somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি সাধাসিধা ফুটবল ম্যাচের কাহিনী

১২ ই নভেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৫:০৬
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

আমাদের পাড়ার 'দি রয়াল বেঙ্গল ষ্পোর্টিং ক্লাব'টি শহরে বেশ পরিচিত। যেকোন টুর্নামেন্ট-এ রয়াল বেঙ্গল একটি সমীহ জাগানিয়া নাম।সেটা ফুটবল বা ক্রিকেট যাই হোক না কেন। তাই মোল্লাপাড়ার ছেলেরা যখন 'দি মন্টু মিয়া গোল্ডকাপ টুর্নামেন্ট'র ঘোষনা দিল, আমরা সবাই একটু নড়েচড়ে উঠলাম। মোল্লাপাড়ার সাথে আমাদের হিসেবটা পুরনো। ওদের 'দি গ্রীন ষ্পোর্টিং ক্লাব' নিয়ে ওদের খুব গর্ব। তা তারা গর্ব করতেই পারে। কিন্তু মেজাজ গরম হয় যখন ওদের টীমকে আমাদের টীমের সমকক্ষ ভাবে। ভাবখানা এই- আমরা আবাহনী হলে তারা মোহামেডান, আমরা ব্রাজিল হলে তারা আর্জেন্টিনা। অথচ আমরা তাদের পাত্তাই দেই না। আসলে আমরা আবাহনী হলে তারা ফকিরেরপুল, আমরা ব্রাজিল হলে তারা খুব বেশীর বেশী সৌদী আরব।

এন্ট্রী ফী জমা দিয়েই শুরু করলাম প্র্যাক্টিস। আমাদের প্রবল উৎসাহ। এইবার গ্রীন ক্লাব-কে দেখিয়ে দেবো। টুর্নামেন্ট শুরুর পরে আমরা বেশ তরতর করে একেবারে ফাইনালে উঠে গেলাম। ফাইনালে আমাদের প্রতিপক্ষ পড়লো মোল্লাপাড়ার গ্রীন ক্লাব। এ ধরনের টুর্নামেন্ট-এ কমিটির একটা টীম থাকে, যেটা যেকোন উপায়েই ফাইনাল, নিদেনপক্ষে সেমিফাইনাল পর্যন্ত খেলে। এটাই নিয়ম। আমাদের কপাল ভালো ফাইনালের আগে ওদের সাথে দেখা হয়নি। তবে যতই কমিটির টীম হোক, আমরাও বিনা যুদ্ধে নাহি দিবো…

আমাদের এই খেলাধুলা পাড়ার বড়োদের কাছে কখনই খুব একটা পাত্তা পায়না। কিন্তু এইবার ফাইনালে চলে যাবার জন্য-ই হোক বা প্রতিপক্ষ মোল্লাপাড়া বলেই হোক, ব্যাপারটা তাদের নজরে আসলো। ফাইনালের আগের দিন, বিল্লাল ভাই, যিনি একসময় খোদ ঢাকার সেকেন্ড ডিভিষনে খেলেছেন, আসলেন আমাদের বুদ্ধি পরামর্শ দিতে। শুধু দৌড়াদৌড়ি করলেই খেলা হয় না। খেলায় জিততে হলে চাই পরিকল্পনা, চাই ষ্ট্র্যাটেজি। সদ্য ব্যবসায়ি কয়েসুদ্দিন ভাই হাফটাইমে কোক খাওয়ানোর ঘোষনা দিলেন। আর চ্যাম্পিয়ান হতে পারলে একেবারে চায়নিজ। পাড়াতো রাজনীতিবিদ আহমদুল্লা চাচা 'এই শহরে খেলাধুলার ভবিষ্যত এবং আমাদের পাড়ার ঐতিয্য' শীষক একটা রক্ত গরম করা ভাষন দিলেন। আমরা সবাই বজ্র কন্ঠে আওয়াজ দিলাম- 'নারায়ে…।

খেলা শুরু হবার বেশ আগেই মাঠে পৌছলাম। লোকে লোকারন্য। মন্টু মিয়া নিজের নাম ফাটানোর জন্য বেশ ভালোই মাইকিং করিয়েছে। খেলা শুরুর আগে বিল্লাল ভাই আরেকদফা ব্রিফিং দিলেন। 'মনে রাখবি, কমিটীর টীম, রেফারীও ওদের, সুতরাং নো ফাউল'। আবার জিগস – কমিটীর টীমকে ফাউল করবো, আমরা এতোই আবুল?

