ধরা যাক সূর্য্যটা বিস্ফোরিত হলো কাল, পুরো পৃথিবী তার আগুনে জ্বলে গেলো। কিন্তু বিস্ফোরিত হবার ৮ মিনিটের মধ্যেও আমরা জানবো না,আমরা সব জ্বলে যাচ্ছি, আমাদের সবকিছুর সমাপ্তি ঘটছে। যদি হয় সেভাবেই, তাহলে খুব করে চাইবো সেই আট টা মিনিট খুব দীর্ঘসময় হোক, শুধু দীর্ঘ না, সেই আট টা মিনিট চলতে থাকুক অনন্ত কাল। যেনো পৃথিবীর এই মহাৎসব, ভালোবাসা, বেচে থাকা, সুখে দুঃখে জীবনকে ধারন করা, চলতে থাকুক অনন্তকাল!
তপ্ত দুপুরের কাঠফাটা রোদে লোকাল বাসের জন্য ঘন্টার পর ঘন্টা দাড়িয়ে থাকা আর যখন অতিরিক্ত ভীড়ের চাপে সে বাসে উঠতে না পারার একটা যন্ত্রনা অনেকটা পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবার যন্ত্রনার সমান। কিছু কিছু মানুষ ফাটা কপাল নিয়ে দুনিয়াতে আসে। সবার মুখে হাসি ফুটে, কাছের মানুষেরা স্বপ্ন দেখে। দিন যত যায় এই ভাগ্যের কারনে সে হাসিগুলোর দৈর্ঘ্য কমতে থাকে, বাড়তে থাকে কপালে ভাজের দাগ। শাহেদ জন্মের পর শুধু এটাই দেখেছে ।
সকালে কিছু খেয়ে মতিঝিলে ইন্টারভিউ দিতে আসা। নির্দিষ্ট সময়ের আধা ঘন্টা আগে এসে ২ ঘন্টা বসিয়ে রাখা হয় ওকে। ভিতরে ডেকে নাম, কোথায় পড়া লেখা করেছে, এ চাকরী সে কেনো করতে চায়, এ তিনটা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেই বিদেয়। এখন বেলা গড়িয়ে দুটো, দুটো ঘন্টা ধরে কাঠফাটা রোদে দাড়িয়ে। মতিঝিল থেকে শ্যামলী কতদূর? হেটে যাওয়া যাবে?
শাহেদ হাটতে শুরু করে, বড় বড় বাহারী দালানের ছায়া মাড়িয়ে, কখনো দু একটা অভাগার গাছের ছায়াও মাড়াতে হয়। ইদানিং ছায়ার মাঝেও শীতলতা হারিয়ে গেছে। কি অদ্ভূত সময়ে তার বসবাস!
৫টা নাগাদ ঢাকা ইউনির কার্জন হলের গেটে এসে পড়লো ও। জ্যাম বাড়ছে, গাড়িগুলো স্হির হয়ে দাড়িয়ে আছে পুরোটা রাস্তা দু পাশ জুড়ে। কেউ এক ফোটা নড়ছে না। বাইরে তপ্ত রোদ, আর ভিতরে একজনের গা ঘেষে আরেকজনের গায়ের উত্তাপ, ঘামের গন্ধ আরও কত কি! সবাই নির্বিকার। বাসের জানালার পাশে যে সীট নিয়ে বসেছে সেও উঠছে না এই ভেবে যে এখনই গাড়ি ছাড়বে, যে দাড়িয়ে আছে ঐ সীটের পাশে, ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ঐ সীটের দিকে, কখন খালি হবে। এতগাদাগাদির মাঝেও কন্টাক্টর বাসের এপাশ থেকে ওপাশ চলা ফেরা করছে, হাতে নোট ভরতী সাজানো আছে। দাড়িয়ে থাকা পুরুষ মহিলা মেয়ে সবার গায়ে লেপ্টালেপ্টি করে বাসের ও কোনা থেকে এ কোনা।
আজকে টিউশনি ছিলো, গত ৭ টা বছর ধরে টিউশনি করে যাচ্ছে। ফিজিক্সে মাস্টার্স করছে ৩ বছর হলো, চাকুরী পেলো না সেরকম। সেরকম কথাটা এজন্য যে মাসে ৪ টা টিউশনি করে ১২ হাজার টাকা। যে চাকুরি পায় তার বেতন সর্বসাকূল্যে ৮ হাজার। বয়স হয়ে গেছে ২৯, সরকারী চাকুরী ৩ বছর!
