somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

বাংলা: জনগণকে হত্যা (নিউজউইকের বিশেষ প্রতিবেদন; বিদেশী পত্রিকায় মুক্তিযুদ্ধ, পর্ব ৪৯)

১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১২:৪৪
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

নিউজউইক, ২ আগস্ট, ১৯৭১।

সেটা ছিল পুনরাবৃত্ত অনুরোধ। পূর্ব পাকিস্তানের হালুয়াঘাটের তরুণদের একজন পাকিস্তানী সেনাবাহিনীর মেজর বলেন যে তার আহত সৈন্যদের জরুরিভিত্তিতে রক্ত প্রয়োজন। তারা কি রক্তদানকারী হবে? তরুণেরা অস্থায়ী বিছানায় শুয়ে পড়ে, তাদের ধমনীতে সুঁচ ঢোকানো হয় -- এবং ধীরে ধীরে তাদের শরীর থেকে রক্ত টেনে নেয় যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা মারা যায়। গোবিন্দ চন্দ্র মণ্ডল কার কাছে প্রথম শুনেছিল মনে নেই, কিন্তু সে যখন শুনলো যে সরকার উদ্বাস্তুদের ক্ষমা ঘোষণা করেছে, সে তাড়াতাড়ি ঘরে ফেরার জন্য পথহাঁটা শুরু করে। দু-পাশে কিশোরী দুই কন্যাকে নিয়ে গোবিন্দ চন্দ্র বৃষ্টিধৌত জলাভূমি এবং আগুনে দগ্ধ গ্রামসমূহ পার হয়ে আসে। যখন সে তার বাড়ির কাছাকাছি এসে পৌঁছে সৈন্যরা তাকে থামায়। অসহায়, নিরুপায় গোবিন্দ চন্দ্রের সামনেই তার দুই কন্যা ধর্ষিত হয় -- কয়েকবার এবং বারবার।

বাচ্চাটি ছিল ৩ বছরের, এবং তার মা-ই তখনও কিশোরী। গ্রীষ্মের বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত হওয়া মাটিতে তারা বসে ছিল। বাচ্চাটির পেট অদ্ভূতভাবে ধুঁকছিল, তার পা ফুলে আছে, তার হাত মানুষের আঙ্গুলের চেয়েও পাতলা। তার মা নানাভাবে চেষ্টা করলো তাকে কিছু ভাত ও শুকনো মাছ খাওয়াতে। অবশেষে, শিশুটি দুর্বলভাবে খাবার মুখে নিল, শরীরের ভেতর থেকে গোঙানি বেরিয়ে আসল -- এবং মারা গেল।


কিছু লোক পশ্চিমাদের চাইতে পাকিস্তানীদের কম চেনে। যখন হাজার হাজার মানুষ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে আক্রান্ত হয় এবং যে-দুর্যোগ প্রতিবছরই এসে থাকে, তাদের ভোগান্তি নিয়ে সংবাদপত্রে যে-সংখ্যা প্রকাশিত হয় তাতে অবাস্তব চিত্রই ফুটে ওঠে। এবং আজ পর্যন্ত কেউই পাকিস্তানী গৃহযুদ্ধের সে-দুঃস্বপ্নের কথা ভুলতে পারে না: আড়াই লাখ বাঙালি মারা গেছে, পুরো জনগোষ্ঠীকে ইচ্ছাকৃতভাবে সন্ত্রস্ত করার জন্য আরও ষাট লাখ লোককে নিজ দেশ থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছে। এটা যেন সেরকম কোনো ঘটনা যেক্ষেত্রে জার্মানির বন-এর মতো শহরকে নিশ্চিহ্ন করে দেয়া হয়েছে এবং লন্ডনের মতো শহরের লোকজন হঠাৎ গৃহহারা হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ ও নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে অজ্ঞ জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে যদি এরকম ঘটে থাকে তবে ভোগান্তির মাত্রা কী মাত্রায় হতে পারে তা সহজেই অনুমেয়।

এবং পরিস্থিতি তার চাইতেও ভয়াবহ। গৃহযুদ্ধের মাধ্যমে পাকিস্তান যেভাবে নিজেকে ধ্বংস করতে মত্ত হয়েছে, তার চেয়েও ভয়ংকর ব্যাপার হলো মুসলিম পাকিস্তান ও হিন্দু ভারতের মধ্যে আরও একটি যুদ্ধ লেগে যেতে পারে। গত সপ্তাহে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ঘোষণা করেছেন ভারত যদি বাংলাদেশকে (বিচ্ছিন্নতাবাদী বাঙালি জাতিকে এই নামেই ডাকা হচ্ছে) আরও সাহায্য করে তবে "বিশ্ববাসী একথা জেনে রাখুক, আমি সর্বাত্মক যুদ্ধ ঘোষণা করব"। বিশ্ব সেকথা জেনে রাখছে। এজন্য পাকিস্তানের বন্ধু চীন ও ভারতের বন্ধু রাশিয়াকে অংশগ্রহণ এড়ানোর জন্য কঠিন চাপের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। আর পক্ষ নির্ধারণের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রকেও বিপদের কথা ভাবতে হবে। ইতোমধ্যে বিশ্ব-রাজনীতির বাস্তবতার কারণে যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত ও মানবিক দিক বিবেচনায় কোনটাকে বেছে নিবে সে ধন্যবাদ-বিহীন কাজটি করতে হচ্ছে। ইয়াহিয়ার সরকারের ওপর প্রভাব রাখা শুরু করার কারণে ও ভোগান্তির শিকার বাঙালিদের সাহায্য করতে দ্বিধাগ্রস্ত হবার কারণে আমেরিকা কেবল নিজেকে নিন্দনীয় বিতর্কের মধ্যে নিয়ে যেতে সফল হয়েছে। গত সপ্তাহে এই বিতর্কটি ঘনীভূত হয় যখন সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি পাকিস্তানে মার্কিন কূটনীতিকের গোপন বার্তার বিষয় প্রকাশ করলে। একটি বার্তায় আছে "দুর্ভিক্ষের অশুভ ছায়া পূর্ব পাকিস্তানে দেখা দিয়েছে"। "ব্যাপক বি¯তৃত ক্ষুধা, ভোগান্তি ও সম্ভাব্য অনাহার রোধ করা ভালো হবে না"। কেনেডির পরিস্কার বক্তব্য ছিল নিক্সন-প্রশাসন বাঙালি-ট্রাজেডিকে বাড়িয়ে তুলতে চায়। এবং, সেই বার্তাই শুধু নয়, তিনি আরও বলেছেন, বাঙালিদের প্রতিরোধকে দমন করার জন্য নিয়োজিত ইয়াহিয়ার পাঞ্জাবি সৈন্যদের সাহায্য করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পরিকল্পনা রয়েছে।

