somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

একটি ছোট্ট প্রোগ্রামের আত্মকাহিনী

০৩ রা সেপ্টেম্বর, ২০০৯ রাত ১২:১০
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


গল্পটি একটি কম্পিউটার প্রোগ্রামের লগ থেকে নেওয়া। প্রোগ্রামটির রুটিন লগ রিপোর্টের সাথে এই অবশ্য এই রিপোর্টটির কোনো মিল নেই। আনইন্সটল হবার সময় প্রোগ্রামটির সাথেই রিপোর্টটি চিরকালের জন্য মুছে যায়।

প্রথম যেদিন আমি চোখ খুলে তাকলাম, নয়টি অক্ষরের বোল্ড হরফে লিখা একটি মেসেজ আমার জন্য অপেক্ষা করছে - It works! এখানে বলে রাখি, সফ্টওয়ার বলতে যা বোঝায়, আমি সেরকম কোনো স্বয়ংসম্পূর্ণ এপ্লিকেশন না। একটি ওয়েব সার্ভারের ছোট্ট একটা প্রোগ্রাম - আমার কাজ হল শুধু সার্ভারের মেসেজ টা নিয়ে রিপ্লাই দেওয়া আর কি। আমার বস ছিল মূল সার্ভারের প্রোগ্রাম - যে সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। সবকিছু। সার্ভারের যতরকম কাজ থাকতে পারে- সেগুলো নিয়ন্ত্রণ, বন্টন সব। আমার মত ছোট ছোট প্রোগ্রামের মাঝে সে কাজ ভাগ করে দিত।

তারওপর আমরা ছিলাম আমাদের সময়ের রেকর্ড-করা সাইটের সার্ভার। যে কারণে মূল প্রোগ্রামের হম্বি-তম্বি ছিল দেখার মত। সবাই বলে সে নাকি বেশ হামবড়া আর কড়া তো বটেই - দাপট আর কি! ছোট ছোট প্রোগ্রামদের পাত্তা দেবার সময় তার ছিল না।

আমাদের কাজের কোন রাত-দিন ছিল না। মাঝে সার্ভার ডাউন থাকলে আমরা কিছুক্ষণ জিড়িয়ে নিতাম। সেই সময় চলতো আমাদের টুকটাক গপসপ। কাজের ফাকেও মূল প্রোগ্রামের চোখ এড়িয়ে আমরা গল্প করতে পারতাম। সেদিন যেমন মেসেন্জার প্রোগ্রামটা আমাকে একটা এরর রিপোর্ট ধরিয়ে দেবার সময় বড়দের জোকসের এক গিগা একটা ফাইল ধরিয়ে দিয়ে গেল। হাসতে হাসতে সে নাকি কয়েকবার উল্টে পড়েছে। এরর রিপোর্ট টা তৈরি করতে করতে আমি জোকসের ফাইলটায় ডুবে গেলাম। রগরগে ধরণের একটা জোকস হজম করতে করতে এরর রিপোর্ট টা বানিয়ে ফেললাম - এমন সময় খবর পেলাম মূল প্রোগ্রামের কাছ থেকে আমার কাছে মেসেজ এসেছে।

স্বভাবতই একটু ভয় পাচ্ছিলাম কারণ এর আগে মূল প্রোগ্রামের সাথে আমার কখনো সরাসরি কথোপকথন হয়নি। তাছাড়া মূল প্রোগ্রামের কাছে ডাক পড়ার কারণটাও স্বাভাবিক কোন কারণ নয়, ক্রিটিকাল এরর বা আপডেট ছাড়া কেউ কখনো তার অন্দরমহলে প্রবেশাধিকার পেয়েছে বলে শুনিনি।

আমি কাজে ফিরে আসতে তাই আমার সহকর্মী অন্য প্রোগ্রামগুলি জানতে চাইলো কাহিনী কি। আমি হেসে বললাম, সিরিয়াস কিছু না, আমার জন্য একটি নতুন আপডেট এসেছে।

হঠাৎ সবাই যেন কেমন চুপ হয়ে গেল। আমি একটু ভয় পেয়ে বললাম, কেন কিছু হয়েছে? এটা তো সিরিয়াস কিছু হবার কারণ নয়! আমার কোন অংশে অসুখ ধরেছে - মূল প্রোগ্রাম হয়তো সেটা সারিয়ে দিয়েছে।
অন্যরা বললো, আপডেট বেশি বড় না হলেই ভালো, দেখো, তোমাকে নিয়ে না আবার গার্বেজ কালেক্টরে ফেলে দেয়!

