি ঘোমটা খুলে নাচতে নেমেছে দেখে ভালই লাগলো। আরেকটা বিষয় দেখে মজা পেলাম তা হলো ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের দখলে মাইক্রোফোন। বিএনপির বিজয়নগর অফিসে মওদুদকে কদাচিত দেখা যায় - সেখানে সকল ঘোষনা দেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্যা ফকরুল। কিন্তু গতকাল মওদুদ নিজেই এই বিষয়ে ঘোষনা দিলেন। মওদুদ যখন আন্তর্জাতিক আদালতকে মানি না বলছিলো - তখন মনে পড়ে গেলো জজমিয়া নাটকের কথা - এই মওদুদই আইনমন্ত্রী থাকা অবস্থায় বাংলাদেশের রাজনীতিতে সবচেয়ে ভায়বহ অপরাধের বিচারের নামে কি প্রহসনই না করেছেন উনি। কদিন আগে যখন বলেছিলাম বিএনপির নীতির্নধারকরা (তিন আইনজীবি) কোর্টে গেছে সাইদীর পক্ষে উকালতি করতে - একজন বিএনপির সমর্থক মন্তব্য করেছিলেন - ওরা আইনজীবি হিসাবে গেছে। এখন নিশ্চয়ই বিএনপির সমর্থকরা বলবেন না যে - এই উকিলরা বিএনপির নীতিনির্ধারন করে না!

মওদুদ আহমেদের পাকিস্তানী এবং রাজাকারদের পক্ষে দালালীর ঘটনা কি নতুন ঘটনা? উত্তর হলো "না"। দীর্ঘদিন ধরে উনি দালালী করছেন - হয় সামরিক শাসকের বা রাজাকার এবং পাকিস্তানীদের ।

মওদুদের রাজাকার এবং পাকিস্তানীদের পক্ষে দালালীর ইতিহাসে যাওয়ার আগে একটু পরিচয়ের ভুমিকা দরকার।

ছাত্রজীবনে আইউব খানের এনএসএফ এর সাথে জড়িত ১৯৬৯ সালে ব্যারিষ্টারী পাশ করে দেশে ফেরার পর কবি জসীমউদ্দিন (যিনি উনার শশুড়)সহ বঙ্গবন্ধু সাথে দেখা করলে তাকে ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলামের সাথে কাজ করার সুযোগ করে দেন। সেই সুবাদে স্বাধীনবাংলা বেতারে কাজ করেন মওদুদ। দেশ স্বাধীন হলে বঙ্গবন্ধু তাকে পোস্টমাস্টার জেনারেল পদে বসায়। সেখানে বসে বিরাট দূর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে মওদুদ - জার্মান থেকে ডাকটিকিট এবং খাম ছাপানোর মান এতো খারাপ হয়েছিলো যে - মানুষ বঙ্গবন্ধুর ছবিসহ ডাকটিকিটের উপর থু থু দেওয়ার মতো কৌতুক করা শুরু করে। ফলে তার পদ চলে যায় এবং মামলাও হয়। এদিকে তার গোপনে পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগের বিষয়টা অনেকে জানার ফলে ১৯৭৩ সালে এমপি নমিনেশন পেতে ব্যর্থ হয়ে বাকী জীবনের জন্যে আওয়ামীলীগের সাথে সম্পর্ক ত্যাগ করে। জেনারেল জিয়ার মন্ত্রী সভায় জ্বালানী প্রতিমন্ত্রী হিসাবে দূর্নীতির দায়ে আরেকবার পদ হারান। এরশাদ ক্ষমতা এলে দূর্নীতির অভিযোগে জেলে গেলেও উনার স্ত্রীর এরশাদের সাথে লন্ডন সফলের সময় মুক্তি পায় মওদুদ। পরে জেনারেল এরশাদের মন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী পরে উপ-রাস্ট্রপতি পদ পর্যণ্ত চলে যায়। যেদিন এরশাদের পতনে সারাদেশ উন্মুখ ছিলো - সেদিন মওদুদ টিভিতে এরশাদের পদত্যাগ কেন অসাংবিধানিক হবে তা ব্যাখ্যা করছিলো বিটিভিতে। পরে নিজের এলাকা থেকে নির্বাচিত না হতে পেরে এরশাদের ছেড়ে দেওয়া আসনে উপনির্বাচনে এমপি হয় । অবশেষে বিএনপিতে যোগ দিয়েও সে তার অগ্রগতি ধরে রাখে - স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়ে দলে নীতিনির্ধারন করছে এই ধূর্ত আইনজীবি।

