....
নতুন প্রিন্সিপাল এসেই বিশেষ এসেম্বলি ডাকলেন। শিক্ষক ও ক্যাডেটদের উদ্দেশে প্রথম ভাষণে তিনি জানালেন, বিশেষ পরিস্থিতিতে এই কলেজের প্রয়োজনেই তাকে এখানে আসতে হয়েছে। তার প্রাথমিক দায়িত্ব কলেজের স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা এবং কলেজকে সার্বিক উন্নতির দিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। এজন্য তিনি শিক্ষক ও ক্যাডেটদের কাছ থেকে সহযোগিতা কামনা করেন। তিনি জানান সংঘটিত কাসিম হাউসের ঘটনার প্রকৃত দোষীদের খুঁজে বের করা হবে এবং প্রয়োজনীয় শাস্তি প্রদান করা হবে। এডজুটেন্টের নেতৃত্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠিত হবে এবং ঘটনার তদন্তে যেকোনো সময় যেকাউকে ডাকা হবে। আর কলেজের যাবতীয় অগ্রহণযোগ্য পুরনো ট্র্যাডিশনকে বাদ দিয়ে নতুন ট্র্যাডিশন স্থাপন করতে হবে।
নতুন প্রিন্সিপালের প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে, কাসিম হাউসের ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য, টুয়েলভ ও ইলেভেনের সবাইকে এডজুটেন্ট অফিসে দীর্ঘ জেরার মুখোমুখি হতে হলো। প্রায় দুই সপ্তাহ জুড়ে এই জিজ্ঞাসাবাদ চললো। তদন্ত শেষে শাস্তিস্বরূপ ক্লাস টুয়েলভের পাঁচজনকে লং লিভে পাঠিয়ে দেয়া হলো।
লং লিভ অর্থ একরকম কলেজ থেকে বহিষ্কার, তবে শাস্তিপ্রাপ্তরা ক্যাডেট কলেজ কেন্দ্র থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে পারবে। কিন্তু পরীক্ষা চলাকালে শাস্তিপ্রাপ্তরা থাকবে কলেজ হাসপাতালের একটি কক্ষে, সাধারণ ক্যাডেটদের সঙ্গে তাদের দেখা করার সুযোগ থাকবে না, পরীক্ষাও দিতে হবে সেখানে বসে।
আর ক্লাস ইলেভেনের যে-ক্যাডেট টিভিরুমে বাইরে থেকে তালা লাগিয়েছিল, তাকে কলেজ আউট করে দেয়া হলো। তাকে এখন বাইরের কোনো কলেজে নতুন করে ভর্তি হয়ে পড়াশুনা চালিয়ে যেতে হবে। হাউস-প্রিফেক্ট মাহবুব ভাই টিভিরুমে ছিলেন না বা মারামারিতে অংশ নেননি; কিন্তু বন্ধুদের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি থেকে নিরস্ত্র করতে না-পারার অভিযোগে তার অ্যাপুলেট কেড়ে নেয়া হলো পরবর্তী এক এসেম্বলিতে, সব ক্যাডেটের সামনে। তিনি হাউস-প্রিফেক্টশিপ হারিয়ে সাধারণ ক্যাডেটে পরিণত হলেন। খালিদ হাউসের এসিস্ট্যান্ট হাউস প্রিফেক্টকে কাসিম হাউসের হাউস প্রিফেক্ট করা হলো।
