সার্ক ফোয়ারার কাছে বাস থেকে নেমে পান্থপথ দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে বসুধা সিটির নির্মীয়মান প্রকাণ্ড ভবনটা দেখতে দেখতে সৌরভের মনে হলো, এশহরটা তার নয়। এসব স্থাপনা কাদের? তারা কারা, কাদের জন্যই বা এসব রাজকীয় আয়োজন? এখানে কী হবে -- মার্কেট এবং অফিস এবং আবাসিক ফ্ল্যাট? কারা কিনবে অথবা পজেশন ভাড়া নেবে? সৌরভ খুঁজে-পেতে তার পরিচিত একটি লোকেরও (মাসুদ খান বাদে) কথা মনে করতে পারলো না যারা এরকম একটি কংক্রিটের মার্কেটসিটি বা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারে বা ইতোমধ্যে হয়ে বসে আছে। তবে কেউ না কেউ তো কিনবে, বর্তমানে এশহরের সবচেয়ে বড়ো প্রপঞ্চ হলো মাল্টি-স্টোরেড বানানো এবং অবাক ব্যাপার হলো এর কোনোটি খালিও থাকছে না। এশহরের নাগরিকেরা -- কিছু কিছু নাগরিক -- কংক্রিট গেঁথে আকাশ ছুঁতে চাইছে। অবশ্য এদের সংখ্যা যে নেহায়েৎ কম তাতো নয় -- তা সৌরভের পরিচতের মধ্যে কেউ বা না-থাকুক -- অনেক লোকই তো এসব ফ্ল্যাট কিনে-টিনে আকাশের কাছাকাছি চলে যাচ্ছে, আর সৌরভের মতো মানুষদের কাছ থেকে তাদের দূরত্ব বেড়েই চলেছে। এরা তো সেই বাঙালি মধ্যবিত্ত শ্রেণীর লোকজনই তো না-কি? মধ্যবিত্তের হলোটা কী, তারা কি প্রমোটেড হয়ে গণহারে উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীভুক্ত হয়ে গেল, নাকি পুরো শ্রেণীরই অর্থ-সংস্কৃতি-মনোভাবের সার্বিক উত্তরণ ঘটে গেল। আর সৌরভ তা হলে কোন শ্রেণীভুক্ত? নিম্ন মধ্যবিত্ত? তাই তো! ও, তা হলে দাঁড়ালো কী? মধ্যবিত্ত শ্রেণী কি লোপ পেয়ে গেল? কী ভয়ঙ্কর কথা!
আচ্ছা আবার ভাবা যাক। একটা গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণী এরকম ঘোষণা না দিয়েই লোপ পেয়ে যাবে, তাতো হতে পারে না। নিশ্চয় কোথাও গোলমাল হচ্ছে। তাহলে আবার ভেবে নেয়া যাক। সৌরভ নিজের সঙ্গে আবার প্রথম থেকে বোঝাপড়ায় নামে। উচ্চবিত্তদের তো সবসময় চেনাই যায়, এই যেমন ধরা যাক এই বসুধা সিটির প্রকৃত মালিক যিনি, তিনি সেই শ্রেণীভুক্ত। তারা গুলশান/বনানী/বারিধারা বা বড়োজোর ধানমণ্ডিতে থাকেন। আর নিম্নবিত্ত শ্রেণীর হলো তারা যারা মেগাসিটির মধ্যকার ক্ষুদ্র সিটিসমূহের ছায়ায় বা আড়ালে ঢাকা পড়া বস্তিতে বাস করছে। মধ্যবিত্ত শ্রেণীতে যাবার আগে আরেকটি শ্রেণীকে চিনে নেবার দরকার আছে, বুঝলে মাহমুদ সৌরভ, (নিজের সঙ্গে ছাত্র-শিক্ষক খেলে সৌরভ) সেটা হলো বিত্তহীন/ছিন্নমূল/ভাসমান শ্রেণী যারা রেলস্টশন, ফুটপাথ বা পার্কে ঘুমায়। আর মধ্যবিত্তের মধ্যে মাহমুদ সৌরভ নিজেই তো এক শ্রেণীতে বিলঙ করছে -- নিম্ন মধ্যবিত্ত। আর উচ্চ মধ্যবিত্ত শ্রেণীর কিছু লোক তো আগে থেকেই ছিল। তাদের সংখ্যাই তো বেড়ে গেল? মানে এইসব মাল্টি-স্টোরেডে চড়ে-টড়ে তাদের সংখ্যা বেড়ে গেল। কিন্তু তাদের সংখ্যা কীভাবে বাড়লো? উচ্চ মধ্যবিত্তরা কি জন্মনিয়ন্ত্রণের কথা ভুলে বেশি করে পুত্র-কন্যা জন্ম দেয়া শুরু করেছে? তাতো নয়। তবে সৌরভের সন্দেহই ঠিক হলো -- মধ্যবিত্ত শ্রেণী লোপ পেয়ে গেল, অন্তঃত এশহর থেকে?
