১২ই মার্চে ঢাকায় বিরোধী দল বিশেষ করে জামায়াত শিবিরে সহায়তায় একটা শো ডাউন হবে। অনেকে আরব বসন্তের মতো একটা বিপ্লবের স্বপ্নও দেখছেন এই উপলক্ষে। জামায়াতের ব্যারিস্টার নেতা এই বিষয়ে নয়াদিগন্তে একটা প্রবন্ধও নামিয়েছেন। দেখে শুনে মনে হচ্ছে জামায়াত- শিবির ১২ মার্চ একটা মরণ কামড় দেবার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মূলত একটা রাজনৈতিক কর্মসূচীতে কিছু দাবী দাওয়া থাকে - সাধারনত একটা মুল দাবীকে ঘিরে আরও কিছু অপ্রধান দাবী দাওয়া মিলিয়ে একটা কিছু দফা তৈরি করা হয়। ঐতিহাসিক ৬ দফা থেকে শুরু করে এরশাদ বিরোধী অনেক দফা অবশেষে ৪ দফায় রূপান্তিরত হ - যদিও মূলত এরশাদের বিদায়ই ছিলও মুল দাবী।
একাধিক দফা দিয়ে মুল-দাবীকে শক্তিশালী করা ছাড়াও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে দফাগুলো - তা হলও দুই পক্ষের মধ্যে একটা সমযোতার পথ তৈরিতে একদল কিছু দাবী মেনে নেয় - তাতে বিপক্ষেও কিছু ছাড় দিয়ে উভয় পক্ষ একটা উইন উইন পর্যায়ে যেতে পারে। এখানে মনে রাখা দরকার - দুই পক্ষেরই মরণপণ সমর্থকদের নেতারা যেভাবে উত্তেজিত করে দিনের পর দিন - তাদের কিছুটা নমনীয়তার জন্যে কিছু দাবী রাখা হয় - যাতে দুপক্ষের সমর্থকরাই নেতাদের বিজয়ী দেখার সুযোগ পেতে একটা মাঝামাঝি পর্যায়ে সমযোতা হতে পারে।
সমস্যা হয় যখন বিবদমান দলগুলোর মধ্যে গোপন কোন এজেন্ডা থাকে। তখন তারা কোন ভাবেই সমযোতায় যেতে পারে না - কারণ সমর্থকদের কাছে যা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে তা পুরোপুরি আদায় না করে এরা যখন গোপন এজেন্ডায় সমযোতা করে তখন আন্দোলন একটা বিশৃঙ্খল অবস্থায় চলে যায় - তখন তৃতীয় পক্ষের হস্তক্ষেপ জরুরী হয়ে উঠে। যা আমরা দেখেছি ১/১১ এর আগে। দুই দলই সংলাপের চেষ্টা করেছে - কিন্তু একটা সাজানো নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় যাওয়া যে প্রক্রিয়া গোপনের বাস্তবায়নের চেষ্টা চলছিলো - তা নিয়ে কোন আলোচনা হয় নি - আর দাবী দাওয়াও সেইগুলোর প্রতিফলন ছিলও না। ফলাফল - একটা অগণতান্ত্রিক শাসনের নীচে দুই বছর থাকতে হয়েছে বাংলাদেশকে।
বলাই বাহুল্য যে গনতন্ত্রিক শাসনের সরকার এবং বিরোধীদলের সমান ভাবে দায়িত্বশীল ভূমিকা নিতে হবে। কিন্তু ১/১১ এর পরও আমরা রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে খুব একটা নমুনা দেখিনি। যদিও শুরুর দিকে বিরোধীদল হিসাবে বিএনপির নেতারা (খালেদা জিয়া ছাড়া) সরকারের গঠনমূলক সমালোচনাই করছিলেন। এখন বিরোধীদল আক্ষরিক অর্থেই সরকারে বিরোধিতা করছে। প্রতিটি বিষয়ে শুধু নেতিবাচক ভূমিকা ছাড়া তারা সরকারকে সামান্য সময়ও দিতে রাজী না।
এই রকম একটা পরস্পরবিরোধী অবস্থানে আসার কারণ কি?
