অনুসন্ধান:
cannot see bangla? সাধারণ প্রশ্ন উত্তর বাংলা লেখা শিখুন আপনার সমস্যা জানান ব্লগ ব্যাবহারের শর্তাবলী transparency report
*****
আমি আমার মতো করে বলে দিয়েছি,
তুমি তোমার মতো করেই বুঝে নাও।
*****
চাটুকারিতা আর মিথ্যাবাদিতা সমার্থক।

আপনার গঠনমূলক মন্তব্য...
আর এস এস ফিড

পোস্ট আর্কাইভ

আমার লিঙ্কস

জনপ্রিয় মন্তব্যসমূহ

আমার প্রিয় পোস্ট

এটা আমার জন্য অনেক সুখকর যে, আমি এখন ব্লগ ও ফেইসবুক থেকে নিজেকে আসক্তিমুক্ত রাখতে পারছি। পরিবার ও পেশাগত জীবনের কর্মব্যস্ততা অনেক আনন্দের।

সুগন্ধি রুমাল : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একগুচ্ছ কবিতা

২৪ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ৯:৪৬ |

শেয়ারঃ
15 0

বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,

যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে

সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!

ভালওবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি

দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়

বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম

তবু কথা রাখে নি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ

এখনো সে যে-কোনো নারী!

কেউ কথা রাখে নি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না!



সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের এ কবিতাংশ শুধু আমার লেখালেখিতেই নয়, পুরোটা জীবন জুড়েই ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করে আছে। তিনি আমার প্রিয়তম কবিদের একজন। কবি শহিদুল ইসলামের একটি পোস্টে ২৩ অক্টোবর তারিখে সকাল ১০টার দিকে সুনীলের তিরোধানের খবরটি প্রথম জানতে পারি। সাথে সাথে টিভি অন করতেই টেলপে নিউজটা দেখতে পেলাম। বাস্তবিকই আমার মনটা খুব খারাপ হয়ে গেলো। খুবই।



সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বেশ কিছু কবিতা আমি ব্লগে বিভিন্ন সময়ে পোস্ট করেছি, এবং রেফারেন্স হিসাবে উল্লেখ করেছি। বর্তমান সংকলনে আমার নিজের পোস্ট করা কবিতার পাশাপাশি অন্যান্য ব্লগারের পোস্ট থেকেও প্রচুর কবিতা সুংযুক্ত করেছি, এবং বলাই বাহুল্য যে অন্যান্যদের কবিতার সংখ্যাই সর্বাধিক, যাঁদের মধ্যে ব্লগার ফারজুল আরেফিন ও গাব্রিয়েল সুমনের নাম বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হচ্ছে। এ ছাড়া কবি রেজা ঘটকের সাম্প্রতিক পোস্ট থেকে ৩টি কবিতা, এবং চতুর্মাত্রিক ব্লগের আকাশ অম্বর (যিনি এ ব্লগেরও একজন বিশিষ্ট ব্লগার)-এর একটা পোস্ট থেকে কিছু কবিতা নেয়া হয়েছে। সংকলিত কবিতাগুলোর নিচে মূল পোস্টের লিংক দেয়া হয়েছে, যেগুলোর দেয়া নেই ওগুলো আমার নিজ পোস্টের অন্তর্গত। যাঁদের পোস্ট থেকে কবিতা নেয়া হয়েছে তাঁদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা।





তুমি

(একা এবং কয়েকজন)



আমার যৌবনে তুমি স্পর্ধা এনে দিলে

তোমার দু'চোখে তবু ভীরুতার হিম।

রাত্রিময় আকাশের মিলনান্ত নীলে

ছোট এই পৃথিবীকে করেছো অসীম।

বেদনা মাধুর্যে গড়া তোমার শরীর

অনুভবে মনে হয় এখনও চিনি না

তুমিই প্রতীক বুঝি এই পৃথিবীর

আবার কখনও ভাবি অপার্থিবা কিনা।

সারাদিন পৃথিবীকে সূর্যের মতন

দুপুরদগ্ধ পায়ে করি পরিক্রমা,

তারপর সায়াহ্নের মতো বিস্মরণ-

জীবনকে স্থির জানি করে দেবে ক্ষমা।

তোমার শরীরে তুমি গেঁথে রাখো গান

রাত্রিকে করেছো তাই ঝঙ্কারমুখর

তোমার সান্নিধ্যের অপরূপ ঘ্রাণ

অজান্তে জীবনে রাখে জয়ের স্বাক্ষর।

যা কিছু বলেছি আমি মধুর অস্ফুটে

অস্থির অবগাহনে তোমারি আলোকে

দিয়েছো উত্তর তার নব পত্রপুটে

বুদ্ধের মূর্তির মতো শান্ত দুই চোখে।



*এটি সুনীলের ৪র্থ কবিতা; ১৯৫৩ সালে 'কবিতা' ম্যাগাজিনে ছাপা হয়েছিল



হঠাৎ নীরার জন্য

(আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)



বাসস্টপে দেখা হলো তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ

দেখেছি ছুরির মতো বিঁধে থাকতে সিন্ধুপারে- দিকচিহ্নহীন-

বাহান্ন তীর্থের মতো এক শরীর, হাওয়ার ভিতরে

তোমাকে দেখেছি কাল স্বপ্নে, ওষধি স্বপ্নের

নীল দুঃসময়ে।



দক্ষিণ সমুদ্রদ্বারে গিয়েছিলে কবে, কার সঙ্গে? তুমি

আজই কি ফিরেছো?

স্বপ্নের সমুদ্র সে কী ভয়ঙ্কর, ঢেউহীন, শব্দহীন, যেন

তিনদিন পরেই আত্মঘাতী হবে, হারানো আঙতির মতো দূরে

তোমার দিগন্ত, দুই ঊরু ডুবে গেছে নীল জলে

তোমাকে হঠাৎ মনে হলো কোনো জুয়াড়ীর সঙ্গিনীর মতো,

অথচ একলা ছিলে, ঘোরতর স্বপ্নের ভিতরে তুমি একা।



এক বছর ঘুমোবো না, স্বপ্ন দেখে কপালের ঘাম

ভোরে মুছে নিতে বড় মূর্খের মতন মনে হয়

বরং বিস্মৃতি ভালো, পোশাকের মধ্যে ঢেকে রাখা

নগ্ন শরীরের মতো লজ্জাহীন, আমি

এক বছর ঘুমোবো না, এক বছর স্বপ্নহীন জেগে

বাহান্ন তীর্থের মতো তোমার ও-শরীর ভ্রমণে

পুণ্যবান হবো।



বাসের জানলার পাশে তোমার সহাস্য মুখ, ‘আজ যাই, বাড়িতে আসবেন।’

রৌদ্রের চিৎকারে সব শব্দ ডুবে গেল।

‘একটু দাঁড়াও‘, কিংবা ‘চলো লাইব্রেরীর মাঠে‘, বকের ভেতরে

কেউ এই কথা বলেছিল, আমি মনে পড়া চোখে

সহসা হাতঘড়ি দেখে লাফিয়ে উঠেছি, রাস্তা, বাস, ট্রাম, রিকশা, লোকজন

ডিগবাজির মতো পার হয়ে, যেন ওরাং উটাং, চার হাত-পায়ে ছুতে।

পৌঁছে গেছি অফিসের লিফটের দরজায়।



বাস স্টপে তিন মিনিট, অথচ তোমায় কাল স্বপ্নে বহুক্ষণ।



শুধু কবিতার জন্য

(আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)