এতো বড়ো মারাত্মক কথা! মধ্যবিত্ত শ্রেণী হাওয়ায় মিলিয়ে গেল? তাহলে মধ্যবিত্ত মূল্যবোধের কী হলো? সংস্কৃতির? শ্রেণীর সঙ্গে সঙ্গে সেগুলোও কি লোপ পেয়ে গেল? তা অনেকখানি গেছেই তো! আগে মধ্যবিত্তের ঘরে একজন রবীন্দ্রনাথ বা একজন নজরুল বাস করতো। এখন সেই (উচ্চ)মধ্যবিত্তের অ্যাপার্টমেন্টে রট আয়রনের সোফাসেট আর ক্রিস্টালের শো-পিস বসে বসে ঝিমোয়। এরপরও সিদ্ধান্ত টানা যায় না, তৃতীয় বিশ্বের মেগাসিটি থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী হারিয়ে যাবার কথা নয়, যেতে পারে না। তবে পরিবর্তন কিছু একটা হয়েছে। সে যাই হোক না কেন, নিম্ন মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি হিসেবে সৌরভ আছে, থাকবে, তা সে একলা হলেও থাকবে।
এক কোটিরও বেশি লোক বাস করে এশহরে -- এই মেগাসিটিতে -- এশহর হয়তো তাদের, তাদের প্রত্যেকের। কিন্তু সৌরভ মাহমুদ নামের যে তিরিশোর্ধ্ব মানুষটা এই মুহূর্তে প্রচণ্ড গরমে হাঁটতে হাঁটতে বেইলি রোডের দিকে যাচ্ছে, এশহর তার নয়।
সৌরভের পরিচয় জানা যাক। সে বেইলি রোডে হেঁটে হেঁটে যাচ্ছে, ওখানেই তার অফিস। একটি বিজ্ঞাপনী সংস্থার কপিরাইটার সে। কিন্তু নিজের এই এপরিচয় সে গোপন করতে পারলেই যেন খুশি। চাকরিটা করে সে খেয়ে-পরে বাঁচে, স্ত্রীকে খাওয়ায়, বাচ্চাকে এবছর থেকে স্কুলে পাঠাচ্ছে। কিন্তু এই দরকারী পরিচয়টাকেই সে গোপন করে। আর গর্বভরে নিজের পরিচয় দেয় একজন থিয়েটারকর্মী হিসেবে। 'থিয়েটার হোক সমাজবদলের হাতিয়ার' -- এই স্বপ্ন নিয়ে সে নাট্যচর্চা করে। গ্রুপের জন্য সে দু-টি নাটক লিখেছে, গ্রুপে যোগ দেবার পর প্রায় সবগুলো প্রযোজনায় অভিনয় করেছে, আগামী প্রডাকশনের পরিচালনার দায়িত্ব গ্রুপ তাকে দিচ্ছে। গ্রুপের একজন নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হিসেবে তার ওপরে সবাই নির্ভর করে। বস্তুত এই নির্ভরতা সে অনেক সাধনার মাধ্যমে অর্জন করেছে। তার কর্মনিষ্ঠা, শেখার আগ্রহ, সততা, ধৈর্য, কর্মীগুণ তাকে এপর্যায়ে নিয়ে এসেছে। নইলে কেবল শতভাগ থিয়েটারকর্মী হবার লক্ষ্য নিয়ে মফস্বল থেকে শহরে রাজধানীতে আসার পর তাকে যে সবাই সাদরে বরণ করে নিয়েছে, তা নয়। তার অপ্রতিভতা, ব্রাত্যতা, শহুরে কানুন সম্পর্কে অজ্ঞতা তার অযোগ্যতা হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। সে লেগে ছিল, হতাশ হয়েছে কিন্তু ভেঙ্গে পড়ে নি। আজ সে তার গ্র“পের গুরুত্বপূর্ণ একজন কর্মী।