দু-টি পৃথক সংস্কৃতি

এরকম ঠাণ্ডা-মাথার পদক্ষেপের মাধ্যমে, আধুনিক সময়ের অন্যতম অব্যবস্থাপনাযোগ্য জাতিগত ও সাংস্কৃতিক দ্বন্দ্বকে যুক্তরাষ্ট্র সমাপ্তির দিকে নিয়ে যাবে। ভৌতভাবে ও রাজনৈতিকভাবে, পাকিস্তান পৃথিবীর মধ্যে অন্যরকম একটি দেশ; এর পশ্চিমাঞ্চল হলো বন্ধুর ও অপেক্ষাকৃত ফাঁকা এবং পূর্বাঞ্চল ব্যাপকভাবে জনবহুল এবং এই দুই অঞ্চলের মধ্যে রয়েছে এক হাজার মাইলের ভারতীয় ভূখণ্ড। আর পাকিস্তানের দুই অংশ ভৌগোলিকভাবে দুভাগে বিভক্ত হবার চাইতে বড় ব্যাপার হলো এটি এমন একটি দেশ যেখানে চরমভাবে পৃথক দুটি সংস্কৃতি রয়েছে, এবং এমন দুই জনগোষ্ঠি আছে যারা ঐতিহাসিকভাবে পরস্পরকে অপছন্দ করে এসেছে। পাতলা চামড়ার আক্রমণাত্মক পশ্চিম-পাকিস্তানের পাঞ্জাবিরা পূর্বের বাঙালিদের বুদ্ধিহীন কৃষক অথবা ব্যাবসায়ী হিসেবে অবমাননা করে। অন্যদিকে বাঙালিদের উর্বর ভূমির মানসম্পন্ন চাল ও পাটের সোনালি আঁশ ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকেই দেশটির বেশিরভাগ অর্থনৈতিক মুদ্রা সরবরাহ করে থাকে -- তারা পাঞ্জাবিদের বর্বর মনে করে এবং পরিস্থিতি আরো খারাপ হয়েছে এজন্য যে আক্রমনাত্মক বর্বররা পাকিস্তানি সরকার ও সেনাবাহিনীতে একচেটিয়া দখলদারিত্ব নিয়েছে।

কয়েক দশক ধরে শোষিত হবার পরে গত ডিসেম্বরে বারো বছরের সামরিক শাসনের পর ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর প্রথম সাধারণ নির্বাচনে বাঙালিদের অনলবর্ষী নেতা ও সিংহপুরুষ শেখ মুজিবুর রহমান নেতৃত্ব দেন, তখন তারা উম্মাদনাপূর্ণ উদ্দীপনায় সাড়া দেয়। মুজিবের অনলবর্ষী বাগ্মিতায় (তার অন্ধ ভক্তরা যেভাবে বর্ণনা করে) উদ্দীপ্ত হয়ে বাঙালিরা এমনভাবে ভোটদান করে যে মুজিব ও তার আওয়ামী লীগ নতুন জাতীয় সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। হঠাৎ দেখা গেল বাঙালিদের কাল চলে এসেছে। কিন্তু ঘটনাটি ঘটে যাবার পর পূর্বের জন্য মুজিবের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি পাঞ্জাবি নেতাদের কাছে বিরাট হুমকি হিসেবে দেখা দিল। মুজিবের সঙ্গে দ্বিতীয়বার প্রতারণা করতে অনিচ্ছুক পশ্চিম-পাকিস্তানের বামপন্থী নেতা জুলফিকার আলি ভুট্টো নতুন সংসদে বসতে অস্বীকৃতি জানালেন। এবং পরিশেষে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া হঠাৎ করে অনির্দিষ্টকালের জন্য সংসদের উদ্বোধন বাতিল করে দেন।

গণহত্যার পরিকল্পনা

ইয়াহিয়ার আদেশ জারির পরপরই মুজিব পূর্ব পাকিস্তানে সর্বাত্মক ধর্মঘটের ডাক দেন। পাকিস্তানি কর্মকর্তারা বলে থাকেন এসময় ইয়াহিয়া ব্যক্তিগতভাবে মুজিবের কাছে আপস-প্রার্থনা করেন দেশের ক্ষতি নিরাময় করার জন্য। কিন্তু বেশিরভাগ পর্যবেক্ষক মনে করেন ইয়াহিয়ার মাথায় অন্য মতলব ছিল। ইয়াহিয়া-মুজিবের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবার কয়েক সপ্তাহ পূর্বেই রাষ্ট্রপতি ও তার ডান-হাত লে. জেনারেল টিক্কা খান মুজিবকে গ্রেফতার করা, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা ও বাঙালি জাতীয়তাবাদীদের হত্যা করার পরিকল্পনা করছিলেন।

১৯৬৫ সালে স্থানীয় একটি জাতিগত বিদ্রোহ বিমান ও পদাতিক উপায়ে দমন করে টিক্কা খান 'বেলুচিস্তানের বোম্বার' হিসেবে পরিচিতি পান। তিনি বাংলায় সমরশক্তি বাড়ানোর জন্য কালক্ষেপণ করতে ইয়াহিয়াকে আপাতভাবে রাজি করাতে পেরেছিলেন। সে-অনুসারে ইয়াহিয়া মুজিবের সঙ্গে আলোচনার কাজটি চালিয়ে যাচ্ছিলেন। আর যখন দুই নেতা আলাপ চালিয়ে যাচ্ছিলেন―এবং বাঙালিরা এবং সারা বিশ্ব পাকিস্তানকে রক্ষার জন্য আপসরফার জন্য তাকিয়ে ছিল―সেনাবাহিনী তখন আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। পাকিস্তান ইন্টারন্যাশনাল এয়ারওয়েজ-এর বেসামরিক বোয়িং ৭০৭ বিমান ব্যবহার করে, দক্ষিণ ভারতকে প্রদক্ষিণ করে জলভাগের ওপর দিয়ে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে সামরিক বাহিনী বাংলায় তার শক্তি দ্বিগুণ করে ৬০,০০০-এ উন্নীত করে। যখন টিক্কা সবকিছু প্রস্তুত বলে জানান তখন ইয়াহিয়া ঢাকা থেকে চলে যান। এবং সেই রাতেই বেলুচিস্তানের বোম্বার তার সেনাবাহিনীকে নামিয়ে দেন।

