সাইফুলের এক জিনিস বেশিদিন ভালো লাগেনা।
এইজন্য সে বেশিদিন স্কুলে যেতে পারেনি। ক্লাস নাইনে উঠতে না উঠতেই সে ম্যাট্রিক-পরীক্ষা নামক বিভীষিকা সম্পর্কে জানতে শুরু করে, ম্যাট্রিক ফেল করলে নাকি এতদিনের পড়াশুনার কোনো দাম নাই। আবার পাশ করেও লাভ কী? এরকম আরও কয়েকটা ডিগ্রি না পাইলে নাকি চাকরি নাই। তো যেই পরীক্ষা পাশ করলেও লাভ নাই, ফেল করলেও লাভ নাই, সেই পরীক্ষার জন্য পড়াশুনারও কোনো মানে হয়না। তারচাইতে ফুটবল খেলায় মন দিলে অনেক লাভ। ততদিনে সে হায়ারে এখানে ওখানে খেলতে যায়, কিছু টাকা আয়ও করে। তা দিয়ে সে আমেনাকে সুগন্ধি তেল কিনে দেয়, আসমাকে স্কুলগেটে বারোভাজা খাওয়ায় আর মোমেনাকে ৫০ টাকার বিনিময়ে চুমা খায়।
ক্লাস এইট নাগাদ বাপজান মারা গেলে তার স্কুলছাড়ার বিষয়টি জলের মতো সহজ হয়ে যায়। মাতো সংসারে দুধভাত-মাত্র। ঐটা ছিল তার জীবনের সেরা সময়। বিকালে ফুটবল খেলা ছাড়া সারাদিন ধরাবাঁধা কিছু নাই। গ্রামে-গঞ্জে টো টো করে ঘুরে বেড়াও, যা খুশি তাই কর। গ্রামে চ্যাংড়া পোলাপান স্কুলে যায়, ব্যাটা মানুষেরা হয় কৃষিকাম করে অথবা বাদলগঞ্জে ব্যবসা-বাণিজ্য করে। স্কুলে-না-যাওয়া কিছু কিছু দলছুট চ্যাংড়া কিংবা হাঁপানিপ্রবণ কিছু বুড়ো মানুষই গ্রামের রোদছায়ায় বেকার থাকে। সাইফুলের কাজ হতে পারে হাঁটুর বয়েসী পোলাপানকে বড়োদের গোপন গল্প শোনানো অথবা হাঁপানিপ্রবণ বুড়োর কাছ থেকে যুবাকালে তার জৈবিক দাপট কীরকম আগ্রাসী ছিল তা শুনতে শুনতে তাকে তাতিয়ে তোলা। ছেলেবুড়ো সবার সঙ্গেই মিশে যাবার একটা ক্ষমতা ছিল সাইফুলের।
স্কুলে না-গেলেও স্কুলগেটে যাওয়া একেবারে বন্ধ হয়নি তার। কারণ স্কুলে যাবার সময়, টিফিনের সময় কিংবা স্কুলছুটির সময়, দিনে তিনবার আমেনা-মোমেনা-আসমাদের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ থাকে। তাই দিনে একবার অন্তঃত সে স্কুলে যায়, হয় আমেনা বা মোমেনা বা আসমার সঙ্গে লাইন মারার চেষ্টা করে। বাপজানের দোস্ত রহমান মাস্টার আশপাশে থাকলে অবশ্য লাঠি নিয়ে তেড়ে আসে, স্কুল ছাড়ার জন্য সে সাইফুলের ওপরে ভীষণ ক্ষ্যাপা।
কিন্তু আমেনা-আসমাকে বারোভাজা-আমড়া খাওয়ানোর পয়সা আর জোটেনা। দেশে আজকাল কী হয়েছে পোলাপান খালি ক্রিকেট খেলে, ফুটবল ম্যাচ আর হয়না। হায়ারে-যাওয়া বন্ধ হবার যোগাড়। হাতে কিছু টাকা না-থাকলে সে আমেনা-মোমেনা-আসমাদের সঙ্গে লাইন মারবে কীভাবে? গঞ্জের কাপড়ের দোকানে সোলেমান চাচার সঙ্গে বসলে কিছু টাকা সে পাবে, কিন্তু ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক জায়গায় বসে থাকার ঐ কাম কে করে? নাহলে সোলেমান চাচা তো বাপজানের মরার পরপরই বলেছিল, পার্টনারশিপটা চালিয়ে যেতে চায়, যদি সাইফুল বাপজানের জায়গায় গিয়ে দোকানে বসে।
