সরকারের সর্বোচ্চ নীতি-নির্ধারণী মহলের পক্ষ থেকে একটা প্রচারণা আজ অত্যন্ত জোরের সঙ্গেই করা হচ্ছে যে, পঞ্চম সংশোধনী বাতিলের মধ্য দিয়ে কার্যত ধর্মভিত্তিক রাজনীতি নিষিদ্ধ হয়ে গেছে। ধর্মভিত্তিক রাজনীতি বন্ধকরণ প্রকল্পে তারা সর্বাগ্রে জামায়াতে ইসলামীর ওপর খড়গ চালানোর মাধ্যমে তাদের এই শুভযাত্রা রচনা করেছে। এরপর ক্রমান্বয়ে সব ইসলামী দলের রাজনীতি বন্ধ করে দেয়া হবে। তবে হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাবে। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথা নেই, চিত্ত চাঞ্চল্যও নেই। বড় মনোবেদনা আর গাত্রদাহের কারণ হচ্ছে কেবল ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনীতি। অথচ ইসলাম অকুণ্ঠভাবে ঘোষণা করছে যে, পৃথিবীর যাবতীয় সমস্যার সবচেয়ে সুন্দর সমাধানকল্পে অশান্ত, তমশাচ্ছন্ন এই পৃথিবীকে শান্তি ও আলোয় উদ্ভাসিত করে পথহারা মানবজাতিকে পথের দিশা, কর্মের দিশা, শান্তি ও প্রগতির দিশা দেখাতে, বাঁচার অবলম্বন অন্বেষণের মাধ্যমে সমৃদ্ধ জীবনের অধিকারী বানাতেই পৃথিবীতে ইসলামের আগমন ঘটেছে। ইসলাম ধর্মের মর্মবাণী ও ধর্মতত্ত্ব গভীরভাবে অধ্যয়নের মাধ্যমে পৃথিবীর অনেক নামকরা অমুসলিম মনীষীও ইসলামের এই মূলতত্ত্বের সঙ্গে তাদের দীর্ঘ গবেষণালব্ধ ফলাফল অকুণ্ঠ ইতিবাচক রায় হিসেবে প্রকাশ করেছেন। এ প্রসঙ্গে মহাত্মা গান্ধী ‘ইয়ং ইন্ডিয়া’ গ্রন্থে লেখেন : ‘আল-কোরআন একটি আসমানি গ্রন্থ। আমি আল-কোরআনের শিক্ষা ও দর্শনের ওপর পড়াশোনা করেছি। একে আসমানি গ্রন্থ হিসেবে গ্রহণ করতে আমার বিন্দুমাত্র দ্বিধা নেই। আমার কাছে এ গ্রন্থের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য বা বৈশিষ্ট্য হিসেবে এ দিকটাকেই বেশি প্রতীয়মান হয়েছে যে, মানব প্রকৃতির সঙ্গে এর বিধানাবলীর এক আশ্চর্য মিল পাওয়া যায়।’
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছেন : ‘আল-কোরআন মানবজগতের সংস্কারক, আধ্যাত্মিক নির্দেশনা এবং জ্ঞানগর্ভে তথ্যসমৃদ্ধ এক মহাগ্রন্থ, মানবসভ্যতায় এক বিস্ময়কর সংস্কার সাধন করেছে। যেসব মনীষী এর মর্ম এবং অন্তর্নিহিত তাত্পর্যের সন্ধান পেয়েছেন, তারাই এ সত্য উপলব্ধি করতে পারবেন যে কোরআন একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন দর্শন। মানব জীবনের যে কোনো সমস্যাই এর কাছে নিয়ে যাওয়া হোক না কেন, কোরআন এর সমাধান বের করবেই।’
