১.
কাজ করতে করতেই একবার মাথা তুলে দিগন্ত দেখার চেষ্টা করলো কামাল...দীর্ঘ লাইন দেখে মনে মনে দমে গেল। 'আজ আর লাঞ্চ হবে না' গজর গজর করতে থাকলো।
বাল্যবন্ধু কামালউদ্দিন পাটোয়ারী (আমরা বলি 'হাডারী') ব্যাংকের অফিসার। কোন এক ইসলামী ব্যাংকের চৌমুহনী শাখাকে সুদীর্ঘ চার বৎসর আলোকিত করে রেখেছিল। গজর গজর করা তার স্বভাব নয় কিন্তু সেদিনের অবস্থাটা ছিল ভিন্ন। নাস্তা না খেয়েই অফিসে এসেছিল সে। এখন ক্লায়েন্টের লম্বা ভীড় দেখে পুরোপুরি হতাশ।
লাইন একটু ছোট হওয়ায় পিছনের মানুষগলোকে অনেক বড় মনে হল তার। কিন্তু চোখ আটকে গেল একদম পিছনের মানুষটিকে দেখে। একটা ফকির! সরু চোখে তাকিয়ে ভাবতে লাগলো কি বলে ধমক দেয়া যায় ওকে।
ব্যাংকের যাওয়া আসার পথে প্রায়ই এই ফকিরকে দেখে মাঝে মাঝে তার হৃদয় ঝাঁকি খেত...সেই ঝাঁকিতে কখনো ৫, কখনো ১০ টাকার নোট বেরিয়ে পড়ত। কিন্তু কখনো ভাবেনি এই লাইনের শেষে সে এসে দাড়িয়ে থাকবে। ছুটি হতে এখনো অনেক বাকী...তবে কি আজ তাকে দুপুরের খাবারই খেতে দিতে হবে!
বহুদিন আগে সে একবার আব্দার করেছিল 'একটু ডাল ভাত' খাওয়ার। অনেকদিন ঘুরিয়েছিল কামাল। তাই বলে সে ব্যাংকে ঢুকে যাবে! সে নিজেই এখনো পর্যন্ত অভুক্ত। মেজাজটাই তিরিক্ষি হয়ে গেল!
সহকর্মীকে একফাঁকে বলে বসল - " ভাইজান এট্টু লাইনের শেষে চাইয়া দ্যাহেন"
কাচের দেয়াল ছাড়িয়ে একটু উঁকি দিয়ে দেখেই তাড়াতাড়ি মাথা নামিয়ে ফেললেন। মুচকি হেসে কামাল বলল- " কি ধরা? পাগলায় আইজকা ট্যাহা
না নিয়া যাইবো না মনে অয়!"
"কাছে আইলেই টেরডা পাইবা চান্দু! অরে আমি ৬ বৎসর ধইরা চিনি। এই আমি ফুটলাম, লাঞ্চ কইরা তুমার খবর নিমুনে।"
হতাশ কামাল সমর্থনের আশায় আরেকজনের দিকে তাকাতেই শুনলো, "প্রথম প্রথম নতুন জয়েন করেই আমার সবাই তার কাছে ধরা খেয়েছিলাম, এবার আপনার পালা। হি হি!" মহিলারা এত হৃদয়হীন হয়!
ঠিক আছে কাছে, কাছে আসুক। ঢাকায় গ্যাঞ্জাম করে কিভাবে পার পেয়েছে চোখ বন্ধ করে ভাবার চেষ্টা করলো কিছুক্ষন, তারপর সন্তুষ্ট চিত্তে 'ক্লায়েন্ট সার্ভিসে' মনোযোগ দিতে চেষ্টা করলো।
বার বার মন ছুটে যাচ্ছে লাইনের শেষ মাথায়...আর মাত্র ৬ জন বাকী। 'ঠিক আছে' বলে মনে মনে ঠিক করে নিয়ে হাত ইশারায় লাইনের বাইরে দাঁড়াতে বলল। ব্যাটা উদাস ভঙ্গিতে অন্যদিকে চাইলো। এবার ঘড়ির দিকে ইশারা করে বোঝালো ৬টার পরে আসতে। ব্যাটা কামালকে অবাক করে দিয়ে মুখ ঝামটা দিল। ফিক করে হেসে ফেলল পাশের মহিলা সহকর্মী। তাজ্জবতো, ব্যাংকের রেপুটেশান বলে তো একটা ব্যাপার আছে!