মওদুদ আহমেদ স্বাধীনতার পরপরই পাকিস্তানীদের সাথে যোগাযোগ করে এবং তাদের পক্ষে কাজ করতে থাকে। মওদুদ আহমেদের বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীতার সম্পর্কে একটা সুষ্পষ্ঠ অভিযোগ পাওয়া যায় ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেনের ছেলে সেলিম আর নুরের কাছ থেকে (মুক্তধারা ডট কম)

(২)

মুক্তিযুদ্ধের পরপর দালাল এবং রাজাকারদের একটা অংশ পাকিস্থানে অবস্থান নেয়। তাদের সম্পদ এবং বাড়ীঘরকে সরকার শত্রু সম্পত্তি ঘোষনা করে এবং মুক্তিযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থদের মাঝে বন্ধোবস্ত দেয়। এমনই একটা বাড়ীর মালিক ছিলেন আইয়ুব খানের সময়কার মহিলা সংসদ সদস্য ডলি আজাদ - যিনি গোলাম আজম এবং অন্যান্যদের সাথে নাগরিত্ব হারান। ইস্কাটনের ১৯ নং বাড়ীটি শত্রুসম্পত্তি হিসাবে রাজাকারদের হাতে ১৯৭১ সালের ১০ই ডিসেম্বরে শহীদ সিরাজুদ্দিন হোসেন এবং ১৯৭১ সালের ১৪ ই ডিসেম্বর রাজাকারদের হাতে শহীদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গনিতের শিক্ষক ড. আবুল কালাম আজাদের পরিবারবর্গকে সরকারী ভাবে বন্দোবস্ত দেওয়া হয় ১৯৭২ সালে।

জেনারেল জিয়ার শাসনামলে মওদুদ আহমদ বেশ কয়েকবার পাকিস্থান সফর করেন এবং পাকিস্থানে নির্বাসিত নাগরিকত্ব হারানো দালালদের সাথে তাদের দেশে বসবাসকারী পরিবারবর্গের যোগাযোগ এবং ভুয়া দলিলপত্র আদানপ্রদানের মাধ্যমে শত্রুসম্পত্তি হিসাবে ঘোষিত সম্পদসমূহ ফেরত প্রদানের পক্ষে কাজ শুরু করেন। উনি তাদের বাংলাদেশের নাগরিকত্ব ফিরে পেতেও আইনী পরামর্শ দেন। ম্ওদুদের প্রচেষ্টার ফলে বাংলাদেশ সরকার ইস্কাটনের ১৯ নং বাড়িটি নিয়ে একটা বেকায়দায় অবস্থায় পড়ে যায়। কারন ভুয়া দলিলের মাধ্যমে দালালদের বাংলাদেশে বসবাসরত স্বজনকে মালিক হিসাবে দেখিয়ে কোর্টে মামলা দায়ের করা হয়। অন্যদিকে সরকারপক্ষের ইচ্ছাকৃত উদাসীনতাসৃষ্টি করে মামলাগুলোতে সরকারী পক্ষকে হারানো হয়। এই প্রক্রিয়া শুরু হয় জিয়ার শাসনামলে এবং এরশাদের সময়ে চলতে থাকে। মওদুদের প্রত্যক্ষ সহায়তায় অনেক বাড়ী এবং সম্পত্তি সরকার ভুয়া মালিকদের ফেরত দিয়ে দিলে তারা তা বিক্রয় করে পাকিস্থানে অর্থ পাচার করে।

