পর্ব-৭
সেদিন জুম্মাবার ছিল। কুটিমিয়ার বাবা অনেক আগেই নামাজের জন্য ঘর থেকে বেরিয়ে গেছেন, মাঠ থেকে ফিরতে কুটিমিয়ার দেরি হয়েছিল বলে প্রস্তুত হতে তার বিলম্ব হচ্ছিল।
ঘর থেকে বাইরে কদম ফেলতেই এক জটাধারী পাগল এসে হাঁক দিল, একটা ট্যাকা দে, নইলে ধ্বংস হইয়া যাবি।
কুটিমিয়া ভয় পেয়ে গেলো। তার জমানো কয়েকটা টাকা ঘরে আছে। সে সেখান থেকে একটা টাকা নিয়ে এসে পাগলের হাতে দিতে উদ্যত হয়েছে, এমন সময় তার মা এসে ধমকে উঠলেন, ট্যাকা কি গাছে দরছে নি, কোতাকর কুন্ পাগলে আইয়া কী না কী কইলো আর অমনি ট্যাকা বাইর কইরা দিলি। ট্যাকা থু।
কুটিমিয়া বিব্রত হয়। সে পাগলকে টাকাটা না দিয়ে লুঙ্গির কোঁচড়ে গুঁজে রাখে। তবে তার মন সারাক্ষণ খুঁতখুঁত করতে লাগলো। সে মসজিদে গেলো, কিন্তু স্থিরভাবে নামাজে মনোনিবেশ করতে পারলো না। তার মনে হলো, এই একটি টাকা দান না করার জন্যই হয়তো এই পাগলের অভিশাপে গোয়ালের হালের গরু দুটি মরে যেতে পারে, তার ছোট বোনটি অন্ধ হয়ে যেতে পারে, তার মা-বাবা, ভাইবোন, এমনকি সে নিজেও হয়তো মরে যেতে পারে, বা ভয়ংকর কোনো বিপদে পড়তে পারে। সে তো পাগল না-ও হতে পারে, ভিক্ষুকরূপী ঈশ্বর, মন পরীক্ষা করে দেখার জন্য এক টাকা ভিক্ষা চেয়েছেন।
এরূপ নানাবিধ ভাবনা ভাবতে ভাবতে সে যখন নামাজ পড়ে বাড়ি ফিরছিল, হঠাৎ দেখে সেই পাগলটি থালা হাতে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আছে। সে ছুটে কাছে গিয়ে তার থালায় একটি টাকা রাখে, যেটি সে এই পাগলকে দেবার জন্য ঘর থেকে বের করে এনেছিল, মায়ের আদেশে না দিয়ে যে টাকাটি সে লুঙ্গির কোঁচড়ে গুঁজে রেখেছিল।
সেদিন রাতে তার ছোট বোন নুতুর পাতলা পায়খানা ও বমি হয়, ভোর হবার আগের মুহূর্তে নুতু মারা যায়। দুপুরের দিকে কুটিমিয়ার বাবা বিছানায় পড়েন, তাঁর গুঁটিবসন্ত হয়, সন্ধ্যারাতের দিকে তার মাও টের পান যে, তাঁর শরীর ভরে গুঁটি উঠেছে, পরের দিন সকালে গোয়ালের সবচেয়ে বড় বলদটা একেবারে অকারণে হাম্বা হাম্বা রবে চিৎকার করতে থাকলো, তারপর নেতিয়ে পড়ে মারা গেলো। প্রায় বিশ দিন পর্যন্ত কুটিমিয়ার মা-বাবা বিছানায় পড়ে থাকলেন, যদিও কুটিমিয়ার শরীরে কোনো অমঙ্গলের আভাস পাওয়া গেলো না।
কুটিমিয়ার মনে আর কোনো সন্দেহই থাকলো না যে, একমাত্র সেই পাগলের অভিশাপেই তাদের পরিবারে এতোখানি বিপদ আর ক্ষতি হয়ে গেলো। ওর মা সেই পাগলের খোঁজে হন্যে হয়ে উঠলেন। কুটিমিয়া নিজেও সেই পাগলকে খুঁজলো, কিন্তু তাকে আর কোথাও পাওয়া গেলো না।