আজ আমাদের ক্ষমতাসীন শাসক শ্রেণী ইসলাম সম্পর্কে যে একেবারেই অজ্ঞ, এটুকুই বা বলব কেমন করে। অনেক সময় এরা বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠানে প্রায়ই এমন কথাও বলে থাকেন যে, ইসলামের পরিপূর্ণ জীবন-বিধানের প্রায়োগিক রূপই বিশ্ব মানবতার মুক্তির একমাত্র পথ হতে পারে কিংবা যখন দেখি সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা ও গোয়েন্দা হেফাজতে সব ইসলামী রাজনৈতিক দল বন্ধ করে দিয়ে আসছে নতুন ইসলামী দল। এমতাবস্থায় সরকারের এ বিপরীতমুখী কর্মকাণ্ডের পেছনে ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে অজ্ঞতা ও কূপমণ্ডূকতা না কি নেপথ্যে অন্য কোনো কারণ নিহিত রয়েছে, তাও ভেবে দেখা দরকার। কারণ পৃথিবীর নানা জায়গায় সংঘটিত ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা আমাদের এমনই ধারণা দিয়ে থাকে যে, মানুষ স্বীয় দুরাকাঙ্ক্ষা পূরণের নিমিত্তে কখনও কখনও দ্বৈতনীতি গ্রহণ করে থাকে।
আমাদের এই পাক-ভারত উপমহাদেশে মোগল শাসনামলে মোগল সম্রাট আকবরকে আমরা একজন ধর্ম অবজ্ঞাকারী সেক্যুলার শাসক হিসেবে দেখতে পাই। কিন্তু পরবর্তী সময়ে যখন তিনি একমাত্র ইসলাম ধর্ম ব্যতীত সব ধর্মের সমন্বয়ে ‘দ্বীন-ই-ইলাহী’ নামে একটি জগাখিচুড়ি ধর্ম সৃষ্টি করেন, তখন তার এই নতুন ধর্ম সৃষ্টির অভিলাষ কী ছিল, বোধ হয় বর্তমান সময়ে তা কাউকে বুঝিয়ে বলার অবকাশ থাকে না। সম্রাট আকবরের সব অনৈতিক কর্মকাণ্ডের প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন ইসলাম ধর্মানুসারী তত্কালীন সময়কার সুশিক্ষিত উলামা সমাজ। অতএব নিষ্কণ্টক রাজকার্য পরিচালনার জন্য তাদের (উলামা সম্প্রদায়ের) কর্মকাণ্ড রহিত করাটাই হয়ে দাঁড়িয়েছিল সেই সময়ে তার প্রধান কাজ। সম্রাট আকবরের এমন চিন্তা থেকেই দ্বীন-ই-ইলাহীর’ জন্ম। অনুরূপভাবে ব্রিটিশ শাসনামলে ব্রিটিশদের হাতে গদিহারা সবদিক থেকে সুবিধাবঞ্চিত মুসলমান সমাজই সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে, শাসক শ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা ছিল তাদের জন্য ‘জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহু’। তখন এই বিরোধিতা দমাতে শাসকগোষ্ঠী কাঁটা দিয়ে কাঁটা তোলার কৌশল অবলম্বন করে। আঠার শ শতকের শেষদিকে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশের গুরুদাসপুর জেলার কাদিয়ান গ্রামে জন্মগ্রহণকারী গোলাম আহমদ নামে এক ব্যক্তির কাছে ব্রিটিশ রাজশক্তি মারফত অবতীর্ণ হয় ‘কাদিয়ানী’ বর্তমানে ‘আহমদী’ নামে নতুন এক ধর্মমতের। যে ধর্মের মূল বাণীই ছিল ‘ক্ষমতাসীন শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধাচরণ করা হারাম। আর বিদ্রোহকারী কাফের বলে গণ্য হয়।’ তাদের অবলম্বিত সেই শঠ কৌশল কতেক সরলপ্রাণ, ইসলামের প্রতি অজ্ঞ ধর্মানুরাগবিহীন এবং অনেক ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর ধরনের লোভাতুর মানুষ স্বীয় সত্তা হারিয়ে বিপথগামীও হয়েছিল। কিন্তু নিষ্ঠুর বাস্তবতা হলো, তাদের রোপিত সে বিষবৃক্ষের মাধ্যমে আকবর কী ব্রিটিশ রাজশক্তি কারোর উদ্দেশ্যের অণুমাত্র সফল হয়নি। অতএব নিছক ইসলাম বৈরিতাই যে রাজশক্তির একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল, তা কিন্তু নয়; বরং ক্ষমতা নিষ্কণ্টক রাখাটাই ছিল তাদের মূল অভিপ্রায়।
