১)
: দোস্ত, একটু শুনবি?
: (কাপের চায়ে এক চুমুক দিয়ে মুদির দোকানদার তমিজ আলির দিকে তাকিয়ে) মামা, আজকা কি কবরের ভিতর থিকা চাপাতা চুরি করছো? চায়ের স্বাদ এমুন ড্যাম ড্যাম লাগে কেন? আর কি সিগারেট দিলা? ২ বছর থিকা গোল্ড লিফ টানতাছি আর আজকা দিলা পলমল, চাচীর লগে কি হাতাহাতি করছো নাকি?
তমিজ আলির মুখে কোনো বিকার না দেখে তাহের শাহেদের দিকে মুখ ঘুরায়,"আরে আমার লাট সাবের নাতী, জীবনে কুনো দুঃখ নাই, এডভেন্ঞ্চার চাই। কই তর সমস্যা কি?"
: দোস্ত সমস্যাটা আসলে তুমি বুঝতাছো না। দেখো ছোটকাল থিকা দেখছি আমার বাবা মা পুরা পারফেক্ট, না আছে টাকা পয়সার প্রবলেম না আছে অন্য কিছু। মানুষরে কুড়ায় পায়, আমি তাও না, পুরাই জেনুইন পোলা। ছোটকালে আমি যা চাইছি তাই পাইছি, কেউ আমারে ভুলে চটকানাও মারে নাই যেইটা নিয়া মনে দুয়েকটা দুঃখ থাকতে পারে। বড় হইয়া মানুষ প্রেমে ছ্যাক খায়, আর আমার গার্ল ফ্রেন্ড এমুনি একটা যে যেইটা কই সেইটাই শুনে, ছ্যাক তো দূর কি বাত, অন্য কারো দিকে তাকানোর কথাই মনে থাকে না তার। এইটা কুনো লাইফ হইলো?
: ব্যাটা, কালকা তোর ম্যাট্রিকের রেজাল্ট দিছে? এইবারও ফেল মারছস ?
: হ দোস্ত, কিন্তু সমস্যা এইটা না!
: চুপ থাক। ছুটোকাল থিকা দেইখা আইছি ক্লাসে তুই কুনোদিন সেকেন্ড হস নাই, আর অখন শুনি তিনবার ম্যাট্রিক দিয়াও পাশ করবার পারস না। গরু ছাগল বকরী ভেড়া নকল ছাড়া অখন গোল্ডেন এ প্লাস হাতে নিয়া ঘুরে আর তুই পাশ করবার পারস না। তোরে আমার বন্ধু কইতেও লজ্জা লাগে!
: দোস্ত সমস্যা এইটা না। তোর ম্যাট্রিক পাশ না, তুই যদি চাস আমি সামনের বার গোল্ডেন এ প্লাস দিয়া দিমু। কিন্তু দোস্ত লাইফে কুনো মজা নাই!
: একখান কাম কর, আমি তোরে একখান বুদ্ধি দেই। দেখ কি হয়!
তাহের শাহেদের কানে ঘি ঢালতে লাগলো!
২)
শাহেদের বাবা পেপার পড়ছেন, দৈনিক শেষের আলু। পুরো শহরে এই পত্রিকা কেউ পড়ে কি না সন্দেহ, শাহেদের মনে সন্দেহ জাগে যদি এই পত্রিকাটি সার্কুলারের অভাবে কাল বন্ধ হয়ে যায় তাহলে শিওর তার বাবা এই পত্রিকা অফিস পুরোটা কিনে চালু রাখবেন!
: কি কিছু বলবে? দীর্ঘ ১০ বছর পর তোমাকে আমি এত সকালে ঘুম থেকে উঠতে দেখলাম। সকাল ৮ টায় শেষবার যখন উঠেছিলো তখন তোমার দাতে নাকি পোকা ধরেছিলো। যাই হোক, শুনি কি বলবে এবার?
: বাবা, আমি অনেক চিন্তা করে দেখলাম, এই দেশে আর থাকবো না। আমার একটু চেন্জ্ঞ দরকার!