তবে অন্য আরেকজন পাগলের সাক্ষাৎ পাওয়া গেলো।
সেদিন টিফিন পিরিয়ডে স্কুল ছুটি হয়ে গিয়েছিল। বাড়ি না ফিরে দু শ গজ দক্ষিণে মেঘুলা বাজারে গেলো সে চুল কাটাতে। সেলুনঘরের পাশে উঠোনের মতো একটা খোলা জায়গা আছে। সেই খোলা জায়গায় অনেক মানুষের ভিড় দেখতে পেয়ে কুটিমিয়া সেখানে গিয়ে দাঁড়ায়। দেখে, তার দ্রুতপঠনের কাবুলিওয়ালার মতো বিশাল-দেহ এক পাগল-কাবুলিওয়ালানকালো রঙের ঢিলেঢালা কাবুলি তার পরনে, মাথায় কালো হ্যাট, চারধারে ঝাঁকড়া চুলের বাবরি দোলে, শ্মশ্রূমণ্ডিত মুখমণ্ডল, তার হাতে বাঁশির মতো এক লাঠি, লাঠি নেড়ে নেড়ে সে অনর্গল কথা বলে যাচ্ছে আর মাঝে মাঝেই চিৎকার দিয়ে বলে উঠছে, এই দুনিয়া ফানা হবে কিছুই রবে না রে, কিছুই রবে না...
ভিড় ঠেলে কুটিমিয়া একদম পাগলের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। পাগলের গলায় লম্বা পুঁতির মালা কিংবা তসবি ঝোলে, সবচেয়ে আশ্চর্য তার ডান হাতের আঙ্গুলভর্তি আংটিনতিনটি আংটি তার তিন আঙ্গুলে শক্তভাবে এঁটে আছে, মাংস ফুলে এতোই স্ফীত হয়েছে যে আংটির পেঁচানো ধার দেখা যায় না, সবচাইতে বীভৎস ও ভয়ংকর দৃশ্য যা দেখে কুটিমিয়ার গা কাটা দিয়ে উঠেছিল তা হলো, পাগলের বাম হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলির গোড়ায় মাংস ছিদ্র করে একটি বড় সাদা আংটি গেঁথে রাখা হয়েছে, পাগল হাত নেড়ে নেড়ে কথা বলে, আংটিটা সেই সঙ্গে ঝুলতে থাকে। কী অদ্ভুত হাস্যলীলায় সেই পাগল সবাইকে মাতিয়ে তুলেছে।
এ কোন পাগল? কুটিমিয়ার মনে প্রশ্ন জেগেছিল, নতুন বেশে সেই পাগল নয় তো যে একদিন তার কাছে একটা টাকা ভিক্ষা চেয়েছিল, যার অভিশাপে তার ছোট বোন নুতু মারা গিয়েছিল, গোয়ালের সবচাইতে বড় বলদটা মরে গিয়েছিল, তার মা ও বাবা গুঁটিবসন্তে আক্রান্ত হয়েছিলেন? কিন্তু এই পাগল কোনো টাকা ভিক্ষা চাইছে না কেন? এর কি কোনো টাকার দরকার নেই? পেটের খিদে নেই? সে অনর্গল অ-হাসি হাসছে, গলা ছেড়ে ধুয়া তুলছে- এই দুনিয়া ফানা হবে-, আরো কতো মজার মজার কথা বলছে, মানুষ প্রাণভরে তা উপভোগ করছে।
কুটিমিয়ার বুক আনচান করতে লাগলো। তার বুকপকেটে দুটি টাকা আছে, চুল কাটানোর টাকা। আজ যদি এই পাগল টাকা চায় তবে সবার আগে সে তার হাতে টাকা দুটি তুলে দিবে।
বেলা পড়ে যায়, আশ্চর্য পাগলের মেলা তবু ভাঙ্গে না। মন্ত্রমুগ্ধের মতো কুটিমিয়া সেই তখন থেকেই অনড় দাঁড়িয়ে আছে। তার মনে একবার একটু ইচ্ছেও জাগলো, পাগল যখন আসর ছেড়ে বের হয়ে যাবে তখন সে তার কাছে গিয়ে বলবে, সে যেন তার সাথে তাদের বাড়িতে যায়, তার মা-বাবা এমন একজন পাগলের জন্য অস্থির হয়ে আছেন।
