আমার প্রিয় পোস্ট

আমার আড়িয়াল বিল কাঁদে... মা আমাকে কতোদিন দেখে নি

পথের সন্ধানে পর্ব-৮

০৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:৩০

শেয়ারঃ
0 0 0



পর্ব-৮

ধামাইলের সাত দিন আগেই বাঁইশাগণ দূর-দূরান্তের মুরিদগণের উদ্দেশে বেরিয়ে পড়ে। বহু পথ পাড়ি দিয়ে গ্রাম থেকে গ্রামান্তরের বাড়ি বাড়ি ঘুরে তারা বাঁশ নাচায়। নিজ নিজ বাড়িতে বাঁশ নাচানো শেষে বেতের ঝাঁপিতে ভক্তগণ চালডাল দেয়, সংগৃহীত বিপুল পরিমাণ চালডাল বহন করার জন্যও দলের সাথে সাগরেদ থাকে। দিনভর এবং রাতেরও অনেকখানি জুড়ে বাঁশ নাচিয়ে বাঁইশাগণ যখন ক্লান্ত হয়ে পড়ে তখন তারা কোনো এক সাগরেদের বাড়িতে রাত্রিযাপন করেনসে-বাড়িতে বাঁশ নাচানো শেষে উঠোনে গোল সারিতে বসে কলাপাতায় পাতলা খিচুরি খায়, তারপর গভীর রাত পর্যন্ত একটানা মারফতি আর মুর্শিদি গান গায়। সকালে উঠে তারা অন্য গাঁয়ের অন্য সাগরেদগণের উদ্দেশে পুনরায় বেরিয়ে পড়ে। দূরের মুরিদগণের বাড়িতে বাঁশ নাচানো শেষ করে ধামাইলের দু একদিন আগে বাঁইশাগণ ফকির বাড়িতে ফিরে আসে। ধামাইলের দিন তারা সকালে বাড়ি হতে বেরিয়ে কাছের গাঁয়ের ভক্তদের বাড়িতে বাঁশ নাচাতে যায়। সকল ভক্তের বাড়িতে বাঁশ নাচানো শেষে সৌজন্য পৌঁছে দেয়ার লক্ষে তারা সতীর্থ ফকিরগণের বাড়িতেও বাঁশ নাচায়; কোনো ফকিরের বাঁশ যদি অন্য এক ফকিরের বাড়িতে না নাচানো হয়, সেটা দুই ফকিরের মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্বের বহিঃপ্রকাশ বলেই গণ্য করা হয়।

এভাবে বাড়ি বাড়ি বাঁশ নাচাতে নাচাতে ধামাইলের লগ্ন ঘনিয়ে আসতে থাকে। ওদিকে বাবা-ফকিরের বাঁশের নাচ দেখার জন্য ভক্তগণ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে থাকে। লগ্নের ঘণ্টা দুয়েক আগে ফকিরের বাঁশ নিজ বাড়িতে ফিরে আসে। ততোক্ষণে দরগায় বাবার আসন ঘিরে ভক্তগণ গভীর জিকিরমগ্ন হয়ে পড়ে।

নিজ বাড়ির বাঁশ নিজ বাড়িতে ফেরত আসার পর অন্য ফকিরের বাঁশ আর আসার নিয়ম নেই। অন্য ফকিরের বাঁশ খুব অল্প সময়ের জন্য নাচানো হয়নউর্ধ্বে দশ মিনিট। কিন্তু বাড়ির বাঁশ নাচানো হয় দীর্ঘ সময় ধরেন্দুই ধাপে, ফেরত আসার পর থেকেই ভিতর বাড়ির উঠোনে প্রায় ঘণ্টাখানেক, মাঝখানে আধঘণ্টার মতো বিশ্রাম, তারপর বার বাড়ির উঠোনে তেঁতুল গাছের কাঁচা লাকড়ি দিয়ে সাজানো ধামাইল-স্থানের চারধারে, পূর্ণিমার লগ্নে ধামাইল শেষ না হওয়া পর্যন্ত তা চলতে থাকে।

বাঁশ বাড়িতে ফেরত আসার সঙ্গে সঙ্গে ভক্তদের মাঝে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে, অন্য ফকিরের বাঁশ নাচানোয় এতো উত্তেজনা জাগে না। তারা ছুটে এসে উঠোনের মাঝখানে ভিড় করে গোল হয়ে দাঁড়ায়, বাঁইশাদের হাতে বাঁশ নাচে, দরগার ভিতরে একটানা জিকির ধ্বনিত হয়, পুরো আকাশ বাতাস সেই সময় টলমল টলমল করে।

