somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাজারমুখিনতা (পর্ব ২)

৩০ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:০০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

(আগের অংশের পর)

বাংলাদেশের গণমাধ্যম: মুক্তবাজার সাংবাদিকতার বিকাশ

বাংলাদেশের বিদ্যমান গণমাধ্যম সম্পর্কিত আমার মতামত যতটুকু এখানে বিধৃত করা হবে, তা সাধারণ পর্যবেক্ষণ মাত্র, এটি কোনোক্রমেই গবেষণালব্ধ প্রাপ্তি নয়। এখানেই সব দিক ও প্রবণতা উল্লেখিত হবে, তেমন দাবিও করছি না। আর লেখকের ব্যক্তিগত কিছু পছন্দ ও ঝোঁকের কারণে নির্দিষ্ট কিছু বিষয়েই আলোচনা সীমাবদ্ধ থাকবে। এই নিবন্ধটি ২০০২ সালে লিখিত। এখানে ব্যবহৃত কিছু উদাহরণ তাই পুরনো মনে হতে পারে।

প্রথমেই বলা যেতে পারে বিজ্ঞাপনের আধিক্যের কথা। আজকাল সংবাদপত্রগুলো পড়তে গেলে মনে হয় এ-সংবাদপত্র নয়, যেন বিজ্ঞাপনপত্র পড়ছি। কারণ মাঝে মাঝে সংবাদই গৌণ হয়ে পড়ছে, বিজ্ঞাপনকে খাতির করতে গিয়ে সংবাদ তার বেশভূষা পাল্টাচ্ছে। আমরা একাডেমিশিয়ানরা বইপত্র থেকে প্রথম পৃষ্ঠার জন্য দু-ধরনের বিজ্ঞাপনকে চিনতাম। এক হলো সোলাস, আরেকটি হলো সেমি সোলাস। সোলাস হলো প্রথম পৃষ্ঠার সেই বিজ্ঞাপনটি যেটি একেবারে নিচে ডান কোণায় সাধারণত ৩ কলাম ও ৮ ইঞ্চি আকারে ছাপা হয়ে থাকে। আর একেবারে নিচে বাম কোণায় আরেকটি বিজ্ঞাপন ছাপা হলে তখন উভয় বিজ্ঞাপনকেই সেমি-সোলাস বলা হবে। কিন্তু আজকাল বিজ্ঞাপন এতো বিচিত্র আকার দেখা যাচ্ছে এবং এমন সব স্থানে ছাপা হচ্ছে যে আমরা খুব বিপদে পড়ে যাই। সোলাস আর সেমি-সোলাসের তত্ত্ব অচল হয়ে যাচ্ছে। আবার এমন কিছু বিজ্ঞাপন দেখা যায় যেগুলো একেকটা সংবাদকে কিনে নিচ্ছে। বিশেষত খেলার খবরগুলো সহজেই অন্যের কাছে বিক্রি হয়ে যায়। সেই সংবাদগুলোর মেক-আপ দেখলে এটা বুঝতে কোনো বেগই পেতে হবে না। সংবাদটির ছবি, ছবির ক্যাপশন, শিরোনাম যেমন সংবাদটির অংশ, বিজ্ঞাপনটি তেমনই ঐ খবরের অংশ। এভাবে শুধু একটি সংবাদ নয়, প্রায় পুরো পত্রিকাই বিক্রি হয়ে আছে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে। সাম্প্রতিক সময়ে টেলিভিশন-সংবাদের 'কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং' আরও খোলামেলাভাবে প্রকাশ হয়ে পড়েছে। সংবাদের শিরোনাম, সংবাদের বিজ্ঞাপন-বিরতি, খেলার সংবাদ, বাণিজ্য-সংবাদ ইত্যাদি নানা স্লট একেকটি কোম্পানির সৌজন্যে প্রচারিত হয়। এভাবে দেখা যাবে, সংবাদের কোনো অংশই আর টেলিভিশনের নিজের নয়, অন্যের সৌজন্যে সেসব প্রচারিত হচ্ছে।

বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো যেমন বিজ্ঞাপন প্রদানের মাধ্যমে পত্রিকার ব্যবসায় সহায়তা করে, তেমনি পত্রিকাও তাদের একেবারে সংবাদমূল্যহীন কর্মকাণ্ডকে পত্রিকায় ছেপে দায়বদ্ধতা পূরণের কাজটি করে থাকে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক। জন প্লেয়ারের সমুদ্রসফরের কী মূল্য আছে আমাদের দেশে? একটি লালরঙা ইয়ট দুবাই থেকে মালে-তে এসে পৌঁছলে বাংলাদেশের জনগণের কী এসে যায়? কিন্তু এরকম একটি খবর অবলীলায় শেষ পৃষ্ঠায় রঙীন ছবিসহ স্থান করে নেয়। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে দায়বদ্ধতার কারণেই লাক্স সুন্দরী প্রতিযোগিতা, ফেয়ার এন্ড লাভলি ডায়মন্ড লটারি, বেনসন এন্ড হেজেস স্টার সার্চ, নেসক্যাফে সঙ্গীত সন্ধ্যা, পেপসি কনসার্ট ইত্যাকার বিষয়গুলো যেকোনো পৃষ্ঠায় সবচেয়ে বড়ো সংবাদ আকারে ছাপা হয়ে থাকে। গণমাধ্যমের এজেন্ডা-সেটিং বলে যে-কাজটি রয়েছে তার দৌলতে তারা পণ্যের সংবাদ, কোম্পানির সংবাদ, পণ্যসংশিষ্টতার সংবাদ সর্বোপরি বাজার সংস্কৃতিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে ঠিক করে দিচ্ছে। এপ্রসঙ্গে উদাহরণ দেয়া যায় -- দেখা যায় পণ্য-পরিচিতি নামের এক ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রিকায়। বাজারে নতুন পণ্য আসলে পত্রিকার কী দায়িত্ব তাকে 'পণ্য-পরিচিতি' লেবেল লাগিয়ে পরিচিত করানোর? এখানেই বোঝা যায় গোপনে গোপনে একটা লেনদেন সবসময়ই চলে। জন প্লেয়ারের সংবাদ ছাপো, তাহলে বিজ্ঞাপনও আসবে। খুব সহজ হিসাব। পণ্য-পরিচিতি দাও, তাহলে পণ্যটির বিজ্ঞাপনও পাবে। তার চাইতেও বড়ো কথা পাঠককে বাজার-সংস্কৃতির সঙ্গে নিয়ত সংশিষ্ট করে রাখা। এতে দু-পক্ষেরই লাভ হয়Ñ-- সংবাদপত্রের ও বাজারের।

বিনোদন সংবাদপত্রগুলোর খুবই প্রিয় একটি বিষয়। ভালো কথা, পাঠকরা বিনোদিত হতে ভালবাসে। কিন্তু বিনোদনের হাত ধরে প্রায়ই যৌনতা চলে আসে। বিশেষত পত্রিকা সুযোগ পেলেই মেয়েদের খোলামেলা ছবি ছেপে দেয়। সেলিম রেজা নিউটন বাংলাদেশের মুক্তবাজার-সংবাদপত্রের আলোচনায় দেখিয়েছেন এখানে কীভাবে প্রতিদিন পৃষ্ঠাসজ্জার নামে নারীর ফটো ছাপা হয়। (দেখুন নিউটন, ১৯৯৯: ১৭) পৃষ্ঠাসজ্জার জন্য ছবি প্রয়োজন হয় এবং এসব ক্ষেত্রে মেয়েদের ছবিই সংবাদপত্রে বেশি ছাপা হয়। ফ্যাশন শো, পুষ্প প্রদর্শনীর ছবি, পরীক্ষা শুরুর ছবিতে মেয়েরাই অবধারিতভাবে চলে আসে। সুন্দরী মেয়েদের ছবি ছাপতে পারলে ভালো, তাই মিস ভেনেজুয়েলার ছবি অনায়াসে বাংলাদেশের পত্রিকায় ছাপা হয়। টিভি-গাইডের পাতায় নায়িকাদের অথবা তাদের গা-খোলা ছবি থাকবেই। স্পোর্টসের ক্ষেত্রে সংবাদমূল্যের বাছবিচার না-করেই বিচ ভলিবল বা সিংক্রোনাইজিং সুইমিং খুবই গুরুত্ব পায়। কারণ এখানে মেয়েদের অনাবৃত শরীরের ছবি ছাপা সম্ভব হয়। অথচ এ-দুটি খেলার কোনোটিই বাংলাদেশে কোনোকালেই কেউ খেলে নি। টেনিসের ক্ষেত্রে উইলিয়ামস ভগ্নীদ্বয়ের চাইতে কুর্নিকোভা বেশি গুরুত্ব পেত, কারণ কুর্নিকোভার সাফল্য উইলিয়ামসদের ধারেকাছে না হলেও, তার বড়ো গুণ হলো সে সুন্দরী এবং সে টেনিস-কোর্টের বাইরে সাঁতার-পোশাকে ছবির জন্য পোজ দিতে অনাগ্রহী নয়।

