বিকল্প ভাবনার প্রস্তাবনা
আজকের বাংলাদেশের সাংবাদিকতায় যেখানে পুঁজি আছর করেছে, যেখানে বড়ো গ্রুপ অব কোম্পানিজ একেকটি পত্রিকা বা টিভি চ্যানেলের মালিক, সেখানে মিডিয়ার কাছ থেকে প্রো-পিপল অবস্থান আশা করাই হয়তো বাড়াবাড়ি। স্বৈরাচারের সময়ে সংবাদপত্রের ওপরে সরকারী চাপ ছিল। কিন্তু ১৯৯০ সালের পর স্বৈরাচরমুক্ত পরিবেশে এক সরকারী সিদ্ধান্তের পরে সংবাদপত্রের ওপরে সরকারী চাপ নেই বললেই চলে। তবে বর্তমান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময়কার জরুরি অবস্থার মধ্যে সংবাদপত্র আগের মতো আর স্বাধীনতা ভোগ করছে না। এছাড়া স্থানীয় পর্যায়ে সাংবাদিকদের ওপরে নির্যাতন হচ্ছে। কিন্তু এসবকে ছাপিয়ে পুঁজির কাছে সমর্পিত হওয়াটাই এখনকার সংবাদপত্রের, জনগণের কথা বলতে না-পারার পেছনে, প্রধান প্রতিবন্ধকতা। বাজারসংস্কৃতির পৃষ্ঠপোষকতা করা এবং পাঠককে এই সংস্কৃতিতে শিক্ষিত করে তোলাই আজকের মূলধারার সংবাদপত্রের মূল লক্ষ্য। এজন্যই সংবাদপত্রে সংবাদের চেয়ে বিজ্ঞাপনের দাপট বেশি। বিজ্ঞাপনের দাবি মোতাবেক সংবাদ তাকে যেকোনো জায়গা ছেড়ে দিতে বাধ্য। 'পণ্য উদ্ভূত হয়েই মালিককে খোঁজ করে। উদ্দেশ্য মালিকটিকে সে বলবে, তোমার জিভটি আমাকে ধার দাও, আমি আমার দামের কথা বলি'। (Karl Marx, কলিম খান উদ্ধৃত, ১৪০৬ বাংলা: ১১)। তেমনি আজকের যুগে বিজ্ঞাপন বলে, 'তোমার স্পেসটা ধার দাও, আমি আমার গুণের কথা বলি; বিনিময়ে আমি তোমাকে পয়সা দেব'। পুঁজির প্রতাপের যুগে এটাই হবার কথা। আমি জানি, যদি পত্রিকাওয়ালাদের সত্যি সত্যি পাঠকের কাঠগড়ায় জবাবদিহিতার জন্য দাঁড় করানো হয়, তবে তারা বলবেন, আমাদের তো টিঁকে থাকতে হবে; আমরা তো ব্যবসা করতেই এসেছি, দেশোদ্ধার করতে আসিনি। কিন্তু পত্রিকাওয়ালারা এই কথাটা প্রকাশ্যে কখনোই বলেন না। তাদের সম্পর্কে 'জাতির বিবেক', 'চতুর্থ স্তম্ভ', 'সমাজের দর্পণ' ইত্যাদি যে-ইমেজ চালু আছে সেটাকে তারা ব্যবহার করতেই চান, এবং সেটাকে ব্যবহার করে ব্যবসা করতে চান। নতুন ধারার সাংবাদিকতার অনুসন্ধান করতে গিয়ে আমাদের প্রথম কাজটি হবে এই মিথগুলোকে একে একে ভেঙ্গে ফেলা। সংবাদপত্রগুলো যেন 'জাতির বিবেক' অভিধা থেকে নিজেদের প্রত্যাহার করে নেয়। কারণ মানুষ এখনও সংবাদপত্রের ছাপা হরফকে বিশ্বাস করে, এবং করে প্রতারিত হয়। এরপরের কাজটি হবে বিদ্যমান ধারার সংবাদপত্রে নতুন ধারার সাংবাদিকতার উপাদানসমূহকে বাড়িয়ে তোলা। গণমাধ্যম বিষয়ক প্রতিষ্ঠানসমূহ, সাংবাদিকতা-বিভাগসমূহ, গণমাধ্যম-বিশেষজ্ঞদের, গবেষকদের, সচেতন সমাজের কাজ হবে সংবাদপত্রগুলোর ওপরে এবিষয়ে নিরন্তর চাপ প্রয়োগ করা।