টাকার সরবরাহ থাকলে তার কাছে মনে হয় দুই তিনজনের সাথে পাশাপাশি লাইন মারা কোনো ঘটনাই না। টাকার অভাবে সে যে কতবড়ো প্রেমিক, এবার তা প্রমাণে মন দিল। সিগারেটের ছ্যাঁকা দিয়ে সে হাতে লিখলো 'আ'। একটা সুবিধা হলো সে আমেনা ও আসমা দুজনকেই এক আ দেখিয়ে বলতে পারলো যে তাকে সে কতটা ভালবাসে। তবে এই সুবিধাটা বেশিদিন টিকলো না। আমেনা ও আসমা একদিন গল্পচ্ছলে যখন একইসঙ্গে দাবি করা শুরু করলো যে সাইফুল তাকেই ভালবাসে, তখন আসল ঘটনা বেরিয়ে পড়লো। এক আ দুইজনকে একসঙ্গে সাইফুলের কাছে এনেছিল, আবার একই আ দু’জনকে নিমিষে দূরে ঠেলে দিল।
বাকি রইলো মোমেনা। কিন্তু নগদ টাকা ছাড়া মোমেনা কথা কয়না। অবশ্য মোমেনা যে খারাপ মেয়ে তা নয়। আসলে মেয়েটার দুর্ভাগ্য তাকে এরকম করেছে। বাপমরা মেয়ে, অসুস্থ মাকে নিয়ে চাচার সঙ্গে থাকে। বাপের কয়েক বিঘা জমির বিনিময়ে চাচা তাদের খেতে দেয়, নিরাপত্তা দেয়, স্কুলে পাঠায়। কিন্তু সত্য হলো খাবার বা নিরাপত্তা আসলে চাচা ঠিকঠাকমতো দেয়না। সঙ্গে আছে চাচীর অত্যাচার। মেয়েটা দেখতে একটু সুন্দরমতো আছে, আসলে তিনজনের মধ্যে সাইফুল মনে করে মোমেনাই বেশি সুন্দর। মোমেনার গরিবদশা না-থাকলে সাইফুল নির্ঘাৎ তাকেই বিয়ে করার কথা ভাবতো। ঐ খচখচানিটার কারণেই সে আসলে আমেনা-আসমার সঙ্গে লাইন চালিয়ে যায়। তো ঐ চুমা খাবার আগে বা পরে মোমেনা বলতো যে, ‘সাইফুল ভাই, মন ভালো না, স্কুলে তিনমাসের বেতন বাকি’ অথবা ‘সাইফুল ভাই, মায়ের খুব জ্বর, ডাক্তার দেখানোর পয়সা নাই’। টাকা দাও-চুমা খাও -- এই চুক্তিটা সাইফুল সহজভাবেই মেনে নিয়েছিল। আর যেহেতু মোমেনা তার লাইনের সঙ্গী, তাই তাকে ও তার মাকে দেখা সে একরকম দায়িত্ব বলেই মেনে নিয়েছিল। আমেনা ও আসমা হাতছাড়া হয়ে যাবার পর সাইফুলের মনে হলো, টাকা না থাকলে তার লাইন-মারা বন্ধ। আর লাইন-মারা ছাড়া জীবনের আর কোনো মানে নাই।