অনেক পরে জটলা ভেদ করে পাগল বের হয়ে গেলো, তার পিছে পিছে ছুটলো কিশোরের দল, অনেক যুবক, এমনকি বয়স্করাও কেউ কেউ পিছু নিল। পিছু নিল কুটিমিয়াও। কুটিমিয়া ভাবে, পাগলের একদম কাছাকাছি হবে সে, তার হাত ধরে গা ঘেঁষে হাঁটতে হাঁটতে সে পাগলকে অনুনয় করে বলবে, তাদের বাড়িতে তাকে যেতেই হবে, যেতেই হবেনতার মা-বাবা পাগলের মতো এমন একজন পাগল খুঁজছেন।
বাজারের ভিতরের গলি দিয়ে পাগল তার ধুয়া তুলতে তুলতে পশ্চিম দিকে ছুটছে, দেখতে দেখতে তার পেছনে মানুষের সংখ্যা প্রচুর বেড়ে গেলো, কেউ জানে না তারা কেন কী উদ্দেশে এই পাগলের পিছে পিছে ছুটে চলেছে, তবু মানুষ ছুটছে তো ছুটছেই। যেন এক হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা, সব মানুষ সেই বংশীবাদকের পিছে ছুটে চলেছে। এখন মানুষের মুখে মুখেও সেই ধুয়া, পাগল সুর তুলে গেয়ে ওঠে- এই দুনিয়া ফানা হবে কিছুই রবে না, সঙ্গে সঙ্গে ছুটন্ত মানুষের মুখেও প্রতিধ্বনিত হতে থাকলো-এই দুনিয়া ফানা হবে কিছুই রবে না।
কিশোর কুটিমিয়া জানে না এই ধুয়ার অর্থ কী। সবে সে ষষ্ঠ শ্রেণীর ছাত্র, এই আধ্যাত্মিক ধুয়ার গূঢ়ার্থ তার বোধগম্য নয়, তবু সে সবার সাথে সুর তুললো- এই দুনিয়া ফানা হবে কিছুই রবে না রে, কিছুই রবে না। যেন এক স্বপ্নাতুর ঘুমের ঘোরে আছে সে, সবাই যেদিকে ছুটছে সে-ও সেদিকে ছুটে চলেছে পাগলের পিছে পিছে। সে দৌড়ে পাগলের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করে, কিছুদূর অগ্রসর হয়, আবার মানুষের চাপাচাপিতে সে পেছনে পড়ে যায়।
কিন্তু শেষ পর্যন্ত কুটিমিয়া পাগলের একদম নাগালে চলে এলো। তার বামপাশ ঘেঁষে সে হাঁটতে লাগলো, সুর করে সমবেত ধুয়া তুলতে লাগলো, সে বেমালুম ভুলে গেলো তার মনের সেই কথাটি, যে কথা বলার জন্য সে কতো উদগ্রীব ছিলনপাগলকে সে বলবে সে যেন তার সাথে তাদের বাড়ি যায়।
মেঘুলা বাজার পার হয়ে খালের পারের সরু রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে নদীর পানে ছুটে চললো পাগল ও তার অনুসারীদের দল। কেউ জানে না কোথায় গিয়ে এই যাত্রা শেষ হবে।
ছুটতে ছুটতে তারা পদ্মা নদীর তীরে চলে এলো। পাগলের দু পাশে জড়ো হয়ে দাঁড়ালো সবাই, প্রমত্ত পদ্মার উত্তাল ঢেউ পাড়ে এসে আছড়ে পড়ছে, দড়াম দড়াম শব্দে ঝপাঝপ তীর ভেঙ্গে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে, নদীর ওপাড় যায় না দেখা, মাঝখানে শুধু ঢেউ আর ঢেউ। কুটিমিয়া ভাবে, পাগলের মনে কতোই না বিচিত্র শখ জেগেছে, তাই হয়তো এই সর্বগ্রাসী পদ্মাকে দেখার জন্য এ পাগল এতোদূর ছুটে এসেছে।