তবে এই পরিস্থিতির মধ্যে থেকেই জন-সাংবাদিকতার নিদর্শন স্থাপন করা যায় কিনা, সেদিকেও আলোকপাত করার প্রয়োজন আছে। আর এই পর্যায়ে ভাবনাগুলোকে এখানে প্রস্তাব আকারে উপস্থাপন করা হচ্ছে। অবশ্য বিদ্যমান সাংবাদিকতাকে নিয়ে যে-প্রশ্নগুলো এই প্রবন্ধে উস্থাপন করা হয়েছে, সেই প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজাকে কেন্দ্র করেই জন-সাংবাদিকতার ভাবনাগুলো চলে আসতে পারে।
নতুন ধারার সাংবাদিকতা বলে ষাটের দশকে আমেরিকায় এক ধরনের সাংবাদিকতা দেখা গিয়েছিল। সেখানে সংবাদের ফর্মটাকে তারা খুব গুরুত্ব দিতেন। প্রচলিত ‘ষড় ক’ ধারায় সংবাদ না লিখে তারা হয়তো গল্পের মতো করে বা অন্য কোনো কায়দায় সংবাদকাহিনী লিখতেন। তবে আমাদের দেশের নতুন ধারার সাংবাদিকতায় আমরা কেবল ফর্ম নয়, বিষয়বস্তুতেই অধিক গুরুত্ব দিতে পারি। তাতে দেখা যাবে যে, পুঁজির প্রতাপের অধীনে থেকেও সেই ধারার সাংবাদিকতা বিদ্যমান গণমাধ্যমে ইতোমধ্যেই কিছুমাত্রায় আছে। যেমন পরিবেশ সাংবাদিকতাকে আমরা নতুন ধারার সাংবাদিকতা বলতে পারি। পরিবেশের যথেষ্ঠ তি করে, তারপরে মানুষের মধ্যে পরিবেশচেতনা কিছুটা এসেছে। সাংবাদিকরাও আজকাল পরিবেশ বিষয়ক সংবাদ পরিবেশন করছে। কিন্তু তা প্রয়োজনের তুলনায় যৎসামান্য। এই তৎপরতা বাড়িয়ে তোলাটা প্রয়োজন। আ-আল মামুন ১৯৯৭ সালের প্রথম তিন মাসে প্রকাশিত ইত্তেফাক, ইনকিলাব, অবজারভার ও ডেইলি স্টার পত্রিকার পরিবেশ বিষয়ক সংবাদের প্রকৃতি অনুসন্ধান করে দেখিয়েছিলেন যে সেখানে মোট সংবাদ এলাকার মাত্র ০.৩৮%, ০.৪৯%, ০.১৩% ও ০.৩৮% পরিবেশ বিষয়ক সংবাদের জন্য যথাক্রমে বরাদ্দ ছিল। (দেখুন মামুন, ১৯৯৭: ১৩)
এছাড়া বলা যায় এডভোকেসি সাংবাদিকতার কথা। বস্তুনিষ্ঠতা ও নিরপেতার রণশীলতায় আবদ্ধ না-থেকে কোনো একটি জনস্বার্থ-সংশিষ্ট বিষয়ের পে কাজ করে যাওয়াকে এডভোকেসি সাংবাদিকতা বলা যেতে পারে। আমাদের পত্রিকাগুলোও কোনো কোনো ইস্যুতে এডভোকেসি করে থাকে। যেমন কোনো কোনো পত্রিকা নারী-অধিকারের বিষয়ে এডভোকেসি করে থাকেন। উদ্যানের গাছ রার ব্যাপারেও তারা এডভোকেসি করেছেন। কিন্তু অনেক বিষয়েই তারা এডভোকেসি করেন না। গ্যাস রফতানি ইস্যুতে তারা এডভোকেসি করতে পারতেন। শহুরে শিতি এলিট শ্রেণীর পে তারা যতোটা এডভোকেসি করেন, প্রত্যন্ত গণমানুষের সমস্যা নিয়ে তারা তেমন এডভোকেসি করেন না। এসব ক্ষেত্রে একটা যুক্তি প্রায়ই দেখানো হয় যে, গ্রামীণ নিরর মানুষেরা তো আর সংবাদপত্র পড়ে না, স্বভাবতই যারা সংবাদপত্র পড়েন (কেনেন), তাদের খবরই পত্রিকায় বেশি আসে। যুক্তি হিসেবে এটা অকাট্য, তবে এতে পত্রিকার ব্যবসায়ী মনোভাবই নির্লজ্জভাবে প্রকাশিত হয়।
