বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির সভাপতি ড. আবুল বারকাতের কথাবার্তা, লেখালেখি কিংবা ভাষণ-বক্তৃতার মধ্যে কোনোকালে কেউ কোনোদিন কোনো ‘বরকতের’ সাক্ষাত্ পেয়েছেন কি-না আমরা জানি না। কিন্তু তিনি শনিবার আমাদের অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে আবিষ্কারটি জনসম্মুখে উপস্থিত করেছেন, তার জন্য হয়তো তিনি দীর্ঘকাল স্মরণীয় হয়ে থাকবেন। ঢাকা স্কুল অব ইকোনমিক্স ও বাংলাদেশ অর্থনীতি সমিতির এক যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি তার আবিষ্কারের বিষয়টি জাহির করেছেন। আমাদের অর্থনীতির হাজার বছরের ইতিহাস পর্যালোচনা করার পর হয়তো বিশেষজ্ঞরা এই আবিষ্কারের নাম দেবেন ‘সিন্দুকের পুনরাবির্ভাব’ কিংবা ‘সিন্দুক তত্ত্ব’ আবিষ্কার।
তিনি গভীর গাঢ় অধ্যয়ন, পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা ইত্যাদির ভেতর দিয়ে দেখেছেন, দেশে কয়েক মাসে সিন্দুকের চাহিদা বেড়ে গেছে তিনগুণ। তিনি নিজে বিভিন্ন সিন্দুকের দোকানে ব্যাপক অনুসন্ধান পরিচালনা করেন। এই অনুসন্ধানে যে তিনি উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন তারও কারণ আছে। তিনি বিভিন্ন জায়গায় টাকার খোঁজ নেন। কিন্তু কোথাও টাকা না পাওয়ার পর তার মাথায় আসে সিন্দুকের দোকান প্রসঙ্গটি। আরও অন্য কোনো দোকানের চিন্তা তার মাথায় আসতে পারত। কিন্তু আল্লাহর অসীম কৃপায় তার মনে সিন্দুক বিক্রেতাদের কথা চলে আসে। তারপর তিনি তাদের বিক্রি-বাট্টার খোঁজ-খবর নেন। খোঁজ নিয়ে জানতে পারেন গত ছয় মাসে সিন্দুকের চাহিদা তিনগুণ বেড়ে গেছে। এই চাহিদা বৃদ্ধির কারণও তিনি অতি বিচক্ষণতার সঙ্গে বয়ান করেছেন। তিনি বলেছেন, ব্যাপক হারে বেড়ে যাওয়া কালো টাকা সংরক্ষণ করতেই এসব সিন্দুক ব্যবহার করছে কালো টাকার মালিকরা। দেশের টাকা কোথায় যাচ্ছে—এই অনুসন্ধিত্সা শেষ পর্যন্ত তাকে জীবনে প্রথমবারের মতো হলেও একটি সত্যিকার দামি কথা বলার সত্ সাহস জুগিয়েছে। তাকে ধন্যবাদ জানাতেই হয়।
বাংলাদেশের অর্থনীতির ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, আগে এ দেশে কোনো ব্যাংক-বীমা ছিল না। মানুষ বাড়িতে কলসিতে-বদনাতে টাকা-পয়সা, সোনাদানা ভরে গোপন স্থানে মাটির নিচে পুঁতে রাখত। এই পুঁতে রাখার বিষয়টি শুধু জানতেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিটি। বড়জোর তার বিশ্বস্ত কোনো লোক বা স্ত্রী। এদের মৃত্যু হলে পুরোটাই যেত গচ্চা। আবার বাড়িতে ডাকাত পড়ত কিংবা মালিকানার ভাগাভাগি নিয়েও লেগে যেত ধুন্দুমার কাণ্ড। বাড়িঘর-উঠান, বাগান সব ছিঁড়ে-খুঁড়ে বড় বড় গর্ত করা হতো। তারপর হয়তো পাওয়া যেত গুপ্তধন অথবা পাওয়া যেত না। গরিব-মধ্যবিত্তরা ঘরের মধ্যে বাঁশের চোঙ্গার মধ্যে কিংবা ঘরের একটি খুঁটিতে ছিদ্র করে তার মধ্যে টাকা জমাত। এরপর এলো মহাজনী, জগেশঠী কায়কারবার। সেখানে জিনিসপত্র, টাকা-পয়সা জমা রেখে, বন্ধক দিয়ে এক মহাগ্যাড়াকলে আটকে যেত বেশিরভাগ মানুষ। এরপর এলো ব্যাংক, দেশি ব্যাংক, বিদেশি ব্যাংক, সুইস ব্যাংক। টাকা পাচার, অর্থ পাচার, মানি লন্ডারিং। এইসব অতিমাত্রায় আসার কারণ আমাদের মধ্যে শিক্ষার হার বেড়ে গেছে। শিক্ষার হার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সমাজে বাড়তে লাগল দুর্নীতি, চুরি, ডাকাতি ও চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি, ঘুষ ও কমিশন। এইসব বাড়তে বাড়তে ১৯৯৯ সালে আমরা দুর্নীতিতে ‘বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন’ হলাম। এখন আমাদের দুর্নীতি পৃথিবীর চ্যাম্পিয়নশিপের সব সীমা ছাড়িয়ে সদম্ভে ঘোষণা করছে, ‘বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি আমরা, মহাদুর্নীতির শির’।