একটি নিষ্ঠুর ও আকষ্মিক আঘাত প্রতিরোধকে দ্রুত দমন করা যাবে, এই তত্ত্বানুসারে সেনাবাহিনীকে চরম আঘাত হানার জন্য নির্দেশ দেয়া হয় এবং সেনাবাহিনী এই নির্দেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করে। পূর্ব পাকিস্তানের রাজধানী ঢাকার রাস্তায় ট্যাংক দিয়ে নির্বিচারে মানুষ হত্যা করা হয় ও ভবন ধুলিস্যাৎ করা হয়। ঠাণ্ডা মাথায় পাঞ্জাবি সৈন্যরা নিরীহ নাগরিকদের মেশিনগান দিয়ে হত্যা করা হয় এবং সারা শহর জুড়ে বস্তিগুলোতে আগুন ধরিয়ে দেয়। দ্রুতই শহরটি মৃতদেহে ছেয়ে যায় এবং বিচ্ছিন্নতাবাদীদের উর্বর-ক্ষেত্র ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যাপক রক্তপাত হয়।

সেই কালো রাত জুড়ে এবং তারপর কয়েক দিন ও কয়েক সপ্তাহ জুড়ে গণহত্যা চলতে থাকে। এই হত্যালীলা শুধু ঢাকায়ই নয়, গ্রামাঞ্চল জুড়েও চলতে থাকে। ভারতীয় সীমান্তে নিজের গ্রাম দেখে এসে একজন ক্রন্দনরত বাঙালি সাংবাদিক বর্ণনা করলেন কীভাবে সবকিছু ধ্বংস করা হয়েছে: "আমি এক ডজন গ্রাম দেখেছি যেগুলোকে পুড়িয়ে ফেলা হয়েছে এবং ধ্বংস করা হয়েছে, এবং সর্বত্র মৃতদেহগুলোকে কাকে খেয়ে ফেলেছে। কী ভয়ংকর দুর্গন্ধ! কী বীভৎসতা! আমি প্রার্থনা করছিলাম যেন আমার গ্রামেও এই দৃশ্য না দেখতে হয়। কিন্তু সেখানেও একই দৃশ্য। গ্রামটি ছিল মৃতদেহের স্তূপ মাত্র। আমার স্ত্রী ও বাচ্চাদের খুঁজে পাই নি। সেখানে কেবল একজন বৃদ্ধাকে জীবিত পাওয়া গেল এবং তিনি কোনো কথা বলতে পারলেন না। তিনি কেবল মাটিতে বসে ছিলেন, কাঁপছিলেন এবং সুর করে নিচুগ্রামে কাঁদছিলেন"।

সময়ের পরিক্রমায় গণহত্যা থেমে গেছে কিন্তু পাকিস্তানি বাহিনীর নিষ্ঠুরতা কমেনি। নিউজউইকের লোরেন জেনকিনস্, যিনি জেনারেল টিক্কা খানের সৈন্যরা যে-রাতে হত্যাপরিকল্পনা নিয়ে রাস্তায় নামে সে-রাতে ঢাকায় নামেন, গত সপ্তাহে তিনি বর্তমানে পূর্ব-পাকিস্তানে কী পরিস্থিতি বিরাজ করছে সে-রিপোর্ট নিয়ে তার করেন:

প্রথম রক্তপাতের পর চার মাস পার হয়ে গেছে, পূর্ব পাকিস্তানে এখনও ভীতি বিরাজ করছে। সেনাবাহিনী আসলে ভয় দেখাতে চেয়েছিল। কিন্তু ভয় পাবার পরিবর্তে জনগণের মধ্যে নিরব ঘৃণা ও ক্ষোভ জমে উঠছে। যা ভয় আছে তা এসেছে নিষ্ঠুর বাস্তবতা মেনে নিয়ে, কোনো জনগোষ্ঠির মনোবল ভেঙ্গে দেয় এমন কোনো ভয় সেটা নয়। ঢাকার রাস্তায় হাঁটতে হাঁটতে আমার একজন সাংবাদিকের সঙ্গে দেখা হলো যাকে আমি আগে থেকে চিনতাম। আমাদের চোখাচোখি হলো এবং মাথা নেড়ে অভিবাদন করলাম, কিন্তু তাকে বিব্রত মনে হলো। নার্ভাসভাবে এদিক-ওদিক তাকিয়ে তিনি বললেন, "হায় খোদা, হায় খোদা। বেসামরিক মানুষ যা করা হয়েছে তার বর্ণনা দিতে পারবে না"। এক ঘণ্টা পরে আরেক বন্ধু ব্যাখ্যা করলেন: "আমাদের বিদেশী সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলা নিষেধ। আমরা ভয়ে দিন কাটাচ্ছি কবে মধ্যরাতে দরজায় কড়া নাড়া হয়। বহু মানুষকে মারা হয়েছে। আরো অনেক মানুষ নিখোঁজ রয়েছে। এবং প্রতিরাতে অনেককে গায়েব করে দেয়া হচ্ছে"।