মার কাছ থেকে টাকা চেয়ে পায়না, কিছু থাকলে তো দিবে? সোলেমান চাচার কাছেও ধরনা দিয়েছিল, বাপজানের ব্যবসাপাতির কোনো টাকা তার কাছে থাকলে যদি পাওয়া যায়। চাচা বলেছিল, আছে কিছু, কিন্তু সাইফুল যেদিন সত্যিকারের কাজ-কাম করবে সেদিন সেই টাকা পাওয়া যাবে। সোলেমান চাচা একরকম ধমকই দিল, সারাদিন টো টো করে ঘুরে বেড়াও, স্কুল-কলেজ যাওনা, কাজ-কাম কিছু একটা কর। সাইফুল বুঝেছিল দোকানে না-বসায় চাচা খুব ক্ষ্যাপা আছে। মিন মিন করে বলেছিল, আমি একটা চ্যাংড়া মানুষ, আমার হাতখরচ লাগে। বাপজানের টাকা আপনার কাছে ...। সোলেমান চাচা নিম্ন অথচ দৃঢ়কণ্ঠে বলেছিল, তুমি এখন যাও।
মোমেনাই বুদ্ধিটা দিয়েছিল।
তুমাদের এত জমিজমা, তাও হাতখরচের টাকা জুটেনা! ... এইভাবে তো বেশিদিন চলেনা সাইফুল ভাই। তোমার পকেট গরম থাকলে, আমিও গরম থাকি। ... এইটাও পাইতা, সেইটাও পাইতা।
মোমেনার ইঙ্গিত স্পষ্ট ছিল। অল্প টাকায় ‘এইটা’ পাওয়া যায়, ‘সেইটা’ পাইতে হলে যথেষ্ট টাকা লাগবে। সেইটার জন্য অনেক জোরাজুরি করে এর আগে কোনো লাভ হয়নি। বিয়ার আগে এইসব কিছুতেই না -- এই ছিল তার মত। কিন্তু সেই মত পাল্টাতে পারে, যদি টাকা বেশি ঢালা যায়।
জমি বেচে এই টাকা পাওয়া সম্ভব। তবে জমি তো খুব বেশি না, পৌনে তিন বিঘা মাত্র, আর আছে একটা আমবাগান। মোমেনার কাছে ঐটাই হয়তো অনেক মনে হতে পারে। বাপজান মারা যাবার পর, জমি কয়টায় বর্গাচাষ করতো গ্রামেরই খলিল চাচা। জমি থেকে ধান-সবজি যা আসতো, সাইফুল আর তার মায়ের একরকম চলে যেত। কিন্তু সেইটার লোভে পড়ে সাইফুল পুবপাড়ার পাঁচকাঠা জমি প্রথম বিক্রি করলো। একসাথে এত টাকা সে কখনো দেখেনি, অন্তঃত নিজহাতে নেড়েচেড়ে দেখেনি। সেই টাকা দিয়ে জীবনে প্রথমবারের মতো সে মোমেনার সেইটা ভোগ করলো। তারপর আরও অনেক বার। কিন্তু তাও অনেক টাকা থেকে গেল। সেই টাকা দিয়ে সে কালার টিভি আর ভিসিডি প্লেয়ার কিনলো। এখন সে শুক্রবার টেলিভিশনে বাংলা ছবি থাকলে দেখে, নয়তো ভিসিডিতে হিন্দি আর মান্নার সিনেমা দেখে। আর বাদলগঞ্জ ভিডিওর দোকান থেকে সেইসব ছবি আনে আনে আর মোমেনার সঙ্গে সেইটা করার পাঠ নেয়।
তো এইটা-সেইটা করতে করতে মোমেনা গর্ভবতী হয়ে পড়লো। মোমেনা বললো, সাইফুল ভাই আমাকে বিয়া করে ফেল। সাইফুল মোমেনাকে বিয়া করে ফেলে, বয়স ২০ হতে না হতেই। ততদিনে ফসলী জমি সব বিক্রি করা সারা, বিয়ের খরচ আসে শেষ জমিটা বিক্রি করেই। মা প্রতিদিন কান্দে, আর মোমেনাকে শাপান্ত করে।
মাগিডা আমার পোলার মাথা খাইলো। আমার পোলা উচ্ছন্নে গেল।
সাইফুল পুরা উচ্ছন্নে গেলনা। কারণ মোমেনা ফিরে আসার বুদ্ধি দিল।
এখন আমি তুমার বউ। এখন সেইটা করার জন্য আমারে টাকা দেয়া লাগছে না। কিন্তু আমারে খাওয়ানোর জন্য এখন বেশি টাকা লাগবে। বাচ্চাডা আসতেছে।
কী করবো? জমিজমা তো সব শেষ।
ব্যবসা কর।
পুঁজি?
