somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বিজয়ের শুভেচ্ছা আর কিছু আক্ষেপ

১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ৭:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


মহাকালের কাছে ৪০ বছর কিছুই না - কিন্তু একজন মানুষের জীবনের জন্যে ৪০ বছর অনেক। যারা মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ করেছে - তাদের জন্যে ৪০ বছর বিরাট ঘটনাবহুল সময়। ৪০ বছরে মানুষ অনেক কিছুই ভুলে যায় - কিন্তু যুদ্ধের মতো স্মৃতি ভুলে যাওয়া কি সম্ভব। যে কিশোর বাবার লাশ সনাক্ত করার জন্যে নদীতে ভেসে যাওয়া গুলিবিদ্ধ হাত বাঁধা মরে ফুলে যাওয়া লাশগুলো নিবির ভাবে পর্যবেক্ষন করেছিলো - তার জন্যে মৃত্যু পর্যন্ত মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি জ্বলজ্বল করে ভেসে থাকবে স্মৃতিতে - এইটাইতো স্বাভাবিক।


হাতের আংগুলে গুনলে হয়তো অনেক সময় - কিন্তু স্মৃতি বলে - ঐতো সেইদিন। ডিসেম্বরের ১৪ তারিখ। ১৩ তারিখ রাতে কেউ একজন এসে সাবধান করার পর ছোটদের সাথে চলে গেলাম নানা বাড়ির সবচেয়ে সুরক্ষিত ঘরটিতে। তারপর সারারাত গোলাগুলির শব্দ আর বড়দের নানান আন্দাজের কথা শুনতে শুনতে ভয়ার্ত মনে লেপের নীচে আধাঘুম আধা জাগরনে রাত পার। বড়র বলছিলো - শব্দে মনে হচ্ছে গুলি হচ্ছে এক তরফা - কেউ বলছিলো মিলিটারীরা পালিয়েছে হয়তো। আবার কেউ বলছিলো - মুক্তিবাহিনীরা হয়তো অপেক্ষা করছে - গুলি হয়তো করছে পাকিরা। রাত ভোর হতেই একটা হৈ চৈ - চিৎকারে শব্দ। পালাইছে ...পালাইছে। সবাই তীরের বেগে আশ্রয় থেকে বেড়িয়ে শহরের দিকে দৌড়। হরগংগা কলেজ ছিলো পাকি আর্মিদের ঘাঁটি - সেইটা এখন মুক্তি বাহিনীর দখলে। রাতের আধারে পাকবাহিনীর বীর পংগুবরা পালিয়ে গেলেও মুক্তিবাহিনী সারারাত কলেজের দিকে ফায়ার করেছে - বিষয়টা নিম্চিত হওয়ার জন্যে ভোরে আলোর অপেক্ষায় ছিলো বীর সন্তানেরা।

(২)

পুরো ৯ মাস বাংলাদেশের মানুষ মৃত্যুকে নিয়ে বসবাস করেছে - সবার সাথে তার মৃত্যুর ১টা বুলেটের ব্যবধান ছিলো মাত্র। বিজয়ের ভিতর দিয়ে আবার নির্ভার জীবনে ফিরে গিয়েছিলো সবাই। এই স্মৃতি কি কখনও ফিকে হবে।

(৩)

৪০ বছরে অনেক অর্জন হয়েছে দেশের। বিশেষ করে কৃষি আর রপ্তানী খাতে বিরাট অর্জন। দারিদ্রতা হার ৭০ এ ছিলো ৭৩ ভাগ - এখন ২৩ ভাগ। শিক্ষা খাতেও অনেক উন্নতি হয়েছে। সবচেয়ে বড় যা হয়েছে - বাঙালী ইতিহাসের প্রথম নিজের ঠিকানা পেয়েছে - পেয়েছে গর্ব করার মতো একটা পরিচয়। আজ দেশের বাইরে প্রায় এক কোটি বাংলাদেশী গর্বের সাথে লাল-সবুজ পতাকার পরিচয় নিয়ে বিচরন করছে। তারপর্ আফসোস থেকেই যায়।

স্বাধীনতার পরপরই বিজয়ী মুক্তিযোদ্ধারা বিভক্ত হয়ে পড়ে নানান ভাগে। জাসদ তৈরী হয় - খুন হয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধারা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে। উপলক্ষ সমাজতন্ত্র - আড়ালে বসে হাসে আলবদর রাজাকার আলশামসরা। অপেক্ষা করতে থাকে সুযোগের। খুন হয় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু আর মুক্তিযুদ্ধের চার কান্ডারী তাজউদ্দিন, মনসুর আলী, কামরুজ্জামান, সৈয়দ নজরুল ইসলামকে। কে খুন করলো? একদল মুক্তিযোদ্ধা। কে লাভবান হলো - স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকারচক্র। নিহত হলো খালেদ মোশাররফসহ আরো অনেক মুক্তিযোদ্ধা। ধীরে ধীরে রাজাকারচক্র ফিরে আসছিলো। ক্ষমতাশীন হলেন জিয়াউর রহমান। একজন বীর উত্তম জিয়া ক্ষমতাশীন হওয়ার পরও মুক্তিযোদ্ধাদের নির্মূল প্রক্রিয়া বন্ধতো হলোই না - বরঞ্চ আরো বেগবান হলো - তাহেরকে ফাঁসী দেওয়া ছাড়াও হত্যা করা হলো অনেক মুক্তিযোদ্ধা। অবশেষে নিজেও নিহত হলেন আরেকদল মুক্তিযোদ্ধার হাতে। প্রহসনের বিচারে ফাঁসী হলো আরো ১১ জন বীর মুক্তিযোদ্ধার। ততদিনে জেনারেল জিয়ার কাঁধে ভর করে মঞ্চে পুনরাগামন হলো কুখ্যাত গোলাম আজমের।