মুজিবকেও গায়েব করে দেয়া হয়েছে, যাকে পশ্চিমের গ্যারিসন-শহর মিয়ানওয়ালিতে বন্দি করে রাখা হয়েছে বলে জানা যায়। এক-সময়ের নায়ক মুজিব এখন শাস্তিভোগ করছেন। সব উল্লেখযোগ্য অপরাধের জন্য তিনি এখন বাঙালি জাতীয়তাবাদের মূর্ত প্রতীক হয়ে উঠেছেন। এছাড়া ইয়াহিয়া সম্প্রতি গর্বভরে বলেছেন, "আমার জেনারেলরা এক মুজিবের জন্য সামরিক বিচার ও মৃত্যুদণ্ড দেবার কথা বলছেন। আমি রাজি হয়েছি এবং খুব তাড়াতাড়ি তা অনুষ্ঠিত হবে"। অন্য কোনো নীতি এর চেয়ে অবিমৃষ্যকারী, এর চেয়ে বাঙালি-নিগ্রহকে অধিক কঠোর করার মতো হতো। একজন পশ্চিমা কূটনীতিক আমাকে বললেন, "ইয়াহিয়া স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। তিনি এখনও বুঝতে পারছেন না সেনাবাহিনী কী কাজ করে বসে আছে। তিনি মনে করেন তারা দু-লাখ মানুষকে হত্যা করতে পারে, বিশ্বাসঘাতকতার জন্য মুজিবের বিচার করতে পারে, আইনশৃঙ্খলা আবার ফিরিয়ে আনতে পারবে, এবং সবকিছু ভুলে যাওয়া হবে। এই ভাবনা বোকার ভাবনা। এই জনগণ এসব কিছুই ভুলবে না"।

গেরিলা-প্রতিরোধ

সত্যিকার অর্থে, বাঙালিদের মনে একয়েকটা মাসের ভয়াবহ স্মৃতি চিত্রিত হয়ে আছে। ভীতিপ্রদর্শন সত্ত্বেও, সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধের চিহ্ন সব স্থানেই দেখা যাচ্ছে। গ্রামাঞ্চলে, ফেরি বোটে, যেখানে সব যাত্রী সেনাবাহিনীর নজরদারির ভেতরে রয়েছে, যাত্রীরা এক পাশে দাঁড়িয়ে গণহত্যার ব্যাপারে ফিসফিস করে আলাপ করে অথবা মধুপুরের গভীর জঙ্গলের গল্প করে যেখানে মুক্তি বাহিনীর যোদ্ধারা লুকিয়ে আছে। সারা-দেশে-প্রতিরোধ আদর্শ গেরিলা যুদ্ধে রূপ লাভ করছে। পূর্ব পাকিস্তান হলো দক্ষিণ ভিয়েতনামের মেকং ব-দ্বীপের মতো -- যেখানে ডুবে থাকা ধানী জমি, পাটক্ষেত ও কলাবাগান-এর ব্যাপক বিস্তার রয়েছে।

মুক্তিবাহিনী কিছু সুযোগ-সুবিধা কাজে লাগিয়ে তাদের কাজ হাসিল করছে। তারা ঢাকা থেকে বন্দরনগরী চট্টগ্রাম পর্যন্ত বি¯তৃত রেললাইন কেটে দিয়েছে ও তার সমান্তরালে চলে যাওয়া সড়কপথ ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। শতকরা ৬০ ভাগেরও বেশি খাদ্য এই পথ দুটো দিয়ে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু শান্তি স্থাপিত না হওয়া পর্যন্ত এই রাস্তাগুলো স্বাভাবিক হবার কোনো সম্ভানা নেই। ঢাকায় তিনটি বিদ্যুৎকেন্দ্র গেরিলারা ধ্বংস করার পর এখন মনে হচ্ছে কোনো শহর বা গ্রাম তাদের আওতার বাইরে নেই এবং এভাবেই তারা অর্থনীতিকে স্তব্ধ করে দিতে সক্ষম। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিদ্রোহী গেরিলাদের যে জিনিসটা সবচেয়ে বেশি দরকার, সেই জনসমর্থন তারা পুরোপুরি পাচ্ছে। দু-মাস আগে, নোয়াখালী জেলার গ্রামবাসীরা মুক্তি বাহিনীকে অনুরোধ করেছিল একটা ব্রিজ না-ভাঙ্গার জন্য। কারণ, এতে সেনাবাহিনী পাল্টা আক্রমণ-অত্যাচার করতে পারে। কিন্তু গত সপ্তাহে সেই গ্রামবাসীরা গেরিলাদের খুঁজে বের করে এবং ব্রিজটি ভেঙ্গে ফেলার জন্য বলে।

নিশ্চিতভাবেই, গেরিলারা সামরিক বাহিনীর সমকক্ষ নয়। মুক্তিবাহিনীর সংখ্যা যেখানে ২০,০০০ (আরও ১০,০০০ জন পরের মাসে যোগ দেবে, যারা ভারতে গোপন ট্রেনিং সম্পন্ন করতে যাচ্ছে) এবং অস্ত্র-শস্ত্রের পরিমাণ অল্প, সেই মুক্তিযোদ্ধাদের ৬০,০০০ সশস্ত্র ও দক্ষ সৈন্যের বাহিনীকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে। এবং প্রকাশ্য সাহায্য সত্ত্বেও, ভারত বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকারকে স্বীকৃতি প্রদান করতে সতর্কভাবে দ্বিধাগ্রস্ত থাকতে দেখা গেছে। এই দ্বিধাগ্রস্ততার পেছনে অন্যতম কারণ হলো নয়া দিল্লী সরকারকে ৬০ লাখ বাঙালি উদ্বাস্তুর দেখা-শোনা করতে হচ্ছে। নিউজউইকের এন্টনি ক্লিফটন পাকিস্তানের গৃহযুদ্ধ শুরু হবার পর থেকেই উদ্বাস্তুদের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরে আসছেন। তিনি গত সপ্তাহে কলকাতা থেকে এই রিপোর্টটি পাঠিয়েছেন:

ভারতের ওপরে যে চাপ পড়েছে তা বহন করা একরকম অসম্ভব। উদ্বাস্তুরা এখনও প্রতিদিন ৪০,০০০ জন হারে সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করছে। উদ্বাস্তু-কর্মসূচির দায়িত্বপ্রাপ্ত সাবেক আর্মি অফিসার পি. এন. লুথরা আমাকে জানালেন, "আমার ঘাড়ে এখন ছোট একটি দেশের দায়িত্ব এসে পড়েছে।" বাঙালিদের খাওয়াতে, পরাতে, থাকতে দিতে ও জরুরি ওষুধ সরবরাহ করতে প্রতিদিন ৩ মিলিয়ন ডলার খরচ হচ্ছে যা ভারতের দুর্বল অর্থনীতিকে আরও বিধ্বস্ত করে দিচ্ছে। আরও খারাপ ব্যাপার হলো, তহবিলের ঘাটতির কারণে উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে সবকিছুর অভাব দেখা দিয়েছে, যার ফলে ভোগান্তি, অসুখ ও মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলেছে। লুথরার মতে, এই ট্র্যাজেডির একমাত্র সমাধান হলো পাকিস্তানের ওপর বিশ্বের শক্তিসমূহকে জোর চাপ-প্রয়োগ করতে হবে, যার ফলে এই হত্যালীলা সে বন্ধ করবে এবং বাঙালিরা বাড়ি ফিরে যেতে সাহস পাবে।