পূর্ণিমার লগ্ন সমাসন্ন, বাবার ভার ও ভক্তদের সাথে সওয়াল-জবাব চলমান- জিকিরের ধ্বনি, বাদকদলের বাজনা ও বাঁশির সুরের ঐকতান মূর্ছনা- হঠাৎ একসময় জোড়াসিন ভেঙ্গে সচিৎকারে বাবা উঠে দাঁড়ান, তারপর ভক্তদেরকে ডিঙ্গিয়ে দ্রুত ছুটে চলেন বার বাড়ির উঠোনে ধামাইল-স্থানের দিকেনস্বল্প বিশ্রাম শেষে বাদকদল ও বাঁইশাগণ আগে থেকেই প্রস্তুত ছিল, বাবাকে ছুটতে দেখামাত্র তারা বাঁশ লয়ে বাবার পেছনে ধাবিত হয়ে ধামাইলের জন্য নির্ধারিত স্থানে গিয়ে হাজির হয়।

শিষ্যসাগরেদ সমভিব্যাহারে সাজানো তেঁতুল লাকড়ির চারপাশে গোল হয়ে বাবা হাঁটু গেড়ে বসেন। জোড়াবদ্ধ দুই হাত বার বার কপালে ঠেকান আর সমস্বরে ঘন ঘন গুরু-ধ্বনি করে ওঠেন। বাঁইশাগণ এখন নাচে না, বাঁশ হাতে দ্রুত ছুটে চলেছে তারা, যতো দ্রুত দৌড়ে চলা সম্ভব। ঢোল ও বাঁশির ঐকবাদনে পূর্ণিমার চাঁদ তখন আকাশে টলমল করে। এরই মাঝে সাগরেদগণ মোমের আগুনে কাঁচা লাকড়ি জ্বালতে শুরু করে। লাকড়ির ধোঁয়ায় তাদের চোখ নাক মুখ গলে জল ঝরতে থাকে। তবু তারা থেমে থাকে না।

ঠিক লগ্নের সময়টাতে অকস্মাৎ লাকড়ির স্তূপে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে ওঠে, সেই আগুনের শিখা মানুষের মাথা ছাড়িয়ে বাঁশের মাথায় জুটি পর্যন্ত পৌঁছে যায়। বাদ্যের তাল ও বাঁশির সুরও তখন দ্রুততর লয়ে বাজতে থাকে, বাঁইশাদের গতিও তখন পৌঁছে যায় শীর্ষে। লাকড়ি জ্বলতে জ্বলতে আগুনের শিখা নিচে নেমে আসে, যখন একেবারে নিভে যায়, দু হাতে এক খাবলা জ্বলন্ত কয়লা নিয়ে বাবা ছুটে যান কোনো এক পুকুরের পানে, এক ঝাঁপে পানিতে নেমে দীর্ঘ এক ডুব দেন, তারপর শূন্য হাতে উঠে এসে অন্দর বাড়িতে উধাও হয়ে যান, তাঁর সাথে তখন অন্য কারো সঙ্গী হবার নিয়ম নেই।

ঐ দিকে ভক্তরা ধামাইল শেষে পোড়া লাকড়ির কয়লা কিংবা ছাইয়ের জন্য এক কঠিন যুদ্ধে অবতীর্ণ হয়। মুহূর্তে ধূলাবালি আর মাটিসুদ্ধ সেই কয়লা নিঃশেষ হয়ে যায়। এই কয়লার অনেক ফজিলত, যারা এই কয়লা লাভে ব্যর্থ হয় তাদেরকে পরবর্তী ধামাইলের জন্য পুরো একটা বছর অপেক্ষা করতে হয়।

ধামাইললগ্ন পরবর্তী চাঞ্চল্যের মধ্যেই একসময় দেখা যায় ভোর হয়ে গেছে, তারপরই মানুষজন উঠোনের একপাশে জড়ো করে রাখা কলাপাতার জন্য ছোটে, অল্পক্ষণের মধ্যেই সিন্নি পরিবেশিত হবে। এই সিন্নি কখনো চালডালের খিচুরি, কখনো বা ভাত ও পাতলা ডাল। পুরো রাতের ধকল শেষে সিন্নি খেয়ে ভক্তগণ ক্ষুধা নিবারণ করে।
এভাবে বাড়ি ফেরার সময় হয়ে যায়। ফকির বাবা অন্দর মহল থেকে ফিরে এসে ভক্তদেরকে বিদায় জানানোর জন্য আসন গ্রহণ করেন। তাঁর জোড়াসিন নেই, চেহারায় সৌম্যভাব, তবু ধামাইলের ধকলে বিধ্বস্ত মনে হয়। ভক্তরা একে একে সভক্তি বিদায় গ্রহণ করে, তিনি মৃদু হেসে নিরুত্তর বিদায় জানান।