কিন্তু বিজ্ঞাপনকর্মী হিসেবে পরিচয় ভুলতে চাইলেও সে পারে না। নিজের কাছে সে বারবার ধরা পড়ে যায়; যে-থিয়েটার দিয়ে সে সমাজ বদলাতে চায়; সে-সমাজ বদলাচ্ছে না। কারণ তার মতো সৃষ্টিশীল লোকগুলোই বিজ্ঞাপন বানাচ্ছে, পণ্যের কৃত্রিম চাহিদা তৈরীতে লিপ্ত রয়েছে। তাদের হাত দিয়েই পণ্য পরিচিত হয়ে উঠছে, পণ্যসংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে। সবাই এখন কিনছে: কোকলিপিস্টিকসিডিসেলফোনশাড়িজুতোসানগ্লাসপেস্টফেয়ারএন্ডলাভলিঅলংকারচিপস্আইসক্রিমসাবানশ্যাম্পু ...। আর এসব পণ্যের ফেরিওয়ালা সে। মনভোলানো কপি লিখে ভোক্তাকে প্রলুব্ধ করা তার কাজ। নিজেকে অপরাধী মনে হয়।
এই বোধটা তার আগে ছিল না। গ্রুপের কর্মী মৃদুলা একদিন মাথার মধ্যে দ্বিধার কাঁটা ঢুকিয়ে দিল।
মৃদুলা খুব চটপটে বুদ্ধিমতি, গ্রুপের প্রাণও। গ্রুপের সবাই মৃদুলার সঙ্গ কামনা করে, সেও অকাতরে সবাইকে সমান গুরুত্ব দিয়ে কীভাবে যেন খুশি রাখতে পারে। গ্রুপের আনিস -- ওর স্বামী -- বলে যে মৃদুলা হলো সাম্যবাদী, স্বামীর জন্যও বাড়তি কোনো মনোযোগ বরাদ্দ নেই। টেলিভিশনের গুরুত্বপূর্ণ অভিনেত্রী মৃদুলা। কথাবার্তায় কোনো রাখঢাক নেই। কখনো কখনো এতো স্পষ্টভাবে কথা বলে যে ভড়কে যেতে হয়। সেদিন কী কারণে যেন রিহার্সেল বাতিল হলো, সম্ভবত মাসুদ ভাই হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে অনুপস্থিত ছিলেন। একেবারেই প্রাথমিক রিহার্সেল ছিল বলে লাইটের লোক আনিস মৃদুলার সঙ্গে আসে নি। ছুটির দিন ছিল। সবাই একে একে বাসায় বা অন্য কাজে ফিরে গেল। রাস্তার ওপাশে কফিশপে মৃদুলার সঙ্গে সৌরভের আলাপ হচ্ছিল।
--সৌরভ ভাই, একটা ভালো স্ক্রিপ্ট আছে, করবে নাকি।
--কীসের স্ক্রিপ্ট? টিভি নাটকের?
--তুমি যদি রাজি হও তবে আমি অফারটা নিই। আমার এগেইনস্টে একজন নবাগত সুদর্শনকে নেয়া হচ্ছে, অভিনয়ে একেবারে নাবালক। প্রেমকাহিনী, ফ্যামিলি ড্রামা -- কিন্তু একটু ভিন্ন স্বাদ আছে। তো নতুন কাউকে নিলে যে অভিনয় জানে তাকেই নেয়া উচিত, কী বলো?
