যদিও প্রতিবছর বাংলাদেশে গড়ে ৩৫০০ মানুষ রোড একসিডেন্টে মারা যায় - আহত হয়ে কর্মময় জীবন থেকে ছিটকে পড়ে আরো ৫০০০ নাগরিক। কিন্তু দুজন মিডিয়ার ব্যক্তিত্ব রোড একসিডেন্টে মারা গেলে (সাথে আরো তিন জন মরেছে এবং যাদের নামও আমরা জানি না) সারা দেশ আলোড়িত হয়। আলোড়িত করা যাদের ক্ষমতার মধ্যে তাদের নিজেদের একজন যখন ভিকটিম তখনই সেই ঘটনা হয় দেশের প্রধান নিউজ আইটেম।
তারপর দৃশ্যপটে এলেন দুই আবুল - একজন নায়ক আরেকজন ভিলেন। নায়ক আবুল গলায় চাদর পেঁচিয়ে ঈদ করলেন শহীদ মিনারে আর ভিলেন আবুল ঈদের ছুটিতে ছুটলেন সুটেট-বুটেট হয় রাস্তা পরিদর্শনে। তারপর একসময় সবই সুশাসন।
আসলে গোড়ায়ই যেখানে গলদ - কারন এখানে "আবুল"রাই প্রধান চরিত্র। রাস্তা থাকলে গাড়ী চলবে আর গাড়ী চললে একসিডেন্ট হবে। মানুষ মরনকে নিয়তি হিসাবে গলায় বেঁধে নিয়ে জন্মায় - সুতরাং মৃত্যু ও স্বাভাবিক। কিন্তু রোড একসিডেন্ট যেহেতু একটা নিয়ন্ত্রন করার মতো ঘটনা - সুতরাং নিরাপত্তার মানকে উ্ন্নত করা আর তা যথাযথভাবে মেনে চলা এবং তার জন্যে পর্যবেক্ষন ও প্রয়োগের সঠিক ব্যবস্থা রোড একসিডেন্টের সংখ্যা এবং হতাহতের সংখ্যা কমানো সম্ভব। আর সেই জন্যে দরকার পূর্বপ্রস্তুতি। যেমন রাস্তা নির্মানের সময় ডিজাইন সঠিক রাখা, নির্মানে সঠিক মান ও ডিজাইন অনুসন করা। যথাযথ এবং সঠিক সময় রাস্তা সংস্কার ও রক্ষনাবেক্ষন করা। চালকদের ট্রাফিক আইন সম্পর্কে জানা এবং তা মানতে বাধ্য থাকা। তা ছাড়া যান্ত্রিকযানের কারিগরী ক্রুটি মুক্ত থাকাও গুরুত্বপূর্ন। সবশেষে রাস্তা ব্যবহারকারী সবাইকে দূর্ঘটনার ঝুঁকি সম্পর্কে যথাযথ ভাবে সচেতন থাকাও জরুরী।
সুতরাং দেখা যাচ্ছে একটা রোড একসিডেন্টের জন্যে উপরে অনেকগুলো ফ্যাক্টের যে কোন একটাই যথেষ্ঠ। আর মানুষ ভুল থেকে শিক্ষা গ্রহন করে। বিশেষ করে যখন কোন মারাত্বক দূর্ঘটনা ঘটে- তখন বিশেষজ্ঞরা এই বিষয়ে তদন্ত করে তার কারন নির্নয়ের চেষ্টা করে যাতে ভবিষ্যতে এই ধরনের পরিস্থিতির সাম্ভবনা কমানো যায়। তাই স্বাভাবিক ভাবেই মানুষ একটা দূর্ঘটনার পর তদন্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিষয়ে যারা জ্ঞান রাখেন তাদের মতামতের জন্যে ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা করে।
কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সব কিছুই সুশীলদের অধিকারে চলে গেছে। দূর্ঘটনার পরপরই টকশো গুলোতে সুশীলরা এসে বাসের ড্রাইভারকে দায়ী করে আবেগময় ভাষন দিতে শুরু করলেন। ঠিক সেই সময় ময়মনসিংহের সড়কগুলোর বেহাল অবস্থার কারনে পরিবহন ধর্মঘট চলছিলো। একজন সুশীল এই একসিডেন্টের সাথে সড়কের মেরামতের বিষয়টি এক করে মন্ত্রী আবুলকে দায়ী করলেন। সুবিধাভোগী সুশীলদের আর পায় কে - সরকার বিরোধী যে কোন বক্তব্যই বাংলাদেশে বিপ্লবী হবার অনুপ্রেরনা তৈরী করে। সাথে সাথে আরেক "আবুল" মাঠে নেমে গেলেন আন্না হাজারে হয়ে আমরন অনশনের ঘোষনা দিয়েও ঈদ করলেন শহীদ মিনারে।