শুধু কবিতার জন্য এই জন্ম, শুধু কবিতার

জন্য কিছু খেলা, শুধু কবিতার জন্য একা হিম সন্ধেবেলা

ভুবন পেরিয়ে আসা, শুধু কবিতার জন্য

অপলক মুখশ্রীর শান্তি একঝলক;

শুধু কবিতার জন্য তুমি নারী, শুধু

কবিতার জন্য এতো রক্তপাত, মেঘে গাঙ্গেয় প্রপাত

শুধু কবিতার জন্য, আরো দীর্ঘদিন বেঁচে থাকতে লোভ হয়।

মানুষের মতো ক্ষোভময় বেঁচে থাকা, শুধু

কবিতার জন্য আমি অমরত্ব তাচ্ছিল্য করেছি।



আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়

(আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)



যে পান্থনিবাসে যাই দ্বার বন্ধ, বলে, ‘ঐ যে রুগ্ন ফুলগুলি

বাগানে রয়েছে শুধু, এখন বসবেন?’ কেউ মুমূর্ষু অঙ্গুলি

আপন উরসে রেখে হেসে ওঠে, পাতা ঝরানোর হাসি, 'এই অবেলায়

কেন এসেছেন আপনি, কী আছে এখন? গত বসন্তমেলায়

সব ফুরিয়েছে, আর আলো নেই, দেখুন না তার ছিঁড়ে গেছে, সব ঘরে

ধুলো, তালা খুলবে না এ জন্মে; পরিচারিকার হাতে কুষ্ঠ!' ভগ্ন কণ্ঠস্বরে

নেবানো চুল্লীর জন্য কারো খেদ, কেউ আসবাববিহীন

বুকের শীতের মধ্যে শুয়ে আছে, মৃত্যু বহুদূর জেনে, চৈত্র রুক্ষ দিন

চিবুক ত্রিভাঁজ করে, প্রতিটি সরাইখানা উচ্ছিষ্ট পাঁজর ও রক্তে ক্লিন্ন হয়ে আছে

বাগানে কুসুমগুলি মৃত, গন্ধহীন, ওরা বাতাসে প্রেতের মতো নাচে।

আমার আগের যাত্রী রূপচোর, তাতার দস্যুর মতো বেপরোয়া, কব্জি শক্তিধর

অমোঘ মৃত্যুর চেয়ে কিছু ছোটো, জীবনের প্রশাখার মতো ভয়ঙ্কর

সেই গুপ্তচর পান্থ আগে এসে ছেঁচে নিল শেষ রূপ রস-

ক্ষণিক সরাইগুলি, হায়! এখন গ্রীবায় ছিন্ন ইতিহাস, ওষ্ঠে, চোখে, মসীলিপ্ত পুঁথির বয়স।

আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায়, জুতোয় পেরেক ছিল, পথে বড় কষ্ট, তবু ছুটে

এসেও পারি না ধরতে, ততক্ষণে লুট শেষ, দাঁড়িয়ে রয়েছে সব ম্লান ওষ্ঠপুটে।



নীরা তোমার কাছে

(আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)



সিঁড়ির মুখে কারা অমন শান্তভাবে কথা বললো?

বেরিয়ে গেল দরজা ভেজিয়ে, তবু তুমি দাঁড়িয়ে রইলে সিঁড়িতে

রেলিং-এ দুই হাত ও থুত্‌নি, তোমায় দেখে বলবে না কেউ থির বিজুরি

তোমার রঙ একটু ময়লা, পদ্মপাতার থেকে যেন একটু চুরি,

দাঁড়িয়ে রইলে

নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো।



নীরা, তোমায় দেখি আমি সারা বছর মাত্র দু’দিন

দোল ও সরস্বতী পূজোয়–দুটোই খুব রঙের মধ্যে

রঙের মধ্যে ফুলের মধ্যে সারা বছর মাত্র দু’দিন–

ও দুটো দিন তুমি আলাদা, ও দুটো দিন তুমি যেন অন্য নীরা

বাকি তিনশো তেষট্টি বার তোমায় ঘিরে থাকে অন্য প্রহরীরা।

তুমি আমার মুখ দেখোনি একলা ঘরে, আমি আমার দস্যুতা

তোমার কাছে লুকিয়ে আছি, আমরা কেউ বুকের কাছে কখনো

কথা বলিনি পরস্পর, চোখের গন্ধে করিনি চোখ প্রদক্ষিণ–

আমি আমার দস্যুতা

তোমার কাছে লুকিয়ে আছি, নীরা তোমায় দেখা আমার মাত্র দু’দিন।



নীরা, তোমায় দেখে হঠাৎ নীরার কথা মনে পড়লো।

আমি তোমায় লোভ করিনি, আমি তোমায় টান মারিনি সুতোয়

আমি তোমার মন্দিরের মতো শরীরে ঢুকিনি ছল ছুতোয়

রক্তমাখা হাতে তোমায় অবলীলায় নাশ করিনি;

দোল ও সরস্বতী পূজোয় তোমার সঙ্গে দেখা আমার–সিঁড়ির কাছে

আজকে এমন দাঁড়িয়ে রইলে

নীরা, তোমার কাছে আমি নীরার জন্য রয়ে গেলাম চিরঋণী।



*সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি

(আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি)



আমি কী রকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ।

এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ

পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা

আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা

করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে

থাকি- তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে

হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি,

মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি

অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে-

(ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই!)



আমি স্বপ্নের মধ্যে বাবুদের বাড়ির ছেলে

সেজে গেছি রঙ্গালয়ে, পরাগের মতো ফুঁ দিয়ে উড়িয়েছি দৃশ্যলোক

ঘামে ছিল না এমন গন্ধক

যাতে ক্রোধে জ্বলে উঠতে পারি। নিখিলেশ, তুই একে

কী বলবি? আমি শোবার ঘরে নিজের দুই হাত পেরেকে

বিঁধে দেখতে চেয়েছিলাম যীশুর কষ্ট খুব বেশি ছিল কি না;

আমি ফুলের পাশে ফূল হয়ে ফূটে দেখেছি, তাকে ভালোবাসতে পারি না।

আমি কপাল থেকে ঘামের মতন মুছে নিয়েছি পিতামহের নাম,

আমি শ্মশানে গিয়ে মরে যাবার বদলে, মাইরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

নিখিলেশ, আমি এই-রকমভাবে বেঁচে আছি, তোর সঙ্গে

জীবন বদল করে কোনো লাভ হলো না আমার -একই নদীর তরঙ্গে

ছেলেবেলার মতো ডুবসাঁতার?- অথবা চশমা বদলের মতো

কয়েক মিনিট আলোড়ন? অথবা গভীর রাত্রে সঙ্গমনিরত

দম্পতির পাশে শুয়ে পুনরায় জন্ম ভিক্ষা? কেননা সময় নেই, আমার ঘরের

দেয়ালের চুন-ভাঙা দাগটিও বড় প্রিয়। মৃত গাছটির পাশে উত্তরের

হাওয়ায় কিছুটা মায়া লেগে ভুল নাম, ভুল স্বপ্ন থেকে বাইরে এসে

দেখি উইপোকায় খেয়ে গেছে চিঠির বান্ডিল, তবুও অক্লেশে

হলুদকে হলুদ বলে ডাকতে পারি। আমি সর্বস্ব বন্ধক দিয়ে একবার

একটি মুহূর্ত চেয়েছিলাম, একটি …, ব্যক্তিগত জিরো আওয়ার;