খেলাটা বেশ ভালোই জমলো। ওদের টীমে তিনজন হায়ার করা প্লায়ার আছে। একেকটা মনে হয় ক্যামেরুন নইলে নাইজেরিয়া থেকে এসেছে। বিশালদেহী। মিশা সওদাগর টাইপ চেহারা। মোটামুটি ফেয়ার খেললেও হাফ টাইমের আগেই ২জন হলুদ কার্ড পেয়ে গেলাম। আমাদের লাল্টু আহত হয়ে মাঠ ছাড়লো। হাফ টাইম পর্যন্ত রেজাল্ট ০-০। পায়ের ফোলায় হাত বুলাতে বোলাতে খালি কোকের বোতলে চুমুক দিছি, এমন সময় বিল্লাল ভাই এসে জিয়াকে (আমাদের বেষ্ট প্ল্যায়ার) জিজ্ঞেস করলেন, 'ওই, ওদের ব্যাকের দেড়ইঞ্চি ছাগল্টা কে রে'? 'ওদের ক্যাপ্টেন, তারাজ'। 'তোরা ওই ছাগুটাকেই টারগেট কর'। আমাদের সবাইকে নিরদেশ দিলেন-'তোরা বল টা কোনরকম জিয়াকে পৌছে দিবি। বাকিটা সেই করবে'।

সেকেন্ড রাউন্ডের খেলা শুরুর ১০ মিনিটের মধ্যেই জিয়া ছাগুকে ফাকি দিয়ে গোল করে বসলো। বিনিময়ে পরের ১০ মিনিটে আমাদের ২জন লাল কার্ড। ৯ জনের টীম হয়ে গেলাম ৭ জনের। মাঠের দর্শকদের পুরো এখন আমাদের দিকে। শুধু ওদের পাড়ার আর ভাড়াটে প্ল্যায়ারদের পাড়ার কয়েকজন ওদের পক্ষে চেঁচাচ্ছে। আমরা একটু ডিফেন্সিভ মুডে চলে গেলাম। তারপরও খেলা শেষ হবার ৫ মিনিট আগে জিয়া আরেকটা গোল দিয়ে দিলো। খেলা শেষ হল ২-০ গোলের ব্যবধানে।

পুরষ্কার বিতরনীর সময় আমাদের চোখ পড়লো ট্রফিটার দিকে। বেশ বড়োসড়ো সোনালী রং-এর একটা ট্রফি।
'দোস্ত, ট্রফিটাকি সোনার'? আমাদের গোলকিপার লিয়াকত আস্তে আস্তে জিজ্ঞেস করে।
'আরে ধ্যাত, এসব ট্রফি আবার সোনার হয়নাকি'?
'হতেও তো পারে! মন্টু মিয়া তো বড়োলোক মানুষ', লিয়াকতের সন্দেহ যায় না।
'আরে শোন', এবার বুদ্ধিজীবি হাসু নাকগলায়, 'খেলায় ট্রফীটাই বড় কথা নয়। তারওপর ছাগলগুলোকে ওদের দৌড় বুঝিয়ে দেয়া হয়েছে। এরপর রয়েছে আমাদের পাড়ার ঐতিজ্য, সন্মান…আমাদের পরবর্তি প্রজন্ম যখন…' হাসুর গলা আস্তে আস্তে চড়তে থাকে। আহমদুল্লাহ চাচার ভাষনটা তার খুব মনে ধরেছে বোঝা যাচ্ছে।
'আচ্ছা আচ্ছা বুজচ্ছি, চুপ কর'। হাসুকে তাড়াতাড়ি থামাই। এক আহমদুল্লাহ'র জালায়-ই বাঁচি না, তারওপর আবার উনি।
অনুষ্ঠানের প্রথমেই শুরু হল বক্তৃতা পর্ব। মন্টু মিয়া থেকে শুরু করে ওদের ক্লাবের সহ-দপ্তর সম্পাদক, সবাই কাঁপা কাঁপা গলায় বক্তব্য রাখলেন। এরপর শুরু হল আসল পর্ব। ম্যান অফ দ্য টুর্নামেন্টের পুরষ্কার পেল মোল্লাপাড়ার তেড়া খালেক। তেড়া খালেক মন্টু মিয়ার ছোট ভাই।
'আমি মোটেই আশ্চর্য হইনাই', লিয়াকত ফিসফিস করে।
ম্যান অফ দ্য ম্যাচের পুরষ্কার পেল ওদের ক্যাপ্টেন তারাজ।
'এও দেখতে হল। আমার আর কিছুই বলার নেই'- লিয়াকতটা খামাকাই কথা বলে।