সোলেমান চাচার কাছে যাও। দোকানে বস।
কাপড়ের বস্তার মধ্যে ঠ্যাঙের উপরে ঠ্যাং তুলে সারাদিন বইসা থাকা আমার সম্ভব না। তুমি আমারে চিন। আর সোলেমান চাচার যা মিজাজ! স্বাধীন ব্যবসা করার বুদ্ধি দ্যাও।
সোলেমান চাচার কাছ থেকে বাপজানের টাকাডা এইবার নাও। মুরগির ফার্ম কর।
সোলেমান চাচা সাইফুলের সবকথা শুনে ৩৫ হাজার টাকার একটা চেক দিল সাইফুলকে। বসতভিটার সঙ্গেকার আমবাগানে মুরগির খামার শুরু করলো সাইফুল। মৌসুমী আসার পর সাইফুলের মধ্যকার উড়নচণ্ডী ভাবটা পুরোপুরি চলে গেল -- মেয়ের নাম সাইফুল প্রিয় নায়িকার নামানুসারেই রেখেছিল। আর সদ্যকৈশোরপেরুনো সাইফুল পুরোদস্তুর সংসারী মানুষ হয়ে গেল। ব্যবসায় একটা গতি এল। চারজনের সংসার চালানোর মতো সমর্থ হয়ে উঠলো সে। মার কান্দাকাটিও ততদিনে থেমেছে।
শুরুতেই বলা হয়েছে সাইফুলের এক জিনিস বেশিদিন ভালো লাগেনা।
তাই পোল্ট্রিব্যবসাও তার আর ভালো লাগছিলনা। আর একপর্যায়ে ব্যবসায় একটা স্থবির ভাব চলে এসেছিল। ভবিষ্যতে এর বৃদ্ধিরও কোনো সম্ভাবনা দেখছিল না সে। মাঝখান দিয়ে বার্ড ফ্লু রোগটা এসে ব্যবসার বারোটা বাজিয়ে দিল। সাইফুলকে ততদিনে জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবার উচ্চাভিলাষ পেয়ে বসেছে। সে একদিন সিদ্ধান্ত নিল বিদেশে যাবে। এই বুদ্ধিটা অবশ্য মোমেনার দেয়া না, বুদ্ধিটা দিল সাইফুলের দোস্ত রমজান।
রমজান হলো বাদলগঞ্জের চালের আড়তদার ও গুদামঘরের মালিক, গ্রামের সবচেয়ে ধনী রহমান মেম্বারের পোলা। সাইফুলের মতো স্কুলের পাঠ শেষ না করলেও রমজানের মতো তার জীবনে কোনো উড়নচণ্ডী-পর্ব ছিলনা। বাপের ব্যবসায় ছোটবেলা থেকেই সাহায্য করে। উপরন্তু এলাকায় ফেন্সিডিলের আমদানি তার হাত দিয়েই ঘটে। তার ব্যবসায়িক বুদ্ধি ভালো, রমজান পাগলের মতো জমিবিক্রি শুরু করলে সে বাধাই দিয়েছিল। তাকে বিয়ে-ব্যবসা করে থিতু হতে দেখে রমজান খুশি হয়েছে। সাইফুলের চেয়ে বয়সে তিন-চার বছরের বড়ো রমজান, কিন্তু বরাবরই দোস্ত বলে ডাকে সাইফুলকে। সাইফুলও এরকম বনেদী-বন্ধুর জন্য গর্বিত।
দোস্ত ব্যবসা তো আর বাড়েনা।
ধৈর্য ধর, হবে হবে।
আমার আর ভাল্লাগেনা। তোর ব্যবসা কীরকম জমজমাট!
হিংসা কইরা লাভ নাই। এইডা আমার বাপের ব্যবসা। বাপই সব কইরা রাখছে, আমি খালি জয়েন করছি। তুই তো তোর বাপের ব্যবসায় থাকলি না।
দোস্ত আমার লাখটাকার সঞ্চয় চাই। বুদ্ধি দে।
বিদেশ যা।
বিদেশ?
হ, বিদেশ। হাজরাপুকুরের আরমাইন্যা, আমার মামাতো ভাই, সেদিন গেল, তিনবছরের মাথায় পাঁচ লাখ টাকা নিয়া ফিরা আসলো। ঐখানে থাইকা ফ্যামিলিও দেখছে।
কুন দেশে যাবো?
মাহাথিরের নাম শুনছোস? মাহাথিরের দেশে যা। ব্যাটা দ্যাশটারে সোনার খনি বানাইয়া রাখছে। যাবি, কাম করবি আর সোনা নিয়া ফিরবি।
কীসের কাম?
আরে আরামের কাম। এসিরুমে অফিসের কাম।
আমার ফ্যামিলি? কে দেখবো?
তোর মা আছে, ভাবী আর বাচ্চারে দেইখা রাখবে। তোর মোবাইলটা ভাবীরে দিয়া যাবি। আর আমরা মাঝে মাঝে খোঁজ নিবো।
খরচ কেমন পড়বে?
পাসপোর্ট, সরকারের ফি, এজেন্টের ফি মিইলা দুই-সোয়া দুই লাখ।
এত টাকা!