প্রসঙ্গক্রমে উন্নয়ন সাংবাদিকতার কথাও বলতে হয়। ১৯৬৭ সালে ফিলিপাইনে এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনে উন্নয়ন সাংবাদিকতা প্রত্যয়টি প্রথম ব্যবহৃত হয় এবং এর পর থেকে প্রেস ফাউন্ডেশন অব এশিয়া উন্নয়ন সাংবাদিকতা ধারণাটি প্রচার করে। মূলত দরিদ্র দেশের জন্যই এধারার সাংবাদিকতাটি প্রযোজ্য। জনগণ ও রাষ্ট্রের জন্য উন্নয়নমূলক বিষয়ের সংবাদ প্রচার করার কথা এখানে বলা হয়ে থাকে। এধারায় বিদ্যমান সাংবাদিকতাকে আরও সচেষ্ট হতে হবে। হাজারো নেতির সংবাদ প্রচারের বিপরীতে উন্নয়ন-সংবাদ সংবাদপত্রের পাঠককে হাসান আজিজুল হকের উদ্যমহীন পাঠককে উদ্যমী করে তুলতেও পারে।
বিজ্ঞাপনের হাত থেকে প্রথম পৃষ্ঠাকে রক্ষঅ করাও বিকল্প ভাবনার সাংবাদিকতার একটা চ্যালেঞ্জ হতে পারে। পাশের দেশের বহুল প্রচারিত পত্রিকা টাইমস্ অব ইন্ডিয়ায় দেখা যায়, তারা অনেক বিজ্ঞাপন ছাপছে, কিন্তু প্রথম পৃষ্ঠায় এক সোলাস ছাড়া আর কিছু ছাপে না। অথচ ভেতরের পৃষ্ঠাগুলোর বেশ কয়েকটা বরাদ্দ থাকে কেবল বিজ্ঞাপনের জন্য। আমাদের পত্রিকাগুলোরও এই কায়দাতে বিজ্ঞাপন ছাপানো উচিত। যার বিজ্ঞাপন পড়ার প্রয়োজন, সে বিজ্ঞাপন পড়বে; আর যার সংবাদ পড়ার প্রয়োজন, সে সংবাদ পড়বে। তা হলে পাঠককে সংবাদপত্র কিনে বিজ্ঞাপনের ভাঁজে ভাঁজে সংবাদ অনুসন্ধানের কষ্ট আর পেতে হতো না।
উপসংহার: বাজারের কথা মাথায় রাখতেই হবে
বিদ্যমান বাজার পরিস্থিতিতে নতুন ধারার সাংবাদিকতার বিকাশ কতুটুকু সম্ভব সে বিষয়ে লেখকের সংশয় একেবারেই যাচ্ছে না। কারণ বর্তমান পরিস্থিতিতে বাজারই গণমাধ্যমের প্রকৃতি নির্ধারণ করে দিচ্ছে। নব্বুইয়ের পরে বাংলাদেশের গণমাধ্যমের আকার, আয়তন, অঙ্গসৌষ্ঠবে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। আধেয়তে কিছু পরিবর্তন আসলেও, বাজারের সঙ্গে গণমাধ্যমের নতুন এক গলাগলি-মাখা মধুর সম্পর্ক সৃষ্টি হয়েছে। অবশ্য গণমাধ্যমের বাজার চিরকালই ছিল। টাকা দিয়ে পত্রিকা যখন কিনতে হয়, বাজারের একটা ব্যাপার তখন তো থাকেই। কিন্তু সনাতন এই বাজারের পাশে যোগ দিয়েছে মুক্তবাজার। এবং এখানেই জন-সাংবাদিকতা বিকাশের সবচেয়ে বড়ো চ্যালেঞ্জ। ষাটের দশকে আমেরিকায় যখন নতুন সাংবাদিকতার উদ্ভব হয়, তখন সারা আমেরিকাতেই একটি ক্রান্তিকাল চলছিল। পুঁজিবাদের আজকের ভয়াবহ রূপ তখন ছিল না। ক্যাম্পাসগুলোতে আন্দোলন-বিক্ষোভের পাশাপাশি একটা সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিবর্তনে জনগণ আগ্রহী হয়ে উঠেছিল। পুরো সমাজের ক্রান্তিকালে সেই নতুন সাংবাদিকতার বিকাশ সম্ভবপর হয়েছিল। কিন্তু খোদ আমেরিকাতেই এখন পুঁজিবাদের ধরন পরিবর্তিত হয়ে গেছে। বাংলাদেশে বিশ্বায়নের দৌলতে পুঁজির দাপট বেড়েছে। পুঁজির বাজারই এখন গণমাধ্যমের দায়িত্বপালনে প্রধান অন্তরায়। পূর্বে সরকার