সব ধরনের ভোগান্তির ক্ষেত্রে বাঙালিরা তাদের ধৈর্য ধরে রেখেছে। ভারতে এখন মৌসুমী বৃষ্টিপাতের সময়, কিন্ত বর্ষা এখানে হলিউডের বিখ্যাত বৃষ্টির মতো নয়। মেঘগর্জন ও বজ্রপাতের চাইতে এখানে স্বাভাবিক ও মুষলধারে বৃষ্টি হয়ে থাকে। উদ্বাস্তুদের ক্যানভাস-ছাওয়া তাঁবু দিয়ে বৃষ্টি চুঁইয়ে পড়ে তাদের ভিজিয়ে দেয় ও মেঝের মাটিকে কাদায় রূপান্তরিত করে, এবং নালা উপচে পানি প্লাবিত হয়। কিন্তু উদ্বাস্তুরা ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকে, বদ্ধ পানিতে গরুর বাছুর আটকে থাকে এবং এভাবে আমাকে তাদের দুর্দশার গল্প বলে যাতে আমি অন্যদের সেসব জানাই। আমি বীভৎসতার এক নোটবুক লিখে চলি -- ধর্ষণ, হত্যা ও অপহরণের। তারা আমাকে বলে কীভাবে তাদের বাচ্চারা ছুরিকাঘাতে মরেছে, তাদের স্বামী ও ভাইদের কীভাবে হত্যা করা হয়েছে, তাদের স্ত্রীরা কীভাবে অসুস্থতা ও অবসাদের কারণে ভেঙ্গে পড়েছে। সব গল্পই নতুন, কিন্তু সব গল্পই আবার একইরকম। এবং আমার লুথরার সহজ প্রশ্ন মনে পড়ে, "এইসব দেখে আপনি কীভাবে বলবেন যে মানবজাতি ক্রমে উন্নতি করে চলেছে?"

যেহেতু সামরিক বাহিনীর পীড়ন এবং গেরিলাদের চোরাগোপ্তা হামলা পাশাপাশি ঘটে চলেছে, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ তাতে অনিশ্চিত হয়ে চলেছে। ইতোমধ্যেই, বিশেষজ্ঞদের মতে, পাকিস্তানের অর্থনীতি ভঙ্গুর হয়ে পড়েছে। যুদ্ধ শুরু হবার পর থেকে, রফতানি ব্যাপকভাবে কমে গেছে। পাকিস্তানের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের অন্যতম ফসল পাট কাটা হয় নি, পশ্চিম-পাকিস্তানের ফ্যাক্টরিগুলো পূর্ব পাকিস্তানের যে-বাজারের ওপর বেঁচে থাকতো, উদ্বাস্তু ও বিদ্রোহীদের সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও বিলীন হয়ে গেছে। ঢাকায় একজন পশ্চিমা অর্থনীতিবিদ সতর্ক করে বলেছেন, "সংক্ষেপে, ইয়াহিয়ার সরকারকে দেউলিয়াত্বের সত্যিকারের বিপদকে মোকাবেলা করতে হচ্ছে"। সমানভাবে ভয়াবহ ব্যাপার হলো গণ-অনাহার। একই অর্থনীতিবিদ বলেন, "শিগগীরই কিছু না করা হলে, এখানে দুর্ভিক্ষ দেখা দেবে, যার কাছে পূর্বের সব ভোগান্তিকে কিছুই মনে হবে না"। কিন্তু সবশেষে বলা যায়, পাকিস্তানের সবচেয়ে বড় হুমকি হলো, ইয়াহিয়ার সেনাবাহিনীকে ঘিরে গড়ে ওঠা চরম ঘৃণা। করাচির একজন সম্পাদক বলেছেন, "পাকিস্তানের অস্তিত্ব মার্চেই শেষ হয়ে গেছে। এই দেশটি কেবল বেয়োনেটের ওপরেই বাঁচতে পারে। কিন্তু সেটা ঐক্যমত্য নয়, সেটা দাসত্ব। একটি দেশের ভবিষ্যতে কেবল দুই শত্রু থাকতে পারে না"।

যুদ্ধের হুমকি

অঞ্চলটিতে ইতোমধ্যে যথেষ্ট শত্রু রয়েছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে নয়া দিল্লী ও ইসলামাবাদ ব্যাপাকভাবে পরস্পরকে অপমান করেছে ও অভিযুক্ত করেছে এবং ক্রুদ্ধ বাক্য বিনিময়ের ফলে যুদ্ধ শুরু হবার সত্যিকারের সম্ভাবনা রয়েছে। কোনো কোনো ভারতীয় যুদ্ধ করার মধ্যেই অর্থনৈতিক লাভ দেখছেন; নয়া দিল্লীর ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ-এর মতে, লাখ লাখ বাঙালি উদ্বাস্তুকে দেখাশোনা করার চাইতে যুদ্ধ শুরু করাটা কম ব্যয়সাপেক্ষ হবে। গত সপ্তাহে একজন মার্কিন কর্মকর্তা বলেছেন, "সেসময় এখনো আসেনি। কিন্তু ভারতের একটি সামরিক চাপ রয়েছে, বেশ জোরালো সে-চাপ"। এবং মুক্তি বাহিনীকে সমর্থন করার জন্য পাকিস্তানেরও পাল্টা জবাব হিসেবে ভারতে সামরিক আক্রমণ করার ইচ্ছে আছে।