ইচ্ছে ছিল না জানাবার

এই বিশেষ কথাটা তোকে। তবু ক্রমশই বেশি করে আসে শীত, রাত্রে

এ-রকম জলতেষ্টা আর কখনও পেতো না, রোজ অন্ধকার হাতড়ে

টের পাই তিনটে ইঁদুর না মূষিক? তা হলে কি প্রতীক্ষায়

আছে অদূরেই সংস্কৃত শ্লোক? পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া আর এই অবেলায়

কিছুই মনে পড়ে না। আমার পূজা ও নারী-হত্যার ভিতরে

বেজে ওঠে সাইরেন। নিজের দু’হাত যখন নিজেদের ইচ্ছে মতো কাজ করে

তখন মনে হয় ওরা সত্যিকারের। আজকাল আমার

নিজের চোখ দুটোও মনে হয় একপলক সত্যি চোখ। এরকম সত্য

পৃথিবীতে খুব বেশী নেই আর।।



***



আমার খানিকটা দেরি হয়ে যায় এবং আমী কীরকম ভাবে বেঁচে আছি কবিতা দুটি সমিল মুক্তক অক্ষরবৃত্ত ছন্দের উৎকৃষ্ট উদাহরণ। দেখুন, পঙ্‌ক্তিগুলো সমান নয়, এবং অন্ত্যমিলযুক্ত। এই কবিতায় কোনোরূপ অন্ত্যমিল না থাকলে এটিকে বলা হতো 'অমিল মুক্তক অক্ষরবৃত্ত' বা ফ্রি ভার্স। এই কবিতাটিকে দুই প্যাটার্নে 'ফ্রি ভার্স' আকারে লেখা যায়: ১) উপরের কবিতায় কোনোরূপ অন্ত্যমিল না রেখে এবং ২) পুরোটাই একটা গদ্যের মতো করে লিখে। পরীক্ষামূলকভাবে আমি একবার তা করেছিলাম। নিচে দেখুন।



'ফ্রি ভার্স' কী সে-সম্পর্কে টি. এস. এলিয়ট বলেছেন, ১) এর কোনো প্যাটার্ন বা রূপকল্প থাকবে না, অর্থাৎ এটি হবে মুক্তকল্প। ২) এতে কোনো অন্ত্যমিল থাকবে না, অর্থাৎ এটি হবে মুক্ত মিল। ৩) এতে কোনো ছন্দ থাকবে না, অর্থাৎ এটি হবে মুক্ত ছন্দ। আমার পুনর্লিখিত কবিতাটি এ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। অর্থাৎ, এটি হবে একটি খাঁটি গদ্যের মতো। প্রশ্ন হতে পারে, তাহলে গদ্য আর কবিতার মধ্যে পার্থক্য কী? পার্থক্য অবশ্যই আছে- কবিতার ভাষাই বলে দেবে এটি দেখতে গদ্যের মতো হলেও এটি একটি কবিতা। বাংলা একাডেমী প্রমিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ গ্রন্থের ২য় পর্বে অধ্যাপক পবিত্র সরকারের একটি প্রবন্ধ সংযুক্ত হয়েছে এ শিরোনামে- 'কাব্যভাষার ব্যাকরণ'। সেটি পড়লে গদ্য ও কবিতার ভাষা যে এক নয় তার কিছু ব্যাখ্যা মেলে।



মেঘনাদ বধ-এ কোনো অন্ত্যমিল নেই, এটা কি ফ্রি ভার্স? মেঘনাদ বধ মূলত ১৪ অক্ষরের পয়ারে রচিত, অমিত্রাক্ষর পয়ার এর নাম। কিন্তু বাক্যগঠন এমন যে সাধারণ পয়ারের মতো সর্বত্রই এক পঙ্‌ক্তিতে একটি বাক্য গঠিত হয় নি, অর্থৎ, পঙ্‌ক্তির মাঝখানে 'দাঁড়ি', সেমি-কোলন দেখা যায়, এবং আবৃত্তির সময় এটিকে অবিকল গদ্যের মতোও পাঠ করা যায়। সেই হিসাবে এটি খাঁটি অমিত্রাক্ষর পয়ার নয়, এটিও ফ্রি-ভার্স-এর বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন।



***

আমি কীরকম ভাবে বেঁচে আছি তুই এসে দেখে যা নিখিলেশ। এই কী মানুষজন্ম? নাকি শেষ পুরোহিত-কঙ্কালের পাশা খেলা! প্রতি সন্ধ্যেবেলা আমার বুকের মধ্যে হাওয়া ঘুরে ওঠে, হৃদয়কে অবহেলা করে রক্ত; আমি মানুষের পায়ের কাছে কুকুর হয়ে বসে থাকি- তার ভেতরের কুকুরটাকে দেখবো বলে। আমি আক্রোশে হেসে উঠি না, আমি ছারপোকার পাশে ছারপোকা হয়ে হাঁটি, মশা হয়ে উড়ি একদল মশার সঙ্গে; খাঁটি অন্ধকারে স্ত্রীলোকের খুব মধ্যে ডুব দিয়ে দেখেছি দেশলাই জ্বেলে- (ও-গাঁয়ে আমার কোনো ঘরবাড়ি নেই!)



আমি স্বপ্নের মধ্যে বাবুদের বাড়ির ছেলে সেজে গেছি রঙ্গালয়ে, পরাগের মতো ফুঁ দিয়ে উড়িয়েছি দৃশ্যলোক। ঘামে ছিল না এমন গন্ধক যাতে ক্রোধে জ্বলে উঠতে পারি। নিখিলেশ, তুই একে কী বলবি? আমি শোবার ঘরে নিজের দুই হাত পেরেকে বিঁধে দেখতে চেয়েছিলাম যীশুর কষ্ট খুব বেশি ছিল কিনা; আমি ফুলের পাশে ফূল হয়ে ফূটে দেখেছি, তাকে ভালোবাসতে পারি না। আমি কপাল থেকে ঘামের মতন মুছে নিয়েছি পিতামহের নাম, আমি শ্মশানে গিয়ে মরে যাবার বদলে, মাইরি, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। নিখিলেশ, আমি এই-রকমভাবে বেঁচে আছি, তোর সঙ্গে জীবন বদল করে কোনো লাভ হলো না আমার -একই নদীর তরঙ্গে ছেলেবেলার মতো ডুবসাঁতার?- অথবা চশমা বদলের মতো কয়েক মিনিট আলোড়ন? অথবা গভীর রাত্রে সঙ্গমনিরত দম্পতির পাশে শুয়ে পুনরায় জন্ম ভিক্ষা? কেননা সময় নেই, আমার ঘরের দেয়ালের চুন-ভাঙা দাগটিও বড় প্রিয়। মৃত গাছটির পাশে উত্তরের হাওয়ায় কিছুটা মায়া লেগে ভুল নাম, ভুল স্বপ্ন থেকে বাইরে এসে দেখি উইপোকায় খেয়ে গেছে চিঠির বান্ডিল, তবুও অক্লেশে হলুদকে হলুদ বলে ডাকতে পারি। আমি সর্বস্ব বন্ধক দিয়ে একবার একটি মুহূর্ত চেয়েছিলাম, একটি …, ব্যক্তিগত জিরো আওয়ার; ইচ্ছে ছিল না জানাবার এই বিশেষ কথাটা তোকে। তবু ক্রমশই বেশি করে আসে শীত, রাত্রে এ-রকম জলতেষ্টা আর কখনও পেতো না, রোজ অন্ধকার হাতড়ে টের পাই তিনটে ইঁদুর না মূষিক? তা হলে কি প্রতীক্ষায় আছে অদূরেই সংস্কৃত শ্লোক? পাপ ও দুঃখের কথা ছাড়া আর এই অবেলায় কিছুই মনে পড়ে না। আমার পূজা ও নারী-হত্যার ভিতরে বেজে ওঠে সাইরেন। নিজের দু’হাত যখন নিজেদের ইচ্ছে মতো কাজ করে তখন মনে হয় ওরা সত্যিকারের। আজকাল আমার নিজের চোখ দুটোও মনে হয় একপলক সত্যি চোখ। এরকম সত্য পৃথিবীতে খুব বেশী নেই আর।।