আরে এইটা হইলো বিনিয়োগ। বেশি বিনিয়োগ করলে প্রফিট বেশি। কম টাকায় অবৈধ ভাবেও যাওয়া যায়, কিন্তু লাইফের রিস্ক। একবার পুলিশ ধরলে সোজা জেল।
টাকা কই পামু?
টাকা যোগাড় করা কঠিন, কিন্তু অসম্ভব না। তোর সঞ্চয় কত?
বিশ হাজার।
জমি বিক্রি কইরা তো কিছু করতে পারিসনি। এইবার আমবাগান আর পোল্ট্রিটা বিক্রি কর। ধর আরও বিশ হাজার। বাকি দেড় লাখ টাকা আমি যোগাড় কইরা দিব।
ক্যামনে?
ক্যামনে আবার, ঋণ! তয় যে ঋণ দিবে, সেও তো কিছু লাভ চাবে। তুই ফ্যামিলির জন্য যখন টাকা পাঠাবি, সঙ্গে তার ইন্টারেস্ট দিয়া দিবি।
সুদের টাকা?
আরমাইন্যাও তো এইভাবেই গেছিল। ছয়মাসের মধ্যে ঋণশোধ কইরা ফেলছে।
দেখি ভাইবা দেখি। মোমেনার সঙ্গে আলাপ করি।
ভাব। ভাইবা জানা। তবে মহিলাদের সঙ্গে সব বিষয় আলাপ করা ঠিকনা। ভাবীর পরামর্শ চাইলে তো সে কাইন্দা উঠবে। তোমারে ছাড়া একা কেমন থাকবো, বাচ্চারে কে দেখবে -- কিন্তু এইসব ভাবলে তো মানুষ ভাগ্য গড়তে পারতো না। তুই সিদ্ধান্ত নিয়া জাস্ট জানাইয়া দিবি। ভাবী শক্ত মহিলা, সংসার ঠিকই সামলাতে পারবে। তুই ভাইবা দেখ।
সাইফুল ভাগ্য গড়তে চেয়েছিল। তাই মোমেনার আপত্তি গায়ে মাখেনি। মার কান্দাকাটি ধরার তো প্রশ্নই আসেনা। মোমেনা শেষপর্যন্ত বলেছিল, আমার পেটে তোমার ছেলে। অর জন্মের সময় তোমার থাকা দরকার। এই তথ্য আচমকা মোমেনা সাইফুলকে দিলেও তা তার সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য যথেষ্ট ছিলনা।
মোমেনার শেষ কথা ছিল, এইখানে আমি একলা কান্দবো। কিন্তু তোমাকে ঐখানে আমার চাইতে বেশি কান্দতে হবে।
রমজানের ব্যবস্থাপনায় তার পাসপোর্ট হলো, হাতে চাকরির কাগজপত্র এলো, এবং একদিন ঢাকায় গিয়ে প্লেনেও উঠলো। দেখা গেল, তার মতোই আরও অনেক ভাগ্যান্বেষীতে প্লেনবোঝাই। ফ্যামিলির জন্য সবার মনখারাপ থাকলেও, সাইফুলের মতোই সবার মধ্যেই চাপা একটা আনন্দ-সুখ। কারও কারও মধ্যে সেটা শেষপর্যন্ত চাপাও থাকলো না, ফ্রি মদ অত্যধিক খেয়ে অনেকে প্লেনও ভাসালো।
কিন্তু মাহাথিরের দেশের বিশাল বিমানবন্দরে সকাল সকাল পৌঁছার কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সাইফুলের মন অনিশ্চয়তায় গ্রাস করলো। ঢাকা থেকে শুনেছিল, কোম্পানির লোকজন তাকে নিতে আসবে, সরাসরি কর্মস্থলে নিয়ে যাবে, কাজ বুঝিয়ে দেবে। কিন্তু সারাদিন কাটার পরও কেউ তাদের নিতে আসলো না। মাঝে মাঝে কালো কালো পোশাক পরা পুলিশের লোকজন এসে তাদের দেখে যায়, নিজেদের মধ্যে কী কী বলাবলি করে অজানা ভাষায়। কিন্তু তাদের সঙ্গে কথা বলে না কেউ। দুপুর নাগাদ কয়েকজন পুলিশ জানিয়ে যায়, পরবর্তী নির্দেশ না দেয়া পর্যন্ত তারা যেন এখানেই থাকে। এখানে মানে, বিমানবন্দরের গোডাউন মতো একটা জায়গা যেখানে আলো আছে কিন্তু বাতাস নাই। নিজেদের মধ্যে প্রাথমিক জিজ্ঞাসা-আলাপ শেষ, বিকেল নাগাদ সবার মধ্যে একটা আতঙ্ক গ্রাস করলো। মধ্যরাত নাগাদ ক্ষোভ জন্ম নিল। অনেক রাতে ঘুমে ঢলে পড়ার আগে সাইফুলের মনে হলো, একটা দিন নয়, এক যুগ যেন সে পার হয়ে এসেছে। সারাদিন ধরে মোমেনার শেষকথাটা মনে পড়ছিল। তবে সাইফুল জানে, এখনই ভেঙ্গে পড়া চলবে না, এতদূরে এসেই যখন সে পড়েছে, এর শেষ দেখতে হবে।
