আমার প্রিয় পোস্ট
- ফিরে দেখা ২০১০ : বছরজুড়ে সামহোয়্যারইন ব্লগে যা কিছু আলোচিত-সমালোচিত... - ফিউশন ফাইভ
- টিপাইমুখ বাধ প্রসংগে: চাই সংগ্রামের আন্ত:সংযোগ - দিনমজুর
- যেকোন Webpage থেকে বিজ্ঞাপন অপসারন করুন, বিজ্ঞাপনহীন ওয়েবের জগতে আপনাকে স্বাগতম! (রিপোস্ট)
- নাফিস ইফতেখার
- সামহোয়ারইনের যত্তসব অপশনের ব্যাবচ্ছেদ - কাঙাল মামা
- খিস্তি ঠাটে ত্রিতাল ভৈরবের জঙ্গনামা: সামহোয়ার নিয়ে আরো কিছু ভণিতা - রিফাত হাসান
- ফেসবুকে বাংলা অক্ষর ছোট দেখার সমস্যা দূর করে নিন সহজেই.... - সুনীল সমুদ্র
- সাংবাদিক জীবন: তিনি যেভাবে নির্বাচনী চান্দা দিচ্ছিলেন...... - শওকত হোসেন মাসুম
- ফাহমিদুলের আত্মপরিচয় অনুসন্ধান: পুনর্পাঠ - ভূপর্যটক
- হাইব্রীড বীজ নিয়ে আশঙ্কা সত্যি হলো এবার 'সত্যিরা' ভয়াবহ আতঙ্ক ছড়াচ্ছে ! - মনজুরুল হক
- দুইরকম তারুণ্য - সুমন রহমান
- ভাস্কর্য বিবাদ: লালন উৎখাতের মচ্ছব বসিয়ে হাওয়ার ওপর তাওয়া গরম করে কার জন্য পিঠা ভাজা হচ্ছে? - ফারুক ওয়াসিফ
- গ্লোবাল ভয়েসের সপ্তাহের ব্লগার হিসাবে নির্বাচিত রেজওয়ান ভাইয়ের অনন্য সাক্ষাৎকার - কৌশিক
- অর্ন্তজালের বাংলা ওয়েব সাইটগুলোর একটা তালিকা তৈরী করলাম। - একজন ব্লগার
- বাংলা ব্লগের বিবর্তন ও সম্ভাবনা - রেজওয়ান
- বাংলা ব্লগ ও ব্লগ পলিটিক্স - রেজওয়ান
- পোস্ট ব্রাত্য রাইসুর, মরীয়া বিতর্ক মানস চৌধুরীর এবং আমাদের ব্লগারকূল - ফাহমিদুল হক
- সংবাদপত্রগুলোর কার অবস্থান কেমন - কাঙাল
- ফাহমিদুল হকের বহুলপঠিত একটি পোস্ট এবং ব্লগের লিখিয়েরা: একটি পর্যবেক্ষণ - রিফাত হাসান
- আগুণের পরশমনিতে ফাহমিদুল হক ও তার সাহিত্যের সুবাস - কৌশিক
- ফিরে দেখা ইতিহাস : ভাষা আন্দোলনের দিনপন্জী (১৯৪৭-৫৬)। উৎসর্গ - সকল ভাষাশহীদকে - মিরাজ
- আমেরিকা!!! - লাল দরজা
- শহরে ষোল জনা বোম্বেটে / করিয়ে পাগলপারা / নিলো তারা সব লুটে - মাহবুব মোর্শেদ
- যারা কথা বলার সময় বাংলার সাথে ইংরেজী মিশায় - তাদের কেন যেন বাটপার ধরনের মানুষ মনে হয়! - এস্কিমো
বিজ্ঞাপন-হাটে হঠাৎ সংবাদ: টিভি সংবাদের কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং
০৬ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ বিকাল ৫:৫৮
আমি সচরাচর টেলিভিশন সংবাদ দেখি না। অথচ সাংবাদিকতার ছাত্র ও শিক্ষক হিসেবে তা অবশ্যই আমার দেখা উচিত। তবে একই কারণে আমি টেলিভিশন সংবাদ দেখার দায়বোধ থেকে নিজেকে মুক্ত মনে করি। কারণ সাংবাদিকতার শাস্ত্রীয় এথিকস্ আমাকে শিখিয়েছে যে টিকে থাকা, এমনকি মুনাফার স্বার্থে গণমাধ্যমে বিজ্ঞাপন ছাপা বা প্রচার হতে পারে, কিন্তু অবশ্যই সেই বিজ্ঞাপনের কাছে