***



নীরার জন্য কবিতার ভূমিকা



এই কবিতার জন্য আর কেউ নেই, শুধু তুমি ,নীরা

এ-কবিতা মধ্যরাতে তোমার নিভৃত মুখ লক্ষ্য করে



ঘুমের ভেতরে তুমি আচমকা জেগে উঠে টিপয়ের

জল খেতে গিয়ে জিভ কামড়ে এক মুহহূর্ত ভাববে

কে তোমার কথা মনে করছে এত রাত্রে- তখন আমার

এই কবিতার প্রতিটি লাইন শব্দ অক্ষর কমা ড্যাস রেফ্‌

ও রয়ের ফুটকি সমেত ছুটে যাচ্ছে তোমার দিকে, তোমার

অধোঘুমন্ত নরম মুখের চারপাশে এলোমেলো চুলে ও

বিছানায় আমার নিশ্বাসের মতো নিঃশব্দ এই শব্দগুলি

এই কবিতার প্রত্যেকটি অক্ষর গুণিনের বানের মতো শুধু

তোমার জন্য, এরা শুধু তোমাকে বিদ্ধ করতে জানে



তুমি ভয় পেয়ো না, তুমি ঘুমোও, আমি বহু দূরে আছি

আমার ভয়ঙ্কর হাত তোমাকে ছোঁবে না, এই মধ্যরাত্রে

আমার অসম্ভব যেগে ওঠা, উষ্ণতা, তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও

চাপা আর্তরব তোমাকে ভয় দেখাবে না- আমার সম্পূর্ণ আবেগ

শুধু মোমবাতির আলোর মতো ভদ্র হিম, শব্দ ও অক্ষরের কবিতায়

তোমার শিয়রের কাছে যাবে- এরা তোমাকে চুম্বন করলে

তুমি টের পাবে না, ওরা তোমার সঙ্গে সারারাত শুয়ে থাকবে

এক বিছানায়- তুমি জেগে উঠবে না, সকালবেলা তোমার পায়ের

কাছে মরা প্রজাপতির মতো এরা লুটোবে। এদের আত্মা মিশে

থাকবে তোমার শরীরের প্রতিটি রন্ধ্রে, চিরজীবনের মতো



বহুদিন পর তোমার সঙ্গে দেখা হলে ঝর্নার জলের মতো

হেসে উঠবে, কিছুই না জেনে। নীরা, আমি তোমার অমন

সুন্দর মুখে আঁকা টিপের দিকে চেয়ে থাকবো। আমি অন্য কথা

বলার সময় তোমার প্রস্ফুটিত মুখখানি আদর করবো মনে মনে

ঘরভর্তি লোকের মধ্যেও আমি তোমার দিকে নিজস্ব চোখে তাকাবো।

তুমি জানতে পারবে না- তোমার সম্পূর্ণ শরীরে মিশে আছে

একটি অতি ব্যক্তিগত কবিতার প্রতিটি শব্দের আত্মা।



নীরার অসুখ

(বন্দী, জেগে আছো)



নীরার অসুখ হলে কলকাতার সবাই বড় দুঃখে থাকে

সূর্য নিভে গেলে পর, নিয়নের বাতিগুলি হঠাৎ জ্বলার আগে জেনে নেয়

নীরা আজ ভালো আছে?

গীর্জার বয়স্ক ঘড়ি, দোকানের রক্তিম লাবণ্য–ওরা জানে

নীরা আজ ভালো আছে!

অফিস সিনেমা পার্কে লক্ষ লক্ষ মানুষের মুখে মুখে রটে যায়

নীরার খবর

বকুলমালার তীব্র গন্ধ এসে বলে দেয়, নীরা আজ খুশি

হঠাৎ উদাস হাওয়া এলোমেলো পাগ্‌লা ঘন্টি বাজিয়ে আকাশ জুড়ে

খেলা শুরু করলে

কলকাতার সব লোক মৃদু হাস্যে জেনে নেয়, নীরা আজ বেড়াতে গিয়েছে।



আকাশে যখন মেঘ, ছায়াচ্ছন্ন গুমোট নগরে খুব দুঃখ বোধ।

হঠাৎ ট্রামের পেটে ট্যাক্সি ঢুকে নিরানন্দ জ্যাম চৌরাস্তায়

রেস্তোরাঁয় পথে পথে মানুষের মুখ কালো, বিরক্ত মুখোস

সমস্ত কলকাতা জুড়ে ক্রোধ আর ধর্মঘট, শুরু হবে লণ্ডভণ্ড

টেলিফোন পোস্টাফিসে আগুন জ্বালিয়ে

যে-যার নিজস্ব হৃৎস্পন্দনেও হরতাল জানাবে–

আমি ভয়ে কেঁপে উঠি, আমি জানি, আমি তৎক্ষণাৎ ছুটে যাই, গিয়ে বলি,

নীরা, তুমি মন খারাপ করে আছো?

লক্ষ্মী মেয়ে, একবার চোখে দাও, আয়না দেখার মতো দেখাও ও-মুখের মঞ্জরী

নবীন জনের মতো কলহাস্যে একবার বলো দেখি ধাঁধার উত্তর!

অমনি আড়াল সরে, বৃষ্টি নামে, মানুষেরা সিনেমা ও খেলা দেখতে

চলে যায় স্বস্তিময় মুখে

ট্রাফিকের গিঁট খোলে, সাইকেলের সঙ্গে টেম্পো, মোটরের সঙ্গে রিক্সা

মিলেমিশে বাড়ি ফেরে যা-যার রাস্তায়

সিগারেট ঠোঁটে চেপে কেউ কেউ বলে ওঠে, বেঁচে থাকা নেহাৎ মন্দ না!



*সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



কেউ কথা রাখে নি

(বন্দী, জেগে আছো)



কেউ কথা রাখে নি, তেত্রিশ বছর কাটলো কেউ কথা রাখে নি

ছেলেবেলায় এক বোষ্টুমি তার আগমনী গান হঠাৎ থামিয়ে বলেছিল

শুক্লা দ্বাদশীর দিন অন্তরাটুকু শুনিয়ে যাবে

তারপর কত চন্দ্রভুক অমবস্যা এসে চলে গেল, কিন্তু সেই বোষ্টুমি আর এলো না

পঁচিশ বছর প্রতীক্ষায় আছি।



মামাবাড়ির মাঝি নাদের আলি বলেছিল, বড় হও দাদাঠাকুর

তোমাকে আমি তিন প্রহরের বিল দেখাতে নিয়ে যাবো

সেখানে পদ্মফুলের মাথায় সাপ আর ভ্রমর

খেলা করে!

নাদের আলি, আমি আর কত বড় হবো? আমার মাথা এই ঘরের ছাদ

ফুঁড়ে আকাশ স্পর্শ করলে তারপর তুমি আমায় তিন প্রহরের বিল দেখাবে?

একটাও রয়্যাল গুলি কিনতে পারি নি কখনো

লাঠি-লজেন্স দেখিয়ে দেখিয়ে চুষেছে লস্কর বাড়ির ছেলেরা

ভিখারির মতন চৌধুরীদের গেটে দাঁড়িয়ে দেখেছি

ভেতরে রাস উৎসব

অবিরল রঙ্গের ধারার মধ্যে সুবর্ণ কঙ্কণ-পরা ফর্সা রমণীরা

কতরকম আমোদে হেসেছে

আমার দিকে তারা ফিরেও চায় নি!