: (পত্রিকা দ্রুত বন্ধ করে চোখের চশমা খুলে একটু ভালো করে নজর দেয়া শুরু করলেন ছেলের দিকে) কোথায় যেতে চাও? পড়াশুনা করতে দেশের বাইরে যেতে চাও? ভালো তো। তা কোথায় যাবে বলো, অস্ট্রেলিয়া না আমেরিকা? তোমার বোনের কাছে যেতে পারো। কানাডায় ওদের বাড়িতে থাকতে্ পারো!
: না বাবা, আমি আসলে ভাবছিলাম ধারে কাছেই কোথাও যাই। যেমন ধরো কাশ্মীর, কাবুল!
: (থতমত খেয়ে) এত জায়গা থাকতে কাশ্মীর কেন বাবা? তুমি কি কোনো জঙ্গি সংগঠনের পাল্লায় পড়েছিস?
: আরে না বাবা, আসলে যুদ্ধের মধ্যে মানুষ ঘুমায় কিভাবে, কিভাবে তারা জীবনধারন করে সেটা একটু দেখতে চাচ্ছি। আমি সেরকম অনুভূতি নিয়ে কিছু কবিতা আর গান কম্পোজ করবো। দেখবো আসলে পারিপার্শ্বিক পরিবেশের সাথে এর কি প্রভাব?
শাহেদের বাবা ডানে বায়ে তাকিয়ে শার্টের বোতাম খুলতে থাকলেন আর কলারটা আরও বড় করতে করতে চিৎকার শুরু করলেন,"ও সামিহা, সামিহা, কোথায় গেলে? প্রেসার মাপার মেশিনটা একটু আনো তো! ঐ ডাক্তারটাকে একটু খবর দাও, আমার কেমন যেনো লাগছে! এ আমরা কাকে বড় করলাম!"
৩)
শাহেদ একটা তাল গাছের দিকে চেয়ে আছে। পাশে রিয়া বসে বসে ওকে পলক হীন চোখে দেখছে। শাহেদ মাঝে মাঝে ঘাড় চুলকাচ্ছে!
: এই তোমার কি খুজলি হয়েছে? তুমি কি আবার গোসল করা বন্ধ করে দিয়েছো?
: (মেজাজ খিচে মুখ ভেংচিয়ে) ঐ তাল গাছে উঠতে মন চাইছে। কিভাবে উঠবো বুঝতে পারছি না!
: ঐ তালগাছটা? দেখো কিভাবে উঠে? আমি এরকম গাছে ভালো উঠতে পারি!
শাহেদ অবাক হয়ে দেখলো রিয়া গলার ওড়না কোমড়ে বেধে তাল গাছের দিকে হেটে যাচ্ছে আর পিছন পিছন ওর দিকে তাকিয়ে হাসছে। কিছুক্ষন পর দেখলো একটা সুন্দর মেয়ে ওড়নাটা বেয়ে বেয়ে তালগাছে উঠে গেলো। শাহেদের মাথা ঘুরছে। ওর মাথায় কি যেনো খেলে গেলো!
ও হঠাৎ দৌড়ে গাড়ির কাছে চলে গেলো। রিয়ার ডাক অগ্রাহ্য করে ও গাড়িতে স্টার্ট দিলো!
৪)
: তোর কি হয়েছে শুনি? তুই তো এমন ছিলি না। বলি এসব কাজ করবার বুদ্ধি তোকে কে দেয়? আমি কিছুই বুঝতে পারছি না!
শাহেদের আর ওর মা বসে আছে মুখোমুখি, যেনো একটা চিল একটা ইদুরের সামনে এমন ভাবে দাড়িয়ে আছে যে এখনই ঠোকরটা বসাবে। শাহেদ শুধু শুনেই যাচ্ছে। কখনো ডানে কখনো বায়ে তাকাচ্ছে। এমন ভাব যে সে আসলে কিছুই জানে না!
: কালকে রিয়া ফোন করেছিলো। সে তোর জন্য কানছিলো। বলছিলো সে নাকি ভুল করেছে!