নিজের সংবাদ বিক্রির মাধ্যমে নয়। তবে দুনিয়া শাস্ত্র মেনে চলে না, ব্যবহারিক চর্চাই বরং পরবর্তী সময়ে শাস্ত্রে অন্তর্ভুক্ত হয়। সেই বরাতেও বলা যায়, বাংলাদেশের বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেলে সংবাদের নামে যা চলছে, তা গোটা দুনিয়াতেই অদৃষ্ট। অন্তঃত আমাদের চেনাজানার মধ্যে কোনো দেশের টেলিভিশন-সংবাদেই এমনটা দেখা যায়না যে সংবাদের প্রতিটি স্লট বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে বিক্রি হয়ে গিয়েছে। সংবাদ যেন তাই যা বিজ্ঞাপনের আগে, পরে বা মাঝখানে পরিবেশিত হয়। হায়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড়ো পুঁজিবাদী দেশেও যে বিজ্ঞাপনের এই দাপট দেখা যায়না।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব ব্রডকাস্টারস্, অর্থাৎ বেসরকারী সম্প্রচার কোম্পানিগুলোর সমিতি এরকম একটি আচরণবিধি মেনে চলে যে, একটি টেলিভিশন চ্যানেল প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ সাড়ে নয় মিনিট বিজ্ঞাপন প্রচার করবে। এই হিসাবটা প্রাইম টাইম বা সান্ধ্যকালীন অনুষ্ঠানমালার জন্য। অন্যান্য সময় বিজ্ঞাপন প্রচারের সর্বোচ্চ সময়সীমা ১৬ মিনিট। অন্যদিকে সম্প্রচার মাধ্যমগুলোর দেখভালকারী সরকারী প্রতিষ্ঠান ফেডারেল কমিউনিকেশনস কমিশন (এফসিসি) এটা নিশ্চিত করেছে প্রতিদিন কী কী এবং কতসময় বিজ্ঞাপন প্রচারিত হলো, তার দৈনন্দিন তালিকা মাধ্যমগুলো সাত দিন পর পর এফসিসির কাছে জমা দেবে (এডগার ও রহিম, ১৯৮৩: ৩৪)।
আমি গত ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৯ এনটিভির সাড়ে ১০টার সংবাদ দেখতে বসে হিসেব করলাম: ৪৭ মিনিটব্যাপী প্রচারিত সংবাদ-অনুষ্ঠানে ২৭ মিনিট সংবাদ প্রচারিত হয়েছে এবং বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে ২০ মিনিট। পুরো অনুষ্ঠানের প্রায় অর্ধেক সময়জুড়েই বিজ্ঞাপন প্রচারিত হয়েছে (শতকরা ৪৩ ভাগ সময়জুড়ে)। পুঁজি ও কর্পোরেট-সংস্কৃতির মক্কায় যেখানে প্রাইম টাইমে ঘণ্টায় সাড়ে ৯ মিনিটের বেশি বিজ্ঞাপন প্রচার হয়না, কিন্তু আমাদের শীর্ষস্থানীয় একটি চ্যানেলের প্রাইম-টাইমে ৪৭ মিনিটের সংবাদে প্রচার হয়েছে ২০ মিনিটের বিজ্ঞাপন। কিন্তু এ তো হলো বিজ্ঞাপনের নিজস্ব অবয়ব। সংবাদের উপস্থিতি একটু বেশি সময়জুড়ে হলেও, তার শরীর মোড়া ছিল বিজ্ঞাপনেই। কারণ এনটিভির সংবাদ শিরোনামের নাম ছিল 'পূর্বাচল আমেরিকান সিটি শিরোনাম', অর্থনীতির সংবাদের নাম ছিল 'পাইওনিয়ার ইন্স্যুরেন্স অর্থনীত খবর'। একই দিনে প্রায় একই সময়ে চ্যানেল আইয়ের খবরে দেখা গেল 'বিজ্ঞাপন বিরতির' বিজ্ঞাপন: 'ইস্টার্ন ব্যাংক বিরতি'। তামাশা বটে!