সকালবেলা কালো পোশাকের পুলিশদের তৎপরতায় তাদের ঘুম ভেঙ্গে যায়। বেশ কয়েকজন পুলিশ এসে প্রত্যেকের কাগজপত্র-পাসেপোর্ট চেক করা শুরু করে দিয়েছে। ভাষা বোঝা না গেলেও তাদের ব্যবহার দেখে মনে হলো এরা দেশী পুলিশের মতোই রুষ্টস্বভাবের। কাগজপত্র চেক করার পর তারা কোনো কিছু না বলেই চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ কে একজন চিৎকার করে উঠলো, ওই চুতমারানি, আমাগো কাম দিয়া যা!
তার মুখের ভাষা নিশ্চয়ই পুলিশ বুঝতে পারেনি, কিন্তু ক্ষোভের মাত্রা অপ্রকাশ্য ছিলনা। তারা তেড়ে এলো। “সিয়াপা? সিয়াপা? হু শাউট? হু শাউট?” বলে দৌড়াদৌড়ি শুরু করলো। প্রতিবাদী কণ্ঠটি কেন জানি হিন্দিতে বলে উঠলো, “মে বলতা হ্যায়”, হয়তো তার খানিক-জানা একমাত্র বিদেশী ভাষা ঐ হিন্দি বলেই। পুলিশ তাকে ধরে নিয়ে চলে গেল।
তবে এই প্রতিবাদে কাজ হলো। আধা ঘণ্টার মধ্যে একজন বাঙালিকে নিয়ে পুলিশ আবার হাজির হলো। বাঙালিটা যা বললো তার মানে এরকম, সাইফুলদের এজেন্ট কাগজপত্রে যে-কোম্পানির নাম লিখে দিয়েছে, তার কোনো অস্তিত্ব নাই। এরকম আজকাল খুব বেশি হচ্ছে। দুই দেশেরই বদমাইশ এজেন্টরা এই কাম আজকাল বেশি বেশি করছে। তবে সাইফুলদের অধৈর্য হলে চলবে না। কাজ তারা পাবে। কয়েকদিন অপেক্ষা করতে হতে পারে। তবে যেরকম কাজের কথা তারা শুনে এসেছে সেরকম কাজ পাবেনা। আর যেরকম বেতনের কথা শুনে এসেছে, সেরকম বেতন হয়তো পাবেনা। বাঙালি লোকটা আরও অনেক কিছুই বলছিল, বেশ খানিকটা বক্তৃতার মতো শোনাচ্ছিল শেষদিকে -- যে অসহায় বাঙালিদের জীবন নিয়ে ছিনিমিন খেলছে কতকগুলো প্রতারক এজেন্ট অথচ আমাদের সরকার নিশ্চুপ ... ইত্যাদি। কিন্তু সাইফুলের কানে সেসব আর ঢুকছিল না। কেবল মনে হচ্ছিল, জীবনের চরমতম ভুল সে করে ফেলেছে।
দু’দিন পরে সাইফুলসহ জনাদশেক জীবনের-চরমতম-ভুল-করা যুবককে একটা ট্রাকে করে নিয়ে যাওয়া হলো জঙ্গলে। সেখানকার আরেক গুদামঘরে তাদের থাকতে দেয়া হলো। পরদিন সকাল থেকেই শুরু হলো কঠোর পরিশ্রমের জীবন। উঁচু উঁচু রাবার গাছে উঠে রাবার রসের জন্য গাছের কাণ্ড চেরার কাজ। নির্জন জঙ্গলে কীটপতঙ্গের বিচিত্র শব্দ আর কঠোর পরিশ্রম সাইফুলের মনে দৃঢ় বিশ্বাসের জন্ম দিলো যে এই নরকবাস হলো আর জনমের পাপের শাস্তি। দেশের সঙ্গে কোনো যোগাযোগ নাই, মোমেনা-মৌসুমী-মা কেমন আছে কে জানে? কী সব অখাদ্য এরা খেতে দেয়, সাইফুলের মুখে রোচেনা। একরুমে গাদাগাদি করা অন্য শ্রমিকদেরও একই অবস্থা। সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনি, রাতে কোনোরকমে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে বেশি সময় লাগেনা। কোনো কোনো রাতে ঘুম ভেঙ্গে যায় কারও হু হু কান্নায়। এসব এখন গা-সওয়া সাইফুলের। অন্যকে সান্ত্বনা দেবার ভাষা কারও কাছে আর অবশিষ্ট নেই। ওরকম কান্না সাইফুলও কত কেঁদেছে, এরমধ্যে।