পৃথিবীর সাম্রাজ্যবাদী শক্তির প্রযুক্তিগত দিক বেছে পশ্চাত্পদ ও অনুন্নত অঞ্চলগুলোয় শাসন ও লুণ্ঠন প্রক্রিয়া চালানোর একটি বহুল প্রচলিত কৌশল হলো 'উরারফব ধহফ জঁষব চড়ষরপু।' এই পলিসি দিয়েই তারা এই উপমহাদেশ সুদীর্ঘকালব্যাপী প্রায় একশত নব্বই বছর শাসন প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছিল। শাসনকার্য নির্বিঘ্ন করার প্রয়াসে এরা এখানে রাজানুকূল বিশেষ সহযোগী প্রজা সম্প্রদায় সৃষ্টি করে। রাজ-সহযোগী এই মানুষেরা অবাধ্যদের তুলনায় মর্ত্যের পৃথিবীতে বসেই স্বর্গসুখের আস্বাদ পেত। তাদের সন্তানেরা বিলেতে লেখাপড়ার সুযোগ পেত। ফলে প্রজারাও মনিবের শোধ আদায় করত। এভাবেই 'উরারফব ধহফ জঁষব চড়ষরপু' কিংবা ‘দিবে আর নিবে’ পলিসি ‘বণিকের মানদণ্ডকে প্রায় দুইশত বছরের জন্য শাসকের রাজদণ্ডে উন্নীত করল।’
আফগান সমাজে সেখানকার নানা গোত্র এবং দল-উপদলের মধ্যকার গোত্র বৈষম্য এবং গোত্র কলহ সেখানকার মুসলিম ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে ফাটল ধরাতে একটি জীবন্ত আগ্নেয়গিরির মতো কাজ করে যাচ্ছিল। আর এতেই সেখানকার সমাজতন্ত্রী সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের পৃষ্ঠপোষকতা আগুনে ঘৃতাহুতির মতো আরও শতগুণ বাড়িয়ে দিতে সক্ষম হয়েছিল। আর সেই সুবর্ণ সুযোগেই রুশ শ্বেত ভল্লুকেরা দ্বিধাবিভক্ত আফগানিস্তানে আগ্রাসন চালিয়ে ধূসর ভূমিতে পরিণত করতে সক্ষম হয়েছিল। পরাশক্তির আনুগত্য ও দালালি কোনো দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্বকে কতটা বিপন্ন করতে পারে তার একটা বাস্তব উদাহরণ বর্তমান আফগানিস্তান। বিবিসির এক সংবাদ ভাষ্য থেকে জানা যায়, ১৯৯৭ সালে এক তালেবান প্রতিনিধিদলকে ইউনিকলের টেক্সাস হেড কোয়ার্টারে ডাকা হলো। প্রস্তাব দেয়া হলো, কাস্পিয়ান সাগরে তেল ও গ্যাস পাইপলাইন বসিয়ে টেনে নেয়ার। তাল্লো ইউনিকলের শর্তে রাজি না হলে তাদের আবারও পুনর্বিবেচনার প্রস্তাবে বলা হয়, ‘হয় তোমরা এই সোনার গালিচা প্রস্তাব গ্রহণ কর, নয়তো তোমাদের দেশ আমরা বোমার কার্পেটে ডুবিয়ে দেব’ (৪ এপ্রিল ২০০৭, দৈনিক নয়া দিগন্ত, রাজনীতি ও বিপন্ন স্বাধীনতা, আলমগীর মহিউদ্দিন)। এখানে প্রণিধানযোগ্য যে, সাবেক ইউনিকল কর্মচারী হামিদ কারজাইর পৃষ্ঠপোষকতা মার্কিনিদের অভিপ্রায় ষোলকলায় বাস্তবায়নে মদদদান করে আর সেই ঋণ শোধ করা হয় হামিদ কারজাইকে অজানাকালের জন্য আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট বানিয়ে।