এইসব তামাশায় চ্যানেল আই এক কাঠি অধিক সরেস। তার আছে 'সিটিসেল সংবাদ শিরোনাম', 'ইস্টার্ন ব্যাংক বিরতি', 'গ্রিন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স বাণিজ্যিক সংবাদ', 'ন্যাশনাল ব্যাংক অর্থনীতি সংবাদ', 'আনন্দ আলো সাংস্কৃতিক সংবাদ'। এসবকিছু পাওয়া গেল একই দিনে, দিনটি ছিল ৩ সেপ্টেম্বর, ২০০৯। প্রসাধিত সংবাদ-অপ্সরাকে কিনে নিয়ে গেছে একেক খদ্দের। তাই বলি, এনটিভিতে সেদিন ৫৭% সময়জুড়ে সংবাদ থাকলেও এবং বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি সংবাদের চাইতে খানিক কম (৪৩%) হলেও, যখন দেখা যায় সংবাদ আপাদমস্তক বিজ্ঞাপন-মোড়া, তখন যেকউই মানতে বাধ্য হবেন যে এ মূলত বিজ্ঞাপনের হাট। উপলক্ষ্য হলো সংবাদ। বিজ্ঞাপন-মোড়া সংবাদ-শরীরের উদাহরণ এখনও শেষ হয়নি -- যখন প্রেজেন্টার সংবাদ পাঠ করছেন বা রিপোর্টার ভয়েস-ওভারে তথ্য জানাচ্ছেন তখন আবার স্ক্রল চলছে স্ক্রিনের নিচে: এটিএন বাংলায় আছে 'ন্যাশনাল ব্যাংক শিরোনাম', চ্যানেল আইয়ের আছে 'প্রিমিয়ার ব্যাংক শিরোনাম', এনটিভির আছে 'একটেল শিরোনাম'। অন্য অনুষ্ঠান বা নাটকের মধ্যেও চলে সংবাদ-স্ক্রলের নামে এইসব ব্র্যান্ডের বিকিকিনি। এই বিকিকিনির আদুরে নাম তাই 'কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং'।
জানা যায়, বাংলাদেশে টেলিভিশন-সংবাদে এই কর্পোরেট ব্র্যান্ডিং-এর প্রচলন ঘটায় এটিএন বাংলা (রহমান, ২০০৭: ২৪৭)। তবে এর সর্বোচ্চ বাস্তবায়নে চ্যানেল আই-ই এগিয়ে আছে বলে পর্যবেক্ষণে পাওয়া যায়। শুধু সংবাদ তো আর নয়, ইমপ্রেস-এর ব্যানারে বিজ্ঞাপনদাতানির্ভর ও টেলিভিশনে ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ারসর্বস্ব চলচ্চিত্র নির্মাণের প্রচলন তারাই ঘটিয়েছে। চাতুরতার সঙ্গে তারা বাণিজ্যিক সংবাদ আর অর্থনীতি সংবাদের দু'টি স্লট বানিয়েছে (বাণিজ্যিক সংবাদ ও অর্থনীতি সংবাদ চরিত্রবিচারে কতটুকু আলাদা?), একটি বেচেছে গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্সের কাছে, আরেকটি ন্যাশনাল ব্যাংকের কাছে। এই জায়গায় যেহেতু বিজ্ঞাপনদাতাদের আনাগোনা বেশি, তাই তারা বুদ্ধি করে এক স্লটকে দুই বানিয়েছে। তো সেদিন সেই 'গ্রীন ডেল্টা ইন্স্যুরেন্স বাণিজ্য সংবাদ'-এ কী প্রচার করলো চ্যানেল আই? প্রিমিয়ার ব্যাংকের মাসিক ব্যবস্থাপক সভার সংবাদ (প্রিমিয়ার ব্যাংকের ব্যবস্থাপকদের