somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

ব্রীড়া

২৪ শে অক্টোবর, ২০০৯ রাত ৮:৩৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :




টেবিলের ওপর সুমনের মোবাইলটা রাখা ছিল, সে ঝুঁকে পড়ে খাতায় দিনের হিসেব মিলাচ্ছিল। অমন সময় মোবাইল বেজে ওঠে। হাতে নিয়ে সে এক পলক নম্বরটি দেখে, একটা অপরিচিত নম্বর। বাটন টিপে কানের কাছে মোবাইল ধরে সুমন- হ্যালো স্লামালাইকুম, হ্যালো...
অপর প্রান্তে কোনো শব্দ নেই। সুমন আবার একটু জোরে জিজ্ঞাসা করে, হ্যালো...। এবার উত্তর মেলে...একটা মেয়েকণ্ঠ। মেয়েটির মুখে মনে হচ্ছে কথা আটকে যাচ্ছে। সে টেনে টেনে বলে, ভাইয়া, আপনি কি হাসান ভাইয়া বলছেন?
সুমন খুব মজা পায়। কিন্তু মিথ্যে বলে না। বলে, না, আমি সুমন ভাইয়া বলছি।
স্যরি সুমন ভাইয়া, আপনার সাথে তো আমার পরিচয় নেই। আমি মিনুর বান্ধবী বলছি, আমার নাম নিপা। আপনি কি মিনুর সেঝ ভাইয়া বলছেন?
সুমন থামে। একটু বিরতির পর বলে, কার বান্ধবী বলছেন?
নিপার বান্ধবী। আপনার ছোট বোন নিপার বান্ধবী বলছি।
ম্যাডাম, আমার তো মনে হচ্ছে আপনি একটু ভুল করেছেন।
ভুল করবো কেন? মিনু তো আমাকে এই নাম্বারটি দিয়েই বললো মোবাইল করতে। এটা কি ০১৭১২০৮০৬৬৭ না?
স্যরি, আপনি রং নাম্বারে করেছেন। এনি ওয়ে, আপনার কী নাম যেন বললেন? আপনার কণ্ঠটা কিন্তু ভারী মিষ্টি।
থ্যাংক্‌স ফর দি কমপ্লিমেন্টস। কিন্তু আপনার কণ্ঠস্বরও আমার কাছে দারুণ লেগেছে।
আপনাকেও ধন্যবাদ। কিন্তু আমার নাম্বারটি কোথা থেকে পেলেন, বলুন তো?
ভাইয়া, আমার মনে হচ্ছে আপনি ঠাট্টা করছেন। মিনু নিশ্চয়ই আপনার ছোট বোন। তা না হলে ও আমাকে এ নাম্বারটা দেবে কেন?
আচ্ছা, আমি মিনুর বড় ভাই না হলে কি আমার সাথে কথা বলা যাবে না?
ছিঃ ছিঃ ভাইয়া, ওভাবে বলছেন কেন? আমি কি বলেছি যে আমি আপনার সাথে কথা বলবো না?
থ্যাংক ইউ। এটা কি আপনার মোবাইল?
হ্যাঁ, একান্তই আমার।
তা হলে তো মাঝে মাঝে কথা বলা যাবে। আপত্তি আছে কোনো?
দ্যাট উড বি মাই প্লেজার। আপত্তি থাকবে কেন?
আপনার ল্যান্ডফোন নেই?
হ্যাঁ আছে, তবে ওটা বাবা-মার ঘরে থাকে।
তাতে অসুবিধে নেই, আমার ল্যান্ডফোন আছে। অবসর পেলে মিস্‌ডকল দেবেন, আমি আপনাকে ল্যান্ড ফোনে কল করবো।
আইডিয়াটা দারুণ।
আমার নাম্বার ৭৬০১৮০৪। বুঝেছি মনে রাখতে পারবেন না। আপনার নাম্বারটা প্লিজ?
৭৪১৭২৩৯।
মোবাইলে যে অনেক বিল উঠে গেলো আপনার।
আরে ধূর, বিল না উঠলে মোবাইল কোম্পানি চলবে কী করে?
আপনি কী করেন যেন?
