মানুষের অযোগ্যতার কথা মহান আল্লাহর চেয়ে আর কে বেশী জানে? অধিকাংশ মানুষের সবচেয়ে বড় ভূলটি হয় কোনটিতে মঙ্গল আর কোনটিতে অমঙ্গল সেটি চিনতে। এমন অযোগ্যতার কারণেই মানুষ অন্তহীন আখেরাতের কল্যাণ ভূলে দুনিয়ার কল্যাণ অর্জনে মৌলবী ডেকে দোয়ার মজলিস বসায়। দোয়ার মধ্যে ধরা পড়ে প্রাণের মূল আকুতি ও প্রায়োরিটি। আল্লাহর কাছে চাওয়ায় ব্যক্তি মনের আসল কথাটি লুকায় না। ভিতরের সেকুলারিজম তথা ইহজাগতিকতা তখন দোয়ার মধ্যে সুস্পষ্ট হয়। ভাল চাকুরি, ভাল বেতন, অধিক সন্তান-সন্ততি ও ব্যবসায় উন্নতির ন্যায় পার্থিব চাওয়া-পাওয়াটাই তখন চাওয়ার মূল বিষয়ে পরিণত হয়। গুরুত্ব হারায় সিরাতুল মোস্তাকিমের আকুতি। এমন ব্যক্তিরাই স্বার্থ উদ্ধারে সিরাতুল মোস্তাকিম ছেড়ে সিরাতুশ শয়তানের পথ ধরে। ডি-ইসলামাইজেশন ঢুকেছে এভাবে মোনাজাতে। সিরাতুল মোস্তাকিমের প্রতি আগ্রহ হ্রাস পাওয়ার কারণে সেটি অর্জনে অন্যকে ডেকে তাই দোয়ার আসর বসানো হয় না। অথচ মুসলিম দেশে পরিবার, সমাজ, মসজিদ-মাদ্রাসা, স্কুল-কলেজসহ সকল সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের কাজ হল আল্লাহর পথে চলার সামর্থ বাড়ানো। জীবনকে পরকালমুখী করা এবং পরকালের জবাবদেহীতাকে তীব্রতর করা। এটিই হল ইসলামাইজেশন। অপরদিকে শয়তানী প্রতিষ্ঠানের কাজ হল, সে পথ থেকে বিচ্যুতি বাড়ানো। সে বিচ্যুতিকরণ প্রক্রিয়াই হল ডি-ইসলামাইজেশন। এটি ইসলামের মুল চেতনা, লক্ষ্য ও মিশন থেকে মুসলমানদের সরিয়ে নেওয়ার কাজ। মুসলমানের ঈমান ও আমল বন-জঙ্গলে গড়ে উঠে না। এজন্য অপরিহার্য হল উপযোগী পরিবেশ। মুসলমানদের পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র এবং সে রাষ্ট্রের শিক্ষা-সংস্কৃতি, মসজিদ-মাদ্রাসা, মিডিয়া ও বইপত্র মূলতঃ সে পরিবেশই সৃষ্ঠি করে। অপরদিকে ডি-ইসলামাইজেশন বাড়াতে কাজ করে অসংখ্য শয়তানী প্রতিষ্ঠান। সেগুলোর মাঝে প্রধান হলো, সেকুলার রাষ্ট্র ও তার বিচার-ব্যবস্থা ও প্রশাসন, সেকুলার শিক্ষা-ব্যবস্থা, সেকুলার রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠন, সেকুলার সাহিত্য, নাচ-গানের আসর, পতিতালয়, মদ্যপান ও জুয়ার আসর, সূদী ব্যাংক, ইত্যাদি।
আল্লাহর পথে পথচলায় সফলতা অর্জন করতে হলে পুরা পথটাই চলতে হয়। হাজারো মাইলের যাত্রাপথে যদি এক মাইল পথও বাঁকি থাকে তবে তাতে গন্তব্যস্থলে পৌঁছা যায় না। পথে যেমন নয়নাভিরাম প্রাকৃতিক দৃশ্য আসে, তেমনি ধুসর মরুভূমি, দুর্গম পাহাড়, নদ-নদী, অশান্ত সমূদ্রও আসে। গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে হলে বাঁধাবিঘ্নতা যত বিশলই হোক, তা দেখে দমে গেলে চলে না। ধৈর্য ধরে ও কষ্ট সয়ে সবটাই চলতে হয়। সফলতা তো আসে এভাবেই। নইলে ব্যর্থতা অনিবার্য। একই রূপ অবস্থা আল্লাহর পথে পথ-চলায়। এ পথে শুধু নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতই আসে না, আসে সংগ্রাম ও প্রতিরোধ। আসে রক্তাত্ব লড়াই ও জিহাদ। আসে আর্থিক ও দৈহিক ক্ষয়ক্ষতি। আসে মৃত্যু। তবে বাধাবিঘ্নতা ও ক্ষয়ক্ষতি যত বিশালই হোক, আল্লাহর নির্দেশিত সিরাতুল মোস্তাকিমে চলা পথে থামার সুযোগ নেই। বিচ্যূত হওয়ারও সুযোগ নেই। বিচ্যুত ও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিকে আল্লাহপাক অভিশপ্ত দোয়াল্লীন বলেছেন। তাদের জন্য প্রস্তুত