সেদিন কুটিমিয়াকে কোনোভাবেই ভক্তি করানো যায়নি, সে পাথরের মতো শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেকে ভক্তি করাতে না পেরে কুটিমিয়ার বাবা ফকিরের সামনে খুব লজ্জিত হয়েছিলেন।
এরপর যতোবার সে ধামাইলে গেছে, বাবার সাথে একবারও ফকিরের সামনে গিয়ে উপস্থিত হয়নি সে, উপুড় হয়ে ফকিরের পায়ে ভক্তি করতে হয় যদি, এই ভয়ে। ভক্তি করতে কুটিমিয়ার লজ্জার অন্ত ছিল না। কখনো কখনো তার মা তাকে হাত ধরে টেনে ফকিরের সামনে নিতে চেষ্ট করতো, কিন্তু সে ছুটে পালাতো, অথবা শক্ত হয়ে পেছনে ঝুঁলে পড়ে বাঁকা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, যেতো না। অথচ দূরে দাঁড়িয়ে সে দেখতো তার মা ও বাবা অতিশয় শ্রদ্ধাবিগলিত হয়ে ফকির-বাবার পায়ের উপর উপুড় হয়ে পড়ে থেকে ভক্তি প্রদান করছেন। ভক্তি শেষে ফিরে এলে কুটিমিয়া একা একা ফকিরের খুব কাছাকাছি গিয়ে মানুষের ভিড়ে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে থাকতো, দেখতো কতো মানুষ তার মা-বাবার মতো দীর্ঘ সময় ধরে ভক্তি করে ফকির বাবার পদধুলি গ্রহণ করছে।

ধামাইল শেষে পরদিন নুরুল্লাপুরের মেলায় যেতো তারা। নুরুল্লাপুরের শানাল ফকিরের বাড়িতে বিরাট মেলা বসে। ধামাইলের দু দিন আগে মেলা শুরু হয়, ধামাইলের পর আরো সাত দিন পর্যন্ত সেই মেলা থাকে। অত্র অঞ্চলে শানাল ফকির হলেন সবচাইতে বড় ফকির। সারা দেশ জুড়ে তাঁর লাখো লাখো মুরিদ। শানাল ফকির এখন আর জীবিত নেই, কিন্তু তাঁর ছেলেরা আছেন, প্রত্যেক ছেলেই উত্তরাধিকার সূত্রে বাবার কাছ থেকে ফকিরি প্রাপ্ত হয়েছেন। প্রত্যেক ছেলেই আলাদা আলাদা ধামাইল করেন, সারা দেশের মুরিদগণ নিজেদের পছন্দ মতো যে কোনো পুত্রের কাছে ভক্তি প্রদান করে। ছেলেরা আলাদা ধামাইল করলেও মেলার আয়োজন হয়ে থাকে যৌথভাবে। সারা দেশে এরূপ বৃহৎ মেলা অন্য কোথাও আর দেখা যায় না। পুরো গ্রামের বিশাল এক চক জুড়ে মেলার স্থান নির্ধারণ করা হয়, গাঁয়ের মানুষ নিজ উদ্যোগে মেলার যাবতীয় নিরাপত্তা, দোকানঘরের জন্য স্থান বণ্টন ও অন্যান্য বিষয়াদির দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