কাসিম হাউসের ঘটনার এই রায়ের পরে, নতুন প্রিন্সিপাল ও এডজুটেন্ট কলেজের সার্বিক উন্নয়নে মনোযোগ দিলেন। এসএসসি এবং এইচএসএসসি পরীক্ষার দুই মাস আগে থেকে সাধারণত পরীক্ষার্থীরা কোনো ধরনের দৈনিক কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকতো। যেমন পিটি-ড্রিল তাদের করতে হতো না, কেবল পড়াশুনা করবে তারা। পড়াশুনাও করতে হবে হাউসে বসে। সে-হিসেবে ক্লাস টুয়েলভ মাসখানের ধরে বেশ আরামে জীবনযাপন করছিল, পড়াশুনার কষ্টটুকু ছাড়া তারা পিটি-ড্রিল-ক্লাস এসব করতে হতো না। কারণ মাসখানেক পরেই ছিল তাদের পরীক্ষা।
কিন্তু এবার তাদের আরাম ছেড়ে পিটি-ড্রিল শুরু করতে হলো। ক্যাডেট কলেজের যে-জীবনকে তারা বিদায় জানিয়েছিল, সেই জীবনে আবার ফিরে আসতে হলো, যা কিনা ক্যাডেট কলেজের ইতিহাসে একটি বিরল একটি ঘটনা। জানা গেল এমনকি পরীক্ষার মধ্যেও তাদের পিটি-ড্রিল করতে হবে।
এতো গেল ক্লাস-টুয়েলভের জন্য হৃদয়বিদারক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সাধারণ ক্যাডেটদেরও জীবনযাত্রা ধীরে ধীরে অধিক কঠিন হয়ে উঠলো। যেমন, নিয়ম চালু হলো, ক্যাডেটদের-কাছে-আসা-চিঠি হাউস-টিউটররা খুলে পড়ে তবেই ক্যাডেটদের দিবেন। কোনো চিঠি বাবা-মা বা অন্য কাউকে পাঠাতে চাইলে হাউস-টিউটরকে দিতে হবে, তিনি পড়ে অনুমতি দিলে সেই চিঠি পোস্ট করা যাবে।
রহমান ভাই সাকলায়েন ভাইকে একদিন বললেন, আমি তখনই বলেছিলাম, এখন দেখছো তো? মানুষ হিসেবে আমাদের মিনিমাম প্রাইভেসিও কেড়ে নেয়া হচ্ছে। সাকলায়েন ভাই তখন কিছু না বললেও পরে দেখা গেল দেলোয়ার ভাইকে বলছেন, রহমান ভাইয়ের এক গার্লফ্রেন্ড আছে। তার কাছে আর চিঠি লেখা যাবেনা বলে উনি এত ক্ষিপ্ত। আমার চিঠিতে যদি অবজেকশনেবল কিছু না থাকে, তবে কেউ পড়ে দেখলে আর ক্ষতি কী?
দেলোয়ার ভাই বলেন, ক্ষতি কিছু নাই, তবে শুনলাম তারিক হাউসের টিউটর বাংলার আব্দুস সবুর স্যার ক্যাডেটদের চিঠিই কেবল পড়ছেন না, বাংলা বানান ভুল ধরে ধরে ক্যাডেদের বকাবকি করছেন। ক্যাডেটদের চিঠি নাকি তাদের বিনোদনের খোরাক হিসেবে কাজে দিচ্ছে। আর টিচারদের মধ্যে কে কতটা ডিসিপ্লিনড, এটা প্রমাণ করতে দৃষ্টিকটু প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেছে। সেদিন চুল কাটতে গেছি মজিদ ভাইয়ের বারবার শপে, ইংরেজির হান্নান স্যার ঢুকলেন। ক্যাডেটদের সামনেই বললেন, মজিদ, আমার চুলটা ক্যাডেটদের মতো ছোট করে দাও। টি-ব্রেকের সময়ে প্রিন্সিপাল স্যার কেমনভাবে আমার চুলের দিকে যেন তাকিয়ে থাকেন, আমার কেমন কেমন লাগে।
কিছুদিনের মধ্যেই পুরো কলেজ সুঁইয়ের মতো সোজা হয়ে গেল। ক্লাস-সেভেনের খুশি হওয়ার কথা যে, নিয়ম কেবল তাদের মানতে হচ্ছেনা। এখন সবাই মানছে। কিন্তু সিনিয়রদের এইসব নিয়ম মানতে দেখে জামিলদের অস্বস্তি লাগে, সিনিয়রদের জন্য খারাপও লাগে।
