তাই বলে কেউ স্বপ্ন দেখবে না
ফাহমিদুল হক
যোগাযোগ-অধ্যয়ন-চক্র আয়োজিত সেমিনার সম্পর্কে গত ২০ নভেম্বর, ২০০২-এ, প্রথম আলো-তে প্রকাশিত মশিউল আলম-এর কলামটি পড়ে একই বিষয়ে আবার কলম ধরতে হলো। কেননা 'বাংলাদেশের সংবাদপত্রের বাজারমুখিনতা ও ভিন্ন ভাবনার প্রস্তাবনা' শীর্ষক আমার প্রবন্ধের মূল বক্তব্যকে সাংবাদিক-কথাসাহিত্যিক মশিউল আলম খণ্ডিত ও আংশিকভাবে উপস্থাপন করেছেন। এক্ষেত্রে আমার মূল বক্তব্যকে (সংক্ষেপে) উপস্থাপন না করলে পাঠকের মনে ভুল ও খণ্ডিত ধারণার জন্ম নেবে। ১৮ নভেম্বরের সেমিনারে মশিউল আলম এক অর্থে প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছিলেন (তার ভাষায় 'কাঠগড়ায়' দাঁড়িয়েছিলেন)। অনুমান করি, সেদিন তিনি তার বক্তব্যকে খুব গুছিয়ে বলতে পারেন নি বলে নিজ পত্রিকায় না-বলা কথাগুলো বলার প্রয়াস পেয়েছেন। আর বলে নেয়া ভালো আমার এই প্রতিক্রিয়ায় সেদিনের মূল প্রবন্ধের কিছু পুনরুক্তি হবে, বৃহত্তর পাঠকগোষ্ঠীর হাতে লেখাটি এখনও পৌঁছে নি বলে, এক্ষেত্রে সহজেই মাফ পেয়ে যাবো আশা করি।
আমি বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাজারমুখিনতা অনুসন্ধানের পূর্বে বৈশ্বিক গণমাধ্যমসমূহের চরিত্র নিয়ে একটি বিশ্লেষণ করেছি এবং দেখানোর চেষ্টা করেছি যে বৈশ্বিক গণমাধ্যম ও বাংলাদেশের গণমাধ্যমের চরিত্রগত পার্থক্য নেই। এই সমিল মূলত রাজনৈতিক দর্শনে ও অর্থনৈতিক প্রণোদনায়। ব্যাপারটা খোলসা করে বলি। বর্তমানে পুঁজিবাদী বিশ্বব্যবস্থায় মুক্তবাজার অর্থনীতির খুব চল এবং পশ্চিমাদের উদ্যোগে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া দুনিয়াব্যাপী চলছে। প্রলোভন দেখিয়ে, ভুলিয়ে ভালিয়ে, চাপপ্রয়োগ করে বিশ্বের প্রায় সব দেশকে ডব্লিউটিও-তে তারা স্বার করিয়েছে। কিন্তু তৃতীয় বিশ্ব যে বিশ্বায়ন ও মুক্ত বাজার অর্থনীতি থেকে কোনো লাভ পাচ্ছে না, একথা আজ প্রমাণিত। উল্টো বিদেশী পণ্যের অবাধ অনুপ্রবেশের কারণে প্রান্তিক অর্থনীতির দেশের নিজস্ব পণ্যই মার খাচ্ছে। বর্তমানের বিশ্বায়নের যুগে পণ্য যখন নিজেকে বিক্রির উদ্দেশ্যে সারা বিশ্বে ছোটার জন্য উদগ্রীব হয়ে রয়েছে তখন তার হয়ে কাজটি সহজ করে দিচ্ছে গণমাধ্যম। তাই বলা যায়, বৈশ্বিক গণমাধ্যমসমূহ কর্পোরেট কোম্পানিকে সেবা প্রদান করছে, জনগণ বা মানবতার জন্য তার পে কাজ করা কিছুতেই সম্ভব হয়ে উঠছে না। এই পরিস্থিতিতে একেকটি মিডিয়া-কোম্পানি মেগা কর্পোরেশনে পরিণত হয়েছে। মতা বোঝাতে তাদের পোশাকী নাম হয়েছে 'মিডিয়া জায়ান্টস'। মিডিয়া-বিশেষজ্ঞ জর্জ গার্বনার বলেন, 'মিডিয়া জায়ান্টস হ্যাভ নাথিং টু টেল, বাট প্লেন্টি টু সেল।'