: তাই নাকি? ও কি তাহলে স্বীকার করছে? বাচা গেলো অবশেষে।
: হ্যা, ও এর জন্য খুব কেদেছে। আজকে সকালে এসে অনেক কাদলো। বললো ও তোকে ভয় দেখাতে চায়নি। ওর কারনে তুমি নাকি ইনসিকিউরড ফিল করেনি!
শাহেদের মুখ হা হয়ে গেলো। ওর মনে বিশাল ঝড় বইছে। এত কষ্ট করেও ও কোনো ছ্যাকা খেতে পারলো না।
: আমি আর তোর বাবা দুজনে মিলে ডিসিশন নিয়েছি সামনের মাসে তোদের বিয়ে। আর মাথার মধ্যে থেকে এসব কাশ্মীর কাবুল সরা, নাহলে তোকে শিকল দিয়ে বেধে রাখবো!
৫)
: দোস্ত, কি করো?
: (খাটে শুয়ে বিশাল একটা সুখটান দিয়ে) ভাবতাছি। ভাবতাছি কত মানুষ কষ্টে আছে আর তুই....
: এখন কি করবো?
: একটাই বুদ্ধি।
: কি বুদ্ধি?
: তুই বিয়ার অনুষ্ঠান থিকা পলা! সোজা চইলা যাবি কক্সবাজার। কোনো হোটেলে উঠবি না। আমি তোকে একটা ঠিকানা দিবো। টুটুলরে চিনস, বাইট্টা কইরা গোল গাপ্পা। ও ঐখানে জাহাজ ভাঙ্গার কাম নিছে। ওর ঐখানে উঠ!
: কি বলিস দোস্ত, আমি তো এরকম ঠিকানাই খুজছি!
: তবে এখন পলাবি না। বিয়ের সময় যখন কাজী সাহেব কবুল বলবে তার কিছু আগে পালাবি! এর মধ্যে একটা অন্তর্নিহিত ভাব আছে! ঠিক আছে?
: ঠিক থাকবো না মানে, আবার জিগস!
: সাবধান, তোর বাবা যেনো না জানে। তাহলে কিন্তু আমি শেষ!
: ওকে!
৬)
চারিদিকে ধুমধাম। জহির সাহেব একলা বসে আছেন। কিযেনো ভাবছেন চুপচাপ, রুমটা অন্ধকার। সামিহা সেজে গুজে হঠাৎ রুমের লাইট জ্বালিয়ে জ হির সাহেবকে দেখেই চমকে গেলো। আস্তে আস্তে এগিয়ে পিঠে হাত রাখতেই দেখলো জ হির সাহেব মাথা নীচু করে নিজের অশ্রু লুকোচ্ছেন!সামিহা পাশে বসলেন।
: মনে পরে আমাদের বিয়ের কথা। তুমি এক কাপড়ে চলে এসেছিলে। আমার কাছে রিক্সাভাড়া নেই। টিউশনি করে পেট চালাই। তুমি রিক্সাভারা দিলে, কাজী অফিসের খরচাটা তোমার কাছ থেকেই গেলো। সেদিন রাতে আমরা বাসর রাত করবার জন্য একটা রুম খুজে পাই নি। তুমি ভয় পাচ্ছিলে হোটেলে যদি কিছু হয়, এদিকে আমার মেসে এক রুমে সবাই গাদাগাদি করে থাকি!
: তোমার জন্য সব রুম মেট গুলো সেদিন রুমটা ফাকা করে দিলো। ওরা তারপরদিন অন্যকোথাও শিফট হলো। শুধু তোমার আমার সংসারটা যেনো নির্বিঘ্নে শুরু হয় সেটা এনশিওর করার জন্য। কিন্তু তুমি কাদছো কেন?
: এ কান্না সুখের কান্না, তুমি বুঝবে না।
: তোমার পাগল ছেলেটা সুখী হবে বলে দিলাম। ওকে ডাকো। সবাই নীচে রেডি।
শাহেদ একটা সাদা শেরওয়ানী পড়ে বসে আছে। ওর পাশে তাহের বসে।
: পুরা ব্যাগ রেডীতো?