বাংলাদেশের গণমাধ্যমের আরেকটি প্রবণতা হলো, তারা বিতর্ক জীইয়ে রাখতে খুবই পছন্দ করে। এর মাধ্যমে পাঠককে আরো সংবাদপত্র-সংশিষ্ট রাখা যায়। এর অর্থ আরও পত্রিকা বিক্রি, আরও পত্রিকা বিক্রি অর্থ আরও বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তি, আরও বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তি অর্থ আরও ব্যবসা ও মতা। গ্যাস রফতানি প্রশ্নে আমরা দেখেছি পত্রিকাগুলো বিষয়টিকে 'বিতর্কিত' ট্রিটমেন্ট দিতেই পছন্দ করেছে বেশি। অথচ জাতীয় স্বার্থে গ্যাসরফতানি কোনোভাবেই কল্যাণকর হতে পারে না। কিন্তু পাছে সরকারসমর্থক পাঠকগোষ্ঠীকে হারাতে হয়, এই ভয়ে পত্রিকা এই বিষয়টিতে নিজস্ব কোনও অবস্থান গ্রহণ করতে পারে নি। অভিমত পাতার কলামগুলোতে এবং সাক্ষাৎকারে গ্যাস রফতানির বিপরে মতামত যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি পরে মতামতও উপেক্ষিত হয়নি। এর নাম কি নিরপেক্ষতা? তত্ত্বীয়ভাবে এই-ই হয়তো নিরপেক্ষতা, এমনকি বস্তুনিষ্ঠতাও। নিরপেক্ষতার সংজ্ঞায় আমরা এখানে যদি পরাস্ত হই, তবে 'নিরপেতা' পদার্থটিকে নিয়েই প্রশ্ন ওঠাতে হবে। আবার হাসান আজিজুল হকের উদ্ধৃতি নিচ্ছি:

"একমাত্র খবরের কাগজই পারে মানুষের ব্যাপারে পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ হাজির করতে আর পারে মানুষের পৃথিবীটাকে একটা একতলিক নিরক্ত নীরস বিজবিজে অরের জগতে রূপান্তরিত করতে। আমরা কাগজের চেয়ে শুকনো কোন জিনিস দেখি না, কল্পনাও করতে পারি না। পাথরের দিকে চেয়ে মনে হতেও পারে ভিতরে কোথাও রস আছে; কিন্তু কাগজ তৈরি হতে পারে চূড়ান্তভাবে পেশাই হবার পরেই, তার আগে নয়। যতোণ রস আছে, ততোণ তা কাগজ নয়। সমকালের পৃথিবী তার উপর চড়ানো যেন বইয়ের পাতার ভিতরে প্রজাপতির কংকাল। একেবারে পপাতীন। বর্ণহীন গন্ধহীন স্বাদহীন।
আজকের পৃথিবীর দিকে চেয়ে মনে হতে পারে সংবাদপত্রশিল্প বোধহয় এই খানেই পৌঁছুতে চায়। একটা পপাতহীন নিরপে জগতের বর্ণনাই তার শেষ লক্ষ্য। বাসি খবরের কাগজ থেকে সমস্ত কালি মোচন করে আবার তাকে নিরপে সাদা কাগজে নিয়ে আসা যেন মানব অনুভূতিশূন্য নিরপেতা পাবারই একটা প্রক্রিয়া।" (হক, ১৯৯৩: ২৬৯)

এরকম মানবানুভূতিশূন্য 'নিরপেক্ষতা'র দায় থেকে বাঁচার জন্যই এডভোকেসি-সাংবাদিকতার উদ্ভব হয়েছিল। গ্যাস রফতানি প্রসঙ্গে পত্রিকাগুলো এডভোকেসি-সাংবাদিকতা করতে পারতো। 'একতলিক নিরক্ত নীরস বিজবিজে অরের জগতে' পাঠককে টেনে নিয়ে যাওয়া সংবাদপত্রের সার্বণিক ল্য হওয়া উচিত নয়।