আমরা দেখেছি বিরোধীদল শুরু থেকেই সরকারের বিভিন্ন ইস্যুতে সমালোচনা করছে - অনেক ক্ষেত্রে সরকার সমালোচনার যথাযথ মর্যাদাও দিয়েছে ( সবচেয়ে বড় উদাহরণ ছিলও আড়িয়াল বিলে এয়ারপোর্ট নির্মাণ ইস্যু) । খালেদা জিয়া শুরু থেকেই সরকার ব্যর্থ হিসাবে আখ্যায়িত করে আন্দোলনের কথা বললেও - বিভিন্ন বিভাগে এবং ঢাকায় মহা-সমাবেশের মতো কর্মসূচীগুলো ছিলও মূলত শান্তিপূর্ণ এবং নিয়মতান্ত্রিক। যা জনমনে অস্থির কারণ হয়নি। গণতান্ত্রিক রাজনীতির চর্চা হিসাবেই দেখেছে সবাই। গন-অনশন কর্মসূচীও সবার প্রশংসা কুড়িয়েছে।
কিন্তু যখন থেকে জামায়াতের সাথে আনুষ্ঠানিক ভাবে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার ঘোষণা আসলো - তখন থেকে দেখা গেলো বিএনপির নেতা খালেদা জামায়াতের এজেন্ডার উপর বেশী জোর দেওয়া শুরু করলেন। আর রাজপথ হয়ে উঠলো উত্তপ্ত। বাস-পোড়ানো থেকে শুরু করে গেরিলা স্টাইলে ভরদুপুরে রাজপথে ভাংচুর আর পুলিশের উপর আক্রমণ করে জামায়াত শিবির আগেই সংহিতার কথা জানান দিয়েছিলো। এখন সেই ধ্বংসাত্মক শক্তি খালেদা জিয়া নেতৃত্বে নিরাপত্তা পেয়ে গেছে। বিএনপির ব্যনারের নীচে এখন শিবির-জামায়াতের কর্মীরা সংহিতা করছে আর তার দায় নিতে হচ্ছে বিএনপিকে।
জামায়াতের এজেন্ডাটা সবাই বুঝি - যেভাবেই হোক দ্রুত সরকারের পতন হলে নেতারা বিনাবিচারের জেল থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে। কারণ অতীত ইতিহাস থেকে দেখা যায় বিএনপি অপরাধীদের (যেমন ১৫ ই আগস্টের হত্যাকারীদের ) অপরাধের সুবিধা নিলেও যখন বিচারে সাজা পেয়েছে তার দায় নেয়নি। তেমনি যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের দল ভালভাবেই জানে একবার রায় হয়ে গেলে বিএনপি এই লোকজনের দায় নেবে না। তাই বিএনপির ঘাড়ে চেপে বসে দ্রুত সরকারকে বিদায় করতে পারলে হয়তো এই বিচার বন্ধ করা যাবে।
অন্যদিকে দেখি বিএনপির তরুণ কর্মীরা এবং সাধারণ সমর্থকদের একটা বড় অংশ যুদ্ধাপরাধীদের দায় নিতে না চাইলেও শুধুমাত্র দলের প্রতি আনুগত্যের কারণে এখন আন্দোলনের প্রতি সমর্থন করতে বাধ্য হচ্ছে। কর্মী সমর্থকদের মতামতের প্রতি তোয়াক্কা না করেই খালেদা জিয়া সরাসরি যুদ্ধাপরাধের বিচার বিরোধিতা করে বত্তৃতা দিচ্ছেন কারণ উনার ব্যক্তিগত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্যে দলকে উদ্ভৃদ্ধ করতে উনি ব্যর্থ হয়েছেন। বিশেষ করে উনার ছেলেদের ভবিষ্যত বিবেচনায় উনিও দ্রুত সরকারের বিদায় চাচ্ছেন। খালেদা জিয়ার পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে সরকারের সাথে একটা সমযোতায় আসার