রাবার বাগানে মাস দেড়েক কাজ করার পর আবার আরেকদিন সাইফুলদের ট্রাকে উঠিয়ে দিলো। তবে এবার তারা খুশি। কারণ তাদের আরেক মালিকের কাছে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে। এবার তাদের কাজ দেয়া হবে সভ্য শহরে। জংলী জীবন থেকে মুক্তিই তাদের মনে বিরাট প্রশান্তি আনে। ধীরে ধীরে সুন্দর-মসৃণ-রূপসী এক শহরে তাদের ট্রাক ঢোকে। সাইফুল পায় টেসকো নামের সুপারমার্কেটের ক্লিনারের কাজ।
শহরে ঢুকেই সে জঙ্গলে কামানো টাকা দিয়ে একটা মোবাইল ফোনের সেট কেনে। দেশে ফোন করে। মোমেনা ফোন ধরে প্রথমেই বলে, তুমি বেঁচে আছো?
কী বলো, বেঁচে থাকবো না কেন?
এতদিন ফোন করোনি কেন?
আসলে এতদিন অনেক দূরের এক জায়গায় চাকরি করতাম, মোবাইল নেটওয়ার্ক ছিলনা। এখন নিয়মিত তোমারে ফোন করবো।
কোনোভাবে একটা খবর দিতে পারতা। মৌসুমী তোমার চিন্তায় শ্যাষ। দিন দিন শুকায়ে যাইতেছে।
আমার ছেলে কেমন আছে?
নড়ে-চড়ে।
মা ভালো আছে?
কান্দে।
তুমি?
কান্দিনা।
আমি জানতাম। তুমি অনেক শক্ত মেয়ে মোমেনা। আই লাভ ইউ।
কতদিন পরে বললা। বিয়ার পরে তো বলা ছাইড়া দিছো।
ক্যান, সেইটা করার সময় তো বলি।
কী খাও?
কতদিন সেইটা করিনা।
কী খাও?
নিজেরা রান্না করি। এখানকার খানা মুখে দিতে পারিনা।
বেতন কেমন?
যেমন শুনছিলাম, অত না। একটু কম।
তোমার দিয়ে যাওয়া পাঁচ হাজার শ্যাষ।
ক’দিন একটু চালাও। দুয়েক মাসের মধ্যেই একসঙ্গে কয়েক হাজার টাকা পাঠাবো।
মাসে দশ হাজার করে দেড় মাসে বেতন জমেছে পনের হাজার টাকা। এইখানে বেতন একটু বেশি, দেশী টাকায় বারো হাজার টাকা, যদিও চুক্তিমতো বিশ হাজার টাকা বেতন হবার কথা। খাটতে হবে দিনে বারো ঘণ্টা, সাতটা-সাতটা। সপ্তাহে কোনো ছুটি নাই। রমজানের বর্ণনামতো এতদিনে সত্যিকারের ঠাণ্ডাঘরে কাজ পেয়েছে সাইফুল। তবে কাজ তো নিম্নমানের, অফিসের কাজ তো নয়ই -- সারাক্ষণ ঘুরে ঘুরে মার্কেটের মেঝে মোছা, ক্রেতারা পেঁয়াজের খোসা ফেলে গেলে উঠিয়ে ফেলা, ফুডকোর্টে পানি গড়ালে, খাবার পড়লে পরিস্কার করা। কত বড়ো শহর, কত বিচিত্র মানুষের আনোগোনা। কিন্তু সাইফুলের জীবন প্রতিদিন একইরকম, একঘেঁয়ে। সকাল সাতটায় আসো, সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত মোছামুছি করো, ঘরে ফিরে রান্না করো। ঘুমিয়ে পড়ো। ঘুমানোর আগে কোনো কোনো দিন দেশে কথা বলা হয়।
ক’দিন ধরে মোমেনাকে ফোন করলে কেবল একটা কথাই বলে, টাকা পাঠাও। অন্য কথা শুনতেই চায়না।
কেমন আছো?
