somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

এই রায়টি মোটিভেটেড

০৪ ঠা ডিসেম্বর, ২০০৭ সন্ধ্যা ৬:৫০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

প্রথমে মর্মাহত, পরে ভারাক্রান্ত এবং ধীরে ধীরে ক্রুদ্ধ হয়ে উঠছি। আজ রাবি শিক্ষকদের বিরুদ্ধে যে-রায় হলো তা মোটিভেটেড, সরকার বিশেষত আর্মির পক্ষ থেকে একটি প্রতিশোধ নেয়া হলো। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো থেকে বরাবরই যেকোনো সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিবাদ হয়ে থাকে। সামান্য ঘটনার উছিলায় ব্যাপক বিক্ষোভ হয়। স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্রবিক্ষোভ বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরের শক্তি নৈরাজ্যের দিকে নিয়ে যায়। বিচারবিভাগীয় তদন্ত কমিটি জানায়, দ্বিতীয় দিন থেকেই এটা ঘটতে থাকে। ভাঙচুর অগ্নিসংযোগ বাইরের কোন শক্তি করেছিল তা কি অনুমান করা কঠিন?

বিগত ২৫ তারিখে এই রায় হবার কথা ছিল, কিন্তু রায় হবার দ'তিনদিন আগে হাকিম হঠাৎ ছুটি নেন এবং ঢাকায় যান। জানা যায় সরকার তাকে তলব করেছে।

নতুন রায়ের তারিখ ঘোষিত হয়, আজ তার ঘোষণা হলো। রায়টা পর্যালোচনা করে কী দেখতে পাই? যারা দুইবছর কারাদণ্ড ভোগ করার মানসিক ও শারীরীক শক্তি রাখেন, তাদের ভেতরে রেখে দেয়া হলো। আর যারা বয়স্ক অধ্যাপক তাদের ছেড়ে দেয়া হলো। নানা দিক থেকে শিক্ষকদের মুক্তির যে আবেদন আসছিল, তার প্রতি বিচারকের(সরকারের) এই হলো 'সম্মানপ্রদর্শন'।

সামহোয়ারেরর এই সংক্রান্ত পোস্টগুলোতে অনেকেই না-বুঝে অনেক কমেন্ট করছেন। বোঝা যায় শিক্ষক-রাজনীতির বিরুদ্ধে তাদের গড়পড়তা একটা ক্ষোভ রয়েছে। "শিক্ষকরা রাজনীতি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধঃপাতে নিয়ে যাচ্ছে", এই শুভবোধ থেকে তারা এসব কমেন্ট করছেন। এই সরকার আসার পর দেখা গেছে, যারা এমপি-মিনিস্টার ধরে যেকোনো কাজ বাগানোকে কোনো নৈতিক সমস্যায় পড়তেন না, কিন্তু তথাকথিত নিরপেক্ষ তত্ত্ববধায়ক সরকার আসার পর তারাই আজ সবচেয়ে বড়ো নিরপক্ষেতাবাদী। দুই দল দেশটাকে ধ্বংসের কিনারায় নিয়ে গেছে, আর্মিসমর্থিত সরকার দেশকে বাঁচালো -- এই মন্তব্য করতে তারাই আজ সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ।

"শিক্ষকরা রাজনীতি করে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে অধঃপাতে নিয়ে যাচ্ছে", এই শুভবোধের সঙ্গে গ্রেফতারকৃত শিক্ষকদের বিচার-প্রক্রিয়া ও রায়ঘোষণাকে মিলিয়ে পাঠ করতে চাইলে আমরা কী পাই? রাজশাহী ও ঢাকা উভয় বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করার সূত্রে আমি গ্রেফতারকৃত শিক্ষকদের বেশিরভাগকে ভালমতো চিনি। তাই আমার বিশ্লেষণটি ব্লগারদের মনোযোগ দাবি করলে তা অহেতুক কিছু হবেনা আশা করি।

সক্রিয়া শিক্ষক রাজনীতি কারা করেন? কয়জন করেন? শিক্ষকতার মতো পেশায় থেকে সব শিক্ষকের কতদূর পর্যন্ত রাজনীতি করা সম্ভব? সক্রিয় রাজনীতি করেও একাডেমিক মান অক্ষুণ্ন রাখা কি সম্ভব?

পাঠকের সুবিধার্থে গ্রেফতারকৃত রাবি শিক্ষকের রাজনৈতিক ও একাডেমিক পরিচয় তুলে ধরছি।