তারপর আরেক জেনারেল ক্ষমতায় এসে অবাধ বিচরন ভূমিতে পরিনত করলেন রাজাকারদের জন্যে। একসময় মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী দলটিও রাজাকারতন্ত্রের সাথে হাত মিলিয়েছে শুধুমাত্র ক্ষমতার সমীকরনে। তারপরের ইতিহাস সবার জানা - কুখ্যাত আলবদরের নেতা নিজামী আর মুজাহিদের মন্ত্রীত্বপ্রাপ্তি আর তাদের মুক্তিযুদ্ধের বিষয় ভুলে যাওয়ার নসিহত তো সেদিনের কথা।

(৪)

১৯৭৫ থেকে আজ অবধি শহীদ পরিবার - নিহত আহত আর নিখোঁজদের স্বজনরা বিচারের জন্যে আহাজারি করছে। কিন্তু রাজনীতির কুটচালে তাদেরকে বিচার পরিবর্তে অপমান সহ্য করতে হয়েছে। যে দেশের মাটি ৩০ লক্ষ শহীদের রক্তে ভেজা - সেই দেশে পরাজিত ঘাতকরা মন্ত্রী হয়ে লাল-সবুজ পতাকা টাংগিয়ে গাড়ি চালিয়েছে। এর চেয়ে বড় অপমান কি হতে পারে। বিচারের পক্ষে বিপক্ষে অনেকে বিতর্ক করেছে - কিন্তু একটা কথা সবাই ভুলে গেছে - কার বিচার হবে আর কে ক্ষমা পাবে তা বলার অধিকার একমাত্র বিচার প্রার্থী - কোন রাজনৈতিক নেতা বা বুদ্ধিজীবির এই বিষয়ে কথা বলা অনধিকার চর্চা।

দীর্ঘদিন পর বিচার শুরু হয়েছে। কিন্তু বিষয়টা এতো সহজে এগোবে বলে মনে করিনা। বিশেষ করে যখন দেখি ইলেকট্রনিক মিডিয়াসহ অন্যান্য মিডিয়া যখন খুবই সহজে নিজেকে বিক্রি করে দিতে সামান্য কুন্ঠিত হয়না। একজন চিহ্নিত ঘাতক গোরাম আজমকে আত্নপক্ষ সমর্থনমুলক জামায়াতের স্পন্সর করা ইন্টারভিউর নামে যে বিজ্ঞাপন বাংলাদেশের বিভিন্ন টিভিগুলো প্রচার করলো - তা শুধু দুঃখজনকই নয় - রীতিমতো ভয়াবহ। সামান্য কয়টা টাকার কাছে সাংবাদিকতার এথিকস বিক্রি করে যে লোক ঘাতকের সাক্ষাতকার নিলো - তাতে পরিষ্কার দেখা গেলো গোরাম আজমকে গল্পের সুত্রটাই ধরিয়ে দিয়েছেন। ১৯৭৮ সাল থেকে নিজের ক্যাডার বাহিনীর সুরক্ষায় বসবাস করা এই ঘাতক আগে কোনদিন মিডিয়ার সামনে আসেনি - হঠাৎ করে যখন গ্রেফতারের বিষয়টি এগিয়ে এলো তখন সিলেকটেড কিছু টিভিতে আত্নপক্ষ সমর্থন করা এই বিজ্ঞাপন প্রচার কেন হয়েছে - বোধসম্পন্ন যে কোন মানুষের কাছে বিষয়টা অত্যান্ত পরিষ্কার। ইন্টারভিউ নামে আমলে গাইড করা হয়েছে যা ছিলো সুষ্পষ্ট পাতানো একটা ইভেন্ট। আর আগাগোড়া মিথ্যাচার আ ধর্মীয় ভন্ডামীতে ভরপুর গোলাম আজমের জবানবন্ধী প্রচার করে টিভি গুলে বিচারপ্রার্থীদের জন্যে একটা চ্যালেঞ্জ আর রাজাকারতন্ত্রকে একটা মোরাল বুষ্ট দিয়েছে। পৃথিবীর কোথাও এই রকম নজির পাওয়া যাবে চিহ্নিত একজন যুদ্ধাপরাধীর জবানবন্ধী এতো যত্ন সহকারে প্রচার করে?

