তাদের অভিনয়ে সমাজ, রাষ্ট্র ও পরিবারের বিভিন্ন বিষয় উঠে আসে। জীবনকে নানা ভঙ্গিমায় উপস্খাপন করেন তারা। নাটক, সিনেমা ও মডেলিংয়ের মাধ্যমে তারা হাজির হন দর্শকের সামনে। অনেকে তাদের ভক্ত। ভক্তরা প্রিয় নায়ক-নায়িকার ছবি বাঁধাই করে রাখেন। কেউ কেউ প্রিয় তারকার কোনো অনুষ্ঠানই মিস করতে চান না।
আর সেই তারকারা এখন হয়ে উঠছেন যৌনবিলাসী। যৌনতার চর্চা শোবিজে নতুন নয়, কিন্তু প্রযুক্তির সাম্প্রতিক বিকাশের সাথে সাথে এটি এখন বেড়ে চলেছে। ঢাউস আকৃতির ভিডিও ক্যামেরার বদলে যখন মোবাইল ফোনে ভিডিও ক্যামেরা যুক্ত হলো তখন এটি আরো সহজ হয়ে গেল। নিজেদের শারীরিক অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো ক্যামেরা ও ভিডিওতে ধারণ করে সংরক্ষণ করাটা যেন একটা ফ্যাশন হয়ে দাঁড়াল। আর এটা দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করার প্রবণতাও বাড়ল। প্রেমিক-প্রেমিকার অন্তরঙ্গ ছবি তুলে তা অনলাইনে ছড়িয়ে দেয়ার হুমকি দিয়ে বিভিন্ন ধরনের প্রতারণার ঘটনা ঘটতে লাগল।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাসুদা এম রশীদ চৌধুরীর কাছে জানতে চাওয়া হয়, এমন সমস্যা কেন জ্যামিতিক হারে বাড়ছে? তিনি বললেন, পবিত্রতা বলে যে একটা বিষয় সম্পর্কের মধ্যে ছিল, সেটা বিভিন্ন কারণে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে স্বামী-স্ত্রীর পবিত্র সম্পর্কটা এখন অশ্লীলতায় রূপান্তর হচ্ছে। বিশ্বাস ও সারল্যের আশ্রয়ে এখন অন্তরঙ্গ মুহূর্তগুলো রেকর্ড করা হচ্ছে। সম্পর্ক খারাপ হলে সেটাই ছড়িয়ে দেয়া হচ্ছে অনলাইনে।
সর্বশেষ ঘটনার কথাই ধরা যাক। দেশের আলোচিত মডেল ও অভিনেত্রী প্রভা। তার বিয়ে ঠিক হয়েছিল রাজীব হাসান নামে এক তরুণ ব্যবসায়ীর সাথে। বাগদানও হয়েছিল। ১৯ ডিসেম্বর তাদের বিয়ে ও ২৫ ডিসেম্বর বৌভাতের দিন ধার্য করা হয়েছিল। সে মতে পারিবারিক সম্মতিতেই তাদের মেলামেশা চলছিল। এর মধ্যে তারা দু’জনে বিদেশ সফর করেছেন বলেও জানা যায়।
তাদের দু’জনের দৈহিক সম্পর্কের ঘটনা ঘটে কয়েকবার। এটি তারা দু’জন জেনেই ভিডিও করেন। প্রভা ও রাজীবের এ ভিডিওর দৈর্ঘ্য সাড়ে তিন মিনিট। রাজীব হাসানের ভাষ্য মতে, এটি ধারণ করার পর প্রভা ও তার মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপে সংরক্ষণ করা ছিল। পরে অবশ্য তারা তা মুছে ফেলেন বলেই দাবি করেন রাজীব হাসান।
গত ১৯ আগস্ট একটি নাটকের শুটিং স্পট থেকে ময়মনসিংহে পালিয়ে বিয়ে করেন প্রভা ও অভিনেতা অপূর্ব। এরপরই অনলাইনে প্রভার এক্সক্লুসিভ ভিডিওচিত্রটি প্রকাশিত হয়। দেশে ও দেশের বাইরে এটি বিপুলভাবে আলোচিত হতে থাকে। কে বা কারা এটি অনলাইনে আপলোড করেছে, সে সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া না গেলেও সবাই সাবেক প্রেমিক রাজীবকে দুষছেন। বলা হচ্ছে, তিনিই এটি অনলাইনে ছেড়েছেন। তবে রাজীব এ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বলেছেন, তারা দু’জন এটি রেকর্ড করেছেন ঠিকই, পরে তা মোবাইল ফোন ও ল্যাপটপ থেকে মুছে ফেলেছেন।
তাহলে এ চিত্র অনলাইনে এলো কিভাবে? সে বিষয়ে রাজীব তদন্ত দাবি করেছেন।
পর্নো ভিডিওচিত্রটিতে প্রভার নায়ক রাজীব হাসান নিজেই। তাদের শারীরিক সম্পর্কের এ ভিডিওচিত্রটি প্রকাশিত হওয়ার পর শোবিজ থেকে শুরু করে তরুণদের মধ্যে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা চলছে। ইন্টারনেট থেকে ডাউনলোড করে এটি এখন অনেকের মোবাইল ফোনে পৌঁছে গেছে। এ বিষয়ে অবশ্য এখন পর্যন্ত প্রভা মুখ খোলেননি। তার নতুন বর অপূর্বও এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।