এবার আসা যাক আমাদের দেশের গণমাধ্যমের প্রসঙ্গে। এদেশের গণমাধ্যমগুলো বৈশ্বিক গণমাধ্যমসমূহ থেকে পৃথক কোনো সত্তা নয়। পশ্চিমা বিশ্বের সঙ্গে আমাদের সংস্কৃতিতে ধর্মে ভাষায় জীবনযাপনে এবং অন্য অনেক কিছুতেই পার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু গণমাধ্যমের প্রকৃতিতে পার্থক্য নেই বললেই চলেÑ-- পূর্বে কোনো এক সময়ে থাকলেও, বর্তমানে বাজারকে সহায়তা করার জন্য গণমাধ্যমের দায়বদ্ধতায় পার্থক্য নেই। এর কারণও খুব স্পষ্ট। বাংলাদেশ ডব্লিউটিও-তে স্বারকারী দেশ এবং এখানে বিশ্বায়ন প্রক্রিয়া ভালোভাবেই চলছে। বাংলাদেশে শিল্পের শক্ত অবকাঠামো নেই, বরং এখানে আদমজীর মতো প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাংকের পরামর্শে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। হয়তো কৃষির ওপর ভিত্তি করেই দেশটা কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে। এখানে বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলোর মূল কাজ হলো বাইরের জিনিস এনে এদেশে বিক্রি করা। বাণিজ্যই এদের মূল ভিত্তি। বিশ্বায়ন-প্রক্রিয়া দ্বারা এরা উৎসাহিত। এরাই আবার কোনো কোনো পত্রিকার মালিক। তাই খুব স্বাভাবিক কারণেই বৈশ্বিক গণমাধ্যমগুলোর মতোই এখানকার সংবাদপত্রের মূল কাজ হলো বাজারের সেবা প্রদান করা। জনগণ তাদের কাছে সেকেন্ড প্রায়োরিটি।
এই মূল উপলব্ধির ওপরে দাঁড়িয়ে আমি বাংলাদেশের গণমাধ্যমের বাজারমুখিনতার স্বরূপ আবিষ্কারের চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু মশিউল আলম দুর্ভাগ্যজনকভাবে কেবল অধিক বিজ্ঞাপন ছাপানো প্রসঙ্গে আমার অভিযোগগুলো নিয়ে বহু শব্দমালা সাজালেন। তিনি আইসবার্গের ওপরের অংশের কথাই কেবল বর্ণনা করলেন, পানির নিচের বেশিরভাগ আইসের কথা তিনি এড়িয়ে গেলেন। আইসবার্গের তুলনা এজন্য দিলাম যে, পাঠকরাও পত্রিকার পাতায় কেবল বিজ্ঞাপনের আধিক্যের ব্যাপারটাই লক্ষ করেন, ভেতরের দায়বদ্ধতাটা লক্ষ করেন না। করতে পারেন না। কারণ পাঠকরা এখনও সংবাদপত্রের ছাপাক্ষরকে খুব বিশ্বাস করেন, সামনে যা দেখা যাচ্ছে এর বেশি কিছু হতে পারে তা তারা মাথায়ই আনেন না। তারা কেবল সংবাদপত্র নিয়ে একটাই অভিযোগ করেন, এখানে বিজ্ঞাপন বেশি ছাপা হয়। এখন প্রশ্ন হলো এই দায়বদ্ধতা কী এবং ভেতরের ব্যাপারটাই বা কী? বড়ো বড়ো কোম্পানিগুলো যেমন বিজ্ঞাপন প্রদানের মাধ্যমে পত্রিকার ব্যবসায় সহায়তা করে, তেমনি পত্রিকাও তাদের একেবারে সংবাদমূল্যহীন কর্মকাণ্ডকে পত্রিকায় ছেপে দায়বদ্ধতা পূরণের কাজটি করে থাকে। বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে দায়বদ্ধতার কারণেই লাক্স সুন্দরী প্রতিযোগিতা, ফেয়ার এন্ড লাভলি ডায়মন্ড লটারি, বেনসন এন্ড হেজেস স্টার