সার্কাস আর যাত্রাপালা হলো মেলার সবচাইতে আকর্ষণীয় বিষয়। যেনতেন সার্কাস আর যাত্রাপালাকে এখানে আসার অনুমতি দেয়া হয় না। দেশের সর্ববৃহৎ ও শ্রেষ্ঠ সার্কাস দল, বর্ধ্বনপাড়ার সার্কাস দলই প্রায় প্রতি বছর সার্কাস দেখানোর নিমন্ত্রণ ও অনুমতি পেয়ে থাকে। এর বাইরে অনেকগুলো পুতুল নাচ ও চড়ক গাছ থাকে। মেলার পুরো জায়গাটাকে কয়েকটা ভাগে ভাগ করা হয়। এক ভাগে শুধু মিষ্টির দোকান- রসগোল্লা, আমৃতি, চমচম, খেজুর, জিলাপি, সন্দেশনদোকানের পর দোকান ভরে থরে থরে বড় বড় পাত্র ভর্তি সাজানো থাকে। অন্যদিকে ভাজাপুরিনযেমন, চানাচুর, মুরলি, নিমকি, পাপরভাজা, গজা; একদিকে খেলনা- হরেকরকম বাঁশি, রং-বেরঙের বেলুন, মাটির তৈরি পুতুল, হাতি, ঘোড়া, গরু, লঞ্চ, স্টিমার, ঠাকুর-দেব-দেবী; একদিকে মেয়েলি কসমেটিকস, চুড়ির বাহার হলো তাতে সবচাইতে বেশি, তাছাড়া আলতা, স্নো, পাউডার, খোঁপার বেণি; একদিকে নিত্য ব্যবহার্য জিনিসপত্রও থাকে, যেমন বলন, ডাল ঘুটনি, তাওয়া, কড়াই, হাঁড়িপাতিল। মেলার এক ধারে খাবারের হোটেল, পাশেই মাছতরকারির দোকানপাট। থৈথৈ করে মানুষ, এতো ভিড় এবং হ-গোল যে বহুদূর থেকে তার শোরগোল শোনা যায়।

ধামাইল শেষে সিন্নি খাওয়ার পরই কুটিমিয়া নুরুল্লাপুরের মেলায় যাওয়ার জন্য ছটফট শুরু করে দিত। কিন্তু একটু বেলা না হলে এবং ফকির বাবার কাছ থেকে বিদায় না নিয়ে তো আর বাড়ি ত্যাগ করা যায় না, তাই দেরি হতে থাকতো। এই দেরি হওয়া কুটিমিয়ার একদম সহ্য হতো না।
শারফিন ফকিরের বাড়ি থেকে বেরুনোর পথে কুটিমিয়ার হাওয়ার বেগে উড়ে নুরুল্লাপুরে গিয়ে পৌঁছতে ইচ্ছে হতো। যখন সে কাঁধে চড়ে যেতো, বাবার ঘাড়ে ঝাঁকি দিয়ে এবং মাথায় চুল শক্ত করে ধরে সামনে ঝুঁকে কুটিমিয়া বলতো, তারতারি কইরা আডো বাজান, তারতারি...। যখন তার হেঁটে চলার বয়স হলো, সে দৌড়ে বাবার আগে আগে ছুটতো। শানাল ফকিরের মেলা অনেক দূর। ছোট পায়ে কুটিমিয়া কেবলই দৌড়ে ছুটতো, তার পা ব্যথা হয়ে যেতো। পথ চলতে চলতে সে দেখতো, মেলা থেকে কিশোর-কিশোরীদের হাতে লাল নীল বাঁশি, বাঁশির মাথায় রঙিন বেলুন, ফুঁ দিয়ে বেলুন ফোলায়, ফুঁ ছেড়ে দেয়, বেলুনের বাতাস বাঁশির মুখ দিয়ে বের হয় আর সুরেলা সুরে বাঁশি বেজে ওঠে। হরেকরকম বাঁশি, দোতারা, ডুগডুগি, পুতুল, পথ চলতে চলতে যার হাতেই সুন্দর একটা খেলনা সে দেখতো, সাথে সাথে ওটা দেখিয়ে বলতো, বাজান, আমারে এই বাশিডার মতন একটা সুন্দর বাশি কিইন্যা দিবানদিবা কিন্তু...। মেলার আরো কাছাকাছি হতেই দূর থেকে অসংখ্য চড়ক গাছের ক্যা-ক্‌-কুক আওয়াজ, বাঁশি আর ডুগডুগির বাজনা, মানুষের চিৎকার আর হৈ-হল্লা কানে এসে লাগতোনতা শুনে কিশোর কুটিমিয়ার মনে ঝিলিক দিয়ে আনন্দ জেগে উঠতো। তার ইচ্ছে হতো লম্বা এক দৌড়ে সে চোখের পলকে মেলায় পৌঁছে যায়।