একটি দ্বিধাপূর্ণ পক্ষাবলম্বন

সমাজতন্ত্রী দুই পরাশক্তির এধরনের অংশগ্রহণ যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নিষ্ঠুর দ্বন্দ্বের মধ্যে ফেলে দেবে। বাঙালিদের ওপর অনস্বীকার্য দমন-পীড়নের পরেও পাকিস্তানের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অনেক দিনের পুরনো বন্ধুত্ব্ রয়েছে এবং পাকিস্তানকে পিকিংয়ের প্রভাব-বলয়ের বাইরে রাখার চেষ্টা করছে। পক্ষান্তরে ভারত হলো গান্ধী ও নেহেরুর সময় থেকে এশিয়ার সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের দেশ। যেকারণে যুক্তরাষ্ট্রের বন্ধু-রাষ্ট্রের তালিকায় ভারতের বিশেষ অবস্থান রয়েছে। দু-দেশের মধ্যে একটিকে বেছে নেয়া অর্থ অন্য একটি দেশকে দুঃখ দেয়া। যুক্তরাষ্ট্রের একজন পররাষ্ট্র-বিষয়ক বিশ্লেষক উপমহাদেশে যুদ্ধংদেহী অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা কী হওয়া উচিত, সে-সম্পর্কে বলেন: "আমাদের প্রথমে অবশ্যই শান্তিস্থাপনকারীর ভূমিকায় কাজ করার চেষ্টা করা উচিত, ১৯৬৬ সালে ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধের সময় রাশিয়া তাসখন্দে যে-ভূমিকা পালন করেছিল, সে-রকম পদক্ষেপই আমাদের নেয়া উচিত। যদি তা ব্যর্থ হয়, যুক্তরাষ্ট্র তা হলে নিজের একটা অবস্থান বের করতে পারবে যেক্ষেত্রে রাশিয়া ও চীন দুই পক্ষে কেবল সরবরাহকারী হিসেবে কাজ করে। কিন্তু তারা যদি প্রত্যক্ষভাবে জড়িয়ে পড়ে, তবে ওয়াশিংটনের পক্ষে একেবারে চুপচাপ বসে থাকা অসম্ভব হয়ে উঠবে। আমাদের একটা না একটা পক্ষে বাজি ধরতে হবে, তাদের অন্তঃত অল্প কিছু সাহায্য করতে হবে, এবং আশা করতে হবে যে, আমরা বিজয়ীদেরই সাহায্য করছি"।

সমর্থন ও সামরিক পরিকল্পনা দেয়া ছাড়া, বিশ্বের বৃহৎ দুই শক্তির কেউই ভারতীয় উপমহাদেশে নিজেদের সামরিকভাবে জড়াতে চাইবে না। কিন্ত ইচ্ছার বিরুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনাকে, তা সত্ত্বেও একেবারে উড়িয়ে দেয়া যায় না। সবকিছুর পরেও, পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ ও সম্ভবত, আরো লক্ষ লক্ষ এশীয়র ভাগ্য ইয়াহিয়া খানের ওপর নির্ভর করছে। এবং এই মুহূর্তে পাকিস্তানী রাষ্ট্রপতিকে নমনীয় হতে দেখা যাচ্ছে না তিনি এই সত্য উপেক্ষা করছেন যে, তার কারণেই জাতীয়তাবাদী গেরিলাদের সমাজতন্ত্রী বিদ্রোহীতে রূপান্তরিত হবার সম্ভাবনা রয়েছে। গত সপ্তাহে ইসলামাবাদে একজন কূটনীতিক বিষণ্নভাবে জানালেন, "পাকিস্তানের ট্রাজেডি হলো ইয়াহিয়া ভুলে গেছেন তিনি কী করছেন, তার কর্মকাণ্ডের কী ফলাফল হতে পারে তিনি তাও ভুলে গেছেন। এখন পাকিস্তানকে রক্ষা করার মতো একজন লোকই জীবিত আছেন, তিনি হলেন মুজিব। ইয়াহিয়া মনে করেন মুজিবকে অবশ্যই মরতে হবে। কিন্তু যেদিন তাকে মারা হবে, পাকিস্তানেরও মৃত্যু সেদিনই হবে"।

ত্রাণের রাজনীতি

যদি কোনো আমেরিকান বাঙালি-উদ্বাস্তুদের দুর্দশা নিয়ে এখনও না জেনে থাকেন, তবে বিটলস্-সদস্য জর্জ হ্যারিসন ও রিঙ্গো স্টার এসপ্তাহে তাদের তা জানিয়ে দিয়েছেন। বিখ্যাত রক-গোষ্ঠিটি ভেঙ্গে যাবার পর তাদের প্রথম জনসম্মুখে আসায় হ্যারিসন ও রিঙ্গো নিউ ইয়র্কের ম্যাডিসন স্কোয়ারে একটি কনসার্টের কথা ভাবলেন যা গৃহহীন বাঙালি শিশুদের জন্য উৎসর্গীকৃত হবে। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটি, ক্যাথোলিক রিলিফ সার্ভিসেস, ইউনিসেফ ও আমেরিকানস ফর চিলড্রেনস্ রিলিফ-এর মতো তাদের উদ্যোগও পাকিস্তানের গণহত্যার গৃহযুদ্ধের ব্যাপারে মার্কিন জনমত গড়ে তুলবে।

দু-বছর আগের বায়াফ্রান ট্রাজেডির সময় যেরকম উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল, অনেক সাধারণ লোক বাঙালিদের ত্রাণের ব্যাপারে, সেরকম কাজ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছে। এবং অনেকে এজন্য হতাশ যে, বায়াফ্রান শিশুদের উদ্ধার করার ক্ষেত্রে যেরকম ব্যাপক সাড়া পড়েছিল, তার তুলনায় বাঙালি-উদ্বাস্তুদের ব্যাপারে বিশ্ব-প্রতিক্রিয়া অনেক কম দেখা যাচ্ছে। পূর্ব পাকিস্তানে ভোগান্তির যে-ব্যাপকতা, তাকেই আংশিকভাবে এজন্য দায়ী করা চলে। ইন্টারন্যাশনাল রেসকিউ কমিটির পক্ষ থেকে ঘটনা যাচাই করার জন্য ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আসা ড. ড্যানিয়েল এল. ওয়েনার বললেন, "এটা এমন একটি সমস্যা যাকে আন্তর্জাতিকভাবে দেখতে হবে; ব্যক্তি-পর্যায়ে কোনো উদ্যোগ এর ভার নিতে পারবে না। ত্রাণ-সংস্থাগুলো পুরো সমস্যার কিছু দিক মাত্র দূর করতে পারবে। কিন্তু সমস্যার ব্যাপকতা জনগণকে পক্ষাঘাতগ্রস্ত করে তুলছে -- অসহায়ত্বের অনুভবে আগ্রহের অভাবই এখানে বড়ো ব্যাপার নয়"।

