ত সপ্তাহে একদল ভারতীয় নর্তকী নিয়ে বাংলাদেশ সফরে এসেছিলেন প্রখ্যাত ভারতীয় চিত্রাভিনেতা শাহরুখ খান। তিনি আসার দু' সপ্তাহ আগে থেকেই প্রচার-প্রচারণায় মুখর করে তোলা হয়েছিল বলতে গেলে গোটা দেশ। শাহরুখ খান আসবেন। মঞ্চে শো করবেন। মাতিয়ে যাবেন বাংলাদেশ। একটি বেসরকারি সংস্থা শাহরুখ খানকে নিয়ে আসার বন্দোবস্ত করে। ঢাকার আর্মি স্টেডিয়ামে সে শো'র আয়োজন করা হয়। এই শোতে প্রবেশ ফি ছিল পাঁচ হাজার টাকা থেকে পঁচিশ হাজার টাকা পর্যন্ত। তাতেও মানুষের আগ্রহের কোনো কমতি ছিল না। উদ্যোক্তারা স্টেডিয়ামের ধারণ ক্ষমতার চেয়ে অনেক বেশি টিকিট বিক্রি করেছিলেন। এবং ধারণা করা যায়, তারা আর্থিকভাবে যথেষ্ঠ লাভবানও হয়েছেন।
শো করতে শাহরুখ খানের ঢাকা আগমণ নিয়ে আমার ব্যক্তিগতভাবে তেমন কোনো কৌতুহল ছিল না। আমি ভারতীয় আর এক শক্তিশালী অভিনেতা অমিতাভ বচ্চনকে বলতে শুনেছি যে, তাদের আগের সময়ে নবাগত অভিনেতারা দিলীপ কুমার হতে চাইতো। তার সময়ে হতে চাইতো অমিতাভ বচ্চন। আর বর্তমান সময়ে হতে চায় শাহরুখ খান। এ কথার মধ্যে শাহরুখ খানের অভিনয় দক্ষতার স্বীকৃতি আছে। তার দু'একটি ভাল ছবি আমিও দেখেছি। স্বীকার করতে হবে, তিনি একজন শক্তিশালী অভিনেতা। তিনি বাংলাদেশে মঞ্চে শো করতে এল তার সে অভিনয় প্রতিভারই স্বাক্ষর রাখবেন, তেমনটাই আশা ছিল আমার। অভিনয় প্রতিভার কারণে তিনি গোটা ভারতে যেমন জনপ্রিয়, তেমনি অবাধ আকাশ সংস্কৃতির কারণে তিনি বাংলাদেশেও তরুণদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়। তাতেও আমি দোষের কিছু দেখিনি। আমি যদি মার্লোন ব্রান্ডো, জন ফ্রন্ডা, ওমর শরীফ, দিলীপ কুমার, নাসিরউদ্দিন শাহ, এলিজাবেথ টেলর, স্মিতা পাতিলের ভক্ত হতে পারি, তাহলে তরুণ প্রজন্ডের কেউ শাহরুখ খানের ভক্ত হতে পারবে না কেন। আসুক শাহরুখ খান।
এর আগে বিগত আওয়ামী শাসনকালে একইভাবে বাংলাদেশে ভারতীয় শিল্পীদের আমদানির হিড়িক পড়ে গিয়েছিল। আজ এ শিল্পী আসে। কাল সে শিল্পী আসে। মঞ্চে-অডিটোরিয়ামে শো করে। বাংলাদেশ-বাংলাদেশীদের গালাগাল করে। এমনি চলছিল। তখনও তুমুল সমালোচনা হয়েছিল যে, শিল্পী নামে যাদের নিয়ে আসা হচ্ছে, তারা যতো না শিল্পী, তার অধিক তার দেহপ্রদর্শনকারিণী। তার নিকৃষ্ট নমুনা দেখিয়ে গিয়েছিল নানা নামের কুলকার্নি-চুলকার্নিরা। কার্যত তাদের নিয়ে আসা হতো তরুণদের সুড়সুড়ি দেয়ার জন্যই। সমাজের নানামুখি বিরূপ প্রতিক্রিয়ার কারণে সে প্রবণতা শেষ পর্যন্ত অনেকটাই স্তিমিত হয়ে গিয়েছিল। আবার বর্তমানে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাসীন হবার পর নতুন করে একই কারবার শূরু হয়েছে।