ভাইয়া, আপনার রসিকতাটা রেখে একটু মিনুকে ডেকে দিন না প্লিজ। আপনিও ঠিক হাসান ভাইয়ার মতো, একবার কথা শুরু করলে আর থামতেই চান না।
আচ্ছা, আপনি কি শুধু মিনুর সাথে কথা বলতেই ফোন করেছেন, না আমার সাথে কথা বলবেন বলে মিনুর নাম করছেন?
ছিঃ, আপনি না কী যে একটা, দিন না ভাইয়া মিনুকে। আপনি কিন্তু আমার প্রচুর বিল উঠিয়ে দিচ্ছেন।
এই যা, কিছুক্ষণ আগে বললেন বিল উঠলে ক্ষতি নেই, এখন আবার টাকার ওপর মায়া পড়ে গেলো?
বুঝতে পেরেছি ভাইয়া, আপনি খুব দুষ্টু লোক, আমি রাতে আবার ফোন করবো, দশটায়। মিনুকে কিন্তু ঠিক দশটায় মোবাইলটা হ্যান্ড ওভার করবেন। নইলে খবর আছে। বলে নিপা লাইন কেটে দেয়।
কিন্তু দশটায় নিপার ফোন এলো না। সাড়ে দশটায়ও না। সুমন অবশ্য ভেবে কোনো কূল কিনারা পায় নি কে এই নিপা মেয়েটা, সে তার নাম্বারই বা কোথা থেকে পেলো। মিনু নামে তার কোনো ছোট বোন নেই, অথচ সে বলছে মিনুই তাকে এ নাম্বারটা দিয়েছে। মিনুটাই বা কে?

রাত এগারটার দিকে সুমন কল দেয় নিপাকে।
হ্যালো স্লামালাইকুম। কী খবর ভাইয়া, ভালো?
হ্যাঁ ভালো। দশটায় না কল করার কথা ছিল?
ওহ্‌হো... হ্যাঁ। আসলে ভাইয়া খুব একটা মজার কাণ্ড হয়েছিল।
মজার কাণ্ড? কী রকম?
আপনার সাথে কথা বলার কিছুক্ষণ পরই মিনু ফোন করে, ওর ভাইয়ার মোবাইল থেকে।
ওন। আচ্ছা মিনু কে?
মিনু আমার ক্লাসমেট। আগামীকাল আমাদের এক জায়গায় যাওয়ার প্রোগ্রাম আছে। আমি যাবো কিনা তা কনফার্ম করে বলার জন্য ওর ভাইয়ার মোবাইল নাম্বার দিয়েছিল।
কিন্তু সে আমার মোবাইল নাম্বার দিল কেন?
মজার কাণ্ডটা ঘটেছে এখানেই। ওর ভাইয়ার মোলাইল নাম্বার ০১৭১২০৮০৯৯৭। একটা টুকরো কাগজে লিখেছিল। ভুল বশত ওর ইংরেজিতে লেখা নাইন সংখ্যাটাকে সিক্স হিসেবে ডায়াল করি, ফলে নাইন নাইন সেভেন এর জায়গায় সিক্স সিক্স সেভেনে রিং চলে যায়।
কী দারুণ সৌভাগ্য আমার!
সোভাগ্য তো আমারও। আপনার মতো একজন মানুষের সাথে পরিচয় হলো।
আচ্ছা, আপনি কী করেন?
আমি এবার এইচএসসি দিলাম। সিটি কলেজ থেকে। আপনি?
আমি ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ছি। ইংলিশ ফাইনাল ইয়ারে।
এখন কি বাসায়?
হ্যাঁ, বাসায় তো। এতো রাতে আমি কখনো বাইরে থাকি না।
কেন, মা-বাবার শাসন? নাকি নিজে নিজেই ভদ্র ছেলে?
ভদ্রতা নিজে নিজে। নিজে ভদ্র না হতে পারলে অন্যের শাসনে কেউ হয় না।
এটা কি নিজস্ব ফিলসফি?