সামনে সেই চেনা টিএসসি, খুব শখ ছিলো এই ইউনিতে ওর থাকার একটা জায়গা হবে। হওয়াটা অস্বাভাবিক ছিলো না মোটেও। অনার্স মাস্টার্স দুটোতেই ফাস্ট ক্লাস ছিলো। অনার্সে মেধা তালিকায় তৃতীয় আর মাস্টার্সে চতুর্থ। ওর আগের দুজন মাস্টার্সেও এগিয়ে থেকে স্কলারশীপে বাইর চলে যায়। তৃতীয় যে হয়েছিলো মাস্টার্সে সে বিসিএসে টিকে যায়। স্বভাবতই ওর শিক্ষক হবার কথা ছিলো।
ওদের ব্যাচ থেকে ২ জনকে শিক্ষক হিসেবে নেয়া হয়। একজন মেধা তালিকায় সপ্তম আরেকজন ১২ তম। দুজনই আশীর্বাদ তুল্য। দুজনই ওর প্রিয় বন্ধু অমিত আর রায়হান।
অমিতের কোয়ার্টারেই যাবে ও। ওখানে ওর থাকা খাওয়া ফ্রি। নিতান্ত দুর্দিনেও ছেলেটা ওকে সাহায্য করে। ওদের কারো উপরেই রাগ নেই, ওরাও কেনো যেনো ওকে ভালোবাসে।
: কিরে কোথা থেকে?
: একটা ইন্টারভিউ ছিলো মতিঝিলে!
: আয় ভিতরে আয়। একদিনে কি তুই তো কালো হয়ে গেছিস! আগে ফ্রেশ হয়ে আয়। তারপর খেতে বস! আমি টেবিলে খাবার দিচ্ছি!
: ভাবী বাসায় নেই?
: ও শপিং এ! সামনের মাসে আমরা জার্মানী যাচ্ছি, এর জন্য শপিং!
শাহেদ ফ্রেশ হয়ে খেতে বসলো। ইলিশ মাছ কাঠালের বিচি দিয়ে আর পুই শাকের সাথে ঝিঙ্গা। ভাবির রান্নার হাত অসাধারন।
: আর বলিস না। কনফারেন্স, সেমিনার এটা সেটা। একটু যে রেস্ট নেবো সেটার স্বস্তি নেই। তা বল, কোথায় ইন্টারভিউ ছিলো?
: এই একটা কনস্ট্রাকশন ফার্মে। ওদের ওখানে অফিস এসিস্ট্যান্ট দরকার। বেতন ভালোই ছিলো, মাসে ১৫০০০ টাকা।
অমিতের মুখে হাসিটা উবে যায়। ও দেখছে ওদের ক্লাসের মেধাবী একটা ছেলে অফিস এসিস্ট্যান্ট এর চাকরী খুজছে। অমিত পকেট হাতড়ে একটা কার্ড বের করলো।
: কাল এখানে যেতে পারবি? আমি ফোন করে দিবো। একটা রিসার্চ ফার্ম। এনালাইটিক্যাল কাজে লোক খুজছে।
শাহেদের খাবার শেষের দিকে। ওর দিকে একবার তাকালো। তারপর আবারো খাওয়া শুরু করলো। প্লেটের খাবার শেষ করলো। হাত ধুতে চলে গেলো। অমিত চোখ নামিয়ে ফেলেছে।
শাহেদ হাত মুছতে মুছতে বললো,"আমি এখন যাইরে। একটা টিউশনি আছে ৭ টার দিকে। ওটা ধরতে হবে।"
অমিত দাড়িয়ে বললো,"দোস্ত শোন। তুই যদি এই চাকুরীটা করিস, আমার অপরাধবোধ কিছুটা কমতো। একটু দয়া কর!"
শাহেদ পিছনে ঘুরলো না। দরজায় যেতে যেতে বললো,"ভাবীকে বলিস, দেখা করতে পারলাম না। পরে এসে দেখা করবো। রান্নাটা খুব ভালো লেগেছে রে! আজ গেলাম!"
এই বলে শাহেদ বেরিয়ে গেলো!
মাঝরাতে কি কখনো ঢাকা শহরে ঘুরেছে কেউ? কেউ কি জানে ঢাকা শহরটা কত সুন্দর? ছোট একটা শহর, কিন্তু আজ সে বড্ড তিলোত্তমা। বড্ড তিলোত্তমা হয়েও তার সৌন্দর্য্য হারায়নি। ছোট ছোট পার্কে দাড়িয়ে থাকা সবুজ গাছ, শির শির বাতাস অথবা ঢাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা তুরাগ, কি নেই ঢাকার?
নেই শুধু এই শহরটাকে ভালোবাসবার মতো মানুষ। আর তাই এই শহরটা এত সুন্দর হয়েও এর রূপগুলোকে প্রতিনিয়ত ধর্ষন করছি, কলুষিত করছি। সে চুপচাপ সয়ে যাচ্ছে, তার দেহতে জায়গা করে দিচ্ছে সবাইকে।
শাহেদ এই শহরটাকে ভালোবাসে, তাই সে কলুষিত মানুষের ভীড়ে ভিড়তে চায় না। সে সংগ্রাম করে যায় কলুষিত মানুষের ভীড় থেকে, ঢাকার মতো নীরব একটা সংগ্রাম!
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই জুন, ২০১৬ রাত ২:৩১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