আরো সময় চলে যায়, পাগল একটানা তার ধুয়া তুলে যাচ্ছে, ফিরে যাবার কোনো মতিগতি নেই। কুটিমিয়া একবার ভাবে, তার হাত ধরে তাকে টান দিয়ে বলবে, চলো, তাড়াতাড়ি ফিরে যাই। কিন্তু তার সাহসে কুলায় না।
হঠাৎ পাগলের ধুয়া বন্ধ হয়ে যায়, সে স্থির হয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে তাকায়নচোখ জোড়া ঈষৎ মুদিত করে কী যেন বলতে থাকে বিড়বিড় করে, তারপর অকসমাৎ আল্লাহু আকবর বলে সুদীর্ঘ বিকট চিৎকারে চারদিক প্রকম্পিত করে এক লম্ফে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে আশ্চর্য পাগলনঘটনার আকসিমকতায় মুহূর্তকালের জন্য সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়ে, পরক্ষণেই হায় হায় ধ্বনি ওঠে মানুষের, পাগলের মৃত্যু-আশংকায় সবার মুখ শুকিয়ে যায়নপ্রবল ঘুর্ণিস্রোত আর ঢেউয়ের তোড়ে নিমিষেই পানির নিচে তলিয়ে যায় পাগল।
পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাগলনহতবাক মানুষের উদ্বিগ্ন চোখ ঢেউয়ের ভাঁজ ভেঙ্গে ভেঙ্গে কাছ থেকে বহু দূর চলে যায়নযদিই বা পানির ভিতর থেকে ফুউশ করে মাথা তুলে ভেসে ওঠে আশ্চর্য পাগলটি।
সময় পেরিয়ে যায়, সূর্য নামতে থাকে নিচেনএকদল মানুষ গভীর উৎকণ্ঠায় অপলক তাকিয়ে থাকে, পাগলের ভাসমান মৃতদেহটি যদি ভেসে ওঠেনযদিই বা ভেসে ওঠে।
পাগলের ভাসমান মৃতদেহটি ভেসে ওঠে না। ধীরে ধীরে মানুষ স্থান ছাড়তে শুরু করেনযেতে যেতে আফসোসে ফেটে পড়েনহায়, অবলা পাগলটি চোখের সামনে নদীতে ঝাঁপিয়ে পড়ে মারা গেলো!
হঠাৎ কে একজন চিৎকার করে ওঠে, ঐ যেনঐ যে দেখা যায়-
চকিতে সবাই ফিরে তাকায়নঅবাক হয়ে দেখে- দূরে- বহু দূরে- পানির ওপর সটান চিৎ হয়ে ভেসে ঢেউয়ের সাথে দোল খাচ্ছে আশ্চর্য পাগলটি- তার সম্পূর্ণ শরীরখানি পানির ওপরে ভাসমান, পা আর হাতগুলো এলোমেলো ছড়ানো- মাঝে মাঝেই ডান হাতের লাঠিটি উঁচিয়ে আকাশের দিকে তুলে ধরে। তীরের মানুষ আশ্চর্য হয়ে ভাসমান পাগলের আজব কীর্তি দেখে। ভাসতে ভাসতে পাগলের দেহখানি আরো দূরে চলে যায়, যতোক্ষণ দেখা গেলো তীরের মানুষ ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকলো, দূরে যেতে যেতে এক সময় অন্ধকারের ছাযায় সে অদৃশ্য হয়ে গেলো- তখন পশ্চিমাকাশে লাল সূর্য পটে বসে গেছে।