সমস্যা দেখা দিয়েছে অন্যত্র। ব্যবসা, বাণিজ্য, বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদি আর কত করা যায়। টাকা তো বেসুমার। সঙ্গত কারণেই টাকা দিয়ে ডলার, পাউন্ড কিনে বাইরে পাঠানো শুরু হলো। সুইস ব্যাংকে গোপন অ্যাকাউন্ট খুলে জমানো শুরু হলো দেশ ও জাতির রক্ত-চোষা অর্থ। গ্লোবালাইজেশনের গুণে সেখানেও নানা হট্টগোল। ধরা পড়ার ভয়। রাষ্ট্রীয় বিধি-নিষেধের বেড়াজাল। এদিকে কালো টাকার পরিমাণ যে কয়েক লাখ কোটি টাকা। উপায় হিসেবে ‘বন-রাজা’ ওসমান গনির স্টাইলে টাকা দিয়ে সোফা বানিয়ে, তোষক বানিয়ে, ফ্রিজ ভরেও পার পাওয়া যাচ্ছিল না। অগত্যা কালো টাকার মালিকরা উপায়ন্তর না পেয়ে হাত বাড়িয়েছেন এখন দেশের সেই পুরনো সনাতনী পদ্ধতি সিন্দুকের দিকে। আমরা দেশ ও জাতির এই নিকৃষ্ট দুশমন কালো টাকার মালিকদের যতই গালমন্দ করি, কিন্তু একটা কথা মানতেই হবে দেশীয় টেকনোলজি সেই অতি পুরনো সিন্দুককে তারা ফিরিয়ে এনেছেন। কিন্তু অর্থনীতির বারোটা বাজানো এইসব দুর্বৃত্তদের শৃংখলিত করবে কে? কালো টাকা ভরা এইসব সিন্দুকওয়ালাকে যদি শৃংখলিত করা না যায়, যদি তাদের আইনের আওতায় আনা না যায়, তাহলে দেশের অগ্রগতির ভবিষ্যত্ যে অন্ধকার তা তো খোলা চোখেই দেখা যায়।
দেশের টাকা চলে যাচ্ছে ডলার হয়ে দেশের বাইরে। টাকা চলে যাচ্ছে সিন্দুকে। বালিশের নিচে। এই যদি হয় অবস্থা, তাহলে তারল্য সঙ্কট কাটবে কী করে?
ড. আবুল বারকাত তার বক্তৃতায় বেশকিছু নসিহতও করেছেন। তার প্রথম নসিহত সব কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দিতে হবে। দ্বিতীয় নসিহত কালো টাকাকে মূল ধারায় বিনিয়োগের সুযোগ দিলে অর্থনীতি ফলবান হবে। দেশে এই কালো টাকাকে স্বাভাবিক পথে আসতে না দিলে খারাপ কাজ বেশি হবে।
বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার আমাদের রাজনীতিকে রক্তাক্ত করেছে। বাকস্বাধীনতার গলাটিপে ধরেছে। বিচার ব্যবস্থাকে প্রায় ধ্বংসস্তূপে পরিণত করেছে। শিক্ষাঙ্গনগুলোকে পরিণত করেছে রণক্ষেত্রে। প্রশাসনকে করেছে অকার্যকর। শেয়ারবাজারকে পরিণত করেছে গোরস্তানে। পুলিশ মানেই তাদের দলীয় পেটোয়া বাহিনী। দেশের সব উন্নয়ন ও অগ্রগতির চাকা রুদ্ধ করে প্রবল পরাক্রমে চালিয়ে যাচ্ছে বিরতিহীন চোয়ালবাজি। এই চোয়ালবাজি বৃদ্ধির বড় কারণ কালো টাকার দৌরাত্ম্য। নানা অপকর্মের ভেতর দিয়ে কালো টাকার যে পাহাড় তারা বানিয়েছে তা রক্ষার জন্যই এখন খুঁজে বেড়াচ্ছে সিন্দুক। কিন্তু তারা না জানলেও সচেতন প্রতিটি মানুষ জানে, সিন্দুক তাদের পাপকে গোপন রাখতে পারবে না। কাজেই আমাদের অনুরোধ থাকবে ন্যায়, সত্য ও নীতির পথে, আইনের পথে ফিরে আসুন। নিজেরাও ভালো থাকবেন, দেশও ভালো থাকবে। নইলে লোহার সিন্দুকেও ঢুকে যেতে পারে সূতানলী সাপ।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