একান্তই আমার।।
আপনার ইনটেলেক্টফুল ফিলসফিটা বেশ ইন্টারেস্টিং।
আই এ্যাম ইমপ্রেস্‌ড।
থ্যাংক ইয়্যু। তো ভাইয়া, আপনার সাথে কথা বলে বেশ তৃপ্তি পেলাম। মাঝে মাঝে ফোন করলে খুশি হবো।
আমিও আপনার সাথে কথা বলতে পেরে নিজেকে গর্বিত মনে করছি।
আজ তাহলে রাখি ভাইয়া?
ওকে, খোদা হাফিজ।
খোদা হাফিজ।

বাংলা মটরের উলটো দিকে এক চিপা গলিতে ছোট্ট এক লন্ড্রির দোকান সুমনের। এসএসসি পাশের পর গ্রাম থেকে সে শহরে চলে আসে। কবি নজরুল কলেজে ভর্তি হয়েছিল। কলেজ চলতো, কিন্তু পেট চলতো না। ছোট খাটো দু-একটা টিউশনি ধরার চেষ্টা করেছিল। ওর মেজাজ যতোখানি গরম, পড়ানোর মতো মেধা ও দক্ষতা ঠিক ততোখানিই কম। তিনচার দিনের বেশি কোনো টিউশনি টেকে নি। হয় শিশুরা পড়তে বসে নি ভয়ে, অথবা অভিভাবক কাষ্ঠ মুখে বলে দিয়েছেন আর না যাওয়ার জন্য।
পাশের গ্রামের চানমিয়ার ছিল এই লন্ড্রির দোকান। দোকানের এক কোণে শোবার মতো যে জায়গাটুকু, সুমন একদিন চানমিয়ার সাথে সেখানে ঢুকে পড়লো।
চানমিয়া লাভের মুখ দেখছিল না। সুমনের মাথায় সামান্য বুদ্ধি ছিল। দুজনে যোগ দিল লন্ড্রিতে।
লন্ড্রির দোকানটা কিছু দিন আগে পর্যন্ত চানমিয়ার ছিল। মাস খানেক আগে সে এই ব্যবসা ছেড়ে মিডল ইস্টে চলে গেছে। এখন তার বেতন অনেক বেশি।
সুমনের দিন ঘুরেছে। দোকানে একটা ল্যান্ডফোন হয়েছে। হাতে একটা মোবাইল। অনেকে মনে করে এই লন্ড্রি থেকেই তার এতোসব আয় উপার্জন। কিন্তু গূঢ় রহস্য আছে। সেটা সে কাউকে বলে না। সুমনকে এখন গা খাটিয়ে কিছু করতে হয় না, তিনচার জন কর্মচারি আছে। সে শুধু কষ্ট করে ম্যানেজারের চেয়ারে বসে ফোন করে, ফোন রিসিভ করে আর টাকার হিসেব রাখে। পাশের হোটেলে তিনবেলা খায়। সপ্তাহ শেষে বিল পরিশোধ করে।


সকাল থেকেই সুমনের মনটা খুব চনমনে ছিল। আজ দেখা হবে। ওরা তিন বান্ধবী আসবে। নিপা, মিনু আর আঁখি। নিপার কণ্ঠস্বর যেমন কোকিলের সুরের মতো মাধুরীমাখা, ওর চেহারাটাও তেমনি চোখ ধাঁধানো না হয়ে যায় না। সুমন অবশ্য বহুবার জিজ্ঞাসা করেছে ঠাট্টার ছলে, তুমি খুবই রূপবতী, তাই না? নিপা সরাসরি কোনো জবাব না দিয়ে হাসির টেউ তুলে বলেছে, যাহ্‌, আমি রূপবতী হতে যাবো কেন?
