somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ডিজিটাল চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রাসঙ্গিকতা: পরিপ্রেক্ষিত বাংলাদেশ (শেষ অংশ)

১৫ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ৯:৪২
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

পূর্বের অংশ

[তারেক মাসুদের এই নিবন্ধটি ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন সম্পাদিত 'যোগযোগ' পত্রিকা, সংখ্যা ৮ (ফেব্রুয়ারি, ২০০৭)-এ প্রকাশিত হয়েছিল।]

বেশ কয়েক বছর ধরে দুয়েকটি ক্যাবল টেলিভিশনে টেলিফিল্মের বাজেটে ৩৫ মি.মি.-এ দু-আড়াই ঘণ্টার ছবি বানিয়ে টিভি প্রিমিয়ার করছে। তার সঙ্গে একটি, বড়জোড় দুটি হলে, প্রতীকী মুক্তি দিচ্ছে। লক্ষ করার বিষয়, টিভি মাধ্যম থেকে একঝাঁক মেধাবী তরুণ নির্মাতা, কলাকুশলী ও শিল্পী বেরিয়ে এসেছেন। বিশেষ করে ভিডিও ফরম্যাটে তাদের অনেকেই দতা অর্জন করছেন। কিন্তু এই টিভি প্রযোজনা সংস্থাগুলো নিজেদের তৈরি কলাকুশলীদের তাদের প্রযোজিত সিনেমায় ব্যবহার করতে পারছেন না। কারণ তাদের ৩৫ মি.মি.-এর কারিগরি জ্ঞান নেই, তারা নির্ভর করছেন তথাকথিত বাণিজ্যহীন বাণিজ্যিক সিনেমার কলাকুশলীদের উপর। একই সাথে ছোট পর্দার সফল নির্মাতারা বড় পর্দায় কাজ করতে এসে তাদের মান বজায় রাখতে পারছেন না। এর কারণ ৩৫ মি.মি.-এর অবকাঠামোর স্থানীয় সীমাবদ্ধতা ও মাধ্যমটির কারিগরি জ্ঞানের অভাব। অথচ তাদের ডিজিটাল প্রোডাকশন ও পোস্ট প্রোডাকশনের অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করলে চ্যানেল প্রযোজিত ছবিগুলোর চেহারা বদলে যেত। ছোট পর্দায় -- বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মেধাবী যেসব নির্মাতা কাজ করছেন তারা -- ক্যামেরা থেকে শুরু করে পোস্ট-প্রোডাকশনের শেষ কাজটি পর্যন্ত কম্পিউটার বা ডিজিটাল প্রযুক্তিতে করে অভ্যস্ত। এই তরুণ প্রজন্ম যদি তাদের পরিচিত কারিগরি যন্ত্রাদি ও কৃৎ-কৌশলকে ভিত্তি করে ছবি বানাতে পারে, তাহলে তাদের নির্মিত চলচ্চিত্রে তাদের প্রতিভার প্রমাণ রাখতে পারবে বলে আমার ধারণা।

ক্যামেরা যতদিন কলমের মতো সহজ ও সস্তা না হবে, ততোদিন চলচ্চিত্র-শিল্পের সৃজনশীল মুক্তি ঘটবে না -- একথা এখনও ভবিষ্যতের জন্য তোলা থাকলেও তরুণ প্রজন্মের কম্পিউটার-স্বারতা স্বাধীন ধারার চলচ্চিত্রে ইতোমধ্যেই ইতিবাচক ফল নিয়ে আসছে -- চলতি চলচ্চিত্র উৎসবই এর প্রমাণ। এই উৎসবের ১৬৫টি ছবির মধ্যে কয়টি ছবি চলচ্চিত্র ফরম্যাটে তৈরি? কয়টি ছবি চলচ্চিত্র ফরম্যাটে প্রদর্শিত হচ্ছে? দু’মাস আগে নেপালে অনুষ্ঠিত একটি চলচ্চিত্র উৎসবে জুরিপ্রধান হিসেবে যোগদানের সুযোগ হয়েছিল আমার। শ’খানেক ছবির মধ্যে মাত্র একটি ছবি ছিল ৩৫ মি.মি.-এ তৈরি এবং সেটি ছিল হলিউডের নির্মাতা মিরা নায়ার প্রযোজিত।