এদিকে বুয়েটের একসিডেন্ট রিসার্স সেন্টার থেকে ড. হাসিব মিহিমিহি সুরে একসিডেন্টের কারন হিসাবে সড়কের নির্মানত্রুটি, আর রক্ষনাবেক্ষন - বিশেষ করে বৃষ্টির কারনে দৃষ্টিসীমা সীমিত হওয়া আর গাছপালার বাঁধা ইত্যাদি বলছিলেন। কিন্তু কে শুনবে কার কথা। একজন বিশেষজ্ঞের কথা হয়তো সুশীলদের কোটরী স্বার্থের বিপক্ষে চলে যাবে - কারন নিজেদের এবং নিজেদের গাড়ী ড্রাইভারদের লাইসেন্স প্রাপ্তির গল্পটা তাদের চেয়ে ভাল কে জানবে। এছাড়া সড়ক পরিবহনের জন্যে দায়িত্বপ্রাপ্তদের অনেকেই এখন সুশীল সেজে বসে আছেন - উনারা চাইবেন না কেউ যেন উনাদের অতীত নিয়ে কথা বলে। দেখলাম গল্পকারগন নেমে গেলেন আবুল নিয়ে রম্যরচনা লেখতে - কার্টুনিষ্টরা আবুলের কার্টুন বানালো - কবিরা কবিতা লিখলো আর বিরোধীদল সরকারের ব্যর্থতার গদবাঁধা গীত গাইলো। দেখলাম উঠতি সুশীলরা ব্লগে ব্লগে আহ্বান রাখলো ঈদ হবে শহীদ মিনারে - যেতে হবে সবাইকে। একটা উৎসব উৎসব ভাব নিয়ে সবাই কোরাস করা শুরু করলো। ফলাফল রাস্তা নির্মানের ক্ষেত্রে চুরি করে ঢাকার এপার্টমেন্টের দাম আকাশে উঠানো প্রকৌশলীরা পর্দার আড়ালে থেকে গেলো। মানুষ জানলো না মাইক্রবাসের ড্রাইভার কি যথাযথ নিয়মে লাইসেন্স পেয়েছিলো কিনা। অথবা রাস্তা রক্ষনাবেক্ষন বা রুটিন নিয়মে রাস্তার উপরে চলে আসা গাছের ঢালগুলো কাঁটার দায়িত্বে থাকা লোকগুলো কেন তাদের কাজের অবহেলা করেছে!
সবশেষে একটা স্ন্তনা পাওয়া যেতো যদি এতকিছুর পরও যদি সড়ক পরিবহন ক্ষেত্রে অনিয়মগুলো নিয়ে কার্যকর কিছু হতো - তা হলেও আফসোস থাকতো না। কিন্তু সুশীলদের ক্রমাগত বিষয় পরিবর্তনের ফলে মিডিয়ার ফোকাস এখন অন্যকোন একটা বিষয়ে চলে গেছে। সুশীলরা এখন ভিন্ন বিষয়ে টকশোতে বলছেন আর পত্রিকার পাতায় লিখে যাচ্ছেন। আর যথারীতি দেশের মানুষ দূর্ঘটনায় মরছে অথবা পঙ্গুত্ব বরন করছে।
সর্বশেষ খবর হলো নিখিল ভদ্র নামক একজন সাংবাদিক রাস্তা অতিক্রম করার সময় দূর্ঘটনা পড়ে পা হারিয়েছেন। যথারীতি বাস ড্রাইভার গ্রেফতার হয়েছে। আর মিডিয়া সরকারের উপর চাপ দিচ্ছে তাকে বিদেশে চিকিৎসার জন্যে পাঠাতে। প্রশ্ন হলো বাকী যে ৪৯৯৯ জন পঙ্গুত্ব বরন করছে প্রতি বছর - তাদের চিকিৎসার জন্যে সরকার কেন বিদেশে পাঠাচ্ছে না। যারা নিহত হচ্ছে তাদের পরিবারের জন্যে সরকার কেন সাহায্য করছে না। কারন কি - সরকার আসলে দেশের সকল নাগরিকের জন্যে না - যারা মিডিয়াকে নিয়ন্ত্রন করে তাদের সন্তুষ্ট রাখাই সরকারের লক্ষ্য। গনতন্ত্র কি এই যে মিডিয়ার লোকজন গোষ্ঠীবন্ধ হয়ে নিজেদের সুবিধাগুলো আদায়ে সরকারকে ব্লকমেইল করবে আর সাধারন মানুষ তাদের দূর্ঘটনায় মৃত্যু বা বিকলাঙ্গতাকে নিয়তি হিসাবে মেনে নেবে।
আবুলদের এই খেলা থেকে যতদিন বাংলাদেশ বেড়িয়ে আসতে না পারছে - যতদিন প্রতিটি নাগরিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে সমান অধিকার না পাবে - ততদিন "আবুল"রাই হবে বাংলাদেশের বর্ষসেরা চরিত্র।
(সদালাপ ডট অর্গ এ প্রকাশিত)

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