কিন্তু নিপার এ কথা কখনো সুমনের বিশ্বাস হয় নি। তার বদ্ধমূল ধারণা নিপা অবশ্যই হাজারে একটা হবে। এরূপ ধারণার পেছনে তার অবশ্য বেশ শক্ত তত্ত্ব বা দর্শন আছে। নিপা ধণাঢ্য ব্যাসায়ীর একমাত্র মেয়ে, নিপা বলেছে, তার মা নাকি অসম্ভব সুন্দরী। তার বাবাও অত্যন্ত সুদর্শন। তা তো হতেই হবে। দেখুন, ধনীর ঘরে কখনো কালো মেয়ে বা কালো ছেলের জন্ম হয় না। কারণ, তল্লাটের সেরা সুন্দরী মেয়েটাই ধনীর দুলালের বউ হয়ে থাকে। সুন্দরীর গর্ভে রূপবতী মেয়ে এবং সুদর্শন ছেলেশিশুর জন্ম হয়। এভাবেই বংশ পরম্পরায় সুদর্শন ও রূপসীরা ধনবানদের ঘরে ঘরে জন্মলাভ করে আসছে। এর উলটোটা এবার দেখি, একজন চাষা বা চাষার ছেলে, দিনমজুর বা দিনমজুরের ছেলে বিয়ে করবে শ্বশুর বাড়ির যৌতুক নিয়ে। শ্বশুর মশাইয়ের কন্যা সুন্দরী হলে তিনি যৌতুক সহযোগ কন্যা বিয়ে দেয়ার আগেই তা ধনীর দুলালের চোখে পড়বে ও বাহুবন্দি হবে। গরীবের কপালে কালো মেয়েই জোটে, তা থেকে যা 'উৎপাদিত' হয় তার রং খুব একটা বদলায় না।

ও প্রথমে তিনটি মেয়েকে একাই সামাল দেবে ভেবেছিল। কিন্তু এক কান দু কান করতে করতে এ খবর অচিরেই বন্ধুদের মাঝে জানাজানি হয়ে যাবে, তাদেরকে না জানিয়ে এহেন অভিসারে বের হলে তার আর রক্ষা নেই।
রোশন আর শিপনকেও খবর দেয়া হলো। সন্ধ্যা সাতটায় যাত্রাবাড়ির চাংপাই চাইনিজ রেস্তরাঁয় ডেটিং।
পুরনো জুতা জোড়া ভালো করে কালি করালো। বিবেকে বাঁধছিল, ধরা পড়ার ভয়ও ছিল, তারপরও একটা অনৈতিক কাজ করলো। লন্ড্রি থেকে কয়েকটা জিনস, যা চকচকে ছিল, বের করে ট্রাই করলো। গোটা তিনেক ট্রায়াল দেয়ার পর একটা চমৎকার ফিট হয়ে গেলো। গায়ের পিয়ারি কার্ডিন গেঞ্জিটা সে গুলিস্তানের সেকেন্ড হ্যান্ড মার্কেট থেকে কিনেছিল। ওটা সে সব সময় পরে না, পরে বিশেষ বিশেষ ফাংশনে। ওটা ওকে যা মানায়, পরার পর যে-কেউ বলবে গেঞ্জিটার দাম সাড়ে তিন হাজার টাকার কম নয়।
পারফিউমের প্রয়োজন। শিপনের প্রায় খালি হয়ে যাওয়া পারফিউমের বোতলটা সে জোর করে নিয়ে এসেছিল। শিপন অবশ্য বিশেষ মানা করে নি, কারণ সে জানতো ওকে না দিলে ওটা ও চুরি করে নিয়ে আসবে।
কথামতো ওরা তিনজন সাড়ে সাতটার আগেই চাংপাইয়ে গিয়ে সিঁড়ির গোড়ায় দারোয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে থাকলো। নিপা একটা নীল রঙের শাড়ি পরবে। ওর গলায় একটা সোনার চেইন থাকবে। মিনু মেরুন রংয়ের সেলুয়ার কামিজ পরবে। ওর চুলগুলো ববকাট। আঁখির পরনে আঁটসাঁট জিনস থাকবে, অব হোয়াইট, গায়ে থাকবে কালো টি-শার্ট, বুকের মাঝখানে মাইকেল জ্যাকসনের ছবি, বহু পুরনো স্টাইল হলেও এটা ওর খুব প্রিয়।