বাড়ি ফিরে সে রাতে কুটিমিয়ার বহু রাত অব্দি ঘুম হলো না। সে কেবলই ভাবতে লাগলো, এ কি পাগল, নাকি অন্য কিছু? সে এরূপ আরেক পাগলের কথা শুনেছে, সেই পাগলের দেশ বহুদূরে নয়, তার দাদির বাপের বাড়ির গাঁয়ে সেই পাগলের বাড়ি ছিল, তাদের গ্রাম থেকে মাত্র সাতটি গ্রাম উত্তরে। বহু ছোটবেলায় তার দাদি তাকে সেই পাগলের কথা বলতেন। সে আসলে পাগল ছিল না, ছিল ফকির। লোকে বলতো পাষাণ ফকির। এক রাতে পাষাণ ফকির ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লো, তার স্ত্রী কাঁদলো, মা কাঁদলো, কিন্তু তাকে ফেরানো গেলো না, সে গৃহত্যাগী হয়ে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরে বেড়াবে পরমের সান্নিধ্য লাভের জন্য। পাষাণ ফকির সবাইকে উপেক্ষা করে ছুটে চললো, পিছে পিছে তার ক্রন্দনরতা স্ত্রী ও জননী।
পদ্মার পাড়ে এসে সে পানির ওপর কদম ফেললো। তার মা ও স্ত্রী অবাক হয়ে লক্ষ্য করলো, ডাঙ্গায় হেঁটে চলার মতো পাষাণ ফকির পানির ওপর দিয়ে অতি স্বাভাবিক পদক্ষেপে ধীরে ধীরে হেঁটে যাচ্ছে। বধূ ও জননী করুণ কান্নায় বুক ভাসালো, কিন্তু পাষাণ ফকির পিছুটানের কোনো ভ্রূক্ষেপই করলো না। সেই যে সে ঘর ছাড়লো, ইহজনমে আর ফিরলো না। তারপর কেউ তার আর কোনো খবরও জানতে পারে নি।
কার্তিকপুর আর নুরুল্লাপুর গ্রামগুলো পীরফকিরদের জন্য বিখ্যাত। নুরুল্লাপুরের শানাল ফকির, কার্তিকপুরের মাদাইর ফকির, শ্যামফকির এবং শারফিন ফকিরের ভক্তদের সংখ্যা গুণে শেষ করা যাবে না। এঁরা তাঁদের পূর্ব পুরুষগণের কাছ থেকে বংশ-পরম্পরায় ফকিরি লাভ করেছেন। ফকিরি প্রাপ্তি একটা অসামান্য সাধনার ব্যাপার। মুরিদ রূপে বছরের পর বছর বাবা-ফকিরের পদসেবা করতে হয়। মৃত্যুর সময় বাবা যাঁকে ফকিরি দান করে যান তিনিই হোন পরলোকগত ফকিরের যোগ্য উত্তরসূরি। ফকিরি প্রাপ্তিতে অনেক সময় অনেকে বঞ্চিত হয়ে থাকেন। জনশ্রুতি আছে, দোহারপুরীর জাবেদ হাওলাদার জনৈক করিম শাহ্ ফকিরের মুরিদ হয়েছিলেন। সেই কৈশোর-শৈশব থেকেই তিনি ফকিরি প্রাপ্তির সাধনায় বাবা করিম শাহ্-এর চরণতলে ভক্তিরত ছিলেন। বাবার শুভ দৃষ্টিও তাঁর ওপরই ছিল এবং মানুষের ধারণা অমূলক ছিল না যে জাবেদ হাওলাদারই বাবার ফকিরি লাভে ধন্য হবেন। বাবা করিম শাহ্ যেদিন শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবেন, জান কবজ হবার আগের মুহূর্তে তিনি আঁখি মুদিত করে জড়ানো স্বরে টেনে টেনে ডাকলেন, জাবেদ কইরে? জাবেদ হাওলাদার তখন বাবার পথ্য তৈরিতে ব্যস্ত ছিলেন, পাশে বসে পাখায় বাতাস করছিলেন জাবেদ হাওলাদারের জ্যেষ্ঠ সহোদর