মেলায় এসে সর্বাগ্রে তার বাঁশি কেনা চাই। বাঁশির প্যাঁ-পু শব্দ তার মধ্যে একটা উন্মাদনার সৃষ্টি করতো। আরেকটা জিনিসের প্রতি তার দারুণ ঝোঁক ছিলনতা হলো কাগজের বেজি। বেজির মাথায় বাঁধা সুতা ধরে টান দিয়ে সুতাটি ছেড়ে দিলে কড়্‌ড়ৎ করে ওটা দৌড় মারে। বাঁশি আর বেজি কেনার পর কুটিমিয়া শান্ত হতো। কিন্তু যখনই নতুন কোনো একটা খেলনার প্রতি তার চোখ পড়তো, সঙ্গে সঙ্গে সে বাবার হাত টেনে ধরে বলতো, 'বাজান, এইডা কিন্যা দিবা?' বাবা বলতেন, 'দূর ব্যাডা, ঐড্যা কোনো খেলনা অইলো?' তারপরও সে নাকি সুরে গুনগুন করে কাঁদতো, ঐ সময় তার মা তাকে একটা ঝাড়ি দিয়ে ভর্ৎসনা করতো, কুটিমিয়ার কান্না কিছুটা কমতো।

প্রতি বছরই যে নুরুল্লাপুরের মেলায় যাওয়া হতো তা কিন্তু নয়। যে বছর হাত টান থাকতো, সে বছর শারফিন ফকিরের বাড়ি থেকে সোজা বাড়ি ফিরে আসতো তারা। মেলায় না যাওয়ার দুঃখে সারা রাস্তা গুনগুন করে কাঁদতে থাকতো কুটিমিয়া, জয়পাড়া বাজারে এসে তাকে রসগোল্লা সাধা হতো, কিন্তু সে একটা ঝামটা দিয়ে বাড়ির পথে পা বাড়াতো।
কিশোর কুটিমিয়ার মনের ভিতরে এক আশ্চর্য শারফিন ফকির বসবাস করতেন। তার খুব ইচ্ছে হতো শারফিন ফকিরের মতো হতে।

ধামাইল শেষ হওয়ার পর বেশ কিছুদিন পর্যন্ত বাড়িতে কুটিমিয়া খুব আমোদে থাকতো। তাদের রসুই ঘরের পেছনে দক্ষিণ দিকে একটা পোড়ো ভিটা ছিল, সেখানে আগাছা ও ময়লা পরিষ্কার করে খেজুরের ডাওগা আর কলাপাতা দিয়ে একটা দরগা ঘর বানাতো সে। দরগা ঘরের মাঝখানটায় সে জোড়াসিন দিয়ে শারফিন ফকিরের মতো বসতো। তার ছোট বোন, চাচাতো ভাইবোন, প্রতিবেশী ছেলেমেয়েরা ছিল তার মুরিদ। কিশোর কুটি ফকিরের মুরিদরা অনেক লম্বা সময় পর্যন্ত তার পায়ের কাছে উপুড় হয়ে পড়ে ভক্তিরত থাকতো। মুরিদগণের অবশ্য ভক্তি ব্যতীত অন্য কোনো কর্ম ছিল না, তাই তারা একের পর এক কেবল ভক্তিই দিয়ে যেতো। সে সময় তার মুরিদরা কিন্তু তাকে কুটি ফকিরও ডাকতো নানকেউ ভুল করে ডেকে বসলে কুটিমিয়া বেজার-কুজার হয়ে বলতো, 'আমার নাম কি কুডি ফকির? আমার নাম অইলো শারফেন ফকির।'

ধামাইলের দিন শারফিন ফকির গায়ে লাল গেরুয়া ও মাথায় লাল পাগড়ি পরতেন। কিশোর শারফিনের কোনো লাল পোশাক ছিল না, তবে লাল-নীল-সবুজে মেশানো বাবার যে গামছাটা সে পেতো, তা পরেই সে তার আসনে গিয়ে বসতো। সে ধামাইলও করতো। বাঁশের কঞ্চি, কিংবা পাটখড়ির মাথায় পাটের জটা, কিংবা পুরনো কাপড়ের টুকরো বেঁধে বাঁশ বানাতো। বাঁইশাদের সংখ্যা ছিল অনির্দিষ্ট, তিনজন উপস্থিত থাকলে তিন, দশজন হাজির থাকলে দশ; ছেলে আর মেয়েতে কোনো বাছবিচার নেই, কুটিমিয়া ফকির যদিও কিন্তু সে নিজেও বাঁশ নাচাতো; বাঁশ নাচানো খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া লেগে যেতো। তার জের ধরে কুটিমিয়া দাপাদাপি করে দরগা ঘরটা ভেঙ্গে ফেলতো, ভেঙ্গে ফেলতো খেলনা নাচের বাঁশগুলোও।