যেমন, ব্রেকফাস্ট বা লাঞ্চের সময় হাউস থেকেই সবাই ডাইনিং হলে যায়। ডাইনিং হল থেকে বেল পড়লে ক্লাস সেভেনের সবাই এবং এইট-নাইনের কয়েকজন এতদিন হাউসের নিচে ফল-ইন করতো। এরপর হাউস-প্রিফেক্ট বা এসিস্ট্যান্ট হাউস-প্রিফেক্টের নেতৃত্বে তারা লাইন ধরে ডাইনিং হলে ঢুকতো। বাকিরা হেলেদুলে ডাইনিং হলে আসতো। দেখা যেত খাবার শুরুর বেল পড়ে গেছে, ডাইনিং হলের দরজা বন্ধ হয়ে গেছে, কিন্তু এরপরও দু’চারজন পরে ডাইনিং হলে ঢুকছে। ডেইসে উঠে ডিউটি টিচারকে কোনো একটা কারণ দেখিয়ে দিব্যি টেবিলে খেতে বসছে। কিন্তু এখন সব ক্লাসের ক্যাডেটরা হাউসের নিচে ফল-ইন করছে, লাইন ধরে ডাইনিং হলে আসছে। ক্লাস শেষে টুয়েলভ বা ইলেভেনের অনেকেই একাডেমিক বিল্ডিংয়ের সামনে ফল-ইন না করে শর্টকার্টে হাউসে ফিরতো। এখন সবাই ফল-ইনে হাজির থাকছে। সবই কেমন অদেখা-অচেনা লাগে জামিলের মতো অনেক জুনিয়র ক্যাডেটদের কাছে।
নতুন প্রিন্সিপাল বাইরের সংশ্রব থেকে ক্যাডেটদের দূরে রাখার জন্য প্রতি টার্মে প্যারেন্টস্ ডে-র সংখ্যা একে নামিয়ে আনলেন, আগে প্রতি মাসেই প্যারেন্টস ডে হতো। লাইটসের আউটের পরে, গভীর রাতে, সিনিয়র ক্যাডেটদের কেউ কেউ কলেজ প্রাচীর টপকে ইউসুফপুর মোড়ের হারেসের দোকানে গিয়ে মিষ্টি-সিঙাড়া খেয়ে আসতো। জামিল শুনেছে, মধ্যরাতে প্রাচীর টপকে, হারেসের দোকানে মিষ্টি খেতে যাবার এই অভিযান, অভিযানকারীদের কাছে ‘হারেসিং’ বলে পরিচিত। প্রাচীরের কাঁটাতার এবার কেবল মেরামতই করা হলো না, পুরো প্রাচীর জুড়ে কাঁটাতারের উচ্চতা বাড়ানো হলো। ফলে হারেসিং করা কিংবা সারদা বাজারে গিয়ে যাত্রা দেখা, কিংবা কাটাখালির সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল। সাহসী সিনিয়র ক্যাডেটদের এইসব গোপন অথচ রোমাঞ্চকর কার্যকলাপের খবর জামিলের ততটা জানা ছিলনা, শনিবারের এসেম্বলিতে প্রিন্সিপাল স্যার নিজেই ক্যাডেটদের এইসব নিষিদ্ধ কার্যকলাপের ফিরিস্তি দিতে থাকেন এবং জানাতে থাকেন কী কী পদক্ষেপ নেয়া হচ্ছে।
বেশিরভাগ ক্যাডেট ও শিক্ষক এই সামরিক কর্তৃপরে অধীনে খুশিমনে শাসিত হচ্ছে বলে জামিলের মনে হয়। পুরো কলেজে এখন ডিসিপ্লিন-উৎসব শুরু হয়েছে। রহমান ভাই অবশ্য তার অবস্থান থেকে নড়ছেন না। সাকলায়েন ভাইকে প্রায়ই বলেন, তোমাদের এই খুশি বেশি দিন থাকবে না।
জামিলের মতো ক্লাস-সেভেনের ক্যাডেটদের জীবনে অবশ্য কোনো পরিবর্তন আসেনি।
তারা আগে যা ছিল, এখনও তাই আছে।
সমাপ্ত

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

