[গল্পটি ইত্তেফাক ঈদসংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে]
(রাত একটা। বাংলাদেশ।)
--হাই, সবুজ নারী।
--হ্যালো ধূসর নর।
--এখন সবুজ।
--হমম। লগ-ইন করার সময় দেখি ধূসর হয়ে আছো। কেমন আছো?
--ভালো নাই। ভালো আছি।
--মানে কী?
--মানে ভালো ছিলাম না। এখন আছি। তোমার দেখা পেলাম।
--ভালো ছিলে না কেন?
--ছেলেটার হাই ফিভার। তিনদিন হলো। একটু পরপর জলপট্টি দিয়ে জ্বর নামাবার চেষ্টা করছি। প্যারাসিটামল দিয়ে কাজ হচ্ছে না।
--ও। স্ত্রী?
--ঘুমাচ্ছে।
--ও আচ্ছা।
--সারাদিন ওই দেখেছে। ধকল গেছে। আমি দু’ঘণ্টা ধরে ...। আর এমনিতেই আর্লি বেডে যায়।
--ডেঙ্গু নয়তো?
--দেখি। বন্ধু আছে একজন, ডাক্তার। ফোনে আপডেট জানাচ্ছি তাকে। আরও দুয়েকদিন দেখতে বলেছে। তোমারটা কেমন আছে?
--আছে ভালোই। আজ ওর বার্থডে। সন্ধ্যায় পার্টি হবে, সকাল থেকেই খুব চার্জড হয়ে আছে। এখন স্কুলে।
--তোমার লাঞ্চ ব্রেক?
--ঠিক তাই। তোমার?
--চাইল্ড কেয়ারিং। আর অপেক্ষা।
--কীসের?
--তুমি সবুজ হবে।
--সত্যি নাকি? আমি আপ্লুত।
--আমি কৃতার্থ।
[বিরতি]
--আর ইউ দেয়ার? ... আর ইউ দেয়ার?
--ওয়েট ... ছেলেটা একটু কেঁদে উঠলো। ... কেমন লাগে, গবেষণা?
--ভালো। প্যাশন ও পেশা এক হলে, ভালো হবারই কথা। এই ভালোলাগার বোধ সবসময় কাজ করে তা নয়। হঠাৎ পেছন ফিরে মনে হয়, মন্দ নয়।
--নর্থ আমেরিকার নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক। ইউ আর গোয়িং টু বি এ বিগ শট!
--ডোন্ট সে দ্যাট। আই উইশ আই কুড বি এ প্রমিনেন্ট জার্নালিস্ট ইন বাংলাদেশ।
--ধুর! কী যে বলো! কোনো মজা নাই। এদেশে সাংবাদিকতার কোনো স্ট্যান্ডার্ড আছে নাকি? মজা হলো তোমার, গবেষকের।
--আরে দেশে যারা পারে না তারাই বাইরে আসে। দেশের একটা সম্মানজনক চাকরি যার আছে তার কি বিদেশে আসার দরকার আছে নাকি? দেশে থাকার সুখ ... আমি আমার হতভাগা গরিব দেশটাকে, ঢাকাকে খুব মিস করি।
--এখানে আছে ট্রাফিক জ্যাম, ফরমালিনের ভেজাল, অনিয়ম, দুর্বৃত্তায়ন ... আর ওখানে আছে ফাস্ট ড্রাইভিং, পিওর ফুড, একটা সিস্টেম ... জীবন কত সহজ! ক্লিন এ্যান্ড গ্লসি সবকিছু।
--নারে ভাই। ব্যাপারটা অত সহজ না। তোমাকে দেশে সবাই এক নামে চেনে। আর এখানে আমাকে কে চেনে বলো? আমার ল্যাব, টেনেটুনে এই ইউনিভার্সিটি। এর বাইরে আমি নোবডি। এশিয়ান কালো মাইয়ারে কে পুছে বলো?