চেয়ে উনি সরকারের উপর চাপ সৃষ্টির মাধ্যমে একটা মোটামুটি নিশ্চয়তা চাচ্ছিলেন। কিন্তু একসময় একটা বিশেষ মহলের চাপে ঝুলে পড়া মামলাগুলো ( বিশেষ করে ২১এ আগষ্ট, দশট্রাক অস্ত্র মামলা ইত্যাদি) আবার সচল হলে খালেদা জিয়ার জন্যে অল-আউট হয়ে নামা ছাড়া উপায় থাকেনি। উনি সমযোতার আসল পয়েন্ট তারেককে রাজনীতিতে পুনর্বাসন না করার বিষয়টি ভুলে গেলেও অনেকে ভুলে যায়নি। এখন খালেদা জিয়ার সামনে একমাত্র পথ দেশে আন্দোলনের নামে বিশৃঙ্খলার হুমকি দিয়ে বিভিন্ন মহলকে সক্রিয় করে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করা আর নিজের এজেন্ডাগুলোর একটা নিশ্চয়তা পাওয়া।
শুরুতে যা বলছিলাম - যে কোন আন্দোলনের দাবী দাওয়াগুলো জনগণের সামনে সৃস্পষ্ঠভাবে উপস্থাপন করে তার পক্ষে জনমত তৈরি করার একটা প্রক্রিয়া রাজনীতিতে বহুল ব্যবহূত। কিন্তু বর্তমানের জামায়াত নির্ভর খালেদা জিয়া আন্দোলনের দাবীগুলো কি?
মোটাদাগে যদি দেখি - তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা। যা করতে হবে সংসদে। যদি বিএনপি সংসদে গিয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের একটা রূপরেখা দিয়ে তারপর আন্দোলনের নামতো - তাহলে বুঝা যেতো আসলে তারা এই বিষয়ে সিরিয়াস। খালেদা জিয়া বক্তব্যগুলো দেখলে তার থেকে সিদ্ধান্তে আসা কঠিন - তারপরও মনে হচ্ছে উনি চান সরকার যেভাবে বাতিল করেছে ঠিক সেভাবে ব্যবস্থাটা ফিরিয়ে আনুন - যাতে উনি সরকারকে পরাজিত করেছেন তার একটা বিজয় মিছিল করতে পারেন। বাস্তবতা হলও - সরকারের পক্ষে তা সম্ভব নয়। কারণ কোর্টের রায়ে বিচারপতিদের এই ব্যবস্থার বাইরে রাখার নির্দেশ দেওয়া আছে। সুতরাং সমযোতার মাধ্যমে একটা নতুন ব্যবস্থা আনা যেতে পারে। কথা থাকে যে সরকার একক ভাবে যে কেন ব্যবস্থাই আনুন না কেন - খালেদা জিয়া তারই বিরোধিতা করবে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। সুতরাং সরকারের পক্ষে একক ভাবে কোন পদক্ষেপ দেওয়ার রাস্তাও বন্ধ করে রেখেছে বিরোধীদল।
তারপর দেখছি নেতারা থেকে থেকে সরকারের বিদায় ঘণ্টা বাজাচ্ছেন। এইটা খুবই বিভ্রান্তিকর। যখন ডিসেম্বরের ১৮ তারিখের বিকেলের সম্মেলনের নামে ভোর থেকে বোমাবাজি করে বিরোধীদল একটা অবিশ্বাসের জন্ম দিয়েছে - তখন কোন সুনির্দিষ্ট দাবী দাওয়া ছাড়া খালেদা জিয়ার ডাকে জামায়াত শিবির ক্যাডারদের ঢাকায় জমায়েত হতে দেওয়াটা যে বিপজ্জনক হতে পারে - তা বুঝার জন্যে তেমন কোন গোয়েন্দা তথ্যের দরকার হয় না। আগেই বলেছি - যে কোন মূল্যে সরকারের পতনের জন্যে যে কোন ধরনের অপকর্ম করে যে কোন শক্তিকে ক্ষমতায় দেখতে জামায়াত শিবির বদ্ধপরিকর। সেই বিবেচনায় ১২ই মার্চের মহা-সমাবেশ বা চল চল ঢাকা কর্মসূচীকে কোন ভাবেই অহিংস গণতান্ত্রিক অধিকার চর্চার সমাবেশ হিসাবে দেখলে বিরাট ভুল হতে পারে।