ফিরে আসি মূল আলোচনা প্রসঙ্গে। আমাদের এই প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমির অনেক গভীরে ইসলামের শিকড় প্রোথিত। যে কারণে দীর্ঘ সময়ের পরিক্রমায় একে টেনে উপড়ানোর পরীক্ষামূলক পর্যবেক্ষণ বারবারই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। এর মূল কারণ হচ্ছে, ইসলাম কোনো ভূঁইফোড় ধর্ম নয়। এ এক বিপ্লবী আদর্শ। মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতিই বিপ্লবী এ আদর্শকে এ দেশের মাটিতে টিকিয়ে রাখতে সঞ্জীবনী সুধা হিসেবে কাজ করছে। এই বন্ধনে ফাটল আত্মঘাতী। সাম্রাজ্যবাদী শক্তি আমাদের এই ভ্রাতৃত্ব বন্ধনে চিড় ধরানোর মাধ্যমে তাদের ফায়দা হাসিলে নিরন্তর নানামুখী প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছে। প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদ কিংবা অন্যান্য স্ট্র্যাটেজিক দিক থেকে বাংলাদেশ যে মোটেই নিরাপদ অবস্থানে নেই, তা তাদের বর্তমান কর্মকাণ্ডে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞজনের মতামত, তেল ও গ্যাসের ওপর ভাসছে আমাদের এই দেশ, আমাদের চট্টগ্রাম সমুদ্রবন্দর দূরপ্রাচ্যের গেটওয়ে (এধঃবধুি) হিসেবে পরিচিত। তাই আমাদের প্রতি শুধু ভারতের নয়, আমেরিকাসহ অনেক পশ্চিমা দেশের রয়েছে বিশেষ লোলুপদৃষ্টি।
এ দেশে ইসলামী ভাবধারা ও মূল্যবোধে বিশ্বাসী শক্তি সাম্রাজ্যবাদীদের এজেন্ডা বাস্তবায়নে প্রতিনিয়তই বাধার বিন্দাচল সৃষ্টি করে চলছে। এ প্রতিবন্ধকতা অপসারণের নিমিত্তে এখানকার ইসলামী শক্তিতে বিভাজন ও অনৈক্য সৃষ্টির দুরাকাঙ্ক্ষা নিয়েই সব ইসলাম ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলকে সরকার নিষিদ্ধ করে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায় নগণ্য সংখ্যক ভুঁইফোড় আলেম নামধারীদের নিয়ে গঠন করতে যাচ্ছে জমিয়তে ইসলাম বাংলাদেশ নামে এক ভুঁইফোড় ইসলামী রাজনৈতিক সংগঠন (২৫ মার্চ ২০১০ আমার দেশ)। আর এ লক্ষ্যে বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলকে ভিত্তি করে তাদের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। খবরে প্রকাশ, বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলের পাঁচ শতাধিক কওমি মাদ্রাসার প্রধান ও শায়খুল হাদিসরা নতুন এ দলে সম্পৃক্ত হবেন। দলের রূপরেখার মুখবন্ধে জানানো হয়, জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ ২০০১ সাল থেকে চারদলীয় জোটের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ায় মাদ্রাসা শিক্ষিত আলেমদের অনেক ক্ষতি হয়েছে। সিলেট জেলার কানাইঘাট উপজেলার মাওলানা মখলিছুর রহমানকে এ অঞ্চলের প্রধান নিযুক্ত করা হচ্ছে। নতুন এ রাজনৈতিক দল গঠনের জন্য কেন সিলেট বেছে নেয়া হলো, এর পেছনে রয়েছে কিছু ঐতিহাসিক কারণ।
