[প্রাক্কথন: বর্তমান তত্ত্ববধায়ক সরকার রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন বাস্তবায়নের জন্য ইতোমধ্যে ঘোষণা দিয়েছে। কিন্তু এই সরকার মতা গ্রহণের পরে এবং এই ঘোষণা দেবার পূর্বে প্রথম আলোর পাতায় স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে-বিপক্ষে একটি বিতর্ক হয়। বিচারবিভাগের পৃথকীকরণের ঘোষণার পর, আশাবাদী হয়ে, নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনুর রশীদ তার জীবনের সাইকেল কলামে সাংস্কৃতিক-সাংবাদিক মহল থেকে উচ্চারিত স্বায়ত্তশাসনের পুরনো দাবিটি বর্তমান সরকারের কাছে উপস্থাপন করেন। মামুনুর রশীদের কলামের পরে কলামিস্ট-গবেষক রোবায়েত ফেরদৌস রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন নয়, সরকারী মাধ্যম দুটিকে সরাসরি বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেবার পরামর্শ দেন। পরে লেখক-গবেষক ফাহমিদুল হক মামুনুর রশীদকে সমর্থন জানিয়ে ও রোবায়েত ফেরদৌসের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করে একটি প্রতিক্রিয়া লেখেন। তিনটি লেখাই সামহোয়ার-এ উপস্থাপন করা হলো। এই তিনটি লেখা ছাড়াও আরও অনেকে এই বিতর্কে অংশ নিয়েছেন। সবগুলো হাজির করতে পারলে আরও ভালো হতো।]
বেসরকারীকরণ নয়, রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিই জোরালো হোক
ফাহমিদুল হক
কলামিস্ট-গবেষক রোবায়েত ফেরদৌসের রেডিও-টিভির স্বায়ত্তশাসন-সংক্রান্ত ৩ ফেব্র“য়ারিতে প্রথম আলোয় প্রকাশিত একটি ‘প্রতিক্রিয়া’পাঠ করে আমার মাঝে আরেক দফা প্রতিক্রিয়া হলো, এই ছোট রচনাটি লিখতো উদ্বুদ্ধ হলাম। প্রথম দফায় তারও ‘প্রতিক্রিয়া’ হয়েছিল নাট্যব্যক্তিত্ব মামুনূর রশীদের ‘বেতার-টেলিভিশনের স্বায়ত্তশাসন: আমরা কি ভুলতে বসেছি’ শীর্ষক কলাম পড়ে। রোবায়েত ফেরদৌস তার ‘স্বায়ত্তশাসন সমাধান নয়, রেডিও-টিভিকে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দিতে হবে’ শীর্ষক প্রতিক্রিয়ায় মাধ্যম দু’টিকে সরাসরি বেসরকারী হাতে ছেড়ে দেবার আহ্বান জানিয়েছেন, এবং দীর্ঘদিনের আলোচিত এই ইস্যুটিতে নতুন মাত্রা যোগ করেছেন। প্রথমেই বলে নিই, এই দুই লেখকের মধ্যে আমি মামুনূর রশীদের অবস্থানকে সমর্থন করছি এবং রোবায়েত ফেরদৌসের পরামর্শের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করছি।
ফ্রি মিডিয়া ও প্লুরাল মিডিয়া একটি দেশের গণতন্ত্রায়ণ প্রক্রিয়ার একটি সূচক হিসেবে চিহ্নিত। আমাদের দেশের মিডিয়া মোটামুটিভাবে ফ্রি; বহু সংবাদপত্র, বেশ কয়েকটি টিভি চ্যানেল, সামনে আসছে বেশ কিছু বেতার, রয়েছে ইন্টারনেটÑ বলা যায়, আমাদের মিডিয়া এখন প্লুরালও বটে। কিন্তু প্লুরাল মিডিয়া মানেই কি বহু বহু সংখ্যক বেসরকারী মিডিয়ার সমারোহ, নাকি সরকারী, স্বায়ত্তশাসিত, বিকল্প ইত্যাদি নানা ধরনের মিডিয়ার বৈচিত্র্য?