বাবা আমার কাঁধ ছুঁয়ে বলেছিলেন, দেখিস, একদিন আমরাও...

বাবা এখন অন্ধ, আমাদের দেখা হয় নি কিছুই

সেই রয়্যাল গুলি, সেই লাঠি-লজেন্স, সেই রাস উৎসব

আমায় কেউ ফিরিয়ে দেবে না!



বুকের মধ্যে সুগন্ধি রুমাল রেখে বরুণা বলেছিল,

যেদিন আমায় সত্যিকারের ভালবাসবে

সেদিন আমার বুকেও এ-রকম আতরের গন্ধ হবে!

ভালওবাসার জন্য আমি হাতের মুঠোয় প্রাণ নিয়েছি

দুরন্ত ষাঁড়ের চোখে বেঁধেছি লাল কাপড়

বিশ্ব সংসার তন্ন তন্ন করে খুঁজে এনেছি ১০৮টা নীলপদ্ম

তবু কথা রাখে নি বরুণা, এখন তার বুকে শুধুই মাংসের গন্ধ

এখনো সে যে-কোনো নারী!

কেউ কথা রাখে নি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখে না!



নীরার হাসি ও অশ্রু

(বন্দী, জেগে আছো)



নীরার চোখের জল অনেক চোখের অনেক

নীচে

টল্‌মল্‌

নীরার মুখের হাসি মুখের আড়াল থেকে

বুক, বাহু, আঙুলে

ছড়ায়

শাড়ির আঁচলে হাসি, ভিজে চুলে, হেলানো সন্ধ্যায় নীরা

আমাকে বাড়িয়ে দেয়, হাস্যময় হাত

আমার হাতের মধ্যে চৌরাস্তায় খেলা করে নীরার কৌতুক

তার ছদ্মবেশ থেকে ভেসে আসে সামুদ্রিক ঘ্রাণ

সে আমার দিকে চায়, নীরার গোধূলি মাখা ঠোঁট থেকে

ঝরে পড়ে লীলা লোধ্র

আমি তাকে প্রচ্ছন্ন আদর করি, গুপ্ত চোখে বলি :

নীরা, তুমি শান্ত হও

অমন মোহিনী হাস্যে আমার বিভ্রম হয় না, আমি সব জানি

পৃথিবী তোলপাড় করা প্লাবনের শব্দ শুনে টের পাই

তোমার মুখের পাশে উষ্ণ হাওয়া

নীরা, তুমি শান্ত হও!



নীরার সহাস্য বুকে আঁচলের পাখিগুলি

খেলা করে

কোমর ও শ্রোণী থেকে স্রোত উঠে ঘুরে যায় এক পলক

সংসারের সারাৎসার ঝলমলিয়ে সে তার দাঁতের আলো

সায়াহ্নের দিকে তুলে ধরে

নাগকেশরের মতো ওষ্ঠাধরে আঙুল ঠেকিয়ে বলে,

চুপ!

আমি জানি

নীরার চোখের জল চোখের অনেক নিচে টল্‌মল্‌।।



*সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



উত্তরাধিকার

(বন্দী, জেগে আছো)



নবীন কিশোর, তোমাকে দিলাম ভুবনডাঙার মেঘলা আকাশ

তোমাকে দিলাম বোতামবিহীন ছেঁড়া শার্ট আর

ফুসফুস ভরা হাসি

দুপুররৌদ্রে পায়ে পায়ে ঘোরা, রাত্রির মাঠে চিৎ হ'য়ে শুয়ে থাকা

এ-সব এখন তোমারই, তোমার হাত ভ'রে নাও আমার অবেলা

আমার দু:খবিহীন দু:খ ক্রোধ শিহরন

নবীন কিশোর, তোমাকে দিলাম আমার যা-কিছু ছিল আভরণ

জ্বলন্ত বুকে কফির চুমুক, সিগারেট চুরি, জানালার পাশে

বালিকার প্রতি বারবার ভুল

পুরুষ বাক্য, কবিতার কাছে হাঁটু মুড়ে বসা, ছুরির ঝলক

অভিমানে মানুষ কিংবা মানুষের মত আর যা-কিছুর

বুক চিরে দেখা

আত্মহনন, শহরের পিঠ তোলপাড় করা অহংকারের দ্রুত পদপাত

একখানা নদী, দু'তিনটে দেশ, কয়েকটি নারী -

এ-সবই আমার পুরোনো পোশাক, বড় প্রিয় ছিল, এখন শরীরে

আঁট হয়ে বসে, মানায় না আর

তোমাকে দিলাম, নবীন কিশোর, ইচ্ছে হয় তো অঙ্গে জড়াও

অথবা ঘৃণায় দূরে ফেলে দাও, যা খুশি তোমার

তোমাকে আমার তোমার বয়সী সব কিছু দিতে বড় সাধ হয়।



ব্লগার আকাশ অম্বর-এর 'কেন লিখি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।' পোস্টে ব্লগার আবদুর রাজ্জাক শিপন-এর কমেন্ট থেকে সংকলিত



নীরার পাশে তিনটি ছায়া

(বন্দী, জেগে আছো)



নীরা এবং নীরার পাশে তিনটি ছায়া

আমি ধনুকে তীর জুড়েছি, ছায়া তবুও এত বেহায়া

পাশ ছাড়ে না

এবার ছিলা সমুদ্যত, হানবো তীর ঝড়ের মতো–

নীরা দু’হাত তুলে বললো, ‘মা নিষাদ!

ওরা আমার বিষম চেনা!’

ঘূর্ণি ধুলোর সঙ্গে ওড়ে আমার বুক চাপা বিষাদ–

লঘু প্রকোপে হাসলো নীরা, সঙ্গে ছায়া-অভিমানীরা

ফেরানো তীর দৃষ্টি ছুঁয়ে মিলিয়ে গেল

নীরা জানে না!



*সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



আরও নিচে

(বন্দী, জেগে আছো)



সিংহাসন থেকে একটু নিচে নেমে, পাথরের

সিঁড়ির উপর বসে থাকি

একা, চিবুক নির্ভরশীল

চোখ লোকচক্ষু থেকে দূরে।

‘সম্রাটের চেয়ে কিছু কম সম্রাটত্ব’ থেকে ছুটি নিয়ে আজ

হলুদ দিনাবসানে পরিকীর্ণ শব্দটির মোহে

মাটির মানুষ হতে সাধ হয়। এক-একদিন একরকম হয়।

আমার চোখের নীচে কালো দাগ

ব্যান্ডেজের মধ্যে একটা পোকা ঢুকলে যে-রকম জাদুদন্ডসম কোনো

মহিলার মতো

নিয়তি বদল করে, আলো-ছায়া-আলো ঘোরে নিভৃত সানুদেশে

দপ করে জ্বলে ওঠে হৃদয়ের পুরনো বারুদ

তেমনিই দিনাবসান

তেমনিই মোহের থেকে মুক্ত নিচু চাঁদ-

সিংহাসন থেকে নেমে, হাত ভরা পশমের মতো

রোমশ স্তব্ধতা।



পাথরের মতো মসৃণ বেদির নিচে রুক্ষ মাটি, একটু দূরে পায়ে চলা পথ।

সম্রাটের শেষ বৃত্য চিরতরে যেখানে শয়ান

তার চেয়ে দূরে, সীমার যেখানে শেষ

সেখানে উদ্ভিদ, জল মেতে আছে পাংশু ঈর্ষায়

যেখানে বিশীর্ণ হাত কাদার ভেতর খোঁজ বলির ফসল

তার চেয়ে দূরে

যেখানে শামুক তার খাদ্য পায়, নিজেও সে খাদ্য হয়

ভেসে যায় সাপের খোলস, সেখানেও

আমার অতৃপ্তি বড় দীর্ঘশ্বাস বিষদৃষ্টি নিয়ে জেগে রয়-

মুকুট খোলার পর আমি আরও বহুদূরে নেমে যেতে চাই।



ব্লগার আকাশ অম্বর-এর 'কেন লিখি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।' পোস্টে তাঁর নিজস্ব কমেন্ট থেকে সংকলিত



যদি নির্বাসন দাও

(আমার স্বপ্ন)



যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষপান করে মরে যাবো!

