আমি ফান করলেও বিষয়টা এক্কেরে হাছা..................
প্রতিবেশীর মুখে গল্প শুনে আনোয়ারা বেগমের কাছে ছুটে যান যশোর উপশহরের হস্তশিল্প ব্যবসায়ী আলেয়া বেগম। নিজের সারা জীবনের সঞ্চয় ছাড়াও ১০ বিঘা জমি বিক্রি করে ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে নিয়ে মোট এক কোটি ১০ লাখ টাকা তিনি তুলে দেন আনোয়ারার হাতে। শর্ত অনুযায়ী কয়েক মাসের ব্যবধানে দ্বিগুণ টাকা ফেরত পাওয়ার কথা। কয়েক মাস তো দূরে থাক; চার বছর পেরিয়ে গেলেও আজ পর্যন্ত এক টাকাও ফেরত পাননি। আর এভাবে আলেয়ার মতো যশোরের বহু পরিবার হয়েছে সর্বস্বান্ত। 'মৃত স্বামীর ব্যাংক অ্যাকাউন্টে ৭২ কোটি টাকা জমা আছে। এ টাকা তুলতে কোর্ট ফি, ওকালতি ফি, ভ্যাট, ট্যাক্সসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোটা টাকার দরকার। এ কাজের জন্য যারা টাকা ধার দেবে তাদের দ্বিগুণ টাকা ফেরত দেওয়া হবে'_ এমন লোভনীয় গল্প ফেঁদে আনোয়ারা বেগম বিভিন্ন জনের কাছে টাকা ধার চান। দ্বিগুণ টাকা পাওয়ার লোভে আলেয়ার মতো তার এ প্রস্তাবে সাড়া দেন বহু মানুষ। তাদের কাছ থেকে তিনি হাতিয়ে নেন প্রায় পাঁচ কোটি টাকা।
প্রতারণার ফাঁদ পাতা হয় যেভাবে
বছর কয়েক আগে কয়েকটি জাতীয় ও আঞ্চলিক দৈনিকে আনোয়ারাকে নিয়ে প্রকাশিত খবরে বলা হয়, তার মৃত স্বামী ওমর আলীর নামে সোনালী ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ের পাবলিক হিসাব বিভাগের ১২০৮নং হিসাবে ২২ কোটি ৭৮০ টাকা ও জনতা ব্যাংক ঢাকা মতিঝিল শাখায় ২২৫৮নং সঞ্চয়ী হিসাবে ৭///// কোটি টাকা জমা আছে। ওমর আলীর মৃত্যুর পর কোনো নমিনি না থাকায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বিধি অনুযায়ী ওই টাকা জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে জমা রয়েছে, যা সুদে-আসলে বর্তমানে ৭২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। ওই টাকা ফেরত পেতে ওমর আলীর স্ত্রী আনোয়ারা বেগম অর্থঋণ আদালতে মামলা করলে ২০০৭ সালের ৭ নভেম্বর দেওয়া রায়ে সমুদয় টাকা আনোয়ারাকে ফেরত দেওয়ার জন্য আদেশ দেওয়া হয়। এরপর আনোয়ারা এসব সংবাদপত্রের কপি, টাকা ফেরত সংক্রান্ত সোনালী ব্যাংকের অফিস অর্ডার, টাকা জমা সংক্রান্ত সোনালী ব্যাংক রমনা শাখার হিসাব বিবরণী ও এক কোটি টাকার ট্যাক্স প্রদানের চালানপত্রের জাল কপি দেখিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছে দ্বিগুণ অর্থ ফেরত দেওয়ার শর্তে টাকা ধার চাওয়া শুরু করেন। যশোর সদর উপজেলার সুজলপুর গ্রামের নাজমুল হাসান জানান, দিদার মোহাম্মদ আবদুর রব নামে সোনালী ব্যাংকের তৎকালীন একজন পদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়ার পর তিনি আনোয়ারাকে পাঁচ লাখ টাকা ধার দেন। একই গ্রামের অবসরপ্রাপ্ত সেনাসদস্য গোলাম রসুল এসএ পরিবহন ও ইসলামী ব্যাংকের চেকের মাধ্যমে আনোয়ারাকে ২০ লাখ ২০ হাজার টাকা দেন। এর বিপরীতে আনোয়ারা তাকে সোনালী ব্যাংক যশোর করপোরেট শাখার চেক দিলেও তা কয়েক দফা ডিজঅনার হয়।