বই চুরিতে নাকি কোন অপরাধ ধরতে হয়না! (এটা একান্তই উড়ো কথা)
তাই এই মহামণ্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে আমরা বিদ্যা অর্জনের নানা ফন্দি ফিকির শুরু করলাম। আমরা ৬/৭ জন আছি, ভাবলাম দশে মিলি করি কাজ। ভালো কাজের নাকি সঙ্গী নেয়া ভালো! তাই একবাক্যে সবাই রাজি।
দলনেতা যথারীতি জাকির। সদ্য ক্যাডেট কলেজ থেকে বহিষ্কৃত, পাড়ায় ওর দাম ই তখন আলাদা! সবাই ক্লাস সেভেন এ পড়ি। সাথে জাকিরের শালা এসে জুটলো, ও পড়ে ক্লাস ফাইভ এ। পছন্দের সাগরেদ পেয়ে জাকিরের গর্ব দেখে কে!? ঠিক হলো, প্রথমেই এমন কোথাও যাই, যেখানে মাছিও বসে না!
ইসলামিক ফাউন্ডেসন লাইব্রেরী! ( আল্লাহ মাফ করো)
ফন্দিমতো প্রথম দিন আমরা খুব পড়ুয়া। বই যেন এক একটা দুর্লভ এন্টিক। খুব সাবধানে নড়াচড়া, কারো কোন বিরক্তি উদয় যেন না হয়। আমরা খুব সচেতন পড়ুয়া! নজরুলের 'আয়রে আমার আয়রে নবীণ কাচাঁ, আধমরাদের ঘা মেরে তুই বাচাঁ"। লাইব্রেরিয়ান একটু হতচকিত, কিন্তু খুশী (নিপাট ভদ্রলোক বেচারা) জাকির প্ল্যান অনুযায়ি ওনার সাথে খাতির করে ফেল্লো। ওনার বাসা দরকার খুব শীঘ্রই, আমরা হাতে তুড়ি মেরে বল্লাম এ আর এমন কি, আগামী মাসেই আপনি অতি সস্তায় বাসা পেয়ে যাচ্ছেন!
সেদিন আর কিছু হলনা!
ভাল কথা, তখন এসএসসি পরীক্ষার বন্ধ ছিল স্কুল। কোচিং করে এসেই নাকে মুখে কিছু গুঁজে আমরা বিদ্যা অর্জনের জন্য রওনা দিতাম। অপারেশন টাইম দুপুর ২-৩০ থেকে বিকেল ৫-৩০ কিম্বা ৬টা, জিপিও থেকে খিলগাঁও পৌছুতে ৬-৩০ কি ৭টা।
আমাদের নিরাপত্তা বুহ্য খুব চিন্তাভাবনা করে করা। দুজন দুদিক থেকে পাহাড়া। অপরাধী বই নিয়ে পেটের কাছে গুঁজে নেয়া। আবার সেটা ঠিক ঠাক করার জন্য টয়লেট এ গিয়ে আরেকটু সেট আপ করে নেয়া, পেপারবুক সাইজের সর্বোচ্চ ৬ টা বই মোটামুটি সবাই ক্যারী করতে পারতো। শ্যালক মনে হয় ২/৩টার বেশি পারতো না। আহা বেচারা!
খুব তাড়াতাড়িই শেল্ফ খালি হতে থাকলো, পেছন থেকে বই এনে সামনে রেখে দিতাম, যাতে ফাঁকা মনে না হয়! সপ্তাহ পার হয়ে গেল। লাইব্রেরিয়ান ভাই তাড়া দিতে লাগলেন, "কই, বাসার কদ্দুর?"- জী, এই যে খালি হলো বলে, চেষ্টার ত্রুটি করছি না কেউ!"
সেদিন একটু দেরি করে ফেলেছিলাম বেরুতে, তাড়াহুড়া ছিল সবার। আমরা মনে হয় কজন আগেই বের হয়ে গেছি। সব শেষে বের হচ্ছিল শালা!! ধরাটা শালাই খেলো! (শালা কি আর এমনি এমনি বলছিরে ভাই?!)
একটু গুন্জন মতো শুনলাম কি শুনলাম না, আমরা পগাড় পাড়, আর হ্যাঁ, দুলাভাই সবার আগেই পালিয়েছেন!
মালিবাগ রেল লাইনের কাছে এসে দম নিলাম। জল্পনা- কল্পনা, বাসা থেকে কি কি নিয়ে পালাব সব ফন্দি ফিকির করা সারাহ!! ঘন্টাখানেক পরে শালা হাজির!!! বহাল তবিয়তে! তিন কারণে পার পেয়ে গেছে, নেহায়েতই ছোট বলে, লাইব্রেরিয়ান তখন ও ধাতস্ত হতে পারেননি, আর ক্ষয়ক্ষতিটা তখন ও আঁচ করতে পারেনি!
আর একটা ভাল খবর শালা আমাদের কোন তথ্য দেয়নি। ব্র্যাভো, শালা মহাশয়, আমরা সবাই ধন্য ধন্য করতে লাগলাম, জাকিরের বুকের ছাতি বেয়াল্লিশ ইন্চি ফুলে উঠলো।
ওদিকে আর পা মাড়াই নি! এমনকি আজকে ২৪ বছর পরও না! পাগল নাকি?!! আর হ্যাঁ, এর পর ব্রিটিশ কাউন্সিল, রাশিয়ান কালচারাল, শাহাবাগ পাবলিক লাইব্রেরি, আরো কোনটা কোনটা যেন, কিন্তু সে আরেকদিনের গল্প!
আরও একটা তথ্য না দিলেই নয়! আমি সংগ্রহ করেছিলাম দ্বিতীয় সর্বোচ্চ- ১০৭ টি বই, জাকির সবচেয়ে বেশী-১৩০টা! বাকিদের কথা জানিনা, আমার কালেকশনের সব কয়টাই আমি পড়ে ফেলেছিলাম, আমার ইংরেজীর বেশ উন্নতিও হয়েছিলো তখন!
সর্বশেষ এডিট : ০৩ রা নভেম্বর, ২০০৮ রাত ১২:৪০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