একবার পরপর দু বছর তারা ধামাইলে গেলো না। সে সময় কুটিমিয়াদের সংসারে আয়উন্নতি একটু ভালো হচ্ছিল। পৌষ-চাঁদে ধামাইল হয়, পৌষ পূর্ণিমার পরের দিন করিমন অসুখে পড়লো। ঘন ঘন পাতলা পায়খানা আর বমি। কুটিমিয়ার চাচা মেঘুলা বাজার থেকে কল্পনাথ ডাক্তারকে ডেকে আনলেন, তার পথ্যে পায়খানা আর বমি থামলো বটে, কিন্তু করিমনের সমস্ত খাওয়া দাওয়া বন্ধ হয়ে গেলো। সে ঘন ঘন চোখমুখ খিঁচতে লাগলো। কেউ কেউ বললো ধনুষ্টংকার। আবার ডাক্তার ডাকা হলো, কিন্তু কিছুতেই কিছু হয় না। মাঝে মাঝে করিমন চোখ উলটে পড়ে থাকে, নাড়ি নড়ে কী নড়ে না, সারা বাড়ি ভরে কান্নার রোল ওঠে, কিছু পরে হয়তো করিমন সামান্য নড়েচড়ে ওঠেন- এভাবে চার-পাঁচ দিন চলে যায়। এমন সময় একজন বললো, 'খামাখা ডাক্তার দেখাইতেছাও। এই রোগ তো ডাক্তারের রোগ না। ডাক্তার বাইড্যা খাওয়াইলেও কিছু অইবো না। এইড্যা অইলো ফকিরের রোগ।' কুটিমিয়ার চাচিজান দৌড়ে গিয়ে তাঁর চাচা কালু ফকিরকে ধরলো। কালু ফকির এলেন, করিমনের মাথার কাছে বসে একের পর এক বিড়ি টানতে লাগলেন। বিড়ির ধোঁয়ায় পুরো ঘর ভরে গেলো, ওপরে ছাদের দিকে এক পলকে তাকিয়ে থেকে কালু ফকির বললেন, খুব গাড়াইয়া গেছে রে...। কুটিমিয়ার মা হাউমাউ করে কেঁদে ফেলে কালু ফকিরের পায়ের ওপর ভক্তি দিয়ে পড়ে গেলো, বললো, বাবা, আমার মেয়ারে বাছাও তুমি বাবা, তুমি ছাড়া গতি নাই বাবা...।
ভার লাগবো, কালু ফকির গম্ভীর স্বরে বলেন, তরে অনেক বড়ডায় ধরছে। ভার ছাড়া ছোডান যাইবো না।
ঐদিন রাত্রেই ভারের আয়োজন করা হলো। কুটিমিয়াদের ঘরে ভার বসবে। শিমুলিয়া থেকে কালু ফকিরের আরো কয়েকজন শিষ্য সঙ্গে আসবে। ভারের জন্য এক প্যাকেট মোমবাতি, এক প্যাকেট বিড়ি, এক প্যাকেট দিয়াশলাই লাগবে।

এশার পর ভারের গান শুরু হলো। ঘরের মাঝমাঝি জায়গায় নিথর হয়ে করিমন শুয়ে আছে, তার সিথানের কাছে লম্বা ঘোমটা টেনে বসেছে তার মা, এক ধারে মাটির গাছায় সর্ষে তেলে ঝিনুকবাতির সলতে জ্বলছে। ঘর ভর্তি মানুষ গান ধরলো :

আমায় আর কান্দাবি কতোকাল
দয়াল আর কান্দাবি কতোকাল
আজ আমার দুঃখেরই কপাল...

সবাই দুলে দুলে গান গায়, সুরের মূর্ছনায় ঘর ভারী হয়। এক গান থামে, তার রেশ ধরেই শুরু হয় আরেক গান, সবই মুর্শিদি আর মারফতি। গান গাইতে গাইতে এক সময় গভীর ভাবরসে আসর পুরোপুরি জমে উঠবে, আধো আলো আধো অন্ধকারের মাঝখানে আচমকা শরীর ঝাঁকি দিয়ে দয়াল দয়াল বলে সারা ঘর কাঁপিয়ে গম্ভীর চিৎকার দিয়ে উঠবেন ফকির বাবা। সহসা গান থেমে যাবে, তার বদলে একটানা আল্লাহু-আল্লাহু জিকির ধ্বনিত হতে থাকবে, ভারের ঘোরে ফকির বাবা ভক্তের প্রতি তাঁর জমাট ক্ষোভ প্রকাশ করবেননকী কারণে করিমনের ওপর তাঁর নজর পড়েছিল।
রাত্রি গভীর হয়, গভীর হয় গানের ঐকতান, ঘর ভেদ করে নিজ্‌ঝুম চরাচরের অনেক দূর ভেসে যায় গানের সেই সুর।
প্রহর পেরিয়ে যেতে থাকে, গান গাইতে গাইতে সবার গলা ধরে আসে, দু চোখ তন্দ্রাক্লিষ্ট হয়, ধ্যানমগ্ন ফকির বাবা অর্ধ-মুদিত নয়নে সেই যে জোড়াসিনে উর্ধ্বপানে চেয়ে আছেন, তাঁর শরীরে ভার-গ্রহণের কোনো লক্ষণই দেখা যায় না।