: হ
: এখান থেকে বের হয়ে কোথায় যাবি মনে আছে তো?
: হ
: টুটুলের ঠিকানা কি লেইখা রাখছোস নাকি মোবাইলে সেভ?
: পাগল হইছোস, মোবাইল আমার এখনই বন্ধ। মোবাইল সাথে নিবো না!
: পারফেক্ট। আমি যাই গাড়ির ওখানে ওয়েট করছি!
: থ্যাংক্স দোস্ত!
তাহের উঠে গেলো। এমন সময় পাশে রিয়া বসলো। সামনে কাজী সাহেব। কাজী সাহেব কিছু বলবার আগে রিয়া হঠাৎ শাহেদের হাতটা ধরলো। শাহেদ দেখলো ওর বাবার চোখ মুছছেন। ওর মাও কাদছে, তবে মুখে হাসি! জ হির সাহেব হাতে মাইক্রোফোন নিয়ে শুরু করলেন,"আপনাদের সবাইকে ধন্যবাদ আমার ছেলের বিয়েতে আসবার জন্য। আমি আজকে একটু আবেগী। মনে পড়ে আজ হতে ২০ বছর আগে যখন আমাদের বিয়ে হয় আমার কাছে টাকা ছিলো রিক্সাভাড়াটা দেবার। টিউশনি করে পেট চালাতাম। তবু সামিহা আমার উপর বিশ্বাস রেখেছিলো। বিশ্বাস রেখেছিলো এমন একটি ছেলের উপর যার চিন্তাভাবনা শুধু মাস শেষে কিভাবে বাসা ভাড়া দিবে আর কিভাবে ঘরে টাকা পাঠাবে। যার চিন্তায় থাকতো আরও দুয়েকটা টিউশনি করলে হয়তো আরো ভালো হতো! আজকে আমরা সুখেই আছি। আমার সন্তান সেই বৃত্তটি পূরন করছে। আমার বিশ্বাস রিয়ার হাত ধরে আমার আমার সন্তান তার কর্তব্যগুলো পূরন করবে, তারা সুখী হবে!"
শাহেদ তাকিয়ে দেখে রিয়া কাদছে।
: কাদছো কেন?
: তুমি পালাবে তাই না?
: (শাহেদ ডানে বায়ে তাকিয়ে থতমত খেয়ে গেলো) মানে?
: তুমি পায়ে কেডস পড়ে আছে। শেরওয়ানীর নীচে শার্ট। পালাতে চাও? পালাও। আমি তবু অপেক্ষা করবো! যদি কখনো ফেরার কথা মনে পড়ে, তখন এখানেই আমাকে খুজে পাবে! আমি আমৃত্যু তোমার জন্য অপেক্ষা করবো! যাও যেখানে যেতে চাও!
এই বলে রিয়া শাহেদের হাতটা ছেড়ে দেয়। শাহেদের হাত পা জমে গেছে। মনে হলো ওকে কেউ যেনো একটা বড্ড চপেটাঘাত করলো! কাজী সাহেব তার সামনে বসে আছে। কি যেনো বলছে, শাহেদ মাথা নেড়ে যাচ্ছে। ও কিছু সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করেছে। ওর হারিয়ে যাওয়াটা কেনো জানি স্হগিত করে দিলো। রিয়া কাদছে, ওর বাবা মা সবাই হাত তালি দিচ্ছে।
বাংলাদেশে এই এক সমস্যা, সকল কাজী গুলা বোকা। নাহলে আজ পর্যন্ত কোনো বিয়েতে কোনো পাত্র পাত্রী নিজের মুখে কবুল বলে নি, তবু তারা কবুল বলা হয়েছে এটা শুনে বিয়ে পড়িয়ে দেয়! এসব কাজীদের লাইসেন্স কেড়ে নেয়া উচিত কি বলেন?
সর্বশেষ এডিট : ২৩ শে জুন, ২০১৬ রাত ১০:৩৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