আমাদের দেশে চলচ্চিত্র ফরম্যাটে, এমন কি স্বাধীন ধারায়ও, এমন কিছু চলচ্চিত্র তৈরি হয়েছে, যা ঠিক চলচ্চিত্র হয়ে ওঠেনি। অথচ ভিডিও ফরম্যাটে এমন কিছু ভাল কাজ হয়েছে, যেগুলো নিয়মিত ভিডিও ফরম্যাটের পরিবর্তে ডিজিটাল ফরম্যাটে চিত্রায়ন করলে তাকে সহজেই ৩৫ মি.মি.-এ উন্নীত করে দেশে-বিদেশে বড়ো পর্দায় পরিবেশনার সুযোগ নেয়া যেত। এক্ষেত্রে অনেকের সাথে স্বাধীন ধারায় নির্মিত নূরুল আলম আতিক ও শামীম আখতারের ভিডিও ফিল্মসহ বেশ কিছু উদাহরণ দেয়া যায়। দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, এরকম ভিডিও চিত্রগুলোর চূড়ান্ত পরিণতি টেলিভিশনের odd hour।

গত বছরের জানুয়ারিতে ভারতের মুম্বাইয়ে তুলনামূলক ফরম্যাটের একটি কর্মশালায় যোগদানের সুযোগ হয়েছিল আমার। এর উদ্যোক্তা ছিল ভারতীয় চিত্রগ্রাহকদের সংগঠন সিনেমাটোগ্রাফারস কম্বাইন। এতে অংশগ্রহণ করেছিলেন কে কে মহাজন থেকে শুরু করে অনিল মেহতাসহ ভারতের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন চিত্রগ্রাহক। জার্মানি থেকে এসেছিলেন একজন নামকরা চিত্রগ্রাহক। তিনি একই আলোতে ১৬ মি.মি., এইচডি, ডিভি ক্যাম বিভিন্ন ফরম্যাটে একই সঙ্গে তোলা দৃশ্যগুলো ৩৫ মি.মি.-এ রূপান্তর করে কর্মশালায় প্রদর্শন করেছিলেন। কর্মশালায় অংশগ্রহণকারী সবাই একমত হন -- ১৬ মি.মি. থেকে ৩৫ মি.মি.-এ ব্লো-আপ করা ছবির তুলনায় উন্নতমানের ডিভিক্যামে তোলা ডিজিটাল চলচ্চিত্রের ব্লো-আপের পিকচার কোয়ালিটি অনেক ভালো। এইচডি-তো অবশ্যই আরো বেশি ভালো।

চলচ্চিত্রের প্রযুক্তি কেবল উন্নত হচ্ছে না, ক্রমশ সহজ, সহজলভ্য ও সস্তাও হচ্ছে। এটি সম্ভব হয়েছে ডিজিটাল প্রযুক্তির আগমনের ফলে। চলচ্চিত্রের চিত্রায়নের প্রকরণ হওয়ার আগে থেকেই, ডিজিটাল প্রযুক্তি চলচ্চিত্র নির্মাণের অন্যান্য কারিগরি দিকগুলোতে কেবল ব্যবহৃতই হচ্ছে না, এর ব্যবহার এখন অনিবার্যও হয়ে পড়েছে। শব্দ-গ্রহণ, শব্দ-মিশ্রণ, সম্পাদনা এমনকি পরিস্ফুটনের ক্রিয়াকর্মও এখন ডিজিটাল ডিভাইসের আওতায়। ডিজিটাল ইন্টারমিডিয়েট (D.I.) আজকের রণশীল নির্মাতাদের কাছেও অজানা নয়। হলিউড-বলিউডের প্রথম সারির নির্মাতারা ৩৫ মি.মি.-এ চিত্রায়ন করেও প্রথাগত এনালগ প্রক্রিয়ায় ফেড-ইন, ফেড-আউট থেকে শুরু করে সব ধরনের অপটিক্যাল ইফেক্টের দৈন্য ঢাকতে এই ডিআই প্রক্রিয়া ব্যবহার করছেন। অর্থাৎ ডিজিটাল ফরম্যাটের শরণাপন্ন হচ্ছেন।

তবে পশ্চিমে, বিশেষ করে স্টুডিওভিত্তিক চলচ্চিত্রে ডিজিটাল ফরম্যাটের ব্যবহারের চরিত্র বেশ ভিন্ন। সেখানে High end H.D. ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে -- যা বাজেটের দিক থেকে ৩৫ মি.মি.-এ ছবি নির্মাণের থেকে সস্তা নয়। তাছাড়া একাধিক ক্যামেরা ব্যবহার করা হচ্ছে। তবে উন্নত বিশ্বে স্বাধীন ধারায় ডিজিটাল ফরম্যাটে যে সব কাজ হচ্ছে, তা অনেকটা প্রোডাকশন পর্যায়ে ১৬ মি.মি. ব্যবহার করে পরে পরিবেশক বা তহবিল সংগ্রহ করে ৩৫ মি.মি.-এ ব্লো-আপ করার সাথে তুলনীয়। অর্থাৎ বড় বাজেটের ছবির ক্ষেত্রে ডিজিটাল ফরম্যাট নির্মাতার বেছে নেয়া মাধ্যম। স্বাধীন ধারার ক্ষেত্রে এটি এখনও বিকল্প মাধ্যম। কারণ ফরম্যাটটি সহজ, সুলভ ও সস্তা।