খালেদা জিয়া ১/১১ এর পর থেকে দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয়েছে। নিজের একক সিদ্ধান্তে সংসদ বর্জন থেকে শুরু করে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের বিরোধিতা আর জামায়াতকে আশ্রয় দিয়ে নিজেকে বিপজ্জনক নেতা হিসাবে প্রমাণ করেছেন।
বিপজ্জনক এক নেতার নেতৃত্বে একটা সুসংগঠিত ক্যাডার দলকে গণতন্ত্রের নামে রাজধানীতে সমাবেশ করার মাধ্যমে বিশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরির পক্ষে বিপক্ষে সবাইকে সতর্ক থাকা দরকার। ভুল হয়ে যাওয়া আগেই ভাবা দরকার। দরকার সকলের শুভবুদ্ধির চর্চার। গণতন্ত্র চর্চাকে অব্যাহত রাখার স্বার্থে সবাইকে নিজেদের সীমানা বুঝে চলা দরকার। দরকার দেশের অর্থনীতির কথা ভাবা - দরকার আইনের শাসনের প্রতি আনুগত্য - দরকার নিজেদের বিবেকের কাছে জবাবদিহি করা।
এই সময়ে সরকার এবং সরকারী দলকেও ধৈর্যের সাথে কাজ করতে হবে। এইটা বলা দরকার যে সারা বিশ্বে যদি দলীয় সরকারের অধীনে সুস্থ নির্বাচন হয় – তবে বাংলাদেশে কেন হবে না? কারণ দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন করার মতো যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং প্রাজ্ঞ নেতৃত্ব দরকার – বাংলাদেশে তা বর্তমানে অনুপস্থিত। রাজনৈতিক দলগুলোতে প্রাজ্ঞ নেতার চাইতে কৌশলী নেতার সংখ্যা বেশী – যারা রাজনৈতিক বৈরী পরিবেশে নিজেদের পদরক্ষা করাতে যথেষ্ট পারমঙ্গ। এই বাস্তবতায় আগামী সংসদ নির্বাচন একটা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে হবে – এই ধরনের একটা সুস্পষ্ট ঘোষণা আসা দরকার সরকারের পক্ষ থেকে। হুমকি ধমকি দিয়ে আন্দোলনে দমনের ফলাফল হিতে বিপরীত হবে কিংবা কামরুলের মতো একজন উকিল দিয়ে খালেদা জিয়াকে জ্ঞানদান করে সমস্যার সমাধান হবে না। - কারণ খালেদা জিয়া জেনেশুনেই চরমপন্থা অনুসরণ করতে যাচ্ছেন। সুতরাং একটা সুস্পষ্ট ঘোষণার আলোকে আলোচনার একটা প্রক্রিয়া শুরু করা জরুরী। জামায়াত-বিএনপিকে লাশের রাজনীতি করার সুযোগ দিয়ে সরকার দেশকে নিরাপত্তা হীনতায় ফেলে দেবে। একটা সুস্থ রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরিতে সরকারের পক্ষ থেকে অনেক বেশী কৌশলী ভূমিকা দরকার।
সর্বশেষ এডিট : ১১ ই ফেব্রুয়ারি, ২০১২ সন্ধ্যা ৭:০০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