গ্রামীণ উন্নয়নে বাংলাদেশ টেলিভিশনের অনুষ্ঠান ‘মাটি ও মানুষ’-এর ভূমিকার কথা স্মরণ করে বলতে পারি, গণমাধ্যমের যে-ভূমিকার কথা আমরা আদর্শিক জায়গা থেকে বলে থাকি, তা বাংলাদেশ রেডিও-টেলিভিশন এপর্যন্ত সামান্য হলেও যতটুকু পালন করে রেখেছে, এত এত বেসরকারী চ্যানেল এখনও তার ধারেকাছে যেতে পারেনি। শাইখ সিরাজ চ্যানেল আইয়ের অন্যতম পরিচালক বলেই, নিতান্ত ব্যক্তিগত ভালবাসা থেকে ‘হৃদয়ে মাটি ও মানুষ’ অনুষ্ঠানটি চালু করেছেন। কিন্তু অন্য কোনো চ্যানেল তো সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নের জন্য অন্য ধরনের কোনো অনুষ্ঠান চালু করতে সমর্থ হলোনা! আমরা কি ভুলে যাবো জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে বাংলাদেশ বেতারের ভূমিকার কথা? কৃষিভিত্তিক অনুষ্ঠানগুলোর, সীমিত হলেও, সাফল্যের কথা? মামুনূর রশীদ যথার্থই বলেছেন, “বাংলাদেশ টেলিভিশনের বিকল্প প্রাইভেট চ্যানেল নয়। প্রাইভেট চ্যানেলকে বাঁচতে হয় বিজ্ঞাপন থেকে। কাজেই ব্যবসাটা সেখানে মুখ্য। কিন্তু রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের ব্যবসার চেয়ে শিা এবং সঠিক তথ্যপ্রবাহই মুখ্য।”
জনাব ফেরদৌসের লেখা পড়ে মনে হয়েছে একটি মাধ্যম নিরপে সংবাদ ও বিনোদনমূলক অনুষ্ঠান উপস্থাপন করতে পারলেই তার বিচারে সেটি উৎরে যাবে। বিটিভি কিংবা বাংলাদেশ বেতার যেহেতু সেটা দিতে পারছে না, এবং বেসরকারী চ্যানেলগুলো যেহেতু পারছে, তাই মাধ্যম দু’টিকে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়া হোক। কিন্তু একটি গণমাধ্যমের ভূমিকা কি কেবলই ঘণ্টায় ঘণ্টায় সাদামাটা সংবাদ (যধৎফ হবংি) পরিবেশন ও দিনমান বিনোদন বিলানো? সার্বিক আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন অবদান রাখতেই প্রথম দিকে এসব (ইলেক্ট্রনিক) গণমাধ্যমের সৃষ্টি হয়েছিল। অন্যদিকে বিটিভির ব্যর্থতার কথা আমরা সবাই জানি, কিন্তু বেসরকারী চ্যানেলগুলোর সাফল্যের দিকগুলোও প্রশ্নাতীত নয়। সে-আলোচনায় খানিক পরেই আসছি। কিন্তু একটা তথ্য আমাদের কিছুতেই ভুলে গেলে চলবে না যে রেডিও-টেলিভিশন-ইন্টারনেটÑ প্রযুক্তিনির্ভর এই তিনটি মাধ্যমই আবি®কৃত হয়েছে সরকারী উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতায়, সরকারী ল্যাবরেটরিতে। পরবতী সময়ে বেসরকারী উদ্যোগে রেডিও-টিভি চালু হয়েছে। সেটা ভালোই হয়েছে, মিডিয়ার প্লুরালিটি বেড়েছে, বিচিত্র স্বর শোনা যাচ্ছে। কিন্তু সরকারী রেডিও-টেলিভিশনকে বেসরকারী খাতে ছেড়ে দেয়ার প্রস্তাব খানিকটা অভিনব এবং অগ্রহণযোগ্যও।
কলম্বীয় লেখক গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ এক সাাৎকারে বলেছিলেন, ফিদেল ক্যাস্ট্রোকে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরনের ‘পর্নোগ্রাফিক অবসেশন’ রয়েছে। টেলিভিশনকে নিয়ে বাংলাদেশ সরকারের, তা যে-সরকারই হোক, মনোভাব খানিকটা সেরকমই। যে-মাধ্যমকে রাষ্ট্রীয় উন্নয়নে ব্যবহার করার কথা ছিল, তা বিএনপি বা আওয়ামী লীগের দলীয় ‘মাউথপিস’ বানিয়ে ফেলা হয়েছে। সেকাহিনী আমাদের সবার জানা, তবুও রোবায়েত ফেরদৌস চমৎকারভাবে এই দিকটা নিয়ে তার লেখায় আলোচনা করেছেন। মাঝে বেশ কয়েকটি বেসরকারী চ্যানেল চলে আসায়, আমাদের নিরপে সংবাদ জানার এবং রঙচঙে বিনোদন উপভোগের আকাক্সা এতটাই মিটেছে যে আমরা শহুরে মধ্যবিত্তরা জাতীয় রেডিও-টেলিভিশনের কথা প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম, সংকীর্ণ রাজনৈতিক মতাদর্শের সরকারগুলোর ওপরে হতাশ হবার কারণে স্বায়ত্তশাসনের দাবিটিও আড়ালে চলে গিয়েছিল। কিন্তু আজ ভিন্ন রকমের এক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে আমরা খুশিমনে শাসিত হচ্ছি, তাই স্বায়ত্তশাসনের প্রসঙ্গটি আবার সামনে চলে এসেছে।