মাসিক সভা হয়েছে, কর্পোরেট সাজে পালিশমারা ব্যবস্থাপকদের চেহারার ভিস্যুয়াল লইয়া আমি দর্শক হিসেবে কী করিব!), আগোরার র্যাফেল ড্র সম্পন্ন হয়েছে (ভাগ্যিস আগোরায় যাইনা, আর দৈবক্রমে গেলেও কখনও চৌকোণা বাক্সে কিছু ফেলি নাই, নয়তো এটাও আমার জন্য সংবাদ হয়ে যেত)। আরেকদিন কোথায় যেন দেখেছিলাম 'সাউথ-ইস্ট ব্যাংক অর্থনীতি (কিংবা বাণিজ্য) সংবাদ', আর সেখানে একটাই সংবাদ ছিল -- সাউথ-ইস্ট ব্যাংকের এজিএম/ব্যবস্থাপকদের মাসিক সভা বা ওরকম কিছু একটা। আবারও বলি, তামাশা বটে! সংবাদ দেখতে গিয়ে বিজ্ঞাপন দেখছি, বিজ্ঞাপনমোড়া সংবাদ দেখছি, আবার সংবাদ হিসেবে যা দেখছি, তাও যদি প্রকারন্তরে বিজ্ঞাপনই হয়, তাহলে আমরা যাই কোথা?
বিটিভির আটটার সংবাদ নিয়ে অনেক ঠাট্টা হয়েছে, কিন্তু এইসব তামাশাকে নিয়ে রঙ্গ করার লোক কই? সংবাদ-অনুষ্ঠান এইভাবে বিজ্ঞাপন-অনুষ্ঠানে পরিণত হবার দশা কীভাবে ঘটলো? বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ১০টি বেসরকারী টেলিভিশন চ্যানেল রয়েছে যারা সংবাদ প্রচার করে থাকে। এই ১০টি চ্যানেলের সবগুলোকে লাভজনকভাবে বাঁচিয়ে রাখতে পারে এরকম বিজ্ঞাপনের বাজার বাংলাদেশে নেই, যদিও নব্বই দশকের কর্পোরেট বিশ্বায়নের পরে এদেশে, মূলত সওদাগরী ব্যবসা বা ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে, একটি উল্লেখযোগ্য আকারের বেসরকারী খাত সৃষ্টি হয়েছে। তাই নির্দিষ্ট পরিমাণ বিজ্ঞাপন থেকে নিজে কিছু ভাগ পাবার জন্য চ্যানেলগুলো প্রতিযোগিতায় নেমেছে। নিজেকে বিজ্ঞাপনদাতাদের কাছে অধিক সহজলভ্য করে তুলছে, নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পেতে সম্প্রচার-সময়কে সস্তা বানিয়ে ফেলেছে। এতে সংবাদ সম্প্রচার-সময়ের তুলনায় বিজ্ঞাপন সম্প্রচার-সময় বেড়ে যাচ্ছে আর মূল সংবাদ ও অনুষ্ঠান হয়ে পড়ছে ক্ষীণকায়, শীর্ণকায়, মাইনরিটি। নানা ফন্দি-ফিকিরের মাধ্যমে দর্শককে বোকা বানিয়ে সংবাদের ভেতরে বা মোড়কে অমুক শিরোনাম তমুক বিরতির অবতারণা ঘটছে। এরপর সরকার আরও ১০টি টিভি চ্যানেলের অনুমতি দিয়েছে। সব বড়োলেকেরাই বা সরকার-ঘনিষ্ট লোকেরাই অনুমতি পাচ্ছে, যেমনটি আগেও পেয়েছে। ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের এইসব চ্যানেল সংবাদ-পরিবেশনের-মাধ্যমে-জনসেবার উদ্দেশে চালু হচ্ছেনা। উদ্বৃত্ত কালো টাকার জায়েজকরণের জন্য এই বিনিয়োগ, নিজ ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের সম্প্রসারণের জন্য এই বিনিয়োগ, নিজ রাজনৈতিক প্রতিপত্তি বৃদ্ধির হাতিয়ার এই টিভি চ্যানেল। সুতরাং অনেক টাকার বিনিয়োগ সত্ত্বেও, অলাভজনকভাবে হলেও, টিভি চ্যানেল চালিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু এর ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যারা জড়িত থাকবেন, তারা একে লাভজনক করার চেষ্টাও পাশাপাশি চালিয়ে যাবেন। একে লাভজনক করার একটাই রাস্তা -- বিজ্ঞাপনপ্রাপ্তি। আজ ১০ টা চ্যানেল ব্রাউজ করতে করতে আপনি প্রায়ই দেখেন যে সব জায়গাতেই বিজ্ঞাপন প্রচার হচ্ছে, অনুষ্ঠান নাই কোথাও। ২০টা চ্যানেল চালু হলে এর মাত্রা আরও বাড়বে। আর সংবাদ-অনুষ্ঠানের হাল কী হবে তা ভাবতেই আমি শঙ্কিত হয়ে উঠছি।
বিজ্ঞাপন মানুষের মধ্যে কৃত্রিম চাহিদা তৈরি করে, আমাদের মধ্যে অপূর্ণতার কষ্টকে খুঁচিয়ে তোলে। যা ছাড়া আমাদের দিব্যি এতদিন চলে যাচ্ছিল, বিজ্ঞাপন আমাদের সেই দ্রব্যকে অতি আবশ্যকীয় বলে ভাবতে বাধ্য করে। বিজ্ঞাপন বলতে চায় আমাদের চুল যথেষ্ট রেশমী নয়, ত্বক যথেষ্ট ফর্সা নয়, আমাদের কাপড় যথেষ্ট সাদা নয়। কোলা না খেলে আমি যথেষ্ট স্মার্ট নই, প্রেমিকাকে নিজের করে পাবার বিষয়টি পুরোপুরি নির্ভর করে নির্দিষ্ট কোনো সেলফোন-কোম্পানির সংযোগের ওপর। নোম চমস্কি বলেন , যদি আপনার সত্যিকার অর্থে একটা বাজার থাকে তাহলে কিন্তু আপনি বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নেবেন না -- আপনি তখন শুধুই তথ্য দিবেন (চমস্কি, ২০০৭: ২৫৬)। বাংলাদেশে পুঁজিতন্ত্রের পথটি পুঁজিবাদের স্বাভাবিক নিয়ম অনুসারে বিকশিত হয়নি। ফাটকা পুঁজির এই বাজারে আসলে খুব কম পণ্যেরই স্বাভাবিক বাজার রয়েছে। সেই বাজার সৃষ্টিতে তাই বিজ্ঞাপনের এই অস্বাভাবিক তৎপরতা। মনে রাখতে হবে বেসরকারী টিভি চ্যানেলে বিকাশ বা স¤প্রসারণ এই ফাটকা পুঁজির মধ্য দিয়েই ঘটে চলেছে। মিডিয়ায় এবং মিডিয়ায় প্রচারিত বিজ্ঞাপনে তাই ন্যূনতম এথিকস্ মানা হয়না। সংবাদপত্রে একটা প্রত্যয় প্রচলিত আছে -- 'নিউজ হোল'। অর্থাৎ বিজ্ঞাপন মহারাজের আসন নিশ্চিত করে যতটুকু গর্ত অবশিষ্ট থাকে, তাতেই বেচারা সংবাদকে জায়গা করে নিতে হয়। আর বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলসমূহে রয়েছে 'বিজ্ঞাপন বৌল' -- বিজ্ঞাপনের পাতে সংবাদ আরকি!