--তুমি তো কালো নও। বাদামি। বাংলাদেশের বিবেচনায় ‘মাই ফেয়ার লেডি’।
--সাদার বাইরে কালো বাদামি আর বাংলাদেশি ফেয়ার লেডি সবই এক।
[বিরতি ...। ‘ফেয়ার লেডি’র সঙ্গে ‘মাই’ শব্দটি যোগ করার পরপরই ইতস্তত বোধ করছিল ধূসর নর। কিন্তু কেমন অবলীলায় আসলো শব্দটা। ইতোমধ্যেই সবুজ নারীর একটি পোর্ট্রেট ছবি হাতড়ে বের করেছে অ্যালবাম থেকে। সেই মনোরম ছবিই এখন স্ক্রিনজুড়ে। কেমন সহজ আর আপন ভঙ্গিতে তাকিয়ে আছে ধূসর নরের দিকে। যেন কিবোর্ডের মাধ্যমে নয়, মুখোমুখি বসেই আলাপ হচ্ছে। আর সবুজ নারীর কথামালাও সহজ-স্বাভাবিক। ‘মাই’ শব্দটা যেন ধূসর নর বলেই নি। সবুজ নারী, তুমি গ্রেট, ভাবে ধূসর নর। এরকম আলটপকা কথা ধূসর নরেরা হঠাৎ বলেই ফেলে। বুদ্ধিমতী সবুজ নারীরা চিরকালই সেসব সামলে নিয়েছে।]
--কুয়ালালামপুরের কথা প্রায়ই মনে পড়ে।
--হ্যাঁ। আমারও। ইট ওয়াজ রিয়েলি এ নাইস এক্সপেরিয়েন্স। তোমাকে বন্ধু হিসেবে পেলাম।
--উপায় কী? আর তো বাঙালি ছিলনা। নয়তো এই আগলি ডাকলিংসের দিকে কে ফিরে তাকায়?
--বন্ধুত্ব কি ফিজিকাল ফিচার্স দিয়ে হয়?
--আমি কিন্তু তোমার ফিজিকাল ফিচার্স দেখেই আটকে গেছিলাম, এখনো আটকে আছি।
--নটি বয়! আই নো, ইউ আর লায়িং।
--আই ডোন্ট লাভ লায়িং।
--আমি কিছুমাত্রায় বলি।
--সোডারবার্গের ‘সেক্স, লাইজ এ্যান্ড ভিডিওটেপ’ দেখেছো?
--হমম। মিথ্যাগুলো ঐ পর্যায়ে না গেলেই হলো।
--মিথ্যা কি তাহলে পার্ট অব হিউম্যান রিলেশনশিপ?
--ধরো তোমার স্ত্রীর ঘুম এখন একটু ভাঙলো। বিছানা হাতড়ে অভ্যাসমতো তোমাকে খুঁজলো। না পেয়ে ঘুম ঘুম স্বরে জিজ্ঞেস করলো, রাত জেগে কী কর? তুমি কি বলতে পারো এক নারী বন্ধুর সঙ্গে আলাপ করছি? তুমি বলবে ছেলেটার জ্বর নামছে কিনা দেখছি।
--উমম, দু’টাই বলতে পারি। আবার নাও বলতে পারি। কিন্তু যেটার কথা বলছো, সেটাও তো সত্য।
--অর্ধসত্য। আমার ক্ষেত্রেও এরকম হতে পারে। ধরো হাজবেন্ড ফোন করে বললো, হাই হানি, কী কর? আমি বলবো লাঞ্চ করি। সেটাও কিন্তু সত্য। আমি তোমার সঙ্গে আলাপ করতে করতেই কিন্তু লাঞ্চ করছি। অর্ধসত্য।
--আমরা যা করছি তা কি অন্যায়?