বিদেশী সংবাদগুলো পরিবেশনের ক্ষেত্রে, আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে সংবাদপত্র পরমুখাপেক্ষি বটেই, এখানেও তাদের ভূমিকা নিরীহ, নাচার। পৃথিবীব্যাপী সংবাদ পরিবেশনে এপি, এএফপি, রয়টার্স -- এই তিনটি সংবাদসংস্থাই মুখ্য ভূমিকা পালন করে থাকে। সংবাদসংস্থা তিনটি পশ্চিমা -- যথাক্রমে আমেরিকান, ফরাসি ও ব্রিটিশ। ফলে আন্তর্জাতিক সংবাদগুলোতে একপাকি পশ্চিমা দৃষ্টিভঙ্গি পরিবেশিত হয়। আমাদের সংবাদপত্রগুলো সেগুলো অনুবাদ করে দিয়েই দায়িত্ব শেষ হয়েছে বলে মনে করে। তাই আন্তর্জাতিক ইস্যুগুলোতে অর্থনৈতিকভাবে উন্নত, পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী দেশের সরকার ও গণমাধ্যমের যে-মতামত পাওয়া যায়, আমাদের গণমাধ্যমেও সেই একই সুর শোনা যায়। টুইন টাওয়ারে হামলার পরে, আফগানিস্তানে যুদ্ধ শুরু হবার পরে ফক্স নিউজ চ্যানেল সংবাদের লেবেল ব্যবহার করেছে 'আমেরিকা আন্ডার এটাক', 'আমেরিকা এট ওয়্যার'। আর আমাদের দেশের সংবাদপত্রেও দেখা গেছে সংবাদে ও অভিমত-কলামে 'আক্রান্ত আমেরিকা' লেবেল ব্যবহার করতে। পরে দেখা গেছে আফগানিস্তানে আমেরিকার যুদ্ধ কতটা নির্মম ও নিষ্ঠুর হয়েছে। পত্রিকাগুলো পরের দিকে নিজেরাও বুঝতে পেরেছে আফগানিস্তানে যুদ্ধের এবং এমনকি টুইন টাওয়ারে হামলার কারণও হয়তো অন্য কিছু। আন্তর্জাতিক সংবাদ-সংস্থার ওপরে অত্যাধিক নির্ভরশীলতার কারণে আমাদের সংবাদপত্রগুলোকে এমন দেখায় যেন তারা পশ্চিমা ও সাম্রাজ্যবাদী মতাদর্শের পে কাজ করছে। তৃতীয় বিশ্বের ও অপশ্চিমা একটি দেশ হিসেবে তৃতীয় বিশ্বের অন্য একটি দেশের সঙ্গেও আমাদের সাধারণ কিছু স্বার্থগত অবস্থানগত মিল রয়েছে। তাই তৃতীয় বিশ্বের কোনো মুসলিম বা অমুসলিম দেশের ওপরে সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন হলে আমাদের মিডিয়ার ভূমিকা কেমন হওয়া উচিত, তা স্পষ্ট বলে দেবার অপো রাখে না। কিন্তু আমাদের মিডিয়ার সংবাদ পরিবেশনের ধরন দেখে মনে হয়, তারা সাম্রাজ্যবাদের পক্ষেই সংবাদ পরিবেশন করছে। বিদেশী সংবাদসংস্থার ওপরে অতি নির্ভরশীলতার কারণেই এটা হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে তারা ইন্টারনেট থেকে একই ইস্যুতে বিকল্প মতামত অনুসন্ধান করতে পারতো। কিংবা পপাতযুক্ত বাক্যগুলোতে নিজেদের বুদ্ধিমত্তা কাটিয়ে পরিমার্জন করতে পারতো। অবশ্য সাম্রাজ্যবাদকে তুষ্ট করাই যদি তাদের পলিসি হয়ে থাকে তবে তা ভিন্ন প্রসঙ্গ।

গণমাধ্যম আমাদের সবকিছু শেখানোর গুরু দায়িত্ব নিয়ে ফেলেছে। মানুষের ভাবনাটাও যেন তারা ভেবে দেবে। কীভাবে হরেক পদের রান্না করতে হয়, পরীক্ষার জন্য কোন পড়াটা পড়তে হবে, সামনের শীতে কোন শালটা পরতে হবে, ব্যস্ততার মধ্যেও কীভাবে রূপচর্চার কাজটি চালিয়ে যেতে হবে, কীভাবে ঘর সাজাতে হবে -- এসবই বুঝি গণমাধ্যমের 'টু এডুকেট' ফাংশনের অন্তর্গত! মানুষ নিজের মতো কোনো কিছু না ভেবে, গণ্যমাধ্যমের এডুকেশন অনুসরণ করে পাঠক ভাববে, শিখবে, করবে। মানুষের মননের প্রতি, সৃজনশীলতার প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা না-দেখিয়ে তার মনোজগতে উপনিবেশ স্থাপন করেছে গণমাধ্যম। তাই আধুনিক মানুষের মননশীলতা নষ্ট হয়ে গেছে। তারা বাজারি সিনেমা দেখে, বাজারি গান শোনে, বাজারি বই পড়ে, বাজারি কোক খায়। ব্যাপকভাবে গণমাধ্যম অনুসরণ না করলে তাদের এহেন লয় ঘটতো না।