কিন্তু মেয়েরা আসছে না। ঝলমলে পোশাকে অনেক রূপসী অবশ্য এলো-গেলো, তবে একা নয়, তারা তরতর করে সিঁড়ি বেয়ে উঠে ভেতরে চলে যায়, আবার বেরিয়ে আসে।
তিন বন্ধু পিপাসার্ত হতে থাকে। এতোক্ষণ মেয়েগুলোর রূপলাবণ্য নিয়ে নানাবিধ হাসিঠাট্টা ও মুখরোচক গবেষণা করলেও তা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যেতে থাকে।
নিপা প্রতারণা করে নি তো?। হয়তো ঝালিয়ে দেখছে। তিন বান্ধবীর তিন রকম পোশাকের কথা বললেও ওরা হয়তো নির্ধারিত পোশাকে না এসে অন্য পোশাকে এসেছে। মেয়েরা এসব ব্যাপারে বেশি চালাক হয়ে থাকে। ওরা হয়তো এখানে এসে দণ্ডায়মান তিন যুবককে দেখে নিরাশ হয়ে ফিরে গেছে, কারণ রমণীদের মন হরণ ও দৃষ্টি কাড়বার মতো পোশাক-আশাকের চাকচিক্য ও সমার্টনেস ওদের হয়তো নেই।
হঠাৎ তিনজনের চোখ পড়ে অল্প দূরে, আবছা আলোয় তিন যুবতীর শরীর আর ছায়া দেখা যায়, নিপার বর্ণনায় সব মিলে গেছে। রাইট। নিপা, মিনু ও আঁখিই হবে।
উৎসুক হয়ে ওরা তাকায়।
মেয়ে তিনটা ঠিক কাছাকাছি এসে ইস্ততত এদিক-ওদিক তাকায়, ছোট ছোট শব্দে পরস্পর কথা বলে, আড়চোখে বা স্থির চোখে ওদের তিনজনকে দেখে। কিন্তু মুখে কিছু বলে না। সুমনরাও মেয়ে তিনজনকে দেখে, কিন্তু মুখ খোলে না। ওরা তিনজন কান খাড়া করে ওদের কথা শুনছে। ওরা কী বলাবলি করছে বোঝা যাচ্ছে না। দেখতে কেমন ওরা? যেখানে দাঁড়িয়েছে ঠিক সেখানেই দেয়ালের ছায়া, মুখের আদল কিছুই বোঝা যায় না।
সুমনের মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়। নিজে নিজেই বলে, একটু জোরে, যাতে মেয়েরা শুনতে পায়, সুমননদোস্তনমেয়েরা একযোগে ওদের দিকে তাকায়। একটা মেয়ে ধীর পায়ে সামনে এগিয়ে আসে, বাকি দুজনও পিছে পিছে, কাছাকাছি আসতেই আলোয় ওদের চেহারা ফুটে ওঠে, মুহূর্তে সুমনদের মন ফুটো হওয়া বেলুনের মতো চুপসে যেতে থাকে।
প্রথম মেয়েটি বলে, এক্সকিউজ মি, আপনারা কি সুমন...
সুমনের পাকস্থলী ভেদ করে বমি আসতে চাইলো। চোখ বন্ধ করে সে খানিকটা ভাবলো, যা দেখছি তা ভুল দেখছি, ঠিক দেখছি না। চোখ খুলে সে আবার মেয়ে তিনটার দিকে তাকায়। মনে মনে ওদের লাবণ্যের কথা সে ভেবেছিল, অপ্সরীর মতো রূপসী হতে পারে, হতে পারে তার উলটোটাও, কিন্তু ওরা যে দেখতে এতোখানি কুৎসিত আর বীভৎস হতে পারে তা সে কসিমনকালেও ভাবে নি।
সুমন কাঠখোট্টা স্বরে, বলে, হ্যাঁ, আমরাই সুমন। আপনারা কারা?
আমাদের তো আজ এখানে মিট করার কথা, তাই না? আমরা....
হ্যাঁ, মিট তো হলোই।
চলুন না, ভেতরে যাওয়া যাক।
সুমনের মনে আরো দুষ্টুবুদ্ধি চাপলো। মনে যতোখানি হতাশা আর বিবমিষা ছিল, প্রাণপনে বিতারণের চেষ্টা করে আরো প্রাণপনে একটু সহজ ও উৎফুল্ল হতে চেষ্টা করলো।

খাবারের পালা শুরু হলো, ওয়ানথন আর স্যুপ দিয়ে। খেতে খেতে ওরা জিজ্ঞাসা করে, আচ্ছা, সুমন কে?