--কী বলছো তুমি! তোমাদের ঔসব টেলিফিল্মে আমি নাই। কড়া আলো, কড়া মেকাপ, কড়া ডায়লগ, কড়া ড্রয়িংরুম ...
--কড়কড়ে টাকা ...
--আমার টাকার দরকার নেই।
--আছে, তোমার না-হোক তোমার বউয়ের, তোমার পুত্র-কন্যার দরকার আছে।
--দেখো মৃদুলা, থিয়েটার করতে এসেছি, আপস করতে আসিনি।
--এইসব আদর্শের কথা বলো নাতো। তুমি যখন এইসব বলো তোমাকে খুব বিরক্তিকর লাগে।
--মৃদুলা, খ্যাতি তোমাকে খেয়ে ফেলছে। তুমি অভিনয় শিখতে না শিখতেই টিভিতে নামলে, খ্যাতিও পেলে। থিয়েটারে সময় দিন দিন কমিয়ে দিচ্ছো। কিন্তু তুমি নিজে কি জান, তুমি কতটুকু অভিনয় জানো?
--এইরে, তুমি দেখি আমার মতো আসল কথা মুখের ওপরে বলা শুরু করেছো। এখন তোমাকে আর বিরক্তিকর লাগছে না। একটু আগে কফিটা বিস্বাদ লাগছিল, এখন ভালোই লাগছে। তবে তুমি যাই বলো না কেন, আনিসের কিন্তু আমাকে নিয়ে খুব গর্ব। ওর ধারণা আমি অচিরেই সুবর্ণা মুস্তাফার জায়গায় চলে যাবো। কিন্তু হাঁদাটা বোঝে না খোদার দেয়া এই চেহারাটা না থাকলে আমার পয়সায় বসে বসে খাওয়াটা আর হতো না।
--এভাবে বলছো কেন। তোমাদের এব্যাপারটা আমার ভালোই লাগে। তুমি আর্ন করো, আনিস বসে বসে খায় আর গ্র“পের লাইটিং করে। আমরা বউকে খাওয়াই, আর তুমি বরকে খাওয়াও। যে যাই বলুক, আমার ভালোই লাগে।
--আমারও কোনো অসুবিধা নাই, কিন্তু অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নাই বলে সে আমার প্রচুর গালি খায়। কেমন যেন হয়ে যাই, ওকে খুব দুর্বল লাগে, মেরুদণ্ডহীন লাগে। হয়তো এভাবে ভাবা ঠিক নয় কোথায় যেন কী কাজ করে।
--উপার্জন কম হলেও কিন্তু গালি খাওয়া লাগে।
--খাবেই তো, ভাবীকে সংসার সামলাতে নিশ্চয় অনেক কসরৎ করতে হয়। এজন্যই বলি টিভিতে কাজ করো, প্রয়োজনে সিনেমায় নেমে পড়ো।
--না না মৃদুলা, টাকার জন্য টিভিতে আমি নামছি না। সিনেমায় তো প্রশ্নই ওঠে না।
--দেখো রুমা ভাবীকে আমি একদিনই দেখেছি, সেদিন তার পরনে যে থ্রিপিস ছিল তা দেখে আমি একরকম কষ্টই পেয়েছি। একজন মধ্যবিত্ত নারীর কিছু ন্যূনতম স্বপ্নসাধ থাকে। স্বামী হিসেবে তোমার সেগুলো পূরণ করা উচিত। আচ্ছা, তোমার এই ধনুর্ভঙ্গ পণ কেন বলতো?