রাজনীতিতে অভিজ্ঞতা একটি বিশেষ জরুরি অনুষঙ্গ। এ অভিজ্ঞতা মানুষকে বাস্তবতা অনুধাবন করতে শিখায়, দূরদর্শিতা অর্জনে খোরাক জোগায়। ব্রিটিশ শাসনামলে ব্যবসা, চাকরি শিক্ষা সবদিক থেকেই বঞ্চিত ও নিষ্পেষিত মুসলিম সমাজকে অগ্রসর করার মহান ব্রত নিয়ে স্যার সৈয়দ আহমদ আলীগড় শিক্ষা আন্দোলন শুরু করেন। ব্রিটিশদের সঙ্গে অনেকটা আপসকামী মনোভাব নিয়ে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মাধ্যমে স্বাধিকার অনুধাবন ও আদায়ে যোগ্যতর করে তুলতেই ছিল তার দরদমাখা মানসিকতাসম্পন্ন মহতী প্রয়াস।
অন্যদিকে খাঁটি ব্রিটিশবিরোধী মানসিকতা নিয়ে এবং সে লক্ষ্যে উপযুক্ত জনশক্তি গঠনের নিমিত্তে মাওলানা কাসেম নানুডুবি (রহ.)-এর নেতৃত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় দেওবন্দ দারুল উলুম মাদ্রাসা। পাক-ভারত উপমহাদেশসহ বৃহত্তর সিলেট জেলায় অসংখ্য কওমি মাদ্রাসা এই দেওবন্দ আন্দোলনেরই ফসল।
দেওবন্দ শিক্ষিত উলামা সমাজ এবং পরবর্তী সময়ে এদের দ্বারা গঠিত রাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ কংগ্রেস নেতৃত্বের সঙ্গে একাকার হয়ে ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নিজেদের উত্সর্গ করেন। কিন্তু আলীগড় আন্দোলনের ফলে সৃষ্ট আধুনিক শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে কংগ্রেস রাজনীতির প্রতি এক ধরনের বিরূপ আস্থাহীন মনোভাব সৃষ্টি হলো। তারা এ তিক্ত অভিজ্ঞতা তখন অত্যন্ত বেদনার সঙ্গে অনুভব করল যে, ইংরেজি শিক্ষায় নিজেদের শিক্ষিত করে তোলা সত্ত্বেও চাকরি-ব্যবসা সবদিক থেকে দুষ্টু রাজনীতির যাঁতাকলে তাদের পিষ্ট হয়ে পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠী হিসেবেই থাকতে হচ্ছে। অথচ ওলামাদের সঙ্গে তাদের এ ব্যাপারে কোনোরূপ স্বার্থের সংঘর্ষ ছিল না। কারণ আধুনিক শিক্ষিতরা বাস্তব ময়দানে কাজ করার থেকে যে অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন, ওলামাদের সঙ্গে কোথাও এমন প্রতিযোগিতার কারণ ঘটেনি।
কংগ্রেস নেতৃত্বে দেশ স্বাধীন হলেও স্বাধীনতার সে সুফল মুসলমানদের ঘরে তুলতে পারবে না, শিক্ষিত মুসলিম সমাজ এটা তীব্রভাবেই অনুভব করল। মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র নেতৃত্বে মুসলিম লীগ দাবি করল যে, মুসলিম সংখ্যাগুরু এলাকায় মুসলমানদের জন্য পৃথক স্বাধীন রাষ্ট্র হতে হবে। মুসলমানদের এ পৃথক আন্দোলনে বিচলিত হয়ে কংগ্রেস নেতৃত্ব দাবি করল, ভারতের সব ধর্মের লোকই ভারতীয় জাতি হিসেবে এক জাতি। ধর্মের ভিত্তিতে এ মহান জাতিকে বিভক্ত করা কিছুতেই উচিত হবে না। কংগ্রেসের এ ধর্মনিরপেক্ষ মনোভাবের বিরুদ্ধে মুসলিম লীগ দাবি করল, মুসলমানদের আদর্শ ইসলাম এবং ইসলাম শুধু ধর্ম নয়। তাই ইসলামী জীবন বিধানের ভিত্তিতে মুসলমানেরা একটি ভিন্ন জাতি।