সার্চ, নেসক্যাফে সঙ্গীত সন্ধ্যা, পেপসি কনসার্ট ইত্যাকার বিষয়গুলো যেকোনো পৃষ্ঠায় সবচেয়ে বড়ো সংবাদ আকারে ছাপা হয়ে থাকে। গণমাধ্যমের এজেন্ডা-সেটিং বলে যে-কাজটি রয়েছে তার দৌলতে তারা পণ্যের সংবাদ, কোম্পানির সংবাদ, পণ্যসংশ্লিষ্টতার সংবাদ সর্বোপরি বাজার সংস্কৃতিকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এজেন্ডা হিসেবে ঠিক করে দিচ্ছে। গ্রাম, মফস্বল, জনগণ, নিম্নবিত্ত তাদের এজেন্ডা নয়। এপ্রসঙ্গে উদাহরণ দেয়া যায়থÑ দেখা যায় পণ্য-পরিচিতি নামের এক ধরনের সংবাদ প্রকাশিত হয় পত্রিকায়। বাজারে নতুন পণ্য আসলে পত্রিকার কী দায়িত্ব তাকে ‘পণ্য-পরিচিতি’ লেবেল লাগিয়ে পরিচিত করানোর? এখানেই বোঝা যায় গোপনে গোপনে একটা লেনদেন সবসময়ই চলে। খুব সহজ হিসাব। পণ্য-পরিচিতি দাও, তাহলে পণ্যটির বিজ্ঞাপনও পাবে। তার চাইতেও বড়ো কথা পাঠককে বাজার-সংস্কৃতির সঙ্গে নিয়ত সংশ্লিষ্ট করে রাখা। এতে দু-পরেই লাভ হয়Ñ সংবাদপত্রের ও বাজারের।
মশিউল আলম বলছেন, 'সংবাদপত্র প্রকাশের খরচ এখনকার বাজারে বিপুল। এত বিপুল খরচ করে শুধু জনসেবার উদ্দেশ্যে এগিয়ে আসার মতো বিনিয়োগকারী এদেশে নেই। তাই সংবাদপত্র একটা ব্যবসায়িক ভেঞ্চার হতে বাধ্য।' যাক, এতোদিনে কেউ একজন স্বীকার করলেন যে এটা অন্য পাঁচটা ব্যবসার মতো একটা ব্যবসা। আমি আমার নিবন্ধে সংবাদপত্রকে আহ্বান জানিয়েছিলাম যদি তারা জনসাংবাদিকতা করতে ব্যর্থ হন তবে যেন 'জাতির বিবেক' অভিধা থেকে নিজেকে প্রত্যাহার করে নেন। কিন্তু সংবাদপত্র এই মিথগুলো বহুদিন আগেই তৈরী করেছে ও দীর্ঘদিন ধরে এগুলো ব্যবহার করে আসছে এবং সব পাঠকের মনে তা প্রতিষ্ঠা করে ছেড়েছে। তাই আমি যখন পড়তে আসা প্রথম বর্ষের ছাত্র-ছাত্রীদের 'বাংলাদেশের সংবাদপত্র' বিষয়ে লিখতে দিই, কোনো ব্যতিক্রম ছাড়াই দেখি যে, তারা সবাই প্রথম লাইনে যেকথাটা লেখে সেটা হলো 'সংবাদপত্র সমাজের দর্পণ'। মশিউল আলম স্বীকার করে নিলেন যে সংবাদপত্র আর সেরকম কিছু নয়; তিনি আরও খানিকটা এগিয়ে গিয়ে আমার প্রবন্ধে উদ্ধৃত নোয়াম চমস্কির অনুসিদ্ধান্ত ব্যবহার করলেন: 'গণমাধ্যমসমূহের প্রাথমিক কাজ হলো বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে অডিয়েন্সকে বিক্রি করা'। লক্ষ করুন পাঠক, আমি আপনি যে-গণমাধ্যমকে বিশ্বাস করতাম এই বলে যে, তারা আমাদের তথ্য জানাবে ও জীবনের নানা দিক উপস্থাপন করে সমৃদ্ধ-শিক্ষিত করবে, সমাজের নানা অবিচার-অন্যায়ের কথা তুলে ধরবে, সর্বোপরি জনগণের পক্ষে কথা বলবেÑ-- তারা আসলে তা করবে কিনা এই নিশ্চয়তা অন্তর থেকে দিচ্ছে না। তারা আসলে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে আপনাকে-আমাকে বিক্রি করবে। এটা করবে টিকে থাকার জন্য এবং ব্যবসা করার জন্য। তাহলে কী দাঁড়ালো? গণমাধ্যম কি প্রো-পিপল না প্রো-মার্কেট? আমি বলতে চেয়েছি গণমাধ্যম অতীতের কোনো এক সময়ে জনগণের জন্য কাজ করে থাকলেও, বর্তমানে গণমাধ্যমের কাজ হলো বাজারের লক্ষ্য পূরণ করা।