বিগত আওয়ামী শাসনকালে বাংলাদেশে এত বেসরকারি টিভি চ্যানেল ছিল না। এখন বহু সংখ্যক বেসরকারি টিভি চ্যানেল হয়েছে। সেসব টিভি চ্যানেলে নানা ধরনের অনুষ্ঠানও প্রচারিত হচ্ছে। দর্শকরা সেসব অনুষ্ঠান দেখেনও। বেসরকারি টিভি চ্যানেলগুলো বৈচিত্র্য আনার জন্য, এখন দেখছি হরহামেশা ভারতীয় শিল্পীদের ডেকে এনে তাদের লাইভ শো প্রচার করতে শুরু করেছে। নিঃসন্দেহে প্রচার মাধ্যমের সুনির্দিষ্ট কতক দায়িত্ব রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হবার কথা জাতীয় তথা দেশীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ ও বিকাশ। মিডিয়ায় সে চেষ্টা যে একেবারে হয়নি এমন কথা বলতে চাই না। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াইর রহমান টেলিভিশনে নতুন কঁড়ি অনুষ্ঠান চালু করে সারা দেশ থেকে প্রতিভাবান তরুণ-তরুণী, শিশু-কিশোরদের সামনে নিয়ে এসেছিলেন। তাদের অনেকেই এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ও সমাদৃত। গোটা দেশ থেকে প্রতিভাবান সঙ্গীত শিল্পী বাছাই করে বের করে আনার অনুকরণীয় দৃষ্টান্তও স্থাপন করেছে কোনো কোনো টিভি চ্যানেল। সাংস্কৃতিক মাধ্যমগুলোর এটা একটা বড় দায়িত্ব। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, টিভি চ্যানেলগুলো সম্ভবত বড় বেশি অপাত্রে পড়েছে। তারা দেশী শিল্পীদের অনুসন্ধান, তাদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানোর দায়িত্ব উপেক্ষা করে ভারতের শিল্পীদের দখলে তুলে দিচ্ছে বাংলাদেশ। এই হীনম্মন্যতার অবসান দরকার। সরকারও যেন এখানে নীরব দর্শকের ভূমিকায় অবতীর্ণ। দেশীয় সংস্কৃতির সংরক্ষণ, বিকাশ ও পরিচর্যার দায়িত্ব সরকারেরও। সরকার সময়ে সময়ে এসব বিষয়ে চ্যানেলগুলোন সঙ্গে পরামর্শ করতে পারেন। কিন্তু আমরা লক্ষ্র করছি যে, সরকার টিভি চ্যানেলগুলোকে যে নির্দেশনা দেন, তার সবই প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করার জন্য। অমুককে অনুষ্ঠানে আনা যাবে, অমুককে আনা যাবে না, এ কথা বলার জন্য। এ দীনতার অবসান ঘটাতে না পারলে মর্যাদাবান জাতি হিসেবে আমাদের টিকে থাকাই দুরূহ হয়ে পড়বে।
নাকি সরকার এমন নীতি গ্রহণ করেছে যে, বাংলাদেশের বন্দর-সড়ক-রেলপথ-কম্বটনীতি যেমন ভারতের কর্তৃত্বে দিয়ে দেয়া হচ্ছে, সে ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নিজস্বতার আর দরকার নেই। পশ্চিম বাংলার লোকেরা যেমন ভারতীয় জাতীয়তার যূপকাষ্ঠে নিজেদের সবকিছু বলিদান করেছে, বাংলাদেশের লোকেরাও তেমনি মিশে যাক ভারতীয়তার স্রোতে। এর সবকিছু ভারতানুগ করার অপপ্রয়াস শেষ পর্যন্ত যে সফল হবে, এমন মনে করারও কোনো কারণ নেই। কিন্তু এই অপপ্রয়াস এখন দন্ত্য ব্যাদান করে হাসতে শুরু করেছে।