এবার বেসরকারী চ্যানেলগুলোর ‘নিরপে’ সংবাদ ও বৈচিত্র্যময় অনুষ্ঠানের সংপ্তি বিচারও করতে হয়। বিগত জোট সরকারের মেয়াদ শেষে তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে জটিলতা শুরু হবার আগ পর্যন্ত, বেসরকারী টিভি চ্যানেলগুলোর সংবাদ বা অনুষ্ঠানের সত্যিকারের মূল্যায়ন করতে গেলে আমরা কী পাই? চ্যানেলগুলোর সংবাদ দেখে মনে হয় তা যেন বিটিভিরই পরিমার্জিত সংস্করণ। উপস্থাপনা ও আঙ্গিকে কুশলতা রয়েছে কিন্তু আধেয়তে সেই প্রধানমন্ত্রীর স্লট, কয়েকজন প্রভাবশালী মন্ত্রীর মুখে কেবিনেট-মিটিঙের সিদ্ধান্তের বয়ান। বোঝাই যায়, বেসরকারী টিভি-চ্যানেলগুলোর ওপরে, অন্তঃত সংবাদের ওপরে, পরো হলেও কড়া-রকমের নিয়ন্ত্রণ সরকারের ছিলো। ছিল সেল্ফ-সেন্সরও। কারণ চ্যানেলগুলোয় রয়েছে বিগত সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী-নেতার প্রত্য বা পরো মালিকানা। আর বিজ্ঞাপনের চাপে নাজেহাল অনুষ্ঠান-নাটকের মান যাই হোকনা কেন, তাতে প্রাণ অবশিষ্ট থাকেনা। এই অতি ব্যবসায়িক মনোবৃত্তি বিটিভির ছিলনা, যদিও ব্যবসায়িকভাবে চ্যানেলগুলোর চাইতে তা সফলই ছিল বা আছে।
রোবায়েত ফেরদৌসের স্বায়ত্তশাসনে আস্থা নেই, আছে বেসরকারীকরণে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিয়ে বলেছেন, স্বায়ত্তশাসিত হবার পরেও সেখানে সরকারী দলের দাপটই সর্বব্যাপী এবং ভাইস চ্যান্সেলর থেকে শুরু করে কর্মকর্তা-কর্মচারী এমনকি শিক নিয়োগের চেষ্টা করা হয় তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাচনসমূহে সরকারী গ্র“পে ভোট দেবেন কিনা, সেই বিবেচনায়। কথাগুলো সবই সত্যি, কিন্তু ব্যাপারগুলো কি এতই সরলরৈখিক? তিনিও জানেন, তার বিভাগেই অল্প কিছু বিচ্যুতি ছাড়া, সবসময়ই যোগ্যতার ভিত্তিতে শিক নিয়োগ হয়েছে। একজন শিক চাইলে আজও কারও মুখাপেি না-হয়েও চলতে পারেন, স্বাধীন জীবন যাপন করতে পারেনÑ হয়তো তিনি প্রমোশন-আবাসন এরকম কিছু জায়গায় বঞ্চিত হবেন। এরকম দিন কি কখনো আসবে যেদিন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক তার বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি কিংবা বোর্ড অব ডিরেক্টরস বা ভিসির বিরুদ্ধে পত্রিকায় লিখতে পারবেন, যেমনটি রোবায়েত ফেরদৌস প্রায়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রসঙ্গে লিখে থাকেন?
ঢালাও বেসরকারীকরণ সর্বরোগহর নয়, অন্তঃত বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা জাতীয় রেডিও-টেলিভিশনের মতো প্রতিষ্ঠানের তো নয়ই। সরকার তার রাষ্ট্রযন্ত্র চালাতে যে-জনবল লাগবে তা তৈরি করতে যেমন বিশ্ববিদ্যালয়ে নিজস্বার্থেই বিনিয়োগ করবে, তেমনি সরকার তার উন্নয়নমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়নের হাতিয়ার হিসেবে রেডিও-টেলিভিশন ব্যবহার করবে। অথচ বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে সরকার দিনদিনই বিশ্ববিদ্যালয়ের বরাদ্দ সঙ্কুচিত করছে, অভ্যন্তরীণভাবে আয় বাড়াতে চাপ দিচ্ছে। আর রেডিও-টেলিভিশন নিয়ে তারা একটি কাজই কেবল করেছে, সেটা হলো নির্লজ্জভাবে দলীয় উদ্দেশে মাধ্যম দু’টিকে ব্যবহার করা। রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে উন্নয়নমূলক কোনো বার্তা জনগণকে কার্যকরভাবে দিতে চাইলে তাকে আগে জনগণের আস্থা অর্জন করতে হবে। আর সেই আস্থা বর্তমান মালিকানার ধরনে অর্জন করা সম্ভব নয়। আমাদের রাজনৈতিক-সংস্কৃতিকে আমরা ভালো করেই জানি, স্বায়ত্তশাসনই হতে পারে তার সমাধান। ভারত দূরদর্শনকে স্বায়ত্তশাসন দিয়ে প্রসার ভারতী বানিয়েছে, বেসরকারীকরণ করেনি। রোবায়েত ফেরদৌসের মতো আমিও মনে করি, যা করার এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারকেই করতে হবে, তবে কী করতে হবে তা নিয়ে তার সঙ্গে আমার স্পষ্ট দ্বিমত রইলো।

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