মশিউল আলম সংবাদপত্র-অর্থনীতির একটি চিত্র তুলে ধরেছেন। তিনি সেখানে বলছেন যে পাঠকরা সাত টাকা দিয়ে পত্রিকা কেনার পরও প্রতি কপিতে লোকসান হয় তিন টাকা। এই হিসেবে দুই লাখ প্রচারসংখ্যার একটি পত্রিকার মাসিক লোকসান হয় এক কোটি ৮০ লাখ টাকা। অর্থাৎ পাঠক, আপনি প্রায় ১১ টাকার জিনিস মাত্র ৭ টাকায় পাচ্ছেন। সংবাদপত্র আপনাকে সম্মান করে লোকসানটা পোষাচ্ছে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছ থেকে বিজ্ঞাপন নিয়ে। তিনি বলছেন আমাদের 'বিজ্ঞাপনের বাজার খুবই সংকীর্ণ'। কিন্তু দৈনিক পত্রিকা দেখে কে বলবে আমাদের বিজ্ঞাপনের বাজার খুবই সংকীর্ণ? বিশ্বায়নের কারণে নব্বই দশক শুরু হবার পর থেকে আমাদের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে; উৎপাদনে নয়, ভোক্তা-আচরণে। এমনকি অনেক পত্রিকা কোনো সরকারী বিজ্ঞাপন ছাড়াই দিব্যি টিকে আছে। অথচ বছর পনের আগেও পত্রিকাগুলোর মূল বিজ্ঞাপন-উৎস ছিল সরকার। বিশ্বায়নের কল্যাণে আমাদের দেশের বিজ্ঞাপন-বাজার মোটেও ছোট নয়। তিনি আরও বলছেন টাইমস অফ ইন্ডিয়া ২ রুপিতে সংবাদপত্র বিক্রি করতে পারে কারণ তাদের বিজ্ঞাপনের মূল্য বেশি। কিন্তু আমাদের দেশের বিজ্ঞাপনের দাম কম কেন? পত্রিকা খুললে দেখা যায় এত এত বিজ্ঞাপন অথচ এর দাম কম কেন? দাম কম হবার কারণে প্রয়োজনীয় লক্ষ্যের অর্থ জোগাড় করতে বেশি স্থান ছেড়ে দিয়ে বেশি বিজ্ঞাপন ছাপতে হচ্ছে। কিন্তু বিজ্ঞাপনের মূল্য কম হবার পেছনে সংবাদপত্রের কি কোনোই দায়দায়িত্ব নেই? আপাত প্রতিযোগিতার কারণে তারা কি পত্রিকার স্পেসকে সহজলভ্য করে তোলেননি? মশিউল আলম বলছেন, 'সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বেশ কয়েকটি প্রধান দৈনিক পত্রিকার মধ্যে বেশি কমিশন দিয়ে বিজ্ঞাপন ছাপানোর প্রতিযোগিতা চলছে'। বেশি অর্থ উপার্জনের জন্য যতটুক ছাড়ার কথা, তার বেশি স্পেস বিজ্ঞাপনের জন্য ছেড়ে দিতে হচ্ছে। এবং এই বাড়তি স্পেসের চাররঙা মুদ্রণের মূল্য মশিউল আলম পাঠকের দেয়া সাত টাকার মধ্যে ধরছেন। তো প্রতিযোগিতার জন্য আপনি পত্রিকার স্থানের মূল্য কমিয়ে দেবেন, দিনে দিনে পৃষ্ঠা বাড়াবেন, সাদাকালো থেকে রঙিনে যাবেন (মাঝে মাঝে ১৪ নম্বর পাতার খেলার সংবাদও আমরা রঙিন পেয়ে খুশি হই, কিন্তু সেই পৃষ্ঠা ধরে অপর প্রান্তে গেলে দেখা যায়, তিন নম্বর পাতায় একটি রঙীন বিজ্ঞাপনের জন্য এই রঙান্তর), কিন্তু তার মুদ্রণ-খরচ পাঠকের হিসেবের মধ্যে ফেলছেন!
