মূলা চুরির অভিযোগে গ্রেফতারকৃতকেও রিমান্ডে নেয়ার ক্ষমতা আছে পুলিশের। এক্ষেত্রে পুলিশের ক্ষমতা অবারিত। ৫৪ ধারায় গ্রেফতারকৃত এমনকি আদালতে আত্দসমর্পণকারীকে রিমান্ডে নেয়ার ক্ষমতাও চর্চা করছে পুলিশ। আদালতে ডিমান্ড করলেই ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড দিতে অনেকটা বাধ্য। পুলিশের ডিমান্ডে মঞ্জুরকৃত রিমান্ডের কমান্ডিংও থাকে পুলিশেরই হাতে। যদিও ম্যাজিস্ট্রেটের কোনো আসামিকে পুলিশ রিমান্ডে দেওয়া না দেওয়ায় ক্ষমতা দু'টোই আছে। তবে রিমান্ডে দেওয়ার ক্ষমতা যতো বেশি, না দেওয়ার ক্ষমতা ততো নয়। এক্ষেত্রে পুলিশের ডিমান্ডই বেশি কার্যকর। বলা যায়, এ কাজে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পুলিশের।
বরাবরই পুলিশের এ নিরঙ্কুশ ক্ষমতার বেনিফিট নেয় ক্ষমতাসীনরা, প্রভাবশালীরা। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের কাউকে প্লেট চুরি, ঘড়ি চুরি, মোবাইল ফোন চুরির মতো মামলা দিয়ে গ্রেফতারের পর পরই নেয়া হয় রিমান্ডে। মামলা আসল উদ্দেশ্য নয়। আসল উদ্দেশ্য রিমান্ডে নিয়ে নাস্তানাবুদ করা। সোজা কথায় ধোলাই দেওয়া। এর প্রক্রিয়া হচ্ছে প্রথমে মামলা সাজানো। এরপর বিদ্যুৎগতিতে গ্রেফতার-নাজেহাল, ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চালান। সেখান থেকে পুলিশ রিমান্ডে। আসামিপক্ষ নামজাদা উকিল-ব্যারিস্টার দিয়েও এ রিমান্ড ঠেকাতে পারে না। কারণ রিমান্ড ঠেকানোর আইনি কোনো শক্ত বিধান নেই বললেই চলে। রিমান্ডে নেয়ার জন্য পুলিশের স্বপক্ষে যতো সহজতর আইনি বিধান আছে; রিমান্ডে না নেয়ার জন্য আসামি পক্ষে তা নেই।
রিমান্ডের নামে কী হয়_ তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্যদের সেভাবে বোঝার কথা নয়। অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরাও লাজ শরমের মাথা খেয়ে রিমান্ডের সব ঘটনা বলেন না। সমাজের সম্মানিত _অসম্মানিত কারো পক্ষেই বলা সম্ভব নয় রিমান্ডে তার যৌনাঙ্গে ইলেকট্রিক শক দেয়া বা পায়ুপথে লাঠি ঢুকিয়ে দেয়ার কথা। বড় জোর বলেন, পুলিশ তার সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেছে। একটু বেশি বললে বলা যায় পুলিশ গায়ে হাত তুলেছে। শুধু হাতই তুলেছে, না পা-ও তুলেছে এবং তা কিভাবে এসব বলে লজ্জায় পড়তে চান না অনেকেই। অনেকে আবার রিমান্ডের পরিণতিতে শারীরিক-মানসিক বোধই হারিয়ে ফেলেন। স্মরণ করতে পারেন না রিমান্ডে তার ওপর কী নিপীড়ন চলেছিল।
এমনিতেই পুলিশ অত্যন্ত ক্ষমতাধর। প্রকাশ্যে, গোপন স্থানে বা থানার লকআপে যেকোনো স্থানে যে কোনো সময় কাউকে আচ্ছা মতো ধোলাই দেয়ার ক্ষমতা পুলিশের আছে। এ ক্ষমতা পুলিশ অহরহরই চর্চা করছে। আর রিমান্ড হচ্ছে অনেকটা আইনগতভাবে নির্যাতনের পর্ব। প্রচলিত কোনো আইনেই রিমান্ডে নির্যাতন অপরাধ হিসেবে গণ্য নয়।