ভোরের আজান পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্পষ্ট হয়ে যায়, আজ আর ভার আসবে না। ভক্তের ত্রুটির কারণে অসন্তুষ্ট হলে কোনো কোনো সময় 'দয়াল' মুখ ফিরিয়ে রাখেন। ফকির বাবার বিষণ্ন ও অবসন্ন অবয়বে বিরক্তি ফুটে ওঠে, ভক্তের প্রতি দয়াল বাবা মোটেও সদাশয় নন, রাতভর তাঁর অক্লান্ত সাধনা বৃথা গেছে।
পরের রাতে আবারো ভার বসলো। আগরবাতি, মোমবাতি, ঝিনুকবাতি, বাবার জন্য পানবিড়ি, সব সম্পন্ন হলো।
ভারের জন্য এতো দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয় না। রাত্রি গভীর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দয়াল বাবা উদয় হোন, ভক্তের সাথে তাঁর দেনদরবার শেষ করে বিদায় নিয়ে চলে যান।
কিন্তু এদিনও ভারের কোনো আলামত পাওয়া যাচ্ছে না। উপস্থিত সুধীজনেরা কেউ কেউ এ বাড়ির প্রতি খুব নাখোশ হলেন, এরা দয়াল বাবার হুকুমাত মান্য করে না ঠিকঠাক। কেউ কেউ অবশ্য খুব আফসোস করে বলতে লাগলেন, দয়াল বাবা এইভাবে মুখ ফিরাইয়া নিলে ওগোর কী দশা অইবো? বাবার কি মায়ামমতা একটুও নাই?

ভাব সমুদ্রে উথালপাথাল ঢেউ খেলে যায়, কিন্তু দয়াল মুর্শিদ দেখা যে দেয় না, দেয়ই না।
আগের রাতের মতো এ-রাতের ভারও যখন বৃথা যায়নএমন সময় দয়াল বাবা কালু ফকির গর্জন করে উঠলেন- রক্ষা নাই- রক্ষা নাই- রক্ষা নাই- হাঁটু গেড়ে প্রবল শক্তিতে দু হাতে মাটির ওপর ধম-ধম-ধম করে চাপড় মারতে থাকেন- এতো প্রচণ্ড সেই চাপড় যে খেজুর পাতার বিছানা সমতে মাটির অংশটুকু নিচের দিকে দেবে যেতে থাকলো।
গান থেমে যায়, সমবেত আল্লাহু জিকির ধ্বনিত হতে থাকেনসেই সঙ্গে ফকির বাবার মুখে অনর্গল উচ্চারিত হয়নজ্ঞরক্ষা নাই...রক্ষা নাই...রক্ষা নাই...

শংকিত রহিমন বিবি ফকির বাবার সম্মুখে অগ্রসর হয়, সে পাগলিনীপ্রায়, সক্রন্দনে বারংবার বাবার কাছে যাচনা করতে থাকেনজ্ঞদোহাই তোমার আল্লাহ রাসূলের, বাবা, বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানীর দোইাই লাগে, আমার করিমনরে ফিরাইয়া দেও বাবা...। অস্থির আর্তনাদে সে বাবার সামনে আছড়ে পড়তে লাগলো।
কিন্তু কালু ফকিরের মুখের ধূয়া অপরিবর্তিত- রক্ষা নাই...রক্ষা নাই...রক্ষা নাই...