--অন্যায় ভাবলে অন্যায়। না ভাবলে না। বাট এভরিবডি হ্যাজ টু হ্যাভ হিজ অর হার ওউন সিক্রেটস। একান্ত নিজস্ব কিছু না থাকলে মানুষটির আর অবশিষ্ট কিছু থাকেনা। সে সম্পর্ক, সমাজ, সংসারের কাছে দেউলিয়া হয়ে যায়।
--কিন্তু মিথ্যাগুলো ঐ পর্যায়ে না যাওয়াই ভালো। ঐরকম মিথ্যার একটা চাপ আছে, বিপর্যয় আছে। তা সামলানো কঠিন হয়।
--সেটা ঠিক। বন্ধুত্ব, প্রেম, দাম্পত্য -- সবকিছুরই একটা সৌন্দর্য আছে, সীমারেখা আছে।
--আমি সৌন্দর্যের পূজারী, আবার সীমারেখার কথাও ভুললে চলেনা।
--লাঞ্চ আওয়ার শেষ। বাই বলতে হচ্ছে।
--
[সবুজ নারী আর ধুসর নরের দেখা হয় কুয়ালালামপুরে, গত বছর একটা কনফারেন্সে। সবুজ নারী উত্তর আমেরিকার একটি নামী ল্যাবের টেলিকম গবেষক। আর ধূসর নর বাংলাদেশের টেলিকম রিপোর্টার। টেলিকম অপারেটরদের একটা সংস্থার স্পন্সরশিপে কুয়ালালামপুরের ঐ কনফারেন্সে ধূসর মানবের অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটে। সেখানেই পরিচয় হয় সবুজ নারীর সঙ্গে। তারপর থেকে তারা পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম দেশে বন্ধু হিসেবে বসবাস করছে।]
--হাই সবুজ নারী।
--হ্যালো ধূসর নর।
--কাল তোমার কথা বললাম।
--কাকে?
--স্ত্রীকে। অর্ধসত্য এড়াতে চাইলাম।
--তাই নাকি? কী বললেন তিনি?
--পেটের সব কথা ওকে না বললে ভালো লাগেনা। ওর জন্যও বিষয়টা তাই। আমাদের প্র্যাকটিস।
--কীভাবে নিলেন বিষয়টা তিনি?
--ওর সব কথাই আমাকে বলে ও।
--তুমি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছো না। সহজভাবে নিয়েছে?
--হ্যাঁ। তার মহা উৎসাহ। এই মধ্যবয়সে এসে বান্ধবী জোটানো Ñ ব্যাপারটা নাকি খুব এক্সসাইটিং। শুনলে অবাক হবে Ñ সে বললো, আই এ্যাম প্রাউড অফ ইউ।
--অবাক হচ্ছি না। অবিশ্বাস হচ্ছে।
--ইটস ট্রু।
--হয়তো পৃথিবীর দুই প্রান্তের বন্ধুত্ব, দাম্পত্যে কোনো উৎপাত হবার সম্ভাবনা নেই ... এজন্য ...।
--আমার ধারণা, তুমি যদি ঢাকায় থাকতে, তবুও একই প্রতিক্রিয়া আসতো। ও আসলে আমাকে খুব ভালোবাসে।
--তুমি?
--আমিও।
--স্ত্রী কি আসলেই তার সব কথা তোমাকে বলে?
--হ্যাঁ বলে। এই যেমন ধরো একবার এক কলিগের সঙ্গে তার একটা রিলেশন তৈরী হতে যাচ্ছিল। হয়না, কাজ করতে করতে একসময় হঠাৎ অজান্তে একটা ভালোলাগা ... মাঝে মাঝে লাঞ্চে যাওয়া ...।
--তারপর?
--ঐ পর্যায়ে খেয়াল করলাম, যতক্ষণ বাসায় থাকে, সে আমার কাছাকাছি থাকতে চায়। মানে স্বাভাবিকের চাইতে বেশি। রাতে ঘুমানোর সময় সেই যে আমাকে আঁকড়ে ধরে, আর ছাড়ে না। পাশ ফিরতে দেয়না। একদিন বললাম, তুমি রাতে আমাকে ঘুমাতে দাওনা। দিনে কাজ-অফিস করতে খুব সমস্যা হচ্ছে। ও কী বললো শুনবে?
--কী?
--বলে আমাকে তুমি আটকে রাখো, আমাকে বেঁধে রাখো, ছাড়বে না। আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে পারছি না ...। কেমন অদ্ভূত কথা! বললাম, কী সমস্যা খুলে বলো। সে খুলে বললো। আমি বললাম তুমি ব্রাঞ্চ চেঞ্জ করো।
--তাই করলো?
--হ্যাঁ, সে দুই মাসের মধ্যে কর্পোরেট অফিসে ট্রান্সফার নিলো। আর বললাম, মন থেকে এসব মুছে ফেল।
--তাহলে তো তোমার আমার সঙ্গে রেগুলার চ্যাট করা ঠিক না।
--কেন?