--আমি যখন গ্রুপে জয়েন করি, তার আগে খান ভাই আমাকে ইন্টারভিউতে কী জিজ্ঞেস করেছিলেন জানো? থিয়েটার করতে এসেছি মানে শেষ পর্যন্ত আমি টিভিতে নামতে চাই কিনা। আমি বলেছি না, আমি শতভাগ থিয়েটারকর্মী হতে চাই। তিনি বললেন বেশ ভালো, আমি যেন কখনো টিভির নাম মুখে না নেই -- নিজের চেহারা দেখানোর নার্সিসিজম প্রথমেই তিনি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। তিনি আক্ষেপ করেছিলেন, এখনকার ছেলেমেয়েরা থিয়েটার ভালোবাসে না, সবাই দ্রুত খ্যাতি আর অর্থ অর্জন করতে চায়। তিনি জেনে নিয়েছিলেন আমি বিবাহিত কিনা, সন্তান আছে কিনা। অ্যাড ফার্মের চাকরির অ্যাপয়েন্টমেন্ট লেটার দেবার সময় তিনি বলেছিলেন, তোমার যা শিক্ষাগত যোগ্যতা তা দিয়ে এই চাকরি হয়না। কিন্তু আমি এই ফার্মের এমডি হিসেবে তোমাকে চাকরিটা এজন্য দিচ্ছি যে, তুমি আমার গ্রুপের নিবেদিতপ্রাণ কর্মী হবে। অনেক পরে আমাকে বলেছেন, আমার এরকম একজন থিয়েটারকর্মী প্রয়োজন যে টিভিতে গিয়ে নষ্ট হবে না এবং ভবিষ্যতে গ্রুপের হাল ধরবে। তিনি আমাকেই সেরকম মূল্য দিচ্ছেন। আমাকে সেই মর্যাদা রক্ষা করতে হবে না!
--ও বুঝেছি, তিনি তোমাকে ব্যবহার করছেন।
--বাজে বকো নাতো। খান ভাইরা মুক্তিযুদ্ধের পরে থিয়েটার আন্দোলনটা গড়ে তুলেছেন, আর আমরা পরের প্রজন্ম, দ্রুত খ্যাতির প্রতিযোগিতায় তা নষ্ট করে ফেলছি। সবাই যদি দ্রুত খ্যাতির জন্য দৌড়ায়, তাহলে থিয়েটার টিকবে কী করে।
--কিছু মনে করো না, তুমি আমাদের বস্, পরের প্রোডাকশনের নির্দেশক। কিন্তু একটা সত্যি কথা বলি, তোমার মধ্যে কিছু মফস্বলী সততা আছে, আদর্শলিপি-টাইপ ইমোশন আছে। অভিজ্ঞ খানসাহেব সেগুলো দ্রুত আইডেন্টিফাই করতে পেরেছেন, তাই তোমার ঘাড়ে বন্দুক রেখে থিয়েটারের মোড়ল থাকতে চাইছেন।
--মৃদুলা, তুমি ইদানীং বেশি ফালতু কথা বলছো। শোবিজে গেলে এভাবেই মানুষ কমিটমেন্টহীন হয়ে যায়। তোমার উচিত থিয়েটারে আরও একটু মনোযোগ দেয়া। টিভি না ছাড়ো, মডেলিংটা অন্তঃত তোমার ছাড়া উচিত।
--সৌরভ ভাই, আঘাত পেলে বলে দুঃখিত। তবুও কথা যখন উঠেছে আরও দু-একটি কথা বলি। আমি জানিনা, তোমার এইসব কমিটমেন্ট-বিষয়ক কথাগুলো মাসুদ খানের শেখানো বুলি কিনা। যদি তা নাও হয়ে থাকে, তবে বলি, আমরা না হয় শোবিজে গিয়ে কম্প্রোমাইজ করছি। কিন্তু তোমার খান ভাই বা তুমি কি অন্যত্র কম্প্রোমাইজ করছো না?
--নো, নেভার। খান ভাইও তো টিভিতে খুব কম অভিনয় করেন। গত এক বছরে তিনি টিভিতে যান নি, ভারতে গিয়ে কেবল দুটো ভালো ছবি করে এসেছেন। দুটো ছবিই ইউরোপে ফেস্টিভ্যালে গিয়েছে। এসবকে কি তুমি কম্প্রোমাইজ বলবে?
--তোমরা যা করছো তা কম্প্রোমাইজের চেয়ে বেশি। তোমরা করছো হিপোক্রিসি, ভণ্ডামি।
--মানে?