বিষণ্ন আলোয় এই বাংলাদেশ

নদীর শিয়রে ঝুঁকে পড়া মেঘ

প্রান্তরে দিগন্ত নির্নিমেষ-

এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি

যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষপান করে মরে যাবো!

ধানক্ষেতে চাপ চাপ রক্ত

এইখানে ঝরেছিল মানুষের ঘাম

এখনো স্নানের আগে কেউ কেউ করে থাকে নদীকে প্রণাম

এখনো নদীর বুকে

মোচার খোলায় ঘোরে

লুঠেরা, ফেরারি!

শহরে বন্দরে এত অগ্নি-বৃষ্টি

বৃষ্টিতে চিক্কণ তবু এক একটি অপরূপ ভোর,

বাজারে ক্রূরতা, গ্রামে রণহিংসা

বাতাবি লেবুর গাছে জোনাকির ঝিকমিক খেলা

বিশাল প্রাসাদে বসে কাপুরুষতার মেলা

বুলেট ও বিস্ফোরণ

শঠ তঞ্চকের এত ছদ্মবেশ

রাত্রির শিশিরে কাঁপে ঘাস ফুল–

এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি

যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষপান করে মরে যাবো!



কুয়াশার মধ্যে এক শিশু যায় ভোরের ইস্কুলে

নিথর দিঘির পারে বসে আছে বক

আমি কি ভুলেছি সব

স্মৃতি, তুমি এত প্রতারক?

আমি কি দেখি নি কোনো মন্থর বিকেলে

শিমুল তুলার ওড়াউড়ি?

মোষের ঘাড়ের মতো পরিশ্রমী মানুষের পাশে

শিউলি ফুলের মতো বালিকার হাসি

নিই নি কি খেজুর রসের ঘ্রাণ

শুনি নি কি দুপুরে চিলের

তীক্ষ্ণ স্বর?

বিষণ্ন আলোয় এই বাংলাদেশ…

এ আমারই সাড়ে তিন হাত ভূমি

যদি নির্বাসন দাও, আমি ওষ্ঠে অঙ্গুরি ছোঁয়াবো

আমি বিষপান করে মরে যাবো।।



* 'ইতিহাসের স্বপ্নভঙ্গ : সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় আর নেই' : রেজা ঘটক (কমেন্ট)



নীরার দুঃখকে ছোঁয়া

(আমার স্বপ্ন)



কতটুকু দূরত্ব? সহস্র আলোকবর্ষ চকিতে পার হয়ে

আমি তোমার সামনে এসে হাঁটু গেড়ে বসি

তোমার নগ্ন কোমরের কাছে উষ্ণ নিশ্বাস ফেলার আগে

অলঙ্কৃত পাড় দিতে ঢাকা অদৃশ্য পায়ের পাতা দুটি

বুকের কাছে এনে

চুম্বন ও অশ্রুজলে ভেজাতে চাই

আমার সাঁইত্রিশ বছরের বুক কাঁপে

আমার সাঁইত্রিশ বছরের বাইরের জীবন মিথ্যে হয়ে যায়

বহুকাল পর অশ্রু বিস্মৃত শব্দটি

অসম্ভব মায়াময় মনে হয়

ইচ্ছে করে তোমার দুঃখের সঙ্গে

আমার দুঃখ মিশিয়ে আদর করি

সামাজিক কাঁথা সেলাই করা ব্যবহার তছনছ করে

স্ফুরিত হয় একটি মুহূর্ত

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে তোমার পায়ের কাছে…



বাইরে বড় চ্যাঁচামেচি, আবহাওয়া যখন তখন নিম্নচাপ

ধ্বংস ও সৃষ্টির বীজ ও ফসলে ধারাবাহিক কৌতুক

অজস্র মানুষের মাথা নিজস্ব নিয়মে ঘামে

সেই তো শ্রেষ্ঠ সময় যখন এ-সবকিছুই তুচ্ছ

যখন মানুষ ফিরে আসে তার ব্যক্তিগত স্বর্গের

অতৃপ্ত সিঁড়িতে

যখন শরীরের মধ্যে বন্দী ভ্রমরের মনে পড়ে যায়

এলাচ গন্ধের মতো বাল্যস্মৃতি

তোমার অলোকসামান্য মুখের দিকে আমার স্থির দৃষ্টি

তোমার রেজী অভিমানের কাছে প্রতিহত হয়

দ্যুলোক-সীমানা

প্রতীক্ষা করি ত্রিকাল দুলিয়ে দেওয়া গ্রীবাভঙ্গির

আমার বুক কাঁপে,

কথা বলি না

বুকে বুক রেখে যদি স্পর্শ করা যায় ব্যথাসরিৎসাগর

আমি চেয়ার ছেড়ে উঠে আসি অসম্ভব দূরত্ব পেরিয়ে

চোখ শুকনো, তবু পদচুম্বনের আগে

অশ্রুপাতের জন্য মন কেমন করে!



* সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



সত্যবদ্ধ অভিমান

(আমার স্বপ্ন)



এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ

আমি কি এ হাতে কোনো পাপ করতে পারি?

শেষ বিকেলের সেই ঝুল বারান্দায়

তার মুখে পড়েছিল দুর্দান্ত সাহসী এক আলো

যেন এক টেলিগ্রাম, মুহূর্তে উন্মুক্ত করে

নারীর সুষমা

চোখে ও ভূরুতে মেশা হাসি, নাকি অভ্রবিন্দু?

তখন সে যুবতীকে খুকি বলে ডাকতে ইচ্ছে হয়-

আমি ডান হাত তুলি, পুরুষ পাঞ্জার দিকে

মনে মনে বলি,

যোগ্য হও, যোগ্য হয়ে ওঠো-

ছুঁয়ে দিই নীরার চিবুক

এই হাত ছুঁয়েছে নীরার মুখ

আমি কি এ হাতে আর কোনোদিন

পাপ করতে পারি?



এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে , ভালোবাসি-

এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?

সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে মনে পড়ে ভীষণ জরুরি

কথাটাই বলা হয় নি

লঘু মরালির মতো নারীটিকে নিয়ে যাবে বিদেশি বাতাস

আকস্মিক ভূমিকম্পে ভেঙ্গে যাবে সবগুলো সিঁড়ি

থমকে দাঁড়িয়ে আমি নীরার চোখের দিকে...

ভালোবাসা এক তীব্র অঙ্গীকার, যেন মায়াপাশ

সত্যবদ্ধ অভিমান- চোখ জ্বালা করে ওঠে,

সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে

এই ওষ্ঠ বলেছে নীরাকে, ভালোবাসি-

এই ওষ্ঠে আর কোনো মিথ্যে কি মানায়?



* সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



মন ভালো নেই

(মন ভালো নেই)



মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই

কেউ তা বোঝে না সকলি গোপন মুখে ছায়া নেই

চোখ খোলা তবু চোখ বুজে আছি কেউ তা দেখে নি

প্রতিদিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়

আশায় আশায় আশায় আশায়

এখন আমার ওষ্ঠে লাগে না কোনো প্রিয় স্বাদ

এমনকি নারী এমনকি নারী এমনকি নারী

এমনকি সুরা এমনকি ভাষা

মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই

বিকেল বেলায় একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে

একলা একলা পথে ঘুরে ঘুরে পথে ঘুরে ঘুরে

কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না কারুকে চাই নি

কিছুই খুঁজি না কোথাও যাই না

আমিও মানুষ আমার কী আছে অথবা কী ছিল

আমার কী আছে অথবা কী ছিল

ফুলের ভিতরে বীজের ভিতরে ঘুণের ভিতরে

যেমন আগুন আগুন আগুন আগুন আগুন

মন ভালো নেই মন ভালো নেই মন ভালো নেই

তবু দিন কাটে দিন কেটে যায় আশায় আশায়

আশায় আশায় আশায় আশায়...



তুমি জেনেছিলে

(মন ভালো নেই)



তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে

হাত ছুঁয়ে বলে বন্ধু

তুমি জেনেছিলে মানুষে মানুষে

মুখোমুখি এসে দাঁড়ায়

হাসি বিনিময় করে চলে যায়

উত্তরে দক্ষিণে

তুমি যেই এসে দাঁড়ালে-

কেউ চিনলো না কেউ দেখলে না

সবাই সবার অচেনা!



* নির্বাচিত কবিতা‌‌‌ সমগ্র-২ : ফারজুল আরেফিন



নীরা তুমি



নীরা, তুমি নিরন্নকে মুষ্টিভিক্ষা দিলে এইমাত্র

আমাকে দেবে না?

শ্মশানে ঘুমিয়ে থাকি, ছাই-ভস্ম খাই, গায়ে মাখি

নদী-সহবাসে কাটে দিন

এই নদী গৌতম বুদ্ধকে দেখেছিল

পরবর্তী বারুদের আস্তরণও গায়ে মেখেছিল

এই নদী তুমি!



বড় দেরি হয়ে গেল, আকাশে পোশাক হতে বেশি বাকি নেই

শতাব্দীর বাঁশবনে সাংঘাতিক ফুটেছে মুকুল

শোনোনি কি ঘোর দ্রিমি দ্রিমি?

জলের ভিতর থেকে সমুত্থিত জল কথা বলে

মরুভূমি মেরুভূমি পরস্পর ইশারায় ডাকে

শোনো, বুকের অলিন্দে গিয়ে শোনো

হে নিবিড় মায়াবিনী, ঝলমলে আঙুল তুলে দাও।

কাব্যে নয়, নদীর শরীরে নয়, নীরা

চশমা-খোলা মুখখানি বৃষ্টিজলে ধুয়ে

কাছাকাছি আনো

নীরা, তুমি নীরা হয়ে এসো!



* সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



নীরা ও জীরো আওয়ার



এখন অসুখ নেই, এখন অসুখ থেকে সেরে উঠে

পরবর্তী অসুখের জন্য বসে থাকা। এখন মাথার কাছে

জানলা নেই, বুক ভরা দুই জানলা, শুধু শুকনো চোখ

দেয়ালে বিশ্রাম করে, কপালে জলপট্টির মতো

ঠাণ্ডা হাত দূরে সরে গেছে, আজ এই বিষম সকালবেলা

আমার উত্থান নেই, আমি শুয়ে থাকি, সাড়ে দশটা বেজে যায়।



প্রবন্ধ ও রম্যরচনা, অনুবাদ, পাঁচ বছর আগের

শুরু করা উপন্যাস, সংবাদপত্রের জন্য জল-মেশানো

গদ্য থেকে আজ এই সাড়ে দশটায় আমি সব ভেঙেচুরে

উঠে দাঁড়াতে চাই–অন্ধ চোখ, ছোট চুল–ইস্ত্রিকরা পোশাক ও

হাতের শৃঙ্খল ছিঁড়ে ফেলে আমি এখন তোমার

বাড়ির সামনে, নীরা থুক্‌ করে মাটিতে থুতু ছিটিয়ে‌

বলি : এই প্রাসাদ একদিন আমি ভেঙে ফেলবো! এই প্রাসাদে

এক ভারতবর্ষব্যাপী অন্যায়। এখান থেকে পুনরায় রাজতন্ত্রের

উৎস। আমি

ব্রীজের নিচে বসে গম্ভীর আওয়াজ শুনেছি, একদিন

আমূলভাবে উপড়ে নিতে হবে অপবিত্র সফলতা।



কবিতায় ছোট দুঃখ, ফিরে গিয়ে দেখেছি বহুবার

আমার নতুন কবিতা এই রকম ভাবে শুরু হয় :

নীরা, তোমায় একটি রঙিন

সাবান উপহার

দিয়েছি শেষবার;

আমার সাবান ঘুরবে তোমার সারা দেশে।

বুক পেরিয়ে নাভির কাছে মায়া স্নেহে

আদর করবে, রহস্যময় হাসির শব্দে

ক্ষয়ে যাবে, বলবে তোমার শরীর যেন

অমর না হয়…



অসহ্য! কলম ছুঁড়ে বেরিয়ে আমি বহুদূর সমুদ্রে

চলে যাই, অন্ধকারে স্নান করি হাঙর-শিশুদের সঙ্গে

ফিরে এসে ঘুম চোখ, টেবিলের ওপাশে দুই বালিকার

মতো নারী, আমি নীল-লোভী তাতার বা কালো ঈশ্বর-খোঁজা

নিগ্রোদের মতো অভিমান করি, অভিমানের স্পষ্ট

শব্দ, আমার চা-মেশানো ভদ্রতা হলুদ হয়!



এখন, আমি বন্ধুর সঙ্গে সাহাবাবুদের দোকানে, এখন

বন্ধুর শরীরে ইঞ্জেকশন ফুঁড়লে আমার কষ্ট, এখন

আমি প্রবীণ কবির সুন্দর মুখ থেকে লোমশ ভ্রুকুটি

জানু পেতে ভিক্ষা করি, আমার ক্রোধ ও হাহাকার ঘরের

সিলিং ছুঁয়ে আবার মাটিতে ফিরে আসে, এখন সাহেব বাড়ীর

পার্টিতে আমি ফরিদপুরের ছেলে, ভালো পোষাক পরার লোভ

সমেত কাদা মাখা পায়ে কুৎসিত শ্বেতাঙ্গিনীকে দু’পাটি

দাঁত খুলে আমার আলজিভ দেখাই, এখানে কেউ আমার

নিম্নশরীরের যন্ত্রনার কথা জানে না। ডিনারের আগে

১৪ মিনিটের ছবিতে হোয়াইট ও ম্যাকডেভিড মহাশূন্যে

উড়ে যায়, উন্মাদ! উন্মাদ! এক স্লাইস পৃথিবী দূরে,

সোনার রজ্জুতে

বাঁধা একজন ত্রিশঙ্কু। কিন্তু আমি প্রধান কবিতা

পেয়ে গেছি প্রথমেই, ৯, ৮, ৭, ৬, ৫…থেকে ক্রমশ শূন্যে

এসে স্তব্ধ অসময়, উলটোদিকে ফিরে গিয়ে এই সেই মহাশূন্য,

সহস্র সূর্যের বিস্ফোরণের সামনে দাঁড়িয়ে ওপেনহাইমার

প্রথম এই বিপরীত অঙ্ক গুনেছিল ভগবৎ গীতা আউড়িয়ে?