ভালোনা।
কেন?
টাকা-পয়সা কিছু হাতে নাই। আমরা কী খাই?
একটু চালায়ে নাও। আর দিন দশেক। বেতন পাবো, টাকা পাঠাবো।
দশ দিন চালাবো কেমনে?
রমজানের সঙ্গে দেখা করো। ধার চাও। বলো যে আমি যখন টাকা পাঠাবো, সে যেন কেটে নেয়।
ঠিকাছে।
আই লাভ ইউ।
বালের কথা রাখো।
মোমেনা লাইন কেটে দেয়।
প্রথম দেশে টাকা পাঠিয়েছে সাইফুল। পনের হাজার টাকা। পাঁচ হাজার টাকা মোমেনা পাবে, দশ হাজার ঋণশোধ বাবদে। আগেরবার ফোন করার সময় মোমেনার বাজে ব্যবহার সাইফুলকে কিছুটা অভিমানী করে তুলেছিল। টাকা পাঠানোর সপ্তাহখানেক পরে মোমেনাকে ফোন করে। মোমেনা জানায় রমজান পাঁচ হাজার টাকা দেয়নি।
রমজানকে ফোন করে সাইফুল।
কীরে দোস্ত, টাকা পাসনি?
পাইছি তো।
তোরে যে কইলাম মোমেনারে পাঁচ হাজার দিতে।
আর কইস না, সুদখোর ব্যাটা রোজ আমারে ডিস্টার্ব করে। দশ হাজার টাকা দিতে গেছি পুরা পনের নিয়া নিল।
কী কস? রমজান এইটা তুই কী করলি?
ঐ হারামজাদা একটা পশু। তুই মন খারাপ করিস না দোস্ত। পরেরবার টাকা পাঠালে আমি বেশিরভাগটা ভাবীকে দিয়া দিবো।
কিন্তু মোমেনার হাতে তো টাকা নাই। অগো চলবে ক্যামনে?
আমি আজই ভাবীর সঙ্গে দেখা করতেছি। কিছু টাকা দিয়া আসুমনে।
এরমধ্যে অনেকদিন ভয়ে-লজ্জায় মোমেনার সঙ্গে কথা বলেনি সাইফুল। বেতন হতে অনেকদিন বাকি। আর একমাসের বারো হাজার টাকা পাঠালে ব্যাংকের কমিশনে কমে দশ হাজার টাকা হয়ে যায়। সবাই তাই একসঙ্গে তিনমাসের বা ছয়মাসের টাকা পাঠায়। সাইফুল দিশা পায়না। খাওয়াদাওয়ায় অরুচি ধরে গেল, নিজের হাতে-করা দেশী রান্না মুখে দিলে তার বমি আসে। শরীরেও আর বল পায়না। সারাদিন ধরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাজ করে পায়ে খিল ধরে যায়। বউ-বাচ্চার চিন্তায় তার ঘুমও পালিয়েছে।
লজ্জার মাথা খেয়ে একদিন দেশে ফোন করে সাইফুল।
কেমন আছো?
ভালো।
আমি ভালো নাই। মন খারাপ, শরীরও খারাপ।
কী হইছে?
রাইতে বসে বসে কান্দি। তোমার কথা, মৌসুমীর কথা খুব মনে পড়ে।
আমি কান্দিনা।
চলো ক্যামনে?
রমজান ভাই চালায়।
তাই নাকি?
হ্যাঁ।
প্রায়ই আসে? তোমার খোঁজখবর নেয়?
হ্যাঁ।
টাকা ধার দেয়?
না।
তাইলে?
রমজান ভাইয়ের সঙ্গে একবার সেইটা করি, কিছু টাকা পাই। এইভাবে চলে যাইতেছে। ... শুনতেছো? ... তোমার চাইতে রেট বেশি দেয়। ... শুনতেছো? ...
সেই রাতে সাইফুল অনেক কাঁদলো।
প্রথম প্রকাশ: জেসমিন মুন্নী সম্পাদিত ছোটকাগজ 'দ্রাঘিমা', ফেব্রুয়ারি ২০০৯

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