মশিউল আলম বলছেন আর্থিকভাবে 'স্বনির্ভর হওয়ার চেষ্টাই সংবাদপত্রের ব্যবসা, যে-ব্যবসার পণ্য সত্য খবর, যে-পণ্য বিক্রির মধ্যেই আছে বড়ো সামাজিক অঙ্গীকার।' এ-পর্যায়ে এসে তিনি সামাজিক অঙ্গীকারের কথা পাড়ছেন। ব্যবসা করতে করতেও, অডিয়েন্সকে বিক্রি করতে করতেও সামাজিক অঙ্গীকার তাহলে সম্ভব! তিনি 'এই সত্য' সংবাদ পরিবেশন করছেন পেশাদারিত্বের সাহায্যে। এই পেশাদারিত্বটা কী? এই পেশাদারিত্ব হলো ব্যাড জার্নালিজমের পরিবর্তে গুড জার্নালিজম। গুড জার্নালিজমটাই বা কী? তথ্যের নিরপেক্ষতা, বস্তুনিষ্ঠতা রা করা। অর্থাৎ কোনো পক্ষ না নিয়ে যা ঘটেছে সেটাই বলা। যেকোনো ইস্যুতে উভয় পরে মতামতকে প্রশ্রয় দেয়া। পাঠকই বিচার করবে কোনটা সঠিক, আর কোনটা সঠিক নয়। আমি বলেছিলাম 'নিরপেক্ষতার সংজ্ঞায় আমরা এখানে যদি পরাস্ত হই, তবে 'নিরপেক্ষতা' পদার্থটিকে নিয়েই প্রশ্ন ওঠাতে হবে'। একজন খুন হলে, কিংবা কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে সাংবাদিক নিরপেক্ষতার জন্য উভয় পক্ষের মতামতই প্রকাশ করবে। আদালতের রায় না-হওয়া পর্যন্ত কাউকে খুনি বলার অধিকার সাংবাদিকের নেই। এই নিরপেক্ষতা মানি। কিন্তু জাতীয় স্বার্থ লুণ্ঠিত হলেও পত্রিকা নিরপেক্ষতার পরাকাষ্ঠা দেখিয়ে চলবে? বৃহত্তর কল্যাণের জন্য সংবাদপত্র কোনো পক্ষের ওকালতি করবে না? মশিউল আলম এই 'এডভোকেসি জার্নালিজম',-এর সঙ্গে 'ইয়োলো জার্নালিজম'-কে গুলিয়ে ফেলে আমাকে এবং অন্য একজন আলোচক কাবেরী গায়েনকে 'অনিরপেক্ষ' বলে অভিযুক্ত করেছেন। আমার প্রবন্ধে আমি বলেছিলাম যে, বাংলাদেশের গণমাধ্যমের আরেকটি প্রবণতা হলো, তারা বিতর্ক জীইয়ে রাখতে খুবই পছন্দ করে। এর মাধ্যমে পাঠককে আরও সংবাদপত্র-সংশ্লিষ্ট রাখা যায়। এর অর্থ আরও পত্রিকা বিক্রি, আরও পত্রিকা বিক্রি অর্থ আরও বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তি, আরও বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তি অর্থ আরও ব্যবসা ও ক্ষমতা। গ্যাস রফতানি প্রশ্নে আমরা দেখেছি পত্রিকাগুলো বিষয়টিকে 'বিতর্কিত' ট্রিটমেন্ট দিতেই পছন্দ করেছে বেশি। অথচ জাতীয় স্বার্থে গ্যাসরফতানি কোনোভাবেই কল্যাণকর হতে পারে না। কিন্তু পাছে সরকার-সমর্থক পাঠকগোষ্ঠীকে হারাতে হয়, এই ভয়ে পত্রিকা এই বিষয়টিতে নিজস্ব কোনও অবস্থান গ্রহণ করতে পারে নি। অভিমত পাতার কলামগুলোতে এবং সাক্ষাৎকারে গ্যাস রফতানির বিপরে মতামত যেমন স্থান পেয়েছে, তেমনি