ব্যস্ত: বাঙালিদের দুর্দশা দূর করতে আন্তর্জাতিকভাবে যে-পদক্ষেপগুলো নেয়া হয়েছে, তার মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র-সরকার কৃতিত্বের দাবি করতে পারে। ওয়াশিংটন ভারতে অবস্থিত পূর্ব পাকিস্তানি উদ্বাস্তুদের জন্য ৭০.৫ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে (সোভিয়েত ইউনিয়ন এক্ষেত্রে ১১ মিলিয়ন ডলার দিতে চেয়েছে)। ৩৬০,০০০ টন মার্কিন খাদ্যসামগ্রী পূর্ব পাকিস্তানে যাবার জন্য প্রস্তুত রয়েছে। বর্তমানে, মার্কিন বিশেষজ্ঞদের মতে, গণদুর্ভিক্ষের হুমকি সরবরাহের কারণে নয়, বণ্টনের কারণেই বজায় রয়েছে। যদিও যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে ২ মিলিয়ন মার্কিন ডলার দিয়েছে ভাড়া করা বিমানে ত্রাণ-পরিবহণের জন্য, পাকিস্তান-সেনাবাহিনী সেগুলোর বেশিরভাগই সৈন্য ও অস্ত্র পরিবহণের জন্য ব্যবহার করেছে। ত্রাণকার্যে নিয়োজিত এক মার্কিন বলেন, "তারা পূর্ব পাকিস্তানে নিয়ন্ত্রণ-পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য এতো ব্যস্ত যে, তাদের নিজেদের নাকের দিকে তাকাচ্ছে না"।

এধরনের অভিযোগ এটা প্রমাণ করে যে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের নীতি সংশোধনের ব্যাপারে ওয়াশিংটনের সামান্যই সফলতা অর্জন করেছে। এরপরও নিক্সন-প্রশাসন ইয়াহিয়ার সরকারের প্রতি সহায়তা প্রদানের বিষয়টি এই ভেবে চালু রেখেছে যে, তাতে এধরনের সমর্থন ওয়াশিংটনকে কিছু সুবিধা দেবে। এই নীতির বিরুদ্ধে দেশে সমালোচনা বাড়তে থাকলে, যুক্তরাষ্ট্র সম্প্রতি সতর্ক হয়েছে। পরবর্তী বছরে পাকিস্তানের জন্য ১৩১.৫ মিলিয়ন ডলার সাহায্য চাওয়া হলে, পররাষ্ট্র-দফতর কংগ্রেসকে বলেছে, পাকিস্তান লাখ লাখ গৃহহীনের জন্য ব্যবস্থা না নিলে অর্থসাহায্য ফিরিয়ে নেয়া হবে। সন্দেহগ্রস্ত পর্যবেক্ষকরা মনে করতে পারবেন যে, যুক্তরাষ্ট্র এরকম একটি নিষেধাজ্ঞা গত এপ্রিলে জারি করেছিল; কিন্তু তার পরও দেখা গেছে পাকিস্তানী বিমানগুলো যুক্তরাষ্ট্রের দেয়া অস্ত্র ও খুচরো যন্ত্রাংশ ব্যবহার করছে। এবং গত সপ্তাহে, সিনেটর স্টুয়ার্ট সিমিংটন অভিযোগ করেন যে নিষেধাজ্ঞাটির এখনো অনেক ছিদ্র রয়েছে। সিমিংটন বলেন, "কর্তৃপক্ষ কোনো ব্যাখ্যা ছাড়াই জনসম্ম,ুখে দ্ব্যর্থবোধক বিবৃতি দিয়ে থাকে এবং চাপপ্রয়োগ না করা পর্যন্ত কোনো বিষয়ে সত্যিকারের তথ্য প্রদান থেকে বিরত থাকে"।

কৌশলী: ব্যক্তিগতভাবে মার্কিন কূটনীতিকরা একথা স্বীকার করেন যে, সবকিছুর পরেও, কৌশলগত কারণে ওয়াশিংটন পাকিস্তানের সঙ্গে ভালো সম্পর্ক রাখতে চেষ্টা করছে। একজন মার্কিন কূটনীতিক উপমহাদেশে আমেরিকার ভূমিকা শেষ করে দেয়ার বিপক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তিনি যুক্তি দেন, "যদি ভারত ও পাকিস্তান নিজেদের কাপুরুষতার কারণে পরস্পরেরর বিরুদ্ধে রক্ত ঝরায়, আর আমাদের কোনো ভূমিকা সেখানে না থাকে, তবে ঐ এলাকা সোভিয়েত ইউনিয়ন ও চীনের খেলার মাঠ হয়ে যাবে"। তার একজন সহকর্মী সরসরিভাবে সতর্ক করে দেন, "এমুহূর্তে আমরা মতাদর্শের চাইতে স্থিতিশীলতা নিয়ে আগ্রহী হয়ে পড়েছি ... এমুহূর্তে ইয়হিয়ার ওপরেই স্থিতিশীলতার সব সম্ভাবনা নির্ভর করছে"।