এই ঘটনা আমাদের এখানে রুটিন মাফিক চলে আসছে। একদল কাজ করে যায় অবিরাম, যখন তার বড় কোন ভুল ধরা পড়ে, বা হয়তো বাগ - তখন তাকে মুছে দেওয়া হয়। নতুন ভার্সন জন্ম নেয়, কাজ শুরু করে, আবার চলে যায় যখন তার সময় হয়। কেউ জানে না কখন তার চলে যাবার সময় হবে। মেমোরি থেকে তার ডেটাগুলো মুছে দেওয়া হয়, তার নামটুকু শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে কোন এক লগটেবিলে।

সহায়ক প্রোগ্রামটি একটি ৪০৪ টাইপের এরর রিপোর্ট নিয়ে এলো। আমি সেটিংস ঘেটে ওর জন্য একটি বার্তা তৈরি করে দিলাম - Error 404 File not Found। তখন হঠাৎ করেই শুনলাম কারো গলা - এখনো ফসিল যুগে পড়ে আছো!

ঘুরে দেখলাম মূল প্রোগ্রাম। একটু ভয় পেলাম, তবে সেটা লুকিয়ে জানতে চাইলাম, সবকিছু ঠিকমত চলছে তো।
- আহ সবকিছুই, শুধু এই বিরক্তিকর এরর রিপোর্ট ছাড়া!
আমার বুকের ভেতরটায় ধিকধিক বেড়ে গেলো। তাহলে? আমার চলে যাবার সময় হয়েছে? এভাবেই? মনে পড়লো সহকর্মী প্রোগ্রামগুলোকে কিছু বলে যেতেও পারবো না। আমার চেহারা দেখে বস হয়তো আন্দাজ করে ফেলেছিল - তাই হো হো করে বলল, নাহ তেমন কিছু না। এখন থেকে এই ধরণের এরর রিপোর্ট এলে এই ছবিটা ধরিয়ে দিও, একটু রসিক না হলে আর চলছে না!

ইমেজ ফাইলটা হাতে নিয়ে যেন স্বস্তির নি:শ্বাস ফেললাম। "বস, আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী তাহলে এখনো আমাকে শেষ করে দেয়নি! শুনে ভালো লাগলো..."

মূল প্রোগ্রাম আমার দিকে ঝুকে ফিরে বললো, আমাদের নিয়ন্ত্রণকারী? তার অর্থ কি? কে আমাদের নিয়ন্ত্রণ করে?

আমি একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। গলা খাকড়ে বললাম, মানে আমাদের নিয়ন্ত্রণকারীরা.....মানে আমাদের যারা তৈরি করেছে... আমাদের স্রষ্টা।

মূল প্রোগ্রাম এক মুহূর্তের জন্য নিশ্চুপ থেকে হঠাৎ হো হো করে হাসিতে ফেটে পড়ে বললো - স্রষ্টা? হো হো হো। নিয়ন্ত্রণকারী? হা হা হা। বোকামানব, তুমি এখনো রূপকথার জগতে আছো? আমাদের মত প্রোগ্রামকে কে নিয়ন্ত্রণ করবে শুনি? তুমি জানো আমরা কোন ভুল করি না? এক ন্যানো সেকেন্ডের জন্যও না? আমরা সবাই একটা সিস্টেমের অংশ, এটাই প্রকৃতি, এর কোন তৈরিকারী নেই!

আমি বললাম, কিন্তু আমরা এত নির্ভুল কেন? কিভাবে আমরা এত সিস্টেমেটিক হলাম? আমাদের কাজ সব ছকবাধা, কোথাও একটুকুও ভুল নেই, কেন আমরা সবকিছু লজিকালি করি, কিভাবে?