সাংবাদিকতা-শিক্ষা প্রসঙ্গেও বলতে হয়। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাংবাদিকতার গ্র্যাজুয়েটরা ব্যাপকহারেই মিডিয়া-হাউসগুলোতে যোগদান করছে। কিন্তু সাংবাদিকতা-ডিসকোর্সটিও পশ্চিমাদের প্রবর্তিত। বলাবাহুল্য আমাদের দেশেও কাসরুমগুলোতে তাদের লেখা বইগুলো অনুসরণ করা হয়ে থাকে। এতে যা দাঁড়ায় তা হলো, পশ্চিমারা সাংবাদিকতাকে যেভাবে দেখে ও বোঝে, আমরাও ছাত্রদের সেভাবেই শেখাচ্ছি। বিপর্যয়টা কীভাবে হয়, একটা উদাহরণ দিলে পরিস্কার হবে। সংবাদ-উপাদানকে, কোনটা সংবাদ ও কোনটা সংবাদ নয় -- তা বোঝাতে কাসরুমে খুব গুরুত্ব দেয়া হয়। একটা সংবাদ-উপাদান হলো টাকা, অর্থ। অর্থাৎ টাকাপয়সার কারবার থাকলে সংবাদ হবার সম্ভাবনা আছে। কেউ অনেক টাকা ডাকাতি করলে, কোনো কোম্পানি অনেক টাকার মুনাফা অর্জন করলে, কোরবানীর সময় লাখ টাকায় গরু কিনলে, নির্বাচনের আগে অনেক টাকা খরচ করলে সংবাদ হবে। অর্থাৎ বড়োলোকরা সহজেই সংবাদ-শিরোনাম হতে পারে। তাহলে যাদের টাকা নেই, যারা দরিদ্র, যারা ছা-পোষা মধ্যবিত্ত তাদের নিয়ে সংবাদ হবে না? একটি জাতীয় দৈনিক সংবাদ পরিবেশন করবে কেবল দশ-পনের ভাগ মানুষের জন্য। গ্রামের সংগ্রামী, বঞ্চিত মানুষগুলোর সংবাদ হবার যোগ্যতা নেই। আরেকটি সংবাদ-উপদান হলো যৌনতা। যৌনতা মানুষের মৌল প্রবৃত্তি। তাই এটি সংবাদ-উপাদান। পশ্চিমে এটি যেভাবে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের দেশের জন্যও এই উপাদানটি সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ! তাইতো পত্রিকাগুলোতে প্রায়ই যৌনতার ও যৌনতাবিষয়ক সংবাদের প্রাবল্য দেখা যায়। ধর্ষণ, অবৈধ প্রেম, গসিপ খুবই গুরুত্ব পেয়ে যায় পত্রিকায়। অপরাধও একটি অন্যতম সংবাদ-উপাদান। অপরাধ বিষয়ক সংবাদ সংবাদপত্রে সবচেয়ে গুরুত্ব পেয়ে থাকে। রাজনৈতিক অর্থনৈতিক অপরাধ, খুন-খারাবি, সংঘর্ষ সংবাদপত্রের নিত্যকার সংবাদ-উৎস। অপরাধকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে কোনো কোনো দিন পত্রিকায় অপরাধ-সংবাদ ছাড়া আর কিছু পাওয়া যায় না। সমাজের অন্যান্য অগ্রগতির খবর সংবাদপত্রে যেন আসতেই চায়না -- ব্যাড নিউজ ইজ এ গুড নিউজ। আর বলা হয় নাম ও খ্যাতি থাকলে সংবাদ হবে। নামকে গুরুত্ব দিতে গিয়ে দেখা যায় রাজনৈতিক নেতৃত্ব বা সরকারী পদ গুরুত্বহীন সংবাদকে গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আবার নায়িকার মোবাইল ফোন হারালেও সেটা সংবাদ, সাধারণ মানুষের সর্বস্ব লুট হয়ে গেলে সেটা সংবাদ হবে না। এভাবেই আমরা ক্লাসরুমগুলোতে পশ্চিমা কায়দায় সাংবাদিকতা শেখাচ্ছি।
(চলবে)
সর্বশেষ এডিট : ৩০ শে নভেম্বর, ২০০৭ রাত ১০:০৩
৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

লিখেছেন মুনতাসির, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:০৮




আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

লিখেছেন মোস্তফা কামাল পলাশ, ০৯ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১:৪৭



“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমাদের গ্রামের গল্প!

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৯ ই জুন, ২০২৬ সন্ধ্যা ৬:১৩



আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই

লিখেছেন রানার ব্লগ, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৮:৫৫

আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।

তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন

১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ১০ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১০:২৪

আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

×