সুমনরা তিনজনের দিকে পরস্পর চাওয়া চাওয়ি করে।
সুমন শিপনকে দেখিয়ে বলে, ওর নাম সুমন।
শিপন দেখায় রোশনকে, সুমন ওর নাম।
রোশন মিটিমিটি হেসে বলে, আসলে জানেন, আমরা তিন ডিসট্রিক্টের তিন সুমন এক জায়গায় হয়ে সুমন গ্রুপ অব কোম্পানি করেছি। আমাদের সবার নামই সুমন।
ওরা বলে, আপনারা কিন্তু খুবই রসিক।
রোশন বলে, একটা কথা জিজ্ঞাসা করবো খালাম্মারা?
লজ্জায় মেয়েগুলোর চোখমুখ আরো কালো হতে থাকে। রোশন বলে, আপনাদের হাজব্যান্ডরা কি এখন বাসায় নেই? সবাই একযোগে হো হো করে হেসে ওঠে। হাসি থামলে একটা মেয়ে বলে, হাজব্যান্ড পাবো কোথায়, আমাদের তো বিয়েই হয় নি। আসলে আমাদের তো বিয়ের বয়সই হয় নি। কেবল তো পড়ি ক্লাস টেনে।
সুমন এটাকে ফান হিসাবে ধরে নেয়। কারণ, নিপা বলেছিল সে সিটি কলেজ থেকে এবার এইচএসসি দিয়েছে। কথা বলতে বলতে সুমন হঠাৎ বলে, আপনার চেইনটা তো দারুণ, বিদেশী?
হ্যাঁ, আমার মামা সিংগাপুর থেকে পাঠিয়েছে।
একটু দেখানো যাবে?
মেয়েটা ইতস্তত করতে করতে গলা থেকে চেইনটা খুলে সুমনের হাতে দেয়।
সুমন হাতে নিয়ে ঠাট্টা করে বলে, তোরা সাক্ষী, নিপা এটা আমাকে গিফ্‌ট করলো। সবাই হাসে, সুমন চেইনটা নিজের গলায় পরে নেয়।
স্যুপ আর ওয়ানথনের পর ফ্রাইড রাইস, চিকেন ওয়ানিয়ন, শ্রিম খেতে খেতে রসালো গল্পগুজব চলতে থাকে।
সুমনের খাওয়া শেষ হয় সবার আগে। সে উঠে বাইরে চলে যায়। দোকান থেকে তিনটা কাপড়কাচা বল সাবান কিনে। র‌্যাপিং পেপার কিনে। স্কচ-টেপ কিনে। সুন্দর করে মুড়িয়ে তিনটি প্যাকেট করে। প্যাকেট তিনটি সহ আবার এসে খাবারের টেবিলে বসে। সেখানে সবাই খাওয়া দাওয়া শেষ করে বেজায় গল্পে জমে উঠেছে।
সুমন ঘোষণা করে, সম্ভ্রান্ত বংশীয় রূপসী যুবতীগণ, আমাদের পক্ষ থেকে আপনাদের জন্য এই সামান্য উপহার। বলে সে তিনটি প্যাকেট তিনজনকে তুলে দেয়। করতালি পড়ে।
সাতশ টাকার বিল ওঠে। সুমন পান খায়; পান আনার কথা বলে উঠে বাইরে চলে গেলো। একটু পরে শিপনও।
ওরা আসি বলে চলে গেলো, অনেক সময় পার হয়ে যায় কিন্তু ফিরে আসার নাম নেই।
মেয়ে তিনটা মুখ কালো করে বসে আছে। মুখ কালো রোশনেরও। কারণ, ওরা দুজন ফিরে না এলে সাতশ টাকা ওর পকেট থেকেই যাবে।
অনেকক্ষণ অপেক্ষার পর রোশনকেই বিল পরিশোধ করতে হলো।
মেয়েরা চলে যাবে। কিন্তু চেইনটা নিয়ে যে সুমন ভেগেছে সেই চেইন এখন কে এনে দেবে?