-- আমাদের গ্রুপের স্লোগান কী? আমরা সমাজ বদল করতে চাই। আর সেই গ্রুপের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ দু-জন পশ্চিমা বহুজাতিক কোম্পানির পণ্যের ফেরি করে বেড়াচ্ছে। অ্যাডে তোমরা কী করো? পণ্যের গুণাগুণ বাড়িয়ে লিখছো, আমাদের মতো অভিনেত্রী কিংবা মডেলদের চেহারা ও শরীর বিক্রি করছো, মানুষকে ধোঁকা দিচ্ছো, তাদের পকেট খসাচ্ছো, যে-জিনিসটা তাদের না কিনলেও দিব্যি চলে যেতো সেই জিনিসটাও কিনতে বাধ্য করছো। চিপস্ আর কোলা খাইয়ে বাচ্চাদের বারোটা বাজাচ্ছো, শ্যাম্পু আর কসমেটিকসে মেয়েদের মেয়ে বানিয়ে রাখছো -- মানুষ হতে দিচ্ছো না। তোমরা হলে আসলে খচ্চর পুঁজিবাদের প্রতিনিধি। অথচ মুখে সংস্কৃতির সেবকের মুখোশ। তবে খান সাহেব খুব ভালোভাবে জানেন তিনি কী করছেন, কিন্তু তুমি জানো না তুমি কী করছো।
মৃদুলার আক্রমণে সেদিন সৌরভ বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল। তার মুখে আর কথা আসে নি। আসলেই তো, অ্যাড ব্যাপারটা তা হলে কী? সৌরভ কখনো গভীরভাবে ভাবে নি। তার সমস্ত মনোযোগ থিয়েটারে, আর অ্যাড ব্যাপারটাকে তার থিয়েটারের মতো না হোক, ক্রিয়েটিভ একটা কাজই মনে হয়েছে। কিন্তু মৃদুলা তার চোখ খুলে দিল, কিংবা খটকায় বেঁধে দিল। আর ব্যাপারটায় মৃদুলার স্পষ্ট ধারণা দেখে সে খানিকটা অবাকই হয়েছিল। টিভিতে বেশি মনোযোগী হতে দেখে মেয়েটার প্রতি তার এক ধরনের ক্ষোভ ছিল। তার প্রতিভায় সৌরভের আস্থা ছিল, কিন্তু প্রতিভাকে নষ্ট করছে দেখে আশা ছেড়েছিল। তাকে সুন্দরী সঙ্গিনী ছাড়া আর কিছু মনে হতো না। ঐ যে কফিশপে দু-জনের ঢোকাটা, সৌরভের কাছে একজন সুন্দরীর সান্নিধ্য পাবার সুযোগ বলে মনে হয়েছে, এজন্য সে পুলকও অনুভব করেছে। গ্রুপে একসঙ্গে কাজ করতে গিয়ে রিহার্সেলে, মঞ্চে দর্শকদের সামনে কতদিন মৃদুলার হাত ধরতে হয়েছে। বরাবরই ভালোলাগা মন ও শরীরকে আবিষ্ট করেছে, সুন্দরী সঙ্গিনীর স্পর্শ পেলে যা হয় আর কি। সেদিনের তর্কের পর মৃদুলার প্রতি আবার শ্রদ্ধা ফিরে এলো, পছন্দও বেড়ে গেল। কিন্তু তার মাথায় যে দ্বিধার কাঁটা ঢুকিয়ে দিয়ে গেলো তা এখন ক্রমাগত তাকে খোঁচায়।