এছাড়া সমস্যাটির প্রতি নরম ভূ-রাজনৈতিক মনোভাবের মূল্য সবশেষে অগ্রহণযোগ্য বলে প্রমাণিত হতে পারে। আরেকটি বিষয় হলো ইসলামাবাদের ওপর চাপপ্রয়োগের জন্য অর্থনৈতিক সহায়তা রদ করার ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের হিসেব-কষা-নিস্পৃহতা, বিশ্বব্যাংক ও এগারো-জাতির কনসোর্টিয়ামকে বিব্রতকর অবস্থায় ফেলবে, যারা সবাই পূর্বাংশের 'রাজনৈতিক সমাধান' না হওয়া পর্যন্ত পাকিস্তানে উন্নয়ন-কর্মসূচি স্থগিত রেখেছে। (এমনকি বিশ্বব্যাংক পাকিস্তান ইস্যুতে বিতর্ক এড়াতে পারে নি। পাকিস্তানে সফর করা টিমের তৈরি করা সমালোচনামূলক একটি রিপোর্ট বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট ম্যাকনামারা গোপন করতে চাইলে, নিউইয়র্ক টাইমস্ তা প্রথম পাতায় প্রকাশ করে ফেলে)। পরে ম্যাকনামারা পাকিস্তানী সরকারের কাছে একটি চিঠি পাঠান, ব্যাপারটি ফাঁস হয়ে যাবার ব্যাপারে ক্ষমা প্রার্থনা করে।

এছাড়া, ওয়াশিংটনের দ্বৈত অবস্থান ভারতকে ইতোমধ্যে ক্ষেপিয়ে তুলেছে, যেখানে বেশিরভাগ কর্মকর্তাই বিশ্বাস করেন যে, ইয়াহিয়া বাইরের সাহায্য ছাড়া দমন-পীড়ন চালিয়ে যেতে পারতো না। ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রি স্মরণ সিং বলেন, "বর্তমান পরিস্থিতিতে যেকোনো দেশেরই অস্ত্র সরবরাহ করার অর্থ হলো বাংলাদেশে গণহত্যাকে সমর্থন করা। এটা ভারত-যুক্তরাষ্ট্রের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককেও প্রভাবিত করবে'। এভাবে ভুল হোক, শুদ্ধ হোক, পাকিস্তান প্রশ্নে প্রশাসনের দ্বিধাগ্রস্ত অবস্থান যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্কে এরকম একটি ধারণা তৈরি করবে, যা সচেতন ও সংবেদনশীল আমেরিকার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ হবে।

এধরনের শত্রুতা পরে বিপদের মাত্রা বেড়ে যায় যদি সমাজতন্ত্রী রাশিয়া ও চীনের সেখানে জড়িত হবার সম্ভাবনা বেড়ে যায়। চীনের প্রধানমন্ত্রি চৌ এন লাই ভারতকে 'সম্প্রসারণবাদী' হিসেবে আখ্যা দিয়েছেন, এবং 'সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য তাদের সংগ্রামকে' সাহায্য করার জন্য পাকিস্তানকে সহায়তা প্রদানের জন্য ইয়াহিয়ার কাছে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হয়েছেন। চৌ তার কথাকে খুব সহজেই কাজে অনুবাদ করে দেখাতে পারেন ভারতীয় সীমান্তে তার সৈন্যকে নিয়োগ করে ছোট ছোট যুদ্ধ ও অনুপ্রবেশের মাধ্যমে পাকিস্তানের শক্তি বৃদ্ধি করে। একজন মার্কিন কূটনীতিক বলেন, "পিকিং-এর প্রতিশ্রুতি থেকে পাকিস্তান সামরিক সাহায্য নিয়ে কিছু করতে গেলেই যুদ্ধ বেধে যাবে, ভারত রাশিয়ার কাছ থেকে সেরকম কিছু পাল্টা প্রতিশ্রুতি নেবার চেষ্টা করছে। এবং এথেকেই যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবে।"









সর্বশেষ এডিট : ১৪ ই আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১২:৫৬
৩টি মন্তব্য ১টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

আজকাল

লিখেছেন রাজীব নুর, ০৭ ই জুন, ২০২৬ রাত ১০:৫১



আজকাল আমার মনে হয় -
আমাকে কেউ পছন্দ করে না,
কারো কাছে গেলে, সে বিরক্ত হয়।
পোশাক অগোছালো, এলোমেলো চুল,
চোখের দৃষ্টি কেমন ঘোলাটে!
বীরত্ব দেখানোর কিছু নেই।
চতুর পুরুষ স্ত্রীর... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে ৯টি বছরঃ একজন লিলিপুটিয়ান থেকে সত্যিকার ব্লগার হয়ে উঠার গল্প

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ১:২৮

আজ আমার ৩য় বইয়ের জন্য চুক্তি করতে প্রকাশক আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। প্রকাশনা সংস্থা 'উত্তরণ'-এর মাসুদ ভাইয়ের বাংলাবাজারের অফিসে ঘণ্টাখানেক ছিলাম। তাঁর সাথে কথা বলতে বলতেই আমার মনে একটি বোধোদয় আসে! আমি... ...বাকিটুকু পড়ুন

একজন বণিক, যিনি বদলে দিয়েছিলেন সমগ্র আরবের ইতিহাস

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ০৮ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৪৩


মরুভূমির মাঝে দাঁড়িয়ে পুরো আরবকে বদলে দেওয়ার স্বপ্ন দেতেন একজন মানুষ। শুনতে পাগলামি লাগে, তাই না? কিন্তু সেই মানুষটা যদি ছোটবেলা থেকে কাফেলায় কাজ করে থাকেন, যদি তিনি জানেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

আসলে কেউ ফেরে না।

লিখেছেন রানার ব্লগ, ০৮ ই জুন, ২০২৬ সকাল ৭:০৬

মৃতরা ফিরে আসে না।
ফিরে আসে তাদের ফেলে যাওয়া শূন্যতা,
চায়ের কাপের ধোঁয়া,
অধেক বলা কোনো কথা
অথবা হঠাৎ থেমে যাওয়া কোন সুর

যে প্রেম চলে গিয়েছিল,
সে আর কোনোদিন দরজায় কড়া নাড়ে না।
শুধু একদিন আয়নায়... ...বাকিটুকু পড়ুন

সামুতে আবারও লিলিপুটিয়ানদের সংখ্যা বেড়ে যাচ্ছে

লিখেছেন সত্যপথিক শাইয়্যান, ০৮ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ১২:৫৮

আমার গত পোস্টে আলামিন১০৪ নামের এক ব্লগার মন্তব্য করেছেন যে - "এ আই দিয়ে হুমায়ূন আহমেদের মতো লেখা যায়।"
তিনি এ আই-কে প্রম্পট দিয়েছিলেন ' হুমায়ুন আহমেদের মতো গল্প লিখে... ...বাকিটুকু পড়ুন

×