রিমান্ডের অভিধানিক অর্থ 'পুনঃপ্রেষণ'। এর ব্যাখ্যা হচ্ছে, অধিকতর তথ্য সংগ্রহের উদ্দেশ্যে গ্রেফতারকৃতকে পুলিশ হেফাজতে পাঠানো। অভিধানে বা আইনের ভাষায় এরকম বলা হলেও রিমান্ডের বাস্তব বা প্রয়োগিক অর্থ হচ্ছে পুলিশকে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির ওপর নির্যাতনে কার্যত লাইসেন্স বা অনুমতি দেয়া। রিমান্ডে পুলিশ গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে কিভাবে হেফাজত করে তা ভুক্তভোগী ছাড়া অন্য কারো বোঝা কঠিন। শুনলেই গা শিউরে উঠার মতো সেই হেফাজতের বর্ণনা। রাজনীতির পজিশন-অপজিশনের অনেকেই সেই হেফাজতের ভুক্তভোগী। বিশেষত ওয়ান ইলেভেনের পট পরিবর্তনের পর রিমান্ডের নানা বীভৎস ও ভয়ঙ্কর পর্বের স্বাদ নিতে হয়েছে রাজনীতিকদের অনেককেই।
কম্বল থেরাপি (কম্বল প্যাঁচিয়ে পেটানো), বস্তা থেরাপি (বস্তায় পুরে পেটানো-আছড়ানো), বাদুর ধোলাই (উল্টো করে ঝুলিয়ে পেটানো), ড্যান্সিং টর্চার (বৈদ্যুতিক শক), পায়ুপথে লাঠি বা গরম ডিম ঠুকানো, পেনিস থেরাপি_ ইত্যাদি ধরনের লোমহর্ষক নিপীড়নে হেফাজত করা হয় সেখানে। আর রিমান্ডের আসামিটি নারী হলে হেফাজতের নমুনা হয় আরো জঘন্য-অকথ্য। সুস্থ-স্বাভাবিক কোনো নারীর পক্ষে রিমান্ডের সেই বর্ণনা বাইরের কারো কাছে বলার মতো নয়। অবশ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট এরশাদের সাবেক স্ত্রী বিদিশা পুলিশ রিমান্ডে নির্যাতনের কিঞ্চিত বর্ণনা প্রকাশ করেছেন।
সেই হেফাজতের তোড়ে কোনো আসামি যেসব স্বীকারোক্তি দেয় সেগুলোর আইনগত ভিত্তি নেই। আদালতে সেগুলো সাক্ষ্য হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। তাহলে এ ধরনের স্বীকারোক্তির অর্থ কী? অর্থাৎ নির্যাতনই সার কথা। রিমান্ড মঞ্জুরকারী ম্যাজিস্টেটেরও না জানার কথা নয় হেফাজতকালে পুলিশ গ্রেফতারকৃতকে কী করে, তার সঙ্গে কী আচরণ করে। পুলিশী হেফাজতের প্রায়ই মানুষ মরছে। মৃত্যুগুলোর খবর নিশ্চয়ই রিমান্ড মঞ্জুরকারী ম্যাজিস্ট্রেটরাও জানছেন। এরপরও পুলিশ বা সরকারের ডিমান্ড মতো রিমান্ড মঞ্জুর চলছেই।
রিমান্ডের ব্যাপকতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যেও আলোচনা হচ্ছে। রিমান্ড মঞ্জুর প্রশ্নে সমালোচনা হচ্ছে ম্যাজিস্ট্রেটদেরও। পুলিশের ডিমান্ড অনুযায়ী বা পুলিশ চাহিবা মাত্র ম্যাজিস্ট্রেটরা কেন রিমান্ড মঞ্জুর করেন_ এ নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার অন্ত নেই। মামুলি, সাজানো বা সন্দেহজনক (৫৪ ধারার) মামলায়ও পুলিশ রিমান্ড ডিমান্ড করে বসছে। ম্যাজিস্ট্রেটরা তা মঞ্জুর করছেন। এ ধরনের রিমান্ড মঞ্জুরের ঘটনা বিচার ব্যবস্থা এবং ম্যাজিস্ট্রেটদের সম্মানে আঘাত হানছে। বাস্তবতা হচ্ছে, প্রচলিত আইনে ম্যাজিস্ট্রেটদের রিমান্ড দেওয়ার যতো ক্ষমতা আছে, না দেওয়ার ততো ক্ষমতা কার্যত নেই। অপরাধের অধিকতর তদন্তের জন্য গ্রেফতারকৃতের কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের জন্য পুলিশ আদালতের কাছে রিমান্ড ডিমান্ড করে। মামলার ডায়রি উপস্থাপনসহ পুলিশ এমন কিছু কারণ উপস্থাপন করে তখন ম্যাজিস্ট্রেটদের রিমান্ড মঞ্জুর করা ছাড়া আর কোনো পথ থাকে না। মূলা চুরি, থালাবাসন ভাঙচুরের মতো মামলায়ও পুলিশ শক্ত মতো গ্রাউন্ড সাজিয়ে বা আরো এক বা একাধিক মামলা সাজিয়ে কেস ডায়েরি উপস্থাপন করলে ম্যাজিস্ট্রেট রিমান্ড মঞ্জুর করতে অনেকটা বাধ্য হয়। কেস ডায়েরি ও রিমান্ডের আবেদনের বাইরে ম্যাজিস্ট্রেটদের আর বেশি কিছু দেখার অবকাশও নেই। মামলাটি সাজানো না প্রকৃত সেটিও রিমান্ডের ক্ষেত্রে বিবেচ্য নয়। মোট কথা রিমান্ডের বিষয়টি বলতে গেলে প্রায় পুরোটাই পুলিশের এখতিয়ারে।