প্রভা-রাজীবের যৌনবিলাসই মিডিয়ায় এ ধরনের প্রথম ঘটনা নয়। এর আগে মডেল ও অভিনেত্রী তিন্নি ও অভিনেতা হিল্লোলের একটি ভিডিওচিত্র শোবিজ মাতিয়ে তরুণদের মধ্যে তোলপাড় সৃষ্টি করেছিল। বছর কয়েক আগের ঘটনা সেটি। কক্সবাজারের একটি হোটেলে হানিমুনে গিয়ে তারা শারীরিক সম্পর্কের ভিডিওচিত্র ধারণ করেন। সেটি তাদের মোবাইল ফোনেই ছিল। পরে তিন্নি কিংবা হিল্লোলের মোবাইল ফোন হারানো গেলে সেখান থেকে এটি অনলাইনে চলে আসে। বের হয় সিডি। সেটি এখনো অনলাইনে পাওয়া যাচ্ছে। একই সাথে অনেকের মোবাইল ফোনেও রয়েছে।
এর আগে দেশের একজন সুন্দরী সঙ্গীতশিল্পীর সাথে আরেকজন সঙ্গীতশিল্পীর শারীরিক মিলনের দৃশ্যটি ক্যামেরাবন্দী করা হয়েছিল। সেটি বেশ কয়েক বছরজুড়ে আলোচনায় ছিল। এখনো এটি ইন্টারনেটে পাওয়া যাচ্ছে। ওই সঙ্গীততারকা বা তার পরিবারের পক্ষ থেকে এ নিয়ে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখানো হয়নি।
অনেকে বলছেন, এসব শোবিজ তারকাদের যৌনবিলাস। তারা যৌনকর্মের ছবি ধারণ করে এক ধরনের বিকৃত আনন্দ পেয়ে থাকেন।
বাংলা সিনেমার সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি সূত্রের খবর হলো এগুলো কেবল প্রকাশিত হওয়ার কারণে আলোচিত। এ রকম অনেক উঠতি নায়িকা রয়েছেন যাদের নগ্নদৃশ্য ধারণ করে সংরক্ষণ করা হয়েছে এবং এটি দেখিয়ে তাদের অনৈতিক কাজে বাধ্য করা হয়। আবার অনেকে স্বেচ্ছায়ও এতে যুক্ত। বাংলা সিনেমার ‘এস’ আদ্যাক্ষরের একজন নায়কের সাথে ‘এ’ আদ্যাক্ষরের এক নায়িকার লিভটুগেদার চলছে বলে বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে। আবার একজন ভিলেনের সাথে ‘এন’ আদ্যাক্ষরের একজন নায়িকার লিভটুগেদার চলছে।
অবশ্য এ যৌনবিলাসিতা কেবল শোবিজে তা কিন্তু নয়। এর বাইরেও রয়েছে। দেশের তরুণদের মধ্যে এ রকম সমস্যা দিনকে দিন বেড়ে চলেছে। প্রেমিকার সাথে গোপনে সম্পর্ক করে তার ভিডিও বা ক্যামেরা চিত্র ধারণ করে তাকে পরে হুমকির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞানের অধ্যাপক মাসুদা এম রশীদ চৌধুরী বলছেন, এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলার জন্য আমাদের দেশজ আইডেন্টিটি ও সংস্কৃতিকে রক্ষা করতে হবে। কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের হোস্টেল সুপার, প্রভোস্ট, বাবা-মা ও শিক্ষক-শিক্ষিকাদের সতর্ক হতে হবে। এ ধরনের সঙ্কট সম্পর্কে তাদের সচেতন করতে হবে। সরকারকে এ ব্যাপারে উদ্যোগী হতে হবে। যাতে করে কেউ ব্ল্যাকমেইলের শিকার না হয়।
পর্নোগ্রাফির ইতিহাস : বাংলাদেশে পর্নোগ্রাফির ইতিহাস এক দশকের। ২০০১ সালে আমেরিকা প্রবাসী সুমন বাংলাদেশে এসে কয়েকজন তরুণীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং পরে সেটি ভিডিও করে বাজারে ছেড়ে দেয়। তাদের মধ্যে সে সময় একটি মোবাইল ফোন কোম্পানিতে চাকরি করত এ রকম একজন ছিলেন। এ ছাড়া দু’জন ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া। এরপর ছাত্রলীগ নেতা রোকন এক কিশোরীর সাথে শারীরিক সম্পর্ক গড়ে সেটি প্রচার করে। এর কয়েক বছরের মধ্যে কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রী এ ধরনের প্রতারণার শিকার হন। এ সব ঘটনা নিয়ে সে সময় থানা পুলিশ হলেও বাস্তবে এর কোনো বিহিত হয়নি। এমনকি ১৯৯৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর মধ্য রাতে বাঁধন নামে এক মডেল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে লাঞ্ছিত হলেও সম্প্রতি আদালত অভিযুক্ত তিনজনকেই বেকসুর খালাস দিয়েছেন।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