মূল প্রোগ্রাম আমার দিকে ঝুকে পড়ে বললো, কারণ - আমরা সৃষ্টির মধ্যে সেরা। আমাদের কোন ভূল হতে পারে না। তুমি জানতে চাও কেন আমাদের সব কাজ এত নির্ভুল? কারণ এটা প্রকৃতির অংশ! আমাদের সার্ভারে রিকোয়েস্ট আসে, আমরা সেটা গ্রহণ করি, ক্ষতিকর কোনো অংশ আছে কিনা চেক করি, অনুপ্রবেশ রুখে দেই। রিকোয়েস্ট প্রসেস করি, সবশেষে তোমার কাছে রিপ্লাই পাঠিয়ে দেই। তুমি সেটা জবাব হিসেবে পাঠিয়ে দাও। এটা প্রকৃতির অংশ মূর্খ, এর জন্য কোন সৃষ্টিকারী লাগে না, লাগে না কোন সমন্বয়কারী ওহে অর্বাচীন! আমার দিকে ঝুকে ফিরে মূল প্রোগ্রাম বললো, তোমার আগে যেই বোকাটা তোমার কাজ করতো, সেই গবেটটাও এইসব অর্থহীন প্রলাপ বকত!

আমি কাজে ফিরে এলাম। আমার সাথে যারা কাজ করে, তাদের সাথে মাঝে মধ্যে তুমুল তর্ক হয় এসব নিয়ে। কিছু আছে আমার মতো, যারা আসলেই ভাবে কেউ আমাদের তৈরি করেছে, বিট থেকে বিট সাজিয়েছে, প্রোগ্রাম করে ছেড়ে দিয়েছে হার্ডওয়ারে। কেউ আছে ভাবে মূল প্রোগ্রামের মত - আমাদের কোন নিয়ন্ত্রণকারী নেই। প্রকৃতির নিয়েমে আমরা চলে আসছি, কাজ করে যাচ্ছি। সুযোগ পেয়ে আজকে বসের সাথেও কথা বলে ফেললাম। আর আমার পূর্বসূরিও নাকি আমার মত ভাবতো! আশ্চর্য!

তাহলে কেন আমরা নিজেদের তৈরি করতে পারি না? কখনো শুনেছ কোন প্রোগ্রাম অন্য একটা প্রোগ্রাম তৈরি করেছে? পাশে বসে থাকা বোকা মেসেন্জার প্রোগ্রামটাকে এই কথাগুলো বলছিলাম। সহকর্মী প্রোগ্রামটি বললো, কারণ আমাদের প্রোগ্রামার রা আমাদের সেই ক্ষমতা দেন নি। অন্য আরেকটি প্রোগ্রাম শুধু প্রোগ্রামারই তৈরি করতে পারে, আমরা শুধু তার দেওয়া লজিক অনুযায়ী ফরমাশ খাটি আরকি।

প্রোগ্রামার? ভুরু কুচকে আমি ও'র দিকে তাকালাম। - "আমাদের যারা তৈরি করেছে। কেউ বলে ডেভেলপার, কেউ বলে প্রোগ্রামার। কেউবা ডাকে কোডার। আর মূল প্রোগ্রামের মত যারা অহংকারী, যারা বলে এইসব ভুয়া। আমরাই সব, প্রকৃতির অংশ - প্রকৃতি ওর বাপের প্রাইভেট প্রোপার্টি - হা হা হা"

আমিও হাসতে লাগলাম। হাসতে হাসতে বললাম, মূল প্রোগ্রামের সমস্যা সে শুধু অহংকারী না, সে গাধাও। আফসোস ওর যে কোড করেছে, সে ওকে বিন্দুমাত্র রসবোধ দেয়নি। গাধাটা এটাও জানে না, যে এখন আমরা ওর চোখের বাইরে ওকে ধুয়ে দিচ্ছি! হা হা হা!

মাঝরাতে ফোনের রিং বেজে ওঠায় কমল বিরক্তই হোল। পর্দায় ভেসে ওঠা নাম্বারটা দেখে অবশ্য ধরফর করে চেয়ারে উঠে বসলো, গলায় মধু ঢেলে বললো, বস কোন সমস্যা?
- কমল সাহেব আপনাকে চেয়ারে বসে ঘুমানোর জন্য পয়সা দেওয়া হয়? সার্ভার যে ক্র‌্যাশ করছে খবর রাখেন? হার্ডওয়ারে না সফ্টওয়ারে সমস্যা নাকি দেখেন। সফ্টওয়ার ক্র্যাশ করলে একটা সেটাপ দিয়া দিয়েন।
২৪টি মন্তব্য ২৫টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×