আবেদ হাওলাদার। ফকিরি তাঁরও আরাধ্য ছিল আকৈশোর, কিন্তু তিনি কখনো বাবার সেবায় আত্মনিয়োগ করতে পারেননি, অধৈর্য্য হয়ে পড়তেন। আবেদ হাওলাদারের মাথায় কূট বুদ্ধি খেলে যায়; তিনি মাথা নিচু করে বাবার কাছে এগিয়ে এসে অস্থির কণ্ঠে বলেন, বাবা, আমি তো আপনার পায়ের তলেই আছি। বাবা শরীরে শক্তি সঞ্চয় করে ডান হাত উঁচিয়ে আবেদ হাওলাদারকে স্পর্শ করেন, তারপর ঈষৎ কাত হয়ে তাঁকে লক্ষ্য করে মৃদু ফুঁ ছুঁড়ে দিয়ে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।
এরপর আবেদ হাওলাদার ফকির হলেন বটে কিন্তু তাঁর কনিষ্ঠ জাবেদ হাওলাদার ঞ্চানহারা পাগল হয়ে গেলেন। তিনি দু হাতে নিজের বুক ফাটান আর চিৎকার করে করিম শাহ্কে অকথ্য অশ্লীল ভাষায় গালি ঝাড়তে থাকেন, বাবা করিম শাহ্ তাঁর সাথে বেইমানি করেছেন, তাঁকে ঠকিয়ে তাঁর জ্যেষ্ঠ ভ্রাতাকে ফকিরি দান করে গেছেন।
কতো দূর-দূরান্ত থেকে যে ভক্তরা ছুটে আসেন তার ইয়ত্তা নেই। কোনো কোনো ফকিরের বিশেষ শ্রেণীর ভক্ত রয়েছে, যেমন রয়েছে মাদাইর ফকিরেরও। এদের মুরিদ হওয়ারও একটা আশ্চর্য জনশ্রুতি আছে। মাদাইর ফকির একবার তাঁর এক শিষ্যের নিমন্ত্রণে ঢাকা গিয়েছিলেন। লঞ্চ থেকে সদরঘাটে নেমে চিকন অলিগলি খুঁজে খুঁজে তিনি শিষ্যের বাড়ি যাচ্ছিলেন; হঠাৎ একদল মেয়ের কলকল হাসিতে ফিরে তাকান, তখনো তিনি বুঝতে পারেননি এই ললনারা তাঁকেই উদ্দেশ্য করে রঙ্গহাস্যে গলে পড়ছে। তাদের বিশ্রী আর অশালীন দেহভঙ্গি উপেক্ষা করে তিনি আপন মনে সামনে এগোতে থাকেননঅমন সময় এক মেয়ে দৌড়ে এসে তাঁর হাত টেনে ধরে, বলে, আমার ঘরে আসো গো নাগর। হাত ছুটিয়ে নেবার আগেই লক্ষ্য করে দেখেন আরো অসংখ্য মেয়ে তাঁকে ঘিরে ফেলেছে, তাদের ইঙ্গিতপূর্ণ কুৎসিত হাসিতে মুখরিত চারদিক। তাঁর বুঝতে আর বিলম্ব হয় না যে তিনি বেজায় ভুল জায়গায় চলে এসেছেন।
তোরা কী চাস? মাদাইর ফকির এ কথা জিঞ্চাসা করার সঙ্গে সঙ্গে বেশ্যাগণ আবারো কলকল হাসিতে ফেটে পড়ে। অশ্লীল ইঙ্গিতে বলে, তোমারে চাইগো...ঘরে চলো, ঘরে চলো...।
অতঃপর কেউ তাঁর হাত ধরে টানে, কেউ টানে ধূতি, কেউ তাঁর চুলের বেণি ধরে টানে, কেউ টানে শ্মশ্রূ ধরে। মাদাইর ফকির অস্থির হয়ে বলেন, আমারে ছেড়ে দে তোরা, জ্বালাইস না, ছেড়ে দে।
বেশ্যাদের কেউ বলতে থাকে, আসো না নাগর, রস খাইয়া যাও।
ফকির বলেন, তোরা কি চিনলি না আমারে? আমি তো তোদেরই জাত।
আমাদের জাত? ওরা খিলখিল করে হেসে ওঠে। বলে, আমাদের জাত হইলে তোমার দাঁড়ি আর গোঁফ গজাইলো ক্যান গো রসের নাগর?