চ্যানেলের সংখ্যাবৃদ্ধি বা মিডিয়া ইন্ডাস্ট্রির সম্প্রসারণকে তবে কি আমি এই আলোচনার মাধ্যমে বাধা প্রদান করতে চাচ্ছি? উত্তর হলো, হ্যাঁ। আমি কি তবে এক্ষেত্রে সংরক্ষণবাদী? কনজারভেটিভ? উত্তর হলো, না। মিডিয়ার মালিকানা যদি ব্যবসায়ীর পরিবর্তে গণমানুষের হাতে যায় -- অর্থাৎ অনেক পত্রিকা, টিভি বা বেতার চ্যানেলের মালিক যদি জনগণ হয় এবং অন্তঃতপক্ষে সংবাদকর্মীরাই মালিক হন, তবে মিডিয়ার গণতন্ত্রায়ণ ঘটে, মিডিয়ায় জনমানুষের অভিগম্যতা বাড়ে। সাইবারপরিসরে ব্লগ যেমন সাধারণ মানুষের মতপ্রকাশের মাধ্যম হয়ে উঠেছে। বড়োলোকদের মালিকানায় নতুন ১০টি চ্যানেল যাওয়া মানে বিদ্যমান মিডিয়া দৃশ্যপটের গুণগত আর কোনো পরিবর্তন না হওয়া। উল্টো সংবাদ-অনুষ্ঠানে বিজ্ঞাপনের উপস্থিতি আরও বেড়ে যাবার সম্ভাবনা তৈরী হবে।
এই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার জন্য আমরা কী করতে পারি? দর্শকরা নিশ্চয়ই বিজ্ঞাপনের ফাঁকে সংবাদ দেখতে চান না। দর্শক সংবাদ দেখতে টিভি সেটের সামনে বসেন, বিজ্ঞাপনের হাট দেখতে নয়। একটি কার্যকর স¤প্রচার নীতিমালা প্রবর্তন করা খুবই জরুরি, যার আওতায় নতুন চ্যানেল চালু করার নিয়ম-শর্তাবলী নির্ধারণের পাশাপাশি টিভি চ্যানেলে বিজ্ঞাপন প্রচারের নীতি অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এই কাজটা সরকার করতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল এসোসিয়েশন অব ব্রডকাস্টারসের মতো টেলিভিশন চ্যানেলগুলো নিজেরা সরকারের নীতিমালা প্রণয়নের পূর্বেই সিদ্ধান্ত নিতে পারে প্রাইম টাইমে প্রতি ঘণ্টায় সর্বোচ্চ কত সময় বিজ্ঞাপন প্রচার হবে। তবে এই দুটি কাজের কোনোটিই খুব সহজে অর্জিত হবার সম্ভাবনা কম। তাই সমাজে কিছু প্রেসার-গ্রুপ সৃষ্টি হওয়া প্রয়োজন যাদের কাজ হবে এবিষয়ে আওয়াজ তোলা। দাবি উঠতে পারে সার্বিক নীতিমালার অথবা সুনির্দিষ্ট একটি ইস্যু চিহ্নিত করে তা নিয়ে লাগাতার কাজ করার কর্মসূচি হাতে নেয়া যেতে পারে। এই প্রেসার-গ্রুপের সদস্য হতে পারেন এ্যাক্টিভিস্ট, একাডেমিশিয়ান, সাংবাদিক, স্বেচ্ছাসেবক, নাগরিক সমাজ এবং তাদের প্রয়োজন সাধারণ মানুষের সমর্থন।
তথ্যসূত্র
প্যট্রিসিয়া এডগার ও সৈয়দ এ. রহিম (১৯৮৩)। কমিউনিকেশন পলিসি ইন ডেভেলপড কান্ট্রিজ। লন্ডন: কিগান পল।
এ এস এম আনিসুর রহমান (২০০৭)। সংবাদ-সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণেল কাঠামোগত শর্ত বিশ্লেষণ: এটিএন বাংলার ওপর সমীক্ষা, যোগাযোগ। ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন সম্পাদিত। ঢাকা।
নোম চমস্কি (২০০৭)। ভুয়া সংবাদ ও অন্যান্য সামাজিক দুর্দশা, যোগাযোগ। উদিসা ইসলাম অনূদিত, ফাহমিদুল হক ও আ-আল মামুন সম্পাদিত। ঢাকা।
প্রকাশ করা হয়েছে: অ্যাক্টিভিজম, মিডিয়া অধ্যয়ন বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ০৭ ই ডিসেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:৫১ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...
লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
শান্তির দেবদূত বলেছেন:
দারুন লিখেছেন .......টিভি দেখতে বসলে এখন শুধু বিরক্তির উদ্রেগ হয়, আর খবর তো রীতিমত কৌতুকে পরিনত হয়েছে.........
লেখক বলেছেন: সহমত
ফিউশন ফাইভ বলেছেন:
হাউজিং কোম্পানির মালিক, আমার এক বন্ধু, চ্যানেল আইয়ের খবরে তার প্রতিষ্ঠানের বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য চুক্তিবদ্ধ হতে চাইছিল প্রায় বছরখানেক ধরে। একপর্যায়ে তার পক্ষ থেকে আমি খোঁজখবর করলাম। চ্যানেল আইয়ের এক কর্তা জানালেন, আগামী পাঁচ বছর পর্যন্ত নতুন কোনো কোম্পানির সঙ্গে চুক্তিবদ্ধ হওয়ার সুযোগ নেই!অন্য টিভি চ্যানেলগুলোরও একই অবস্থা। শেষমেশ বৈশাখীতে বোধহয় সংবাদের মাঝে বিজ্ঞাপন বিরতির অংশটুকু খালি পাওয়া গিয়েছিল। সংক্ষেপে এই হল অবস্থা। বিশেষ করে খবরের ভেতরে বিজ্ঞাপন প্রচারের জন্য চ্যানেলওয়ালা এবং বিজ্ঞাপনদাতা- দু পক্ষই অস্বাভাবিক মরিয়া হয়ে উঠছে।
লেখক বলেছেন: উভয়পক্ষকেই থামানো দরকার।
টেলিভিশনে সংবাদ দেখার এই প্রাথমিক মোহ কাটিয়ে দর্শক যদি মুখ ফিরিয়ে নিত, তবে উভয়েই একটু রয়েসয়ে এগুতো।
মেসবাহ য়াযাদ বলেছেন:
ভাইরে, আজীব এক দেশে আমরা বাস করছি। যেখানে কোথাও কোনো নীতিমালা নেই। বিজ্ঞাপনের নীতিমালার কথাতো ভাবাই যায় না। দেশিয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান আর পণ্যকে বাঁচানোর বদলে মুক্তবাজারের দোহাই দিয়ে দেশিয় শিল্পের বারোটা বাজিয়ে বিদেশি পণ্যের নিয়মিত বিজ্ঞাপন দিয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রিন্ট আর ইলেকট্রোনিক মিডিয়াগুলো। কে দেখবে এসব ? কার এত সময় আছে ? নীতিহীন নীতি নির্ধারকের দল আছে নাম সর্বস্ব... আল্লা আমাদের সহায়, আমরা, আমাদের দেশ, আমাদের অর্থনীতি, আমাদের মিডিয়াওয়ালারা এভাবেই বেঁচে আছে আর বেঁচে থাকবো... ইনশআল্লাহ !!!!
লেখক বলেছেন: আল্লা তো ওনাদের বাঁচালেন, আমরা যাই কোথা?
যীশূ বলেছেন:
বিজ্ঞাপন প্রচার নিয়া একটা নীতিমালা থাকা দরকার।
লেখক বলেছেন: অবশ্যই দরকার। এইটা হওয়া খুবই জরুরি হয়ে পড়েছে।
বরফ মাখা জল বলেছেন:
অথচ আপনি আপনার কোম্পানীর কোন অনুষ্ঠানের নিউজ যদি সংবাদে প্রচার করতে চান তাইলে আবার তার রেট বাধা, এটিএন ৩৫০০০ টাকার নিচে কোন সংবাদ প্রচার করেনা, চ্যানেল আই ১০০০০ টাকা।এই হইলো সাংবাদিক ও মিডিয়ার অফলাইন ইনকাম।
লেখক বলেছেন: সংবাদ কেন টাকা দিয়ে কিনতে হবে? সংবাদ প্রচার-ছাপা হবে নিজগুণে।
নীতিমালা তো থাকবো, তয় কয়জন মানবো?
আমগো দেশে বহুত নীতিমালা আছে কয়জন মানি বা মানছি?