এক পর্যায়ে মেয়েটা কেঁদে দিল। এটা তার নিজের চেইন না, তার ভাবীর কাছ থেকে অনেক অনুনয় করে চেয়ে এনেছে সে। এটা না নিয়ে গেলে তার ভাই তাকে আস্ত রাখবে না।
কিন্তু সুমনকে এখন কোথায় পাওয়া যাবে?
শেষ পর্যন্ত সুমনের লন্ড্রির ঠিকানা দিয়ে রোশন কোনো মতে পার পায়।

পরদিন নয়টার দিকে সুমনের লন্ড্রিতে এসে মেয়েটা হাজির। কেঁদেকুটে সুমনের পায়ের ওপর পড়ে গেলো সে। সুমন ক্রূর চোখে ওর দিকে তাকায়। তারপর বলে, নরম কিন্তু ভীষণ কড়া স্বরে, ওই মাগি, তুই এতো কালো অইছিস ক্যান রে?
মেয়েটা আরো গলা ছেড়ে কেঁদে ওঠে।
সুমন বলে, চেইন পাবি একটা শর্তে।
কী শর্ত?
ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে বলে, এখন তো আমার কর্মচারীরা চইলা আসবো, তুই রাইত দশটায় আয়।
ও ভাই, ভাইগোনআপনি আমার মায়ের পেটের ভাই, আমার দিকে চান...
নির্বিকার স্বরে সুমন বলে, মাগি, যা ভাগ, কে তোর চেইন নিছে?
মেয়েটা কাঁদতে কাঁদতে চলে গেলো।

বিকেলে খুব ডাটের সাথে বসে সুমন সারাদিনের হিসেব মেলাচ্ছিল। এমন সময় ঘর আলো করে কে একজন এসে তার সামনে দাঁড়ায়। ওর দিকে তাকিয়ে সুমন হতবিহ্বল হয়ে যায়, এমন মেয়েকে সে কোনোদিন স্বপ্ন বা কল্পনায়ও দেখে নি।
আপনি কি সুমন রহমান? মেয়েটি জিজ্ঞাসা করে।
সুমনের মনে হয়, এই কণ্ঠস্বর তার অতি পরিচিত। কোথায় কবে যেন এর সাথে বহু কথা হয়েছিল।
সুমন উঠে দাঁড়ায়। তার চোখে চোখ রেখে বলে, আপনার নামটা কি জানতে পারি ম্যাডাম?
জি জনাব, অবশ্যই। মেয়েটি ব্যঙ্গাত্মক হাসি হেসে বলে, নিপাকে নিশ্চয়ই আপনি চেনেন।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও তো কাল এসেছিল।
জি না জনাব, ও আসে নি। আমার নামই নিপা। ওরা আমার পাড়ার মেয়ে।
তাহলে? সুমন অবাক হতে থাকে।
হ্যাঁ, আপনার সাথে একটু মজা করার জন্য ওদেরকে পাঠিয়েছিলাম। মজাও হলো, প্লাস আপনাকেও চেনা হলো । এবার চলুন।
কোথায়?
যেখানে আপনার যাওয়া প্রয়োজন।
আপনাদের বাসায়? সুমন কম্পিত স্বরে এই অনর্থক ঠাট্টার কথাটি বলে।
আপনাদের মতো লোক কখনো আমার বাসায় যেতে পারে না। স্যরি জনাব। আর দেরি কেন, বাইরে পুলিশের গাড়ি অপেক্ষা করছে। আর কারো কাছ থেকে তো আর শুনবার সুযোগ নেই, তাই আমিই বলছি। আমার বাবা একজন পুলিশ অফিসার। আমার চাচাও একজন ম্যাজিস্ট্রেট। আমার দাদা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক ছিলেন, আমার ফুফু সুপ্রিম কোর্টের একজন নামজাদা ব্যারিস্টার। আমাদের পরিবার এমনই। তাই আপনার মতো একজন কুৎসিত লোককে এভাবে ধরা সম্ভব হলো। আসুন, আশা করি শ্বশুর বাড়িতে আপনার সময় ভালোই কাটবে।



৩০ সেপ্টেম্বর ২০০৬
৯টি মন্তব্য ৯টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×