মাঝে মাঝে সাধ জাগে পেশা পরিবর্তনের। কিন্তু তার যা শিক্ষাগত যোগ্যতা, তা দিয়ে অন্য চাকরি হবে বলে মনে হয় না। থিয়েটার করতে করতেই তো তার এই চাকরি পাওয়া, তার গ্রুপের সাধারণ সম্পাদক মাসুদ খান ডেকে নিলেন তার ফার্মে। খান বিখ্যাত অভিনেতা-নির্দেশক, থিয়েটার সংগঠক আন্তর্জাতিক খ্যাতিও আছে তার। কিন্তু মৃদুলার সঙ্গে সেই আলাপের পর মাঝে মাঝে ভাবে সৌরভ, মাসুদ খান কতটুকু সমাজ-সংস্কারক আর কতটুকু পুঁজিবাদের প্রতিনিধি? থিয়েটার করে সমাজকে কতুটুকু শুধরেছেন, আর বিজ্ঞাপন করে মানুষকে কতটুকু ভোক্তা বানিয়েছেন? সৌরভের খটকা জারি থাকে। মাঝে মাঝে মনে হয়, খান ভাইকে এব্যপারে কিছু জিজ্ঞেস করবে। খটকা দূর হওয়া দরকার। আবার ভাবে খান ভাই তাকে স্নেহ করেন। সে জানে। এমন নয় যে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন যে সৌরভকে তিনি বিশেষ পছন্দ করেন, কিন্তু অফিসে-থিয়েটারে তার আপাত গাম্ভীর্যের পেছনে সৌরভের জন্য যেন প্রশ্রয়ের একটি জায়গা আছে, সৌরভ টের পায়। তার ফার্মের সম্প্রসারণ হয়েছে, সৌরভের বেতন বেড়েছে। অনেক তরুণ হওয়া সত্ত্বেও তাকে গ্রুপের পরবর্তী নাটকে নির্দেশনার দায়িত্ব দিয়েছেন। তাকে এসব জিগ্যেস করে বিব্রত করা কি ঠিক হবে? বিশেষত তার মতো বিরাট ব্যক্তিত্বের সামনে দাঁড়িয়ে এসব বলা তার জন্য কি মানায়? গ্রুপে তিনি একরকম -- প্রগলভ, খানিকটা খোলামেলা। কিন্তু অফিসে খুবই গম্ভীর, রাশভারি। সৌরভের মনে হয় তার এই দুই রূপের মধ্যে অফিসেরটাই আসল রূপ, থিয়েটারে যে তিনি খানিকটা নিজেকে মেলে ধরেন, তা যেন থিয়েটারের খাতিরেই। হয়তো তার এই ব্যক্তিত্বের কারণে, তার খ্যাতির কারণে কিংবা থিয়েটার নিয়ে তার গভীর জ্ঞান ও অধ্যয়নের কারণে গ্রুপের সবাই তাকে পছন্দ করে। ভালবাসে, সমীহ করে, শ্রদ্ধাও করে। একজন মানুষ কীভাবে একইসঙ্গে সবার ভালবাসা-শ্রদ্ধা-সমীহ অর্জন করতে পারে তা দেখে সৌরভ অবাক হয়ে যায়। কিন্তু মৃদুলা কি খান ভাইকে অন্য সবার মতোই দেখে?
সৌরভ কাজ বোঝে, হোক না তা থিয়েটারের খুঁটিনাটি বা বিজ্ঞাপনের কপি-স্লোগান -- দ্বন্দ্ব-সংঘাত সে এড়িয়েই চলে। স্ত্রীর অভিযোগ == অনটন-উদ্ভূত যতো অভিযোগ -- তার সবগুলো জেনুইন নয়; কিন্তু প্রায় সব অভিযোগই সে মেনে নেয়। বলে সে চেষ্টা করবে সমাধান করতে। এটি হয়তো তার চরিত্রের দুর্বলতাও। তার মতো প্রায়-দুর্বল লোকের পক্ষে মাসুদ খানের মতো ব্যক্তিত্ববান লোককে জিজ্ঞেস করা কঠিন যে অ্যাড করাটা কি থিয়েটার করার সঙ্গে কন্ট্রাডিক্ট করে কিনা।
কিন্তু খটকা থেকেই যাচ্ছে। তার মতো লোকের জন্য এই নিয়তি হয়তো বরাদ্দই থাকবে যে তাকে সবসময় দ্বিধায়, ডিলেমায় ভুগতে হবে। অনেক বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান সে নিতে পারে না, এ-হয়তো মফস্বলী জড়তা। বহিরঙ্গে শহুরে প্রলেপ, কিন্তু অন্তরঙ্গে গ্রামীন মূঢ়তা।