রেখেছেন জাহান্নামের কঠিন আযাব। অপর দিকে পৌঁছার আগে নিজ ইচ্ছায় থেমে গেলে ব্যর্থ হয় পূর্বের সকল মেহনত। প্রকৃত মুসলমানের কাছে সেটিও তাই অভাবনীয়। পথ চলা শেষ হতে পারে একমাত্র শাহাদতে, রোগ-ভোগে অথবা মৃত্যুতে। কথা হল, বাংলাদেশের কোটি কোটি মুসলমানের মাঝে ক’জন এধাপ গুলো অতিক্রম করে আল্লাহর রাস্তায় পুরা পথটা চলেছেন? কতজন নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতের গন্ডি ডিঙ্গিয়ে আরো সামনে এগিয়েছেন? অথচ সাহাবাগণ চলেছেন পুরাটা পথ। সে পথচলায় শতকরা ৬০ ভাগের বেশী সাহাবা শহীদ হয়েছেন।
যেদেশে শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ মুসলমান, সেদেশে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্র জুড়ে ইসলামিকরণ বা ইসলামাইজেশন তীব্রতর হবে সেটিই কাঙ্খিত। কিন্তু বাংলাদেশে সেটি হয়নি। বাংলাদেশের মুসলমানদের বড় ব্যর্থতা এখানেই। তারা নিজেদেরকে মুসলিম রূপে পরিচয় দিচ্ছে নিজ দেশ ও সমাজের ইসলামিকরণ না করেই। ব্যক্তির জীবনে ইসলাম গুরুত্ব পেলে জগত ও জীবন নিয়ে সমগ্র ধারণাই পাল্টে যায়। পাল্টে যায় জীবনের মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য। পাল্টে যায় তার নৈতিক চরিত্র, আচরণ, পোষাক-পরিচ্ছদ, খাদ্য-পানীয়, কর্ম, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতি। একজন কাফের থেকে জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলিতে কতটা পার্থক্য সৃষ্টি হল তা থেকেই নির্ণীত হয় মুসলমান হওয়ার পরিমাপ। নবীজী (সাঃ)র আমলে সে পার্থক্যটি ছিল প্রচন্ড। কাফেরদের থেকে সাহাবাদের পার্থক্য শুধু নামায-রোযা-হজ্ব-যাকাতের ক্ষেত্রে ছিল না। আল্লাহ, রাসূল, পরকাল, দোযখ-বেহেশত ও হাশর দিনের বিশ্বাস নিয়েও নয়। সুস্পষ্ট পার্থক্য ছিল জীবনের স্বপ্ন, লক্ষ্য, রাজনীতি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ জীবনের সর্বক্ষেত্রে। যে ব্যক্তি পূর্ব দিকে যায় সে কি পশ্চিমে যাওয়া ব্যক্তির সাথে কি একই ট্রেনে উঠতে পারে? পারে না। তেমনি মুসলমানও পারে না কাফের বা সেকুলার ব্যক্তির সাথে একই লক্ষ্যে রাজনীতি করতে। পারে না যুদ্ধবিগ্রহেও অংশ নিতে। কারণ জীবনের ভিশন, মিশন ও লক্ষ্যের ন্যায় কখনই এক হতে পারে না উভয়ের রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ। হাদীসে আছে, দুনিয়ার এ জীবনে যাদের সাথে জীবন কাটবে পরকালেও তাদের সাথেই হবে তাদের আবাসস্থল। অর্থাৎ এ দুনিয়ায় যাদের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও যুদ্ধবিগ্রহ কাফেরদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে চলে, পরকালেও তাদেরকে কাফেরদের সাথে জাহান্নামে যেতে হবে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশে কি সেটিই বেশী হয়নি? মুসলমানের রাজনীতি ও যুদ্ধবিগ্রহ হল আল্লাহর বিধানকে বিজয়ী করার হাতিয়ার। অপরদিকে কাফেরগণ এ একই অস্ত্র ব্যবহার করে ইসলামের নির্মূলে। সমাজে ও রাষ্ট্রে ইসলামীকরণ কতটা বাড়লো সেটি ধরা পড়ে কাফের রাষ্ট্র থেকে মুসলমানদের রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও আচরণগত পার্থক্য কতটা বাড়লো তা থেকে। অপর দিকে ইসলাম থেকে দূরে সরাটি যতই বিশাল হয় ততই বিলুপ্ত হয় সে পার্থক্য।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