দেওবন্দ শিক্ষিত জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত আলেমরা কংগ্রেসের এক জাতীয়তার অনুসারী ছিলেন বিধায় পুরো উপমহাদেশের সর্বত্রই তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডও গৃহীত সিদ্ধান্ত সাধারণ মুসলমান সমাজের স্বার্থের বিপক্ষে যেতে লাগল।
বৃহত্তর সিলেট অঞ্চলে এক সময় দেওবন্দ শিক্ষিত উলামা সম্প্রদায়ের আধিক্য ছিল। যে কারণে আজও সিলেট অঞ্চলে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা বাংলাদেশের অন্য যে কোনো অঞ্চলের চেয়ে বেশি। দেওবন্দি ওলামাদের সর্বভারতীয় রাজনৈতিক দর্শনের কারণে তত্কালীন সিলেট জেলা থেকে নির্বাচিত তিনজন এম এল এ যথাক্রমে সিলেট জেলার কানাইঘাট থানার ইব্রাহিম আলী চুতলী, গোলাপগঞ্জের আবদুর রশিদ এবং হাইলাকান্দির আবদুল মতলিব মজুমদার (হাইলাকান্দি থানা বর্তমানে ভারতের অংশভুক্ত) ১৯৪৭ সালে সিলেটকে আসামের সঙ্গে থাকার পক্ষে ভোট প্রদান করেন। পরিশেষে এ বিষয়টির নিষ্পত্তির জন্য গণভোট অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনে কংগ্রেসের প্রতীক ছিল ‘কুঁড়েঘর’ আর মুসলিম লীগের প্রতীক ছিল ‘কুড়াল’। ১৯৪৭ সালের ৬ ও ৭ জুলাই দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠিত রেফারেন্ডামে জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের উলামা সম্প্রদায় কংগ্রেস কমিউনিস্ট পার্টি প্রভৃতির ঐকান্তিক প্রচেষ্টা সত্ত্বেও মুসলিম লীগ ৫৫,৫৭৮ ভোট বেশি পেয়ে সিলেট জেলা পূর্ব পাকিস্তানের অংশভুক্ত হয়। তার পরও শীর্ষ নেতৃত্বের চরম মুসলিম বিদ্বেষী প্রতিহিংসাপরায়ণ মানসিকতার জন্য সিলেটের অবিচ্ছেদ্য সাড়ে তিন থানাকে অন্যায্যভাবে ভারতের ভাগে দিয়ে দেয়া হয়, যাক সে ভিন্ন কথা।
আজ দিন বদলেছে। জমিয়তের রাজনৈতিক দর্শন ও চিন্তা চেতনায় সূচিত হয়েছে বিশাল পরিবর্তন। দীর্ঘ সময়ের অভিজ্ঞতায় মানুষ আজ অর্জন করেছে অনেক তিক্ত বাস্তব অভিজ্ঞতা। মানুষ আজ জানতে চায়, বুঝতে চায় যথার্থ অনুসন্ধিত্সু মন নিয়ে। শত্রু-মিত্র ভালো-মন্দ অনুধাবনের যোগ্যতা ও নিরীক্ষণের ক্ষমতা আজ সীমাবদ্ধতার গণ্ডি ছাড়িয়ে। অতএব সভ্যতার সংঘাতের এই যুগে আমাদের ক্ষমতাসীন সরকারি দল সংঘাতে না জড়িয়ে যত শিগগির সম্ভব গণমানুষের মনোজগতের বাস্তবতা অনুধাবনে সক্ষম হবে— ততই তাদের মঙ্গল, দেশ ও জাতির মঙ্গল। আর ভিন্ন মতাবলম্বীদের দমনপীড়ন, উচ্ছেদ, নির্মূল প্রকল্প নিয়ে যদি মাঠে নামে তবে এটা বরং পরাশক্তির এজেন্ডা বাস্তবায়নেই সহায়ক হবে।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