কিন্তু এই জটাজাল থেকে বেরুতে হবে। সৌরভ সিদ্ধান্ত নেয়।
তাকে হয়তো মৃদুলাদের সঙ্গে দৌড়ে সামিল হতে হবে। আপস তো আপসই, তার হয়তো কম-বেশি হয়না। কিন্তু মনকে একরকম প্রবোধ দেয়া যাবে, অ্যাড করার চাইতে টিভি-সিনেমা করা ঢের ভালো। চাকরিটা ছাড়বে সৌরভ, এজন্য মাসুদ খানের থিয়েটারটাও হয়তো ছাড়তে হবে। কিন্তু অন্য গ্র“প তো রয়েছে। তার মতো নিবেদিতপ্রাণ কর্মীকে নিশ্চয় অন্যরা লুফে নেবে, যেক্ষেত্রে আজকাল গ্র“পগুলোতে সাচ্চা কর্মীর সংকট রয়েছে। সে থিয়েটারে আরও মনোযোগী হবে, টেলিফিল্মেও পেশাদারী হবে। থিয়েটার করবে মনের জন্য, টেলিফিল্ম করবে পেটের জন্য। অ্যাড ছাড়লে দশটা-পাঁচটা অফিস থাকবে না, মনের ও পেটের কাজে নিজেকে নিবিষ্ট করা সম্ভব হবে।
সৌরভ যখন এই সিদ্ধান্ত নিতে সক্ষম হলো তখন রাত দুটো। স্ত্রী গভীর ঘুমে অচেতন। মৃদুলা কি ঘুমাচ্ছে? সৌরভের তক্ষুণি ইচ্ছে করছিল মৃদুলার সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু এত রাতে কাউকে ঘুম থেকে তোলা ঠিক নয়। আবার এমন তো হতে পারে মৃদুলা জেগেই আছে। একবার বলেছিল বোধহয়, তার ইনসমনিয়া আছে। তাই বলে রাত দুটোয় ফোন? সিমেন্সএথার্টিফাইভটা হাতে নিয়ে দীর্ঘক্ষণ ভাবে সৌরভ। শেষ পর্যন্ত ঠিক করলো ফোন করেই দেখা যাক না, দু-তিনবার রিং হবার পর না ধরলে কেটে দেয়া যাবে।
মৃদুলা ফোনটা ধরলো প্রথম রিং হবার পরেই।
--কী ব্যাপার সৌরভ ভাই, এতো রাতে?
--হ্যাঁ মানে, সরি। এতো রাতে তোমাকে বিরক্ত করলাম। ঘুমাচ্ছিলে কী?
--আরে না, আমি উত্তরায় শুটিঙে আছি। বলো কেন করেছ, কোনো সমস্যা?
--তোমার নাটকের অফারটা কি এখনও আছে?
ওপাশে খিল খিল করে হেসে ওঠে মৃদুলা।
--বুঝেছি, তুমি এইমাত্র টিভিতে নামার ডিসিশান নিয়েছো। হ্যাঁ আছে, আছে। তুমি যদি নায়ক হও তবে আমি সানন্দে নায়িকা হতে রাজি। কাল সকালেই আমি ডিরেক্টরকে বলে দিচ্ছি।
সেই রাতে আরেকটি সিদ্ধান্ত নেয় সৌরভ। মাসুদ খানের সামনে সে দাঁড়াবে। পেশা পরিবর্তন হোক বা না হোক, মাসুদ খানের সঙ্গে বোঝাপড়া হওয়া জরুরি।
অ্যাড ছাড়ার পর, দ্বিধার কাঁটাটি মাথার ভেতরে এরপরও থেকে যাবে, সে জানে।
...
জুলাই ২০, ২০০৩। মগবাজার।
প্রথম প্রকাশ: রবিউল করিম সম্পাদিত লিটল ম্যাগাজিন 'ব্যাস'। পরে একই শিরোনামের গ্রন্থভুক্ত হয় (আগামী, ঢাকা, ২০০৫)। প্রচ্ছদ: শাহীনূর রহমান।
সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে আগস্ট, ২০০৮ দুপুর ১:৩৮

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