এই সব দেখেশুনে হতাশা আর ক্ষোভ বাড়ছে। স্বাধীনতার ৪০ বছর পরও ঘাতকরা এসিরুমে বসে টিভিতে হুমকী ধামকি দিচ্ছে আর বেঁচে থাকা মুক্তিযোদ্ধারা ক্ষমতার রাজনীতিতে দোল খাওয়াচ্ছে দেশবাসীকে। মুক্তিযোদ্ধারা হয়তো আর ঐক্যবদ্ধ তে পারবে না। একজন সাদেক হোসেন খোকা আর একজন মোফাজ্জল হোসেন মায়া ৭১ এ ঢাকায় জীবন বাজী রেখে পাকবাহিনীকে ভয়ার্ত করেছিলো। কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতিতে একজন আলবদরের পাশে বসে মুচকি হাসে। এইটাই বাস্তবতা। তবে হতাশা কেঁটে যায় -যখন দেখি বাংলাদেশের তরুন সমাজ রাজনৈতিক বিভেদভুলে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের আন্দোলনে এক হয়ে যায়। সকল তরুন গলা মিলিয়ে এক সুরে বলে - রাজাকারদের বিচরন স্বাধীন বাংলায় চলবে না। বিচার হবেই।

(৫)

আজ সকালে টিভিতে দেশের গান শুনছিলাম। কিন্তু ঠিকমতো মনোযোগ দিতে পারলাম না। বারবার মনে হচ্ছিলো - এখনও কি সেই সময় এসেছে যে আমরা পরিপূর্নভাবে আমাদের স্বাধীনতার গানগুলো উপভোগ করতে পারবো। আমি মনে করি না - সময় এখনও আসেনি। একটা প্রজন্ম মুক্তিযুদ্ধ করে - জীবন দিয়ে - সম্ভম দিয়ে দেশের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। আরেকটা প্রজন্ম তাকে কিছুটা হারিয়েছে। কিন্তু যুদ্ধ এখনও শেষ হয়নি - কারন রাজাকারতন্ত্র সামরিক শাসকদের আশ্রয়ে প্রশ্রয়ে তাদের বীজ অনেদুর পর্যন্ত বোপন করেছে। এরা বারবার ফিরে আসবে - ছোবল দেবে স্বাধীনতায়। তাই তরুন প্রজন্মের জন্যে কঠিন দায়িত্ব অর্পন করেছে ইতিহাস - স্বাধীনতাকে ধরে রাখতে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে হবে। সর্বক্ষেত্রে - সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে যেন রাজাকার তন্ত্র কোন ভাবেই বিজয়ী না হয়ে যায়। যতদিন বাংলাদেশ থেকে রাজাকারতন্ত্র পরিপূর্ন নির্মূল না হচ্ছে ততদিন স্বাধীনতার স্বাদ পরিপূর্ন উপভোগ করা যাবে না - ততদিন বিজয়ের আনন্দে নিজেকে পরিপূর্ন বিলিয়ে দিলে ভুল করা হবে - কোন ভাবেই যেন বিজয়ে আনন্দ উচ্ছাস আমাদের স্বাধীনতার শত্রুতে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে না নেয় - কোনভাবেই যেন আমরা মুক্তির সংগ্রামকে অবজ্ঞা না করি।
সর্বশেষ এডিট : ১৬ ই ডিসেম্বর, ২০১১ সকাল ৮:৫০
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

লিখেছেন নাহল তরকারি, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:২৮

আপনার ATM কার্ড কি সত্যিই নিরাপদ?

ধরুন, মাসুদ একদিন বাজার করতে বের হয়েছেন। তার মানিব্যাগে একটি Contactless Visa Card ছিল। বাজারের ভিড়ের মধ্যে একজন চোর একটি বিশেষ স্ক্যানিং ডিভাইস নিয়ে ঘুরছিল।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

নাজিয়া সামান্তা, হিজাব এবং আমাদের সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক ভণ্ডামি।

লিখেছেন মহিউদ্দিন হায়দার, ১০ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫১



​একজন তরুণী প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ড্রাম বাজিয়ে দর্শক মাতাল। নেটিজেনরা বাহবা দিল। কিন্তু সমস্যাটা অন্য জায়গায়—মেয়েটি বোরকা-হিজাব পরা, সে ২০২৫ সালে হজ করেছে, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে এবং নিজের... ...বাকিটুকু পড়ুন

শৃঙ্খল মুক্তি আমার

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১০ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:৪৫

শৃঙ্খল মুক্তি আমার



ভেঙেছি সমাজের যত চেনা দায়,
চিন্তার প্রাচীর আজও ধুলোয় মেশায়।
ঈমানের নোঙর ছিঁড়েছি হেলায়,
ডুবেছি একাকী ; এক অচিন ভেলায়।
ভালোবাসা, মানবিকতার যত শত মায়াজাল,
ছিঁড়ে ফেলেছি আমি সব কটা পাল।
সহমর্মিতার পথ... ...বাকিটুকু পড়ুন

×