আরো আইতাছে দশটা চ্যানেল, সেইগুলা চালাইতে ট্যাকা লাগবো না? আমারতো মনে হইতাছে সেইগুলান আইলে এখন যেখানে ৪৩%, সেখানে ৬০% এডভার্টাইজ দেখানো হবে।
টিভি সামনে বইলে মেজাজ গরম লাগে। এড আইলেই বইনে ঘুরাইতে থাকে চ্যানেল, তার এইকাম দেইখ্যা আমার মাথা জ্বলে। আবার না ঘুরাইলে এড দেখতে দেখতেও মাথা জ্বলতে থাকে। তাই টিভি দেখাই রহিত কইরা দিছি। বনধ, টিভি দেখা বনধ।
লেখক বলেছেন: টেলিভিশন কম দেখুন, সময় কাজে লাগান।
সুধাসদন বলেছেন:
যীশূ বলেছেন: বিজ্ঞাপন প্রচার নিয়া একটা নীতিমালা থাকা দরকার।
বাংলা'র নবাব বলেছেন:
ভালো লাগলো। বেশ তথ্যবহুল। প্রিয়তে রাখলাম। ফেইসবুকে ছড়িয়ে দিলাম।
লেখক বলেছেন: ধন্যবাদ।
লেখক বলেছেন: কার্যকর হবে কিনা, এই সন্দেহ মনে রেখে হলেও নীতিমালা চাই।
জনৈক আরাফাত বলেছেন:
যথেষ্ট যৌক্তিক! প্লাস!
লেখক বলেছেন: পড়ার জন্য ধন্যবাদ।
মোঃমোজাম হক বলেছেন:
প্রথমেই বললেন আমি খবর দেখিনা, কিন্তু যেভাবে খবরের সব বিজ্ঞাপনের হিসাব নিকাস মেলানেন আমি ভয়ে আছি খবর দেখা শুরু করলে তাদের (টিভি মালিক) কি হবে
লেখক বলেছেন: টেলিভিশন কম দেখুন, সময় কাজে লাগান।
আহসান হাবিব শিমুল বলেছেন:
যেভাবে চ্যানেল বাড়ছে কিছুদিন পর দেখা যাবেকোটিপতির সংখ্যা=টিভি চ্যানেলের সংখ্যা।
ব্রডকাষ্ট করার জন্য যে ফ্রিকুয়েন্সি বরাদ্দ করা আছে, তাতেও জট লেগে যাবে, ঢাকার মতো ট্র্যাফিকজট।
লেখক বলেছেন: কোয়ানটিটি চাইনা, কোয়ালিটি চাই।
লাল দরজা বলেছেন:
সব চ্যানেলেই খবর প্রচার করতে হবে কেন! বাংলাদেশে এখন ২টা সিনেমার চ্যানেল, ৪টা নাটকের চ্যানেল, ৪টা খবরের চ্যানেল, ২টা খেলাধুলা চ্যানেল, ২টা স্বাস্থ্য চ্যানেল, ২টা কৃষি চ্যানেল, ১টা অর্থ-বানিজ্য চ্যানেল, ২টা গানের চ্যানেল, ২টা বাচ্চাদের চ্যানেল হওয়া উচিত ছিল।চোর বাটপারের টাকা পয়সায়, লোচ্ছা লাফাঙ্গা মিডিয়া ছ্যাচড়রা বাংলাদেশের এই সেক্টরটির সাড়ে চব্বিশ মেরে দিয়েছে। এ সব দেখেশুনে রাগে দুঃখে দেয়ালের মধ্যে নিজের মাথাটা বাড়ি দিয়ে ফাটাইয়া ফেলতে ইচ্ছা করে।
লেখক বলেছেন: কীভাবে যেন ধারণা হয়েছে নিউজই সবচেয়ে সেলেবল।
মাথা সামলে ... বাড়িটা অন্য কোথাও দেয়া দরকার।
লেখক বলেছেন: এরকম সবাই নিজেকে প্রত্যাহার করলে ওদের শিক্ষা হতো।
সামহোয়্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

















খুব ই তথ্যবহুল।সরাসরি িপ্রয়তে