রাজনৈতিক মামলায় ক্ষমতাসীনরা প্রতিপক্ষকে নাজেহাল করতে পুলিশকে রিমান্ডের ইঙ্গিত দেয়। প্রভাবশালীরাও বিভিন্ন জনকে জনমের শিক্ষা দিতে পুলিশের দ্বারস্থ হন। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে শুধু মামলা চাপানো নয় কেউ কেউ রিমান্ডে নিয়ে ধোলাই দেওয়ার কন্ট্রাক্ট করেন পুলিশের সঙ্গে এটি একটি ওপেন সিক্রেট। রিমান্ডে নেওয়া না নেওয়া নিয়ে পুলিশের বাণিজ্যের কথা বহুদিন থেকেই শোনা যাচ্ছে। গ্রেফতারের পর স্বজনরা পুলিশের কাছে প্রথমেই ধরনা দেয় রিমান্ডে না নিতে। সাধারণ মানুষও ইতোমধ্যে এই জ্ঞানটুকু অর্জন করেছে যে, পুলিশ ইচ্ছে করলে রিমান্ডে নিতে পারে, না-ও নিতে পারে। অর্থাৎ রিমান্ড প্রশ্নে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা পুলিশেরই। ম্যাজিস্ট্রেট কার্যত অসহায়। তবে প্রচলিত আইনের এ মারপ্যাঁচ না বোঝায় অনেকেই ম্যাজিস্ট্রেটদের দোষেন। ম্যাজিস্ট্রেট ও পুলিশকে এক কাঁতারে পরিমাপ করেন। আরো উল্লেখযোগ্য বিষয় হচ্ছে রিমান্ড একবার মঞ্জুর হয়ে গেলে তা আর রদ বা বাতিল করার ব্যবস্থা নেই। উচ্চ আদালতেরও এ ব্যাপারে করার কিছু নেই। জানা মতে, রিমান্ড প্রশ্নে এখনো পর্যন্ত হাইকোর্ট থেকে দিক নির্দেশনামূলক কোনো রুলিং আসেনি। এছাড়া ম্যাজিস্ট্রেটদের মঞ্জুরকৃত রিমান্ড যৌক্তিক না অযৌক্তিক, আইনসম্মত না আইনবিরুদ্ধ তা নির্ণয়েরও কোনো সুযোগও নেই।
ব্যক্তিগত পর্যায়ের আলাপচারিতায় অপজিশনের অনেক রাজনীতিককে বলতে শুনেছি, মামলায় তারা ভয় পান না। ভয় নেই কারাবরণেও। ভয় শুধু রিমান্ড নিয়ে। আবার তারা এমনও বলেন, আল্লাহ কোনোদিন ক্ষমতায় নিলে রিমান্ডের নামে এ পুলিশি বর্বরতার অবসান ঘটানোর উদ্যোগ নেবেন। বাস্তবে অপজিশনের এ রাজনীতিকরা পজিশনে গিয়ে আগের কথা ভুলে যান। ভীতিকর রিমান্ডই তখন তাদের খুব ডিমান্ড। প্রতিপক্ষকে শিক্ষা দিতে তারাই মামলার খেলায় নামেন। গ্রেফতার করান। গ্রেফতারের পর রিমান্ড নিশ্চিত করান। রিমান্ডে পাঠানোর পর খবর নেন_ ঠিকভাবে থেরাপি দেয়া হচ্ছে কি না! নাকে মুখে মরিচ-গরম পানি, পায়ুপথে গরম ডিম যেন ঠিকভাবে দেয়া হয় পুলিশকে সেই তাগিদ দেন। মামলায় কি হবে না হবে সেটি পরের ব্যাপার। রিমান্ডে নিয়ে ধোলাই দেওয়াই তাদের প্রধান লক্ষ্য।
কোনো সরকারই আজ পর্যন্ত রিমান্ড বা এ ধরনের পুলিশি নির্যাতনকে অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করেনি। বিরোধী দলে থাকাকালে রাজনীতিবিদরা এ নিয়ে নীতি-নৈতিকতাপূর্ণ জ্ঞানগর্ভ অনেক কথা বললেও সরকারে যাওয়ার পর নির্যাতনের পক্ষেই অবস্থান নেন। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ছাড়া এ আপদ থেকে মুক্তি মেলার কোনো সম্ভাবনা নেই।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