উপশহরের আলেয়া বেগম অভিযোগ করেন, আনোয়ারা যাদের কাছ থেকে টাকা নিয়েছেন তাদের প্রত্যেককে চেক দিলেও তার সবক'টি ব্যাংক থেকে ডিজঅনার হয়। বাধ্য হয়ে তিনিসহ অনেকেই আনোয়ারার বিরুদ্ধে আদালতে পৃথকভাবে মোট ২২টি প্রতারণা মামলা করেন। আনোয়ারা জামিন নেওয়ার পর তার ক্যাডাররা তাকেসহ অন্যদের নানা হুমকি দিচ্ছে। গত ১৫ মে আনোয়ারার ছেলে বাপ্পী আদালত চত্বরে একটি মামলার বাদী তাসলিমাকে লাঞ্ছিত করে। তিনি আরও অভিযোগ করেন, তার কাছ থেকে টাকা নেওয়ার আগে আনোয়ারা তাকে সঙ্গে নিয়ে ঢাকায় সোনালী ব্যাংকের এক পদস্থ কর্মকর্তার দফতরে যান। তিনি আনোয়ারার ৭২ কোটি টাকা পাওয়ার বিষয়টি সঠিক বলেও উলেল্গখ করেন।এদিকে আনোয়ারার এই প্রতারণার বিষয়ে ব্যাংক কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, কোনো ব্যাংকে তার নামে এত টাকা জমা নেই। জনতা ব্যাংক যশোর করপোরেট শাখার কর্মকর্তা রবিউল ইসলাম সাংবাদিকদের জানান, আনোয়ারা যে অ্যাকাউন্টের কথা বলছেন সেটা ভুয়া এবং ওই ব্যাংকে ওমর আলীর নামে ৭ কোটি টাকা জমাও নেই। তবে আনোয়ারা বেগম সাংবাদিকদের কাছে দাবি করেন, তার স্বামীর অ্যাকাউন্টে ৭২ কোটি টাকা জমা থাকার বিষয়টি সঠিক। পাওনাদারদের তার দেওয়া সব চেক ডিজঅনার হওয়া প্রসঙ্গে তার বক্তব্য, তিনি কাউকে কোনো চেক দেননি। সর্বস্বান্ত পরিবারগুলো প্রতারক এ মহিলার বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রশাসনের কাছে বারবার অভিযোগ করেছে। থানায়ও মামলা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আজ পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।তদন্তে বাংলাদেশ ব্যাংক ও একটি গোয়েন্দা সংস্থাসূত্র জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই সদস্যের একটি প্রতিনিধি দল গত ৪ ও ৫ জুলাই সোনালী ব্যাংক ও ইসলামী ব্যাংকের যশোর করপোরেট শাখায় গিয়ে কাগজপত্র যাচাই-বাছাই করে। তারা প্রতারক চক্রের পেছনে পদস্থ ব্যাংক কর্মকর্তাসহ অনেকেই জড়িত বলে অভিযোগ করেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের পাশাপাশি প্রতারণার ঘটনাটি তদন্ত করছে একটি গোয়েন্দা সংস্থাও। এ সংস্থার এক কর্মকর্তা জানান, আনোয়ারা যে একজন ভয়ঙ্কর প্রতারক এবং রাঘববোয়ালরা এর পেছনে রয়েছে এটা তারা নিশ্চিত হয়েছেন।
সমকাল ০৬/০৮/২০১০

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