বিশেষ করে ডলি আজাদের সম্পত্তির বিষয়ে জিয়া/ সাত্তারের শাসনামলে ড. আজাদ এবং সিরাজুদ্দিনের পরিবারকে নোটিশ দিলে ড. কামাল হোসেন এগিয়ে আসেন আইনী সহায়তা দিতে। কিন্তু সেই পর্যায়ে আসে এরশাদের সামরিক শাসন।

সামরিক শাসনের অধীনে কোর্টের কার্যক্রম বন্ধ থাকার সময় সরকারের প্রশাসন যন্ত্র দুইঘন্টার নোটিশে দুই প্লাটুন পুলিশের সহায়তায় বাংলাদেশের জন্যে শহীদ দুই পরিবারের ৮ জন সদস্যকে বাড়ী থেকে বের করে দেয়। এই বিষয়ে উপর সাপ্তাহিক বিচিত্রা’য় মওদুদ আহমদ এবং পাকিস্থান পলাতক দালালদের সংশ্লিষ্টতার মাধ্যমে শহীদ পরিবারকে গৃহছাড়া করা সম্পর্কে একটা প্রতিবেদনে মওদুদের যোগসাজশের তথ্য প্রকাশিত হয়।

(৩)

দুর্ভাগ্য বাংলাদেশের - দুর্ভাগ্য জাতীয়তাবাদী রাজনীতির - দুর্ভাগ্য আমাদের যুব সমাজের - মওদুদ আহমেদ ব্যক্তিগত এজেন্ডাকে দলের রাজনীতির মুল ধারায় এনে তা চাপিয়ে দিলেও জাতীয়তাবাদী তরুনরা তাকে সহ্য করে যাচ্ছে। তাকেই অনুসরন করে গড়ে উঠছে একদল রাজনৈতিক কর্মী বাহিনী যারা শুধু অন্ধের মতো কারো বিরোধীতেই রাজনীতির মুল মন্ত্র মনে করে। এরা বুঝতেও পারছে না যে - মওদুদের মতো একজন পাকিস্তানে দালাল এবং ধূর্ত আইনজীবির হাতে স্টিয়ারিং দিয়ে দিলে তাদের রাজনীতি কোথায় চলে যাবে। এই মওদুদ কারো বন্ধু না - সে নিজের এজেন্ডাকে বাস্তবায়নের জন্যে কোন না কোন রাজনৈতিক দলের উপর ভর করে থাকে। মওদুদের ইংরেজী লেখা বইগুলোতে যে ভাবে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রশংসা করেছে - তাতে একদিন হয়তো তাকে আওয়ামী মঞ্চে দেখা গেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না।

নষ্ট রাজনীতির নেতৃত্বের দেউলিয়াত্বের সুযোগে ধূর্ত, ষড়যন্ত্রকারী একজন নীতিহীন মওদুদ বাংলাদেশের বড় একটা রাজনৈতিক শক্তির নিয়ন্ত্রন করে - কথাটা ভাবতেও লজ্জা হয়।

(একই সাথে সদালাপে প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০১১ ভোর ৫:২৯
১১টি মন্তব্য ৭টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রাসূলের (সা.) অনুসারি হবেন শুধুমাত্র সাহাবা (রা.), অন্যরা এবং ওলামা ওলামার অনুসারি হবেন

লিখেছেন মহাজাগতিক চিন্তা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:৪০




সূরাঃ ৩৫ ফাতির, ২৮ নং আয়াতের অনুবাদ-
২৮। এভাবে রং বেরং- এর মানুষ, জন্তু ও আন’আম রয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে (ওলামা) আলেমরাই তাঁকে ভয় করে।নিশ্চয়্ই আল্লাহ পরাক্রমশালী ক্ষমাশীল।

সূরা:... ...বাকিটুকু পড়ুন

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×