আশির দশকে যেকোনো সৃজনধর্মী নির্মাতার জন্য যখন মূলধারায় চলচ্চিত্র নির্মাণ অসম্ভব হয়ে পড়েছিল, তখন মোরশেদুল ইসলাম ও তানভীর মোকাম্মেলের নেতৃত্বে বেশ কিছু তরুণ ১৬ মি.মি.-এর বিকল্প ফরম্যাটে ছবি বানিয়ে একটি আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। কম্পিউটার স্বার নতুন প্রজন্মের জন্য আজ ১৬ মি.মি.-এর সেই বিকল্পধারার সময়োপযোগী বিকল্প খুঁজে বার করার প্রয়োজন হয়ে পড়েছে। এখন হয়তো গুরুত্বের সঙ্গে হয়তো ভাবতে হবে ডিজিটাল ফরম্যাটের কথা। নতুন প্রজন্মকে বড় পর্দার কাছে -- বৃহত্তর দর্শকের কাছে -- যেতে হবে। বুঝতে হবে ভিডিওচিত্রের চূড়ান্ত দৌড় টেলিভিশন পর্যন্ত। পরিকল্পিতভাবে এগোতে হবে, দখল করে নিতে হবে মূলধারা। মাত্র দশ বছর আগেও বাংলাদেশের একজন নির্মাতার পে ইউরোপ, আমেরিকার ছবির কারিগরি মানের সাথে পাল্লা দেয়া সম্ভব ছিল না। কিন্তু ডিজিটাল বিপ্লব (Digital Revolution) প্রযুক্তির গণতন্ত্রায়নের মাধ্যমে সবাইকে এক কাতারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। আজ এই সুযোগ ব্যবহার করে অর্জন করতে হবে ডিজিটাল লিপ ( Digital leap)। শুধু দেশীয় মূলধারা নয়, স্থান করে নিতে হবে আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রের মানচিত্রে।

ডিজিটাল বিপ্লব চলচ্চিত্র মাধ্যমের চরিত্র নষ্ট করবে না, বরং চলচ্চিত্র নির্মাণের অতিযান্ত্রিক চরিত্রকে নির্মাতার নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসবে, নির্মাতা ও টেকনিশিয়ানদের মধ্যকার বিশাল বিভাজন ও দূরত্বকে দূর করবে। একজন নির্মাতা সহজেই টেকনিশিয়ানের দায়িত্বের ভাগ নিতে পারবেন। টেকনিশিয়ানরাও নির্মাতাকে কারিগরি অবদান বোঝাতে সম হবেন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির সুবাদে একজন চলচ্চিত্রকার কারিগরি বোঝায় ভারাক্রান্ত না হয়ে, ইয়াসুজিরো ওজুর ভাষায়, সত্যিকারের কারিগর হয়ে উঠবেন। আর চলচ্চিত্র মাধ্যমকে ইন্ডাস্ট্রির অট্টালিকা থেকে নামিয়ে সাধারণ কুটিরে এনে তাকে কুটিরূশিল্পের সৃজনশীলতা ফিরিয়ে দেবে।
তবে বর্তমানের ডিজিটাল ফরম্যাটই শেষ কথা নয়। একটা সময় হয়তো আসবে, যখন কেবল নির্মাণ নয় প্রদর্শনও ডিজিটাল হয়ে যাবে। তখন হয়তো ডিজিটাল ফরম্যাটে চিত্রায়ন করে ৩৫ মি.মি.-এ রূপান্তর করার প্রয়োজন হবে না, বরং ধ্র“পদী চলচ্চিত্রগুলোও ডিজিটাল ফরম্যাটেই আমরা দেখবো। সেদিন বেশি দূরে নয়, যখন আমরা আজকের এই উত্তপ্ত, উত্তেজিত তর্ককে নিয়ে নিজেরাই হাসাহাসি করব।

ছবি পরিচিতি: প্রথম ডিজিটাল কাহিনীচিত্র তারেক ও ক্যাথরিন মাসুদের 'অন্তর্যাত্রা'র একটি দৃশ্য।
সর্বশেষ এডিট : ১৫ ই মার্চ, ২০০৮ রাত ১০:০৪
১১টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×