--তোমাদের এত ভালো, এত সুখের একটা দাম্পত্য। সেটায় কোনো ট্রাবল আনতে চাইনা।
--আমাদের দাম্পত্য জীবনে কোনো ঘটনাই ট্রাবল ক্রিয়েট করতে পারেনা। আমাদের পরস্পরের প্রতি আস্থা প্রবল।
--আই সি। দ্যাটস গ্রেট। আমার ক্ষেত্রে অবশ্য বিষয়টা এত পিওর না। আমার হাজবেন্ডের প্রতি আমার আস্থা আছে। কিন্তু মনে করি এই আস্থা কোনো কারণে চলে যেতেও পারে। হাউএভার, এই যে তোমার সঙ্গে নিয়মিত আলাপ হয়, এটা বন্ধ হোক। আমার নিজের ওপর অত আস্থা নাই। আমার মনে হয়, তোমার সঙ্গে রেগুলার আলাপ হওয়াটা, ইতোমধ্যে স্থাপিত একটা সম্পর্ককে নির্দেশ করে।
--তোমার আমার মধ্যে কোনো সম্পর্ক আদৌ স্থাপিত হয়েছে?
--হয়নি?
--আমি নিশ্চিত না।
--কেন নিশ্চিত না?
--ভার্চুয়াল সম্পর্ক কি কোনো সম্পর্ক?
--ভার্চুয়ালিটি রিয়ালিটির এক্সটেনশন, জানো না? অথবা বলা যায়, টেকনোলজিকাল ভার্সন অব রিয়েলিটি।
--আমার মনে হয়না। এখানকার অনেককিছুই ফেইক।
--আমার পরিচয় তুমি জানো, তোমারটা আমার। আমাদের এই বন্ধুত্ব তো ফেইক না।
--না ঠিক তা না। কিন্তু এই রিলেশনের কোনো বাস্তব ভিত্তি নাই।
--ও, আচ্ছা। তাহলে আজকের ফেইক আলাপটা বন্ধ হোক। বাই।
--এই, কী হচ্ছে? ডোন্ট গো।
[এরপর সবুজ নারীর দেখা পায়না ধূসর নর। নিরুপায় হয়ে ডাকবাক্সে চিঠি লেখে।]
--স্যরি। আমি মনে করিনা তোমার আর আমার বন্ধুত্ব ফেইক।
[এরপর সবুজ নারীর চিঠি পায়না ধূসর নর। নিরুপায় হয়ে ডাকবাক্সে চিঠি লেখে।]
--উত্তর দাও।
[এরপর সবুজ নারীর চিঠি পায়না ধূসর নর। নিরুপায় হয়ে ডাকবাক্সে চিঠি লেখে।]
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
[এরপর সবুজ নারীর উত্তর পায় ধূসর নর।]
--তোমার সমস্যা কি জানো? তোমার লাইফে কোনো সিক্রেট নাই। এ্যান্ড ইউ আর নট এ হ্যাপি ম্যান এ্যাট অল। ডোন্ট নক মি।
[এরপর ধূসর নর ক্রমাগত চিঠি লিখতে থাকে।]
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
--আগলি ডাকলিংস ইজ মিসিং হিজ ফেয়ার লেডি।
...
[এরপর সবুজ নারীর উত্তর পায় ধূসর নর।]
--ডোন্ট ডু দিস। আই মে ব্লক ইউ। ইউ আর হ্যারাসিং আ উইম্যান।
[এরপর অনেকদিন দু’জনের আলাপ বন্ধ। অনেকদিন পর ধূসর মানব একটা চিঠি লেখে সবুজ নারীকে।]
--মাই ওয়াইফ ইজ কিপিং দ্যা রিলেশন উইথ হার কলিগ। সে এটা আমাকে বলেনি, আমি নিজেই আবিষ্কার করেছি। ইউ আর রাইট। আই এ্যাম নট হ্যাপি এ্যাট অল। এ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু ক্রিয়েট সাম সিক্রেটস। নেক্সট গ্লোবাল টেলিকম কনফারেন্স জোহানেসবার্গে। আই ওয়ান্ট টু মিট ইউ দেয়ার।
[এই চিঠির উত্তরে ধূসর নারী তেমন কিছু লিখলো না। শুধু একটা ইমোটিকন বিরাট প্রশ্ন হয়ে ধূসর নরকে অস্থির করে তুললো --
০৫ আগস্ট, ২০১১।
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই সেপ্টেম্বর, ২০১১ রাত ১২:৪৩

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