'এবার এই টুর্নামেন্ট-টা সফল ভাবে পরিচালনা করার জন্য 'মোল্লাপাড়া এলাকা কল্যান সংস্থা'র সন্মানিত সভাপতি জনাব মানব দাসের হাতে পুরষ্কার তুলে দিবেন বিশিষ্ট সমাজসেবী জনাব মন্টু মিয়া। সবাই তালিয়া বাজান'।
আমরা তালিয়া বাজালাম।
'আপনাদের সবাইকে অশেষ ধন্যবাদ। আমাদের অনুষ্ঠান এখানেই শেষ'।

আরে আজব। এটা কেম্নে হয়? আমাদের কথাতো কিছুই কইল না। নিশ্চই কোন ভুল হইছে।
কয়ছরুদ্দিন ভাই গিয়ে মানব দাসের কানে কানে বলেন, 'দাদা, আপনারা মনে হয় ভুইলা গেছেন, রয়াল বেঙ্গল ক্লাব্-রে পুরষ্কার দেয়া হয় নাই'।

'কি কন, রয়াল বেঙ্গল খেলসে নাকি!! আমিতো জানিনা', মানব বাবু চোখ কপালে তোলে।
'জী, খেলছে এবং জিতছেও'।
'আরে ভাই কে জিতছে আর কে হারছে এইটা আপনে বলার কে? গোল বেশি দিলেই খেলায় জেতে নাকি? আর আমিতো ওদের খেলা দেখিই নাই'।
'তাজ্জব, এতো সময় ধইরা দুই দল ফুটবল খেললো, আর আপ্নে খালি এক দল্-রে দেখলেন'? আহমদুল্লাহ চাচা এইবার আওয়াজ দেন।
'স্যরি, আমার টাইম ছিলনা দুই দলের খেলা একসাথে দেখার। আর তাছাড়া পুরষ্কারটাই তো আসল ব্যাপার না।'-মানব বাবুর একগুয়ে উত্তর।
'তাইলে যে আপ্নে মন্টু মিয়ার কাছ থাইকা পুরষ্কার নিলেন' –ভীড়ের মধ্যে কে যেন জিজ্ঞেশ করে।
'তো কি হল। আমরাইতো এই টুর্নামেন্ট-টার কথা আপ্নেদের বলছি, ঠিক কিনা? এই টুর্নামেন্ট আয়োজনে আপ্নেদের রয়াল বেঙ্গলের কোন স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ আছে? নাই। তাইলে আপ্নেরা কি আশা করেন'?
'তারপরও, সবাই কিছু না কিছু পাইল, অন্তত নাম কওয়া হইল, আর আমাগো টীম একেবারে হাওয়া'- তর্কবাজ আহমদুল্লাহও যেনো এই গোঁয়ারের সাথে তর্ক করতে উৎসাহ পাচ্ছেননা।
'আঁরেঁ ভাঁইঁ, আঁপ্নেঁরাঁ কিঁ শুঁরুঁ কঁরলেঁন? ফুঁটবঁল নিঁইয়েঁ রাজনীতি, দোঁহাই লাঁগে, বঁন্ধ কঁরেন'- হঠাৎ পেছন থেকে ভেসে আসে মানব বাবুর চামচা অবহরিদাস-এর গলা।
আহমদুল্লাহ চাচা বা কয়সরুদিন ভাই, কেউই এই গোঁয়ার বা চামচার সাথে আর তর্ক করতে চাইলেন না।
আমরা সবাই আমাদের পাড়ায় ফিরে এলাম।