শাহরুখ খানের লাইভ শো এমনি বহু প্রশ্নের জন্ম দিয়ে গেল। ভক্তরা সেদিন বহু দাম দিয়ে টিকিট করে সপরিবারে তার শো উপভোগ করতে গিয়েছিলেন। তারা সম্ভবত ধারণা করেছিলেন যে, হাস্য-কৌতুক ও অভিনয় দেখিয়ে তিনি দর্শকদের আনন্দ দেবেন। কিন্তু মঞ্চে যা ঘটালেন শাহরুখ ও তার সঙ্গিনীরা তাতে দর্শকদের ভিমড়ি খাবার জোগাড়। শাহরুখ কথাবার্তা বললেন, ঠাট্টা-মশকরা করলেন। সেটাও বোধহয় ঠিকই ছিল। কিন্তু তার সঙ্গিনীরা মঞ্চে যখন নাচতে এলেন, তখন আক্কেল গুড়ুম। তাদের পরনে কাপড় নেই বললেই চলে। বক্ষদেশ প্রায় উন্মোচিত। নিম্নাঙ্গে সামান্য প্যান্টি। ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলে যখন এসব চলে, তখন রিমোট টিপে তা সরিয়ে দেয়া যায়। কিন্তু লাইভ অনুষ্ঠানে তো সরিয়ে দেয়ার উপায় নেই। তাই অনেক পিতামাতা সঙ্গী শিশুদের চোখ হাত দিয়ে ঢেকে দেন। সপরিবারে এসব দৃশ্য কোনো অবস্থাতেই দেখা যায় না। একের পর এক প্রায়নগ্ন ভারতীয় নর্তকীরা যখন মঞ্চে পুরুষ নর্তকদের সঙ্গে ঢলাঢলি করতে শুরু করলো তখন অনেকেই স্টেডিয়াম ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে যান।
পরের দিন পত্রিকার পাতায় সেসব প্রায়নগ্ন নারীদের ছবি ও তাদের ঢলাঢলির ছবি প্রকাশিত হলো। যারা ঢাকার একটি টিভি চ্যানেলে সরাসরি সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটি দেখেননি, তারা পত্রিকার ছবি দেখে হতভম্ভ হয়ে গেলেন। বাংলাদেশের মাটিতেও এটা সম্ভব! মানুষ প্রশ্ন করতে থাকলো এমন একটি অনুষ্ঠানের অনুমোদন সরকার কীভাবে দিল? এ অনুষ্ঠানে কি হবে, সেটা সরকারের অগোচরে থাকার কথা নয়। তবে কি সরকার জেনেশুনেই এমন একটি বেলেল্লাপনার অনুমোদন দিয়েছে। যাতে বাংলাদেশের তরুণ সমাজেন উৎসন্নে যাওয়ার পথ আরও সুগম হয়? হ্যাঁ ইংরেজি বা হিন্দি সিনেমায় আমরা অনেক কিছু দেখি। কিন্তু আমরা কখনও কল্পনাও করি না যে ওসব দৃশ্য আমাদের পথেঘাটেও অহরহ দেখা যাক। এটা পিছিয়ে থাকা নয়। এটা সাংস্কৃতিক চেতনা। সরকার সে চেতনা এখন নস্যাৎ করতে উদ্যত হয়েছে।
এই বেলেল্লাপনার সঙ্গে সরকার যে জড়িত, তার প্রমাণ পাওয়া গেল সঙ্গে সঙ্গেই। সরকারের প্রতিমন্ত্রী কামরুল ইসলাম টুকুও গিয়ে হাজির হয়েছিলেন শাহরুখ খানের সে সুড়সুড়িপ্রধান লাইভ শোটি দেখতে। এবং আশ্চর্য, তার জন্য সংরক্ষিত আসনটিও দখল হয়ে গিয়েছিল মন্ত্রী সেখানে হাজির হওয়ার আগেই। কিন্তু মন্ত্রীর ইস্ক্ এতোই প্রবল ছিল যে, তিনি মাটিতে বসেই সেই আদিরসাত্মক শোটির রসাস্বাদন করতে শুরু করেন। অনুষ্ঠানে কী হবে সেটা না জেনে কোনো মন্ত্রীর ঐ অনুষ্ঠানে যাবার কথা নয়। অর্থাৎ তিনি আগে থেকে জেনেই সেখানে গিয়েছিলেন এবং বড়ই পরিতৃপ্তিতে অনুষ্ঠানটি উপভোগ করেন।
.

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