১. অধ্যাপক সাইদুর রহমান: সাবেক ভিসি, আওয়ামী সমর্থিত। ৯৬-এ নির্বাচিত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়কার দ্বিতীয় ভিসি। একসময় ফলিত পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের নিষ্ঠাবান গবেষক, পরবর্তীতে রাজনীতিতে অধিক সক্রিয়।
২. অধ্যাপক আব্দুস সোবহান: আওয়ামী ও বামপন্থীদের সম্মিলিত রবীন্দ্র গ্রুপের সক্রিয় সদস্য। শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে নির্বাচিত। সজ্জন। একাডেমিক এক্সিলেন্স সম্পর্কে বিশেষ কিছু জানিনা।
৩. অধ্যাপক মলয় কুমার ভৌমিক: ব্যবস্থাপনা বিভাগের শিক্ষক হলেও মূলত সংস্কৃতিকর্মী। একসময় মোনাজাতউদ্দিনের সঙ্গে সংবাদ পত্রিকার হয়ে উত্তরবঙ্গ থেকে রিপোর্ট করতেন। সম্প্রতি রাজশাহীর থিয়েটারের প্রাণপুরুষ। তার নির্দেশিত নাটক ভারতে প্রশংসিত হয়েছে।
৪. সেলিম রেজা নিউটন: ছাত্রজীবনে সক্রিয় বামপন্থী কর্মী, পরে বাংলাদেশের বামপন্থীদের সীমাবদ্ধতার সমালোচক, ফলত সক্রিয় রাজনীতি থেকে অবসর নেন। একাডেমিশিয়ান, সংগঠক, সম্পাদক, সুবক্তা। গণযোগাযোগ বিভাগে তার নেতৃত্বেই সর্বপ্রথম মিডিয়া অধ্যয়ন একটি শক্তিশালী রূপে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হাজির হয়। অধুনালুপ্ত এডকমসো জার্নালের সম্পাদক। 'মানুষ' পত্রিকার সন্ত্রাস-যুদ্ধ-মিডিয়ার সম্পাদক। কবি। বিশ্ববিদ্যালয়ের অনিয়মের বিরুদ্ধে সব সরকারের আমলে সদা সমালোচক, জীবনযাপনের ধরন ইত্যাদির কারণে সমাজের জন্য অস্বস্তিকর ব্যক্তি।
৫. দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস: ব্যক্তিগতভাবে মুক্তিযেদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী, সেহিসেবে খানিকটা আওয়ামী সমর্থক। তবে সক্রিয় শিক্ষক রাজনীতি থেকে দূরে অবস্থান করেন।
৬. আ-আল মামুন: চিন্তাচেতনায় বামপন্থী তবে বামপন্থার সীমাবদ্ধতা সম্পর্কেও সচেতন। কখনোই সক্রিয় রাজনীতি করেননি। নিষ্ঠাবান একাডেমিশিয়ান। মিডিয়া বিষয়ক একাডেমিক পত্রিকা 'যোগাযোগ'-এর অন্যতম সম্পাদক। সুঅনুবাদক। প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা দুই।

এবার দেখুন যারা দলীয় রাজনীতি থেকে দূরে থাকেন, দলীয় লেজুড়বৃত্তির কড়া সমালোচক, তারাই শাস্তি পেলেন। ১ ও ২ নম্বর অধ্যাপককে মুক্তি দেয়া হয়েছে। যেরকম নিষ্ঠাবান, মুক্তচিন্তার শিক্ষক-গবেষক আপনি চান রায়প্রাপ্ত অন্য চারজন ছিলেন সেরকমই।

বিচারকালীন শুনানির প্রত্যেকটি রিপোর্ট আমি পড়েছি। কোনো সাক্ষীই প্রমাণ করতে পারেননি তারা কীরকম 'উস্কানি' দিয়েছিলেন। একই অভিযোগে গ্রেফতার হলেন ছয়জন, আর দু'জনের বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণই পাওয়া গেলনা। সাজানো বিচারের সাজানো রায়!

সাইদুর রহমান স্যার ও সোবহান স্যার যে বেকসুর মুক্তি পেয়েছেন, এজন্য আমি অবশ্যই আনন্দিত। এখন তো দুর্নীতি অনুসন্ধানের সময়, বলতে পারি সাইদুর স্যারের সময়ে রাবিতে বিশেষ কোনো দুর্নীতি হয়নি। তিনি একজন সজ্জন ব্যক্তি। আমার জটিল অসুস্থতার সময়ে তিনি আমাকে বিরাট সমর্থন দিয়েছিলেন। এই বয়সে তাকে যদি জেলখাটতে হতো আরও দুই বছর, তবে তা জাতির জন্যই বিরাট কলঙ্ক হতো। কিন্তু যে-চারজনকে দু'বছর কারাদণ্ড ভোগ করতে হবে, তাদের কথা ভাবি। তাদের স্ত্রীদের মুখগুলো মুখগুলো চোখের সামনে ভাসে। এদের কেউ আমার সরাসরি ছাত্রী, কেউ সহকর্মী। তাদের ছোট ছোট বাচ্চাদের কথা ভাবি। এই কলঙ্কের দায় কে বহন করবে?

সেলিম রেজা নিউটন এবং আ-আল মামুন আমার প্রিয়তম বন্ধু। দুলালচন্দ্র বিশ্বাসও আমার প্রিয় সহকর্মী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ বিভাগে আমি তিন বছরের বেশি সময় শিক্ষকতার দায়িত্ব পালন করেছি। আমরা একইভাবে ভাবতাম, ছাত্রদের ন্যায্য দাবিতে একইসঙ্গে পাশে দাঁড়াতাম। আজ যদি আমি দেশে থাকতাম, যদি রাবিতে থাকতাম, তবে ছাত্রদের প্রতি সংহতি জানানোর ঐ মিছিলে আমিও থাকতাম।

কিন্তু আমি আমার সেই ব্যক্তিগত সম্পর্কের দাবি থেকে নয়, আপনারা একটু তলিয়ে দেখুন, আমরা ভুল লোকের ওপরে আমাদের ক্রোধের ভার চাপাচ্ছি কিনা।
৪৯টি মন্তব্য ০টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×