চোয়াল শক্ত করে ফেলল কামাল। আসুক কাছে, ম্যানেজার তো তার চোখ বরাবরই আছে। আর মাত্র একজন। হুররে! এইবার।
"ভাইজানের মুনে হয় খিদা লাগছে, না? চোখমুখ হুকনা দেহা যায়!"
বেয়াদপ...বেয়াদপ! আগে স্যার বলত এখন বলে ভাইজান! ক্ষুধা তোর লেগেছে ব্যাটা হারামী...আর আমার কাছে এসেছিস ভিক্ষা করতে' বলে একটা ঘুষি বসালো ঠিক নাক বরাবর! কিন্তু কল্পনায় আর কতটুকুই বা রক্ত বেরোবে!
গম্ভীর হয়ে সুধায়, "হুমম, এই টাইমে কি চান!" অবাক হয়ে ভাবলো সেও তুমি থেকে আপনি তে চলে এসছে।
"এই চেকটা যদি নিতেন ভাইজান।" আবারো ভাই!
"কুড়িয়ে পাওয়া চেক এখানে কেন?" বিস্ময়ে বিহ্ববল কামাল দেখে ১ লক্ষ ৭০ হাজার টাকার চেক সেটা।
"জে, এইডা আমারি চেক। টাকাডা তাড়াতাড়ি দিয়া দেন। দেরী কইরেন না। আর ব্যালান্সটা একটু চেক করেন তো।"
বিন্দু বিন্দু ঘাম দেখা দিল কপালে এই শীতকালেও। ত্রস্ত হাতে কিবোর্ডে ইনপুট দিয়ে তাকিয়ে থাকলো স্ক্রীনের দিকে। আওয়ার গ্লাসটা আজ বেশী দেরী করছে মনে হয়। ঘুরছে তো ঘুরছেই! আউটপুট আসার আগেই কে যেন বলল- "প্রিন্ট দ্যান আরও মজা পাইবেন।"
তাকিয়ে দেখলো তার সহকর্মী লাঞ্চ শেষ করে ফিরে এসেছে। সমস্বরে অন্যরাও বলল, "হ! হ! আমরাও দেখমু!"
১৩ লাখ ২৬ হাজার ৭৮০ টাকা!!!!!!!!!!
২.
"উনি এমনই!" অফিস থেকে ফেরার পথে বলল সহকর্মী।
"উনার ছেলেমেয়েরা কিছু বলে না?" কামাল এখনও বিশ্বাস করতে পারছে না ব্যাপারটা।
"নাহ! তারা ফেড আপ। ভিক্ষা করাটা তার এখন রোগ হয়ে গেছে। ছেলে মেয়েরা কতবার নিষেধ করেছে, কোনো লাভ হয় নি। জমি কিনেছে, দোতালা বাড়ী করেছে, মেয়ের বিয়ে দিয়েছে বড় ঘরে! সব এই ভিক্ষার টাকায়। মানুষের কি জীবন, তাই না কামাল ভাই!"
"হুমম! আমার মায় আমারে এমনে এমনে গাইল পাড়তো না। খালি কইতো ফকির!"
তার নিজের ১৩০০০/- টাকা মাসিক বেতন আর ফকিরের চিন্তা কথা চিন্তা করে হঠাৎ পাগলের মত হা হা করে হাসতে হাসতে রাস্তার মাঝ বরারব দাড়িয়ে বলতে লাগলো
"আমি ফকির হমু! ফকিরই হমু!! আর কিছু না, হুহ্ !!"
_____________________________________________
সবাইকে অগ্রীম ঈদ মোবারক !!!!!!!!!
সর্বশেষ এডিট : ২২ শে নভেম্বর, ২০০৯ রাত ১১:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।