*********************
কারও কৃতিত্ব কে কেউ কখনই খাটৌ করতে পারে না | বেতার আবিঃষ্কারের কৃতিত্ব যতই অন্য কারো নামে লিখা হোক, আমরা অন্তরে জগদীশ চন্দ্র বসুর নামই লালন করি | ছোট্ট জনির জন্য আমার ব্লগ এবং অন্যান্য সহ ব্লগারদের অবদানও আমরা লালন করব | রবীন্দ্রনাথ কি সাধে বলেছিলেন :

আপন হতে বাহির হয়ে, বাইরে দাঁড়া |
বুকের মাঝে বিশ্ব লোকের পাবি সাড়া |

আমরা সবাই যদি বুকের মাঝে বিশ্ব লোকের সাড়া পেতাম তবে ফুটবল ম্যাচের ইতিহাস ও মনে পড়ত না আর এ ব্লগেও লিখা হত না |

আর জনি সোনা ....... বেঁচে থাক তুই যখন যেখানে যেমন চাস।
৮টি মন্তব্য ৩টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

রবিন খুদারা কেন বাংলাদেশে বিনিয়োগ করেন না ?

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:২৩


Robin Khuda ঢাকার ছেলে। স্কুল পড়েছেন এই দেশেই। তারপর অস্ট্রেলিয়া গেছেন, AirTrunk বানিয়েছেন, Blackstone তাকে ১৬ বিলিয়ন ডলারে কিনে নিয়েছে, আর এখন তিনি ভারতে ৩০ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করছেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

লিখেছেন নতুন নকিব, ১১ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৯:০৩

দ্বিধাদ্বন্দ্ব কাটিয়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে নবীজির শেখানো এক অনন্য আমল

ছবি অন্তর্জাল থেকে নেওয়া।

মানুষের জীবন মূলত অসংখ্য ছোট-বড় সিদ্ধান্তের সমষ্টি। প্রতিটি বাঁকে, প্রতিটি মোড়ে আমাদের কোনো না কোনো... ...বাকিটুকু পড়ুন

দ্যা ফায়ার অফ মাই সউল

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১১ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৫:১৪

আমি যে ধরণের গান পছন্দ করি, সেগুলোর মাঝে ক্বারি আমির উদ্দিনের 'কুহু সুরে মনের আগুন' গানটি আমার খুব প্রিয়। এই গানটিকে সম্প্রতি ইংরেজিতে অনুবাদ করে গান বানিয়েছি, এনিমেশন... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

লিখেছেন আঘাত প্রাপ্ত একজন, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ৮:২৬

ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬

[সম্ভাবনার ক্রমানুসারে নয়ঃ]

আর্জেন্টিনা: আর্জেন্টিনার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ তার ডিফেন্স আর ইনজুরি । ৩৮ বছরের তরুণ(!) সেন্টারব্যাক ওতামেন্দি আর কমপক্ষে এক হালি হাফ-ফিট ফুটবলার নিয়ে ১৯ জুলাই পর্যন্ত... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমার ডক্টর যেন বাঁচে ১৫০ বছর.....

লিখেছেন শায়মা, ১১ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:০৪



ডক্টরস, হসপিটাল এবং ওষুধ এসব নিয়ে আমার তিক্ত অভিজ্ঞতার শেষ নেই। এ কারনে আমি একদম এদের কাউকেই পছন্দ করি না। তবে কিছু তো করার নেই। জীবনের নানা সময়ে ইচ্ছের... ...বাকিটুকু পড়ুন

×