গণমাধ্যমকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইতো। সেই নিয়ন্ত্রিত পরিস্থিতিতেই গণমাধ্যম তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট ছিল। কিন্তু বর্তমানে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীন পরিবেশে গণমাধ্যম তার দায়িত্ব পালন করতে পারছে না। কারণ এখানে অন্তরায় হয়ে আছে বাজার। কিন্তু গণমাধ্যমকে নিয়ে যারা ভাবি, এই বিরাট চ্যালেঞ্জকে মাথায় রেখেই নতুন ধারার সাংবাদিকতা বিকাশের জন্য কাজ করে যেতে হবে। আর বিদ্যমান গণমাধ্যমকে এইসব বাজারমুখিনতার ডামাডোলের মধ্যেও কীভাবে অধিক মাত্রায় জনসংশ্লিষ্ট করা যায় সেবিষয়েও নিরন্তর প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
তথ্যসূত্র
হক, হাসান আজিজুল (১৯৯৩), সংবাদশিল্প, গণমাধ্যম ৯৩, মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর সম্পাদিত, সেন্টার ফর ডেভেলেপমেন্ট কম্যুনিকেশন, ঢাকা।
নিউটন, সেলিম রেজা (১৯৯৯), বাংলাদেশে মুক্তবাজার-সংবাদপত্র: পৃষ্ঠাসজ্জার নামে প্রতিদিন নারীর ফটো, মিথস্ক্রিয়া, গণযোগাযোগ বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী।
খান, কলিম (১৪০৬ বাংলা), দিশা থেকে বিদিশায়: নতুন সহস্রাব্দের প্রবেশ বার্তা, হাওয়া ঊনপঞ্চাশ প্রকাশনী, কলকাতা।
মামুন, আব্দুলাহ আল (১৯৯৭), পরিবেশ, যোগাযোগ এবং কয়েকটি সংবাদপত্রে পরিবেশ সংবাদ পরিবেশনের মাত্রা ও প্রবণতা, যোগাযোগ, ফাহমিদুল হক সম্পাদিত, ১ম বর্ষ ১ম সংখ্যা, ঢাকা।
Chomsky, Noam (1996), Media and Globalization: An Interview with Noam Chomsky, http//:corpwatch.org.
Webster, Farnk (2002), Theories of Information Society, Routledge, London and New York.
McChesney, Robert W. (2001), The Political Econmoy of Global Communication, Capitalism in an Information Age, Robert W. McChesney et al ed., Cornerstone Publications, India and Monthly Review Press, New York.
Rahim, Syed A (1997), Communicative Empowerment in Cyberspace, The Journal of Development Communication, No. 2 Vol 8, Kuala Lumpur.
Dawson, Michael and Foster, John Bellany (2001), Virtual Capitalism: Monopoly Capital, Marketing and the Information Highway, Capitalism in an Information Age, Robert W. McChesney et al ed., Cornerstone Publications, India and Monthly Review Press, New York.
(পরবর্তী পোস্টসমূহে এই নিবন্ধকে ঘিরে প্রতিক্রিয়া উপস্থাপিত হবে)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা ডিসেম্বর, ২০০৭ রাত ১১:৩৪

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