পক্ষের মতামতও উপেক্ষিত হয়নি। এই 'নিরপেক্ষতা' আমরা পত্রিকার কাছে আশা করি নি। অন্যদিকে সত্যি হলো, সংবাদপত্র সবসময় নিরপেক্ষ থাকে নি, এবং সেটা সমাজের জন্য কল্যাণকরই হয়েছে। আমি আমার প্রবন্ধে স্বীকার করেছি কোনো কোনো ইস্যুতে সংবাদপত্র এডভোকেসি করে থাকে। যেমন উদ্যানের গাছ রক্ষা, বুড়িগঙ্গা নদী রক্ষঅ, নারী-অধিকার, এসিডসন্ত্রাসবিরোধীপ্রচার প্রভৃতি ক্ষেত্রে সংবাদপত্র এডভোকেসি করেছে। মশিউল আলম তার লেখার এক স্থানে দাবি করেছেন, 'ওসমানী উদ্যানের গাছ কেটে আন্তর্জাতিক সম্মেলনকেন্দ্র নির্মাণের সরকারী উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাতিল হওয়া বা মাত্র দুই মাসের মধ্যে কিশোরী তৃষা হত্যামামলার রায় ঘোষণার মতো ঘটনাগুলোতে যে প্রবল জনমতের চাপ ছিল, তা সৃষ্টিতে সংবাদপত্রগুলো বিরাট ভূমিকা পালন করেছে।' অথচ তার পরের অনুচ্ছেদেই গ্যাস-রফতানি প্রসঙ্গে তিনি বলছেন, 'গ্যাস বিক্রি করলে দেশের তি হবে না লাভ হবে সে-ব্যাপারে সাংবাদিকরা রায় না দিয়ে যদি উভয় পরে মতমত প্রকাশ করে তাহলে সাংবাদিকতার ন্যায্য কাজটিই হয় না? তা যদি না হয়, তাহলে সাংবাদিকতার কাজ কী হবে তা নিয়ে আবার নতুন করে চিন্তাভাবনা শুরু করতে হবে।' যে-পত্রিকা গাছ কাটার পরে মতকে প্রশ্রয় দিচ্ছে না, সেই একই পত্রিকা গ্যাস রফতানির পক্ষের মতামতকেও অনুমোদন করছে। এ-পর্যায়ে এসে তিনি একদিকে যেমন স্ববিরোধী কথা বলছেন, তেমনি আমার এবং কাবেরী গায়েনের এমন এক ভাবমূর্তি চিত্রিত করছেন যেন আমরা সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে অসততার এবং অদক্ষতার পক্ষে কথা বলছি।
কথা উঠতে পারে (মশিউল আলমের ভাষায়) 'তীব্র ক্ষোভ' সহকারে আমি যে প্রশ্নগুলো উত্থাপন করেছি, তার লক্ষ্য কী? আমি বিদ্যমান মিডিয়া নিয়ে সমালোচনা করছি, তাহলে আমি আসলে কী ধরনের মিডিয়া চাই? বিদ্যমান যেকোনো সিস্টেম সম্পর্কে প্রশ্ন তুললে এক পর্যায়ে বাধা আসে; বলা হয়, খুব তো বলছো, বিকল্প বাৎলাও দেখি! এপ্রসঙ্গে মশিউল আলমের একটি সোজাসাপ্টা সমাধান রয়েছে। তার মনে হয়, 'রাষ্ট্র পরিচালনা ও সম্পদবণ্টন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন না হওয়া পর্যন্ত, মানুষের জীবনযাপনে ও চিন্তাভাবনায় বাজারের দাপটের এই বাস্তবতায় সংবাদপত্র সম্পর্কে আদর্শ দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে বাস্তবতার এই ফারাক থেকেই যাবে।' অর্থাৎ তার জানা আছে যে, এই মিডিয়াকেই সবাইকে মেনে নিতে হবে। এব্যাপারে তার পরিস্কার ধারণা দেখে তাকে ধন্যবাদ দিতেই হয়। অর্থাৎ বাজারের সম্প্রসারণ হতেই থাকবে, আর মিডিয়া বাজারের দূত হয়ে পণ্য ফেরি করে বেড়াবে, যতক্ষণ না বৈপ্লবিক কোনো পরিবর্তন না হচ্ছে। তিনি এ-পরিবর্তনে সামিল হবেন না, কেউ বিপ্লব করলে করুক। তিনি 'নিরপেক্ষ', বিজ্ঞা