'রক্ষা নাই' ধূয়া তুলতে তুলতে হঠাৎ কালু ফকির নিস্তেজ হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। ঝড়ের পর প্রকৃতি শান্ত হয়। ভারের পর দয়াল বাবার অমঙ্গল-আভাসে পুরো ঘর থমথমে হয়ে উঠলো। ক্লান্তি দূর হলে কালু ফকির ধীরে ধীরে উঠে বসলেন। তিনি অতি ভগ্নহৃদয়, দুঃখ-ভারাক্রান্ত, ভক্তের বিপদ দূর করতে আজও ব্যর্থ হলেন!
মজলিশ ভাঙ্গবার কিছুক্ষণ আগে কালু ফকির গম্ভীর গলায় বললেন, জ্ঞবাবার দরগায় একটা বড় খাসি দিস্‌।
কালু ফকিরের দরগায় খাসি দেয়া ভীষণ দায় হয়ে হলো। একটা মোরগ, কয়েক সের চালডাল তেমন কোনো সমস্যা নয়, কিন্তু একটা বড় খাসি কুটিমিয়ার বাবার জন্য পাহাড় সম কঠিন।
করিমন ধীরে ধীরে সুন্দর ও সুস্থ হয়ে উঠলো। সে কুটিমিয়ার সাথে আগের মতো চঞ্চল হয়ে খেলাধুলোয় মেতে উঠলো।

আশ্বিন মাসের শেষ তারিখে দিবাগত রাত্রে কালু ফকিরের বাড়িতে উরস শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। ভক্তরা বিগত বছরের মানত কিংবা খাজা বাবার আদিষ্ট সামগ্রী উরসের সময় বাবার দরবারে উৎসর্গ করে।
কুটিমিয়ার মায়ের মনে সামান্য চালাকি আর সন্দেহের উদ্রেক হয়। ফকির বাবা ভারের সময় কোনো মানত চান নি, যখন খাসির কথা বলেন তখন ভার শেষ হয়ে গিয়েছিল, কাজেই ওটা দয়াল বাবার মনের কথা নয়। খাসি না দিয়ে ছোটখাটো কিছু একটা দিলেই সারবে। তাছাড়া, এমনও তো হতে পারতো যে, ভার-টার কিছুই না, করিমন এমনি এমনি ভালো হয়ে উঠেছে, সেজন্য একটা বড় খাসি দেয়ার কোনো মানে নেই।
কার্তিকের মাঝামাঝি এসে করিমন শুকোতে শুরু করলো। তার খাওয়া দাওয়া বন্ধ হলো, চঞ্চলতা থেমে গেলো, কয়েক দিনের মাথায় বিছানায় পড়লোন্মড়ার মতো সে পড়ে থাকে, নাড়ি নড়ে না, শ্বাস-প্রশ্বাস চলে কী চলে না।
একদিন রাতের শেষ প্রহরে রহিমন আর্তনাদ করে ওঠে। কী মড়ার ঘুমই না সে ঘুমিয়েছিল! কোন ফাঁকে করিমনের প্রাণপাখি খাঁচা ছেড়ে উড়ে গেছে মা তা টের পায়নি, ছো- চড়ুই পাখির মতো ওর নিথর দেহটি রহিমনের বুকের কাছে ঠাণ্ডা হিম হয়ে পড়ে আছে।

কুটিমিয়ার মা'র মাতম উঠলো। ভোরের প্রকৃতিতে তার করুণ কান্নার সুর বহুদূর- বহুদূর ভেসে ভেসে গেলো, অবিরাম।


আসছে...


আগের পর্ব-৭

 

প্রকাশ করা হয়েছে: ধারাবাহিক উপন্যাসপথের সন্ধানে; ভৌতিক গল্প সিরিজ  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ১০ ই জানুয়ারি, ২০১২ রাত ১১:৫০ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 

১. ০৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ সকাল ১১:৪৭
শামীম আরা বীথি বলেছেন: আমি পড়া শুরু করলাম, কিন্তু ঠিকমতো ঘটনাগুলো বুঝতে পারছি না। কাজেই অর্ধেকের বেশি পড়া হলো না:(
০৬ ই নভেম্বর, ২০০৯ দুপুর ১২:২৩

লেখক বলেছেন: এতোটুকু পড়ার জন্যই ধন্যবাদ:(

 

মোট সময় লেগেছে ১.৫৬৪২ সেকেন্ড

 

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল্যাটফর্ম। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...
© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি
আমার মুক্তিযোদ্ধা চাচা ছিলেন
জ্যেষ্ঠতম। তিনি ২০০৬ সালের
১৪ এপ্রিলে মারা যান

ভাইবোনদের মধ্যে দ্বিতীয়া ছিলেন
আমার ফুপু
২০১১ সালের জুলাইয়ে...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

আমার বিভাগ