এমন সময় একজন সামনে এসে হঠাৎ ধূতির কোনা ধরে এক টানে তাঁকে উলঙ্গ করে ফেলে, তখনই সবাই বিসময়ে হতবাক হয়ে লক্ষ্য করে, মাদাইর ফকিরের নিম্নাঙ্গে কোনো পুরুষাঙ্গ নেই, সেখানে একটা পুষ্পের মতো ফুটে আছে নারীর শাশ্বত যোনিখানি।
বাবা বলে বেশ্যারা তাঁর পায়ে লুটিয়ে পড়ে। বাবা তাদেরকে ক্ষমা করে দেন।
পৌষ মাসে যে চাঁদ ওঠে, সেই চাঁদের পূর্ণিমারাতে ফকির বাড়িতে ধামাইল বসে। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা পায়ে হেঁটে ধামাইলে এসে শরীক হয়।
মাদাইর ফকিরের বাড়িতে যতো ভক্ত আসে, তাদের এক চতুর্থাংশ হলো দেহপসারিণী। সারাদেশে এদের কাছে কিভাবে মাদাইর ফকিরের কথা পৌঁছে গেছে তা এক বিস্ময় বটে।
পৌষ-চাঁদের ধামাইলও একটা দারুণ বিস্ময়। ফকির-বাবাদের অদৃশ্য শক্তি-গুরু, অদৃশ্যে থেকে যিনি তাঁদেরকে যাবতীয় ফকিরি শক্তি সঞ্চালিত করেন, ভরা পূর্ণিমার টলমল লগ্নে সেই শক্তি-গুরু বাবার সামনে আবির্ভূত হোন, সেটাই ধামাইলের লগ্ন। সন্ধ্যায় তেঁতুল গাছের কাঁচা ডাল ভেঙ্গে লাকড়ি করা হয়, বার-বাড়ির প্রশস্ত উঠোনের মাঝখানে সেই লাকড়ি সাজানো হয়, তারপর পূর্ণিমা-লগ্নের জন্য অপেক্ষা শুরু হয়। ফকির বাবা তাঁর দরগায় তাঁর বাবার মাজারের একধারে ভক্ত-মুরিদ পরিবেষ্টিত আসনে জোড়াসিন দিয়ে বসেন, মাজারের চারপাশ জুড়ে ধূপদানি ও মোমবাতি জ্বলে, কুণ্ডলি পাকিয়ে ধূপের ধোঁয়া উড়ে ঘরময় ছড়িয়ে পড়ে, গন্ধে ভারী হয়ে ওঠে বাবার আসনখানি এবং সারা ঘর। বাবার সামনে অদূরে বিশাল কাষার থালায় সোনারুপার মোহর-অলঙ্কার, টাকাপয়সা; একটু দূরে চালডাল ভর্তি বিশালাকার কয়েকটা ঝাঁকা; দূরাগত ভক্তবৃন্দ যে যার সাধ্যমতো থালায় টাকাপয়সা বা গয়নাগাটি ফেলছে, গামছা-চাদরে বাঁধা চালডাল ফেলছে ঝাঁকার ভিতর। দরগার বাইরে কয়েকটা খাঁচা, ভক্তদের মানত করা হাঁস-মুরগিতে বোঝাই, বাইরে খুঁটিতে বাঁধা ছাগল-ভেড়া, বা ষাঁড়। মাজারের পুরো গতরখানি রঙিন মখমলে কাপড়ে মোড়ানো, তার ওপরে ছোট চাঁদোয়া, চাঁদোয়ার ঘেরের মধ্যে সুন্দর অক্ষরে লেখা থাকেনজ্ঞবাবার পদসেবায়ই মুক্তি।ঞ্চ ভক্তগণ এসে সর্বাগ্রে বাবার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে, তারপর মোলায়েমভাবে উপুড় হয়ে বাবার পায়ের কাছে মাথা রাখে, মাথা উঠিয়ে দু হাতে বাবার পদধুলি নিয়ে মুখমণ্ডলে মাখে। তুষ্টমুখ বাবার ঠোঁটের কোণে সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে ওঠে।