বাংলাদেশের সাংবাদিকতার বাজারামুখিনতা (পর্ব ৫)
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
১৭টি মন্তব্য ০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
পাহাড়ে চড়া আর মাউন্টেনিয়ারিং: এক নয়

আজকাল পাহাড়ে ওঠা অনেক সহজ হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রায় প্রতিদিনই দেখা যায় কেউ না কেউ কোনো পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন। ট্রেইল ধরে হেঁটে, কখনো দড়ি ধরে, কখনো গাইডের সাহায্যে... ...বাকিটুকু পড়ুন
“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

“আবহাওয়াবিদ” মোবাইল অ্যাপের শুভ উদ্বোধন: বুধবার, ১০ জুন ২০২৬
আনন্দের সঙ্গে জানাচ্ছি যে বাংলাদেশের সর্বস্তরের মানুষের কাছে সহজে আবহাওয়া পূর্বাভাস এবং আবহাওয়া-সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতামূলক তথ্য পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্য নিয়ে abohawa.com... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমাদের গ্রামের গল্প!

আমাগো গ্রাম আপনারা সবাই চিনেন।
মুন্সিগঞ্জ, বিক্রমপুর। শ্রীনগর থানা। খুবই প্রাচীন অঞ্চল। অবশ্য এখন গ্রাম বদলে গেছে! ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল হয়েছে, বিউটি পার্লার, কমিউনিটি সেন্টার, শপিংমল, ফাস্টফুডের দোকান হয়েছে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
ফিরে যাওয়া বলে কিছু নেই
আমি যে নদীর কথা ভাবি,
সে নদী জল নয় সময় বয়ে নিয়ে চলে।
এক পাড়ে মানুষের কোলাহল,
হাটের গুঞ্জন, ভাতের গন্ধ, সন্ধ্যার আহবান,
অন্য পাড়ে কেবল শূন্যতা,
যেন কেউ কোনোদিন সেখানে ছিলইনা।
তবু দু পাড়ই... ...বাকিটুকু পড়ুন
১০০০-তম পোস্টঃ কন্যা আপন সাজন সাজে রে
আমাকে ও রাহমিনকে এনিমেট করলে কেমন দেখাবে? এই আইডিয়া থেকেই গানটা রিমিক্স করে এনিমেটেড ভিডিও সং বানিয়ে ইউটিউবে ছেড়েছি। ছোটবেলায় মেঝ খালার বিয়েতে এই গানটা শুনেছিলাম। সবাইকে গানটি দেখা ও... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।