বাবার আসন ঘিরে চারপাশে ভক্তবৃন্দ সমবেত কণ্ঠে অনর্গল জিকির তুলতে থাকে; রাত্রি গভীর হয়, আর ধীরে ধীরে ধামাইলের লগ্ন ঘনিয়ে আসে, অর্ধ-নিমীলিত-আঁখি ফকির বাবা উর্ধ্বপানে চেয়ে জোড়াসিনে স্থির ও গভীর ধ্যানে মগ্ননজিকিরের তালে তালে ধূপগন্ধময় বাবার আসনটি যেন দুলতে থাকে।
ধামাইল উপলক্ষে সাত দিন আগে থেকে বাঁশ নাচানো শুরু হয়। বাঁশ নাচানোর জন্য একই মাপের সাতটি লম্বা বাঁশ লাগে। সাত বাঁশের মাথায় সাত রঙের পাটের জুটি বাঁধা হয়, তারপর বাঁশগুলোকে জুটির রঙের কাপড় দিয়ে আগা থেকে গোড়া পর্যন্ত মুড়িয়ে দেয়া হয়। যারা বাঁশ নাচায় তাদেরকে বলা হয় বাঁইশা। ফকির-বাবার জন্য নিবেদিত-প্রাণ না হলে কেউ বাঁইশা হতে পারে না।
সাতটি বাঁশের জন্য সাত জন বা তার বেশি সংখ্যক বাঁইশা লাগে। ক্লান্ত বাঁইশাকে বদল করার জন্য অতিরিক্ত বাঁইশার প্রয়োজন। বাঁইশাদলের সাথে থাকে একদল ঢোলক ও বাদক। ঢোলক ও বাদকদলের বাদ্যের তালে তালে বাঁশ নাচানো হয়। বাঁশ নাচানোর সময় বাঁইশাগণ খাড়া করে বাঁশ ধরে বাদকদল সমেত উঠোনের একটা নির্দিষ্ট গোলাকার স্থানে ঘড়ির কাঁটার বিপরীত দিকে বৃত্তাকারে ঘুরতে থাকে। প্রথমে দৌড়ে ঘুরতে শুরু করে, তারপর বাদ্যের তালে একসঙ্গে সবার পা থামে, এরপর ধীর তালে একবার ডান পা উঠিয়ে ভিতরের দিকে ফেলে, পরক্ষণেই উঠিয়ে বাইরে নেয়, এভাবেই আস্তে আস্তে সামনে এগোয়নধীর তালে বাঁশ নাচানো শুরু করে বাঁইশাগণ ক্রমশ দ্রুত কদম ফেলতে শুরু করে চক্রাকারে ঘুরতে থাকে। এভাবেই বাঁইশারা বাঁশ নাচায়। বাঁশ নাচানোর সময় প্রত্যেক বাঁইশা তাদের ঘুর্ণনের ক্রম বজায় রাখে, কোনোখানেই সেই ক্রমের ব্যত্যয় ঘটানো হয় না। এক নাগাড়ে আট-দশ মিনিট পর্যন্ত বাঁশ নাচানো চলতে থাকে। তারপর উঠোনের মাঝখানে একটা বেতের ঝাঁপি রেখে তার ভিতরে বাঁশের গোড়া ফেলে ঘরের চালের সাথে কাত করে বাঁশ রাখা হয়। বাঁশ নামানো এবং উঠানোর সময় একই ক্রম বজায় রাখা হয়। সর্বাপেক্ষা গুণী ও একনিষ্ঠ বাঁইশাকে দেয়া হয় প্রথম বাঁশটি।
বেতের ঝাঁপিতে বাঁশ নামিয়ে রাখার পর জনৈক মুরিদ অন্দর বাড়ি থেকে সাজিভর্তি চালডাল এনে ফেলে সেই ঝাঁপির ভিতরে। ঝাঁপি টানার জন্যও একজন নিবেদিত ভক্ত থাকে।
আসছে...
আগের পর্ব-৬

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।