কেউ শূন্যে ওঠে কেউ শূন্যে নামে, এই প্রথম আমার মৃত্যু

ও অমরত্বের ভয় কেটে যায়, আমি হেসে বন্দনা করি :

ওঁ শান্তি! হে বিপরীত সাম্প্রতিক গণিতের বীজ

তুমি ধন্য, তুমি ইয়ার্কি, অজ্ঞান হবার আগে তুমি সশব্দ

অভ্যুত্থান, তুমি নেশা, তুমি নীরা, তুমিই আমার ব্যক্তিগত

পাপমুক্তি। আমি আজ পৃথিবীর উদ্ধারের যোগ্য



* সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



নীরা তুমি কালের মন্দিরে



চাঁদের নীলাভ রং, ওইখানে লেগে আছে নীরার বিষাদ

ও এমন কিছু নয়, ফুঁ দিলেই চাঁদ উড়ে যাবে

যে রকম সমুদ্রের মৌসুমিতা, যে রকম

প্রবাসের চিঠি

অরণ্যের এক প্রান্তে হাত রেখে নীরা কাকে বিদায় জানালো

আঁচলে বৃষ্টির শব্দ, ভুরুর বিভঙ্গে লতা পাতা

ও যে বহুদূর,

পীত অন্ধকারে ডোবে হরিৎ প্রান্তর

ওখানে কী করে যাবো, কী করে নীরাকে

খুঁজে পাবো?



অক্ষরবৃত্তের মধ্যে তুমি থাকো, তোমাকে মানায়

মন্দাক্রান্তা, মুক্ত ছন্দ, এমনকি চাও শ্বাসাঘাত

দিতে পারি, অনেক সহজ

কলমের যে-টুকু পরিধি তুমি তাও তুচ্ছ করে

যদি যাও, নীরা, তুমি কালের মন্দিরে

ঘন্টধ্বনি হয়ে খেলা করো, তুমি সহাস্য নদীর

জলের সবুজে মিশে থাকো, সে যে দূরত্বের চেয়ে বহুদূর

তোমার নাভির কাছে জাদুদণ্ড, এ কেমন খেলা

জাদুকরী, জাদুকরী, এখন আমাকে নিয়ে কোন রঙ্গ

নিয়ে এলি চোখ-বাঁধা গোলকের ধাঁধায়!



* সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের নীরা বিষয়ক কবিতা : গাব্রিয়েল সুমন



ব্যর্থ প্রেম

(দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়)



প্রতিটি ব্যর্থ প্রেমই আমাকে নতুন অহঙ্কার দেয়

আমি মানুষ হিসেবে একটু লম্বা হয়ে উঠি

দুঃখ আমার মাথার চুল থেকে পায়ের আঙুল পর্যন্ত

ছড়িয়ে যায়

আমি সমস্ত মানুষের থেকে আলাদা হয়ে এক

অচেনা রাস্তা দিয়ে ধীরে পায়ে

হেঁটে যাই



সার্থক মানুষদের আরো-চাই মুখ আমার সহ্য হয় না

আমি পথের কুকুরকে বিস্কুট কিনে দিই

রিক্সাওয়ালাকে দিই সিগারেট

অন্ধ মানুষের শাদা লাঠি আমার পায়ের কাছে

খসে পড়ে

আমার দু’হাত ভর্তি অঢেল দয়া, আমাকে কেউ

ফিরিয়ে দিয়েছে বলে গোটা দুনিয়াটাকে

মনে হয় খুব আপন



আমি বাড়ি থেকে বেরুই নতুন কাচা

প্যান্ট শার্ট পরে

আমার সদ্য দাড়ি কামানো নরম মুখখানিকে

আমি নিজেই আদর করি

খুব গোপনে



আমি একজন পরিচ্ছন্ন মানুষ

আমার সর্বাঙ্গে কোথাও

একটুও ময়লা নেই

অহঙ্কারের প্রতিভা জ্যোতির্বলয় হয়ে থাকে আমার

মাথার পেছনে



আর কেউ দেখুক বা না দেখুক

আমি ঠিক টের পাই

অভিমান আমার ওষ্ঠে এনে দেয় স্মিত হাস্য

আমি এমনভাবে পা ফেলি যেন মাটির বুকেও

আঘাত না লাগে

আমার তো কারুকে দুঃখ দেবার কথা নয়।



* রেজা ঘটকের পূর্বোল্লেখিত পোস্ট থেকে সংকলিত



চোখ নিয়ে চলে গেছে

(দেখা হলো ভালোবাসা বেদনায়)



এই যে বাইরে হু হু ঝড়, এর চেয়ে বেশি

বুকের মধ্যে আছে

কৈশোর জুড়ে বৃষ্টি বিশাল, আকাশে থাকুক যত মেঘ,

যত ক্ষণিকা

মেঘ উড়ে যায়

আকাশ ওড়ে না

আকাশের দিকে

উড়ছে নতুন সিঁড়ি

আমার দু বাহু একলা মাঠের জারুলের ডালপালা

কাচ ফেলা নদী যেন ভালোবাসা

ভালোবাসার মতো ভালোবাসা

দু'দিকের পার ভেঙে

নারীরা সবাই ফুলের মতন, বাতাসে ওড়ায়

যখন তখন

রঙিন পাঁপড়ি

বাতাস তা জানে, নারীকে উড়াল দেয়ে নিয়ে যায়

তাই আমি আর প্রকৃতি দেখি না,

প্রকৃতি আমার চোখ নিয়ে চলে গেছে!

(ব্লগ থেকে সংকলিত। ব্লগারের নাম ভুলে যাওয়ায় দুঃখিত)



চায়ের দোকানে



লণ্ডনে আছে লাস্ট বেঞ্চির ভীরু পরিমল,

রথীন এখন সাহিত্যে এক পরমহংস

দীপু তো শুনেছি খুলেছে বিরাট কাগজের কল

এবং পাঁচটা চায়ের বাগানে দশআনি অংশ

তদুপরি অবসর পেলে হয় স্বদেশসেবক;



আড়াই ডজন আরশোলা ছেড়ে ক্লাস ভেঙেছিল পাগলা অমল

সে আজ হয়েছে মস্ত অধ্যাপক!

কি ভয়ংকর উজ্জ্বল ছিল সত্যশরণ

সে কেন নিজের কণ্ঠ কাটলো ঝকঝকে ক্ষুরে -

এখনো ছবিটি চোখে ভাসলেই জাগে শিহরণ

দূরে চলে যাবে জানতাম, তবু এতখানি দূরে ?



গলির চায়ের দোকানে এখন আর কেউ নেই

একদা এখানে সকলে আমরা স্বপ্নে জেগেছিলাম

এক বালিকার প্রণয়ে ডুবেছি এক সাথে মিলে পঞ্চজনেই

আজ এমনকি মনে নেই সেই মেয়েটিরও নাম।



* রেজা ঘটকের পূর্বোল্লেখিত পোস্ট থেকে সংকলিত



‘অর্ধেক জীবন’ গ্রন্থের মুখবন্ধ থেকে



জুলপি দুটো দেখতে দেখতে শাদা হয়ে গেল!

আমাকে তরুণ কবি বলে কেউ ভুলেও ভাববে না

পরবর্তী অগণন তরুণেরা এসেছে সুন্দর ক্রুদ্ধ মুখে

তাদের পৃথিবী তারা নিজস্ব নিয়মে নিয়ে নিক!

আমি আর কফি হাউস থেকে হেঁটে হেঁটে হেঁটে

নিরুদ্দিষ্ট কখনো হবো না



আমি আর পকেটে কবিতা নিয়ে ভোরবেলা

বন্ধুবান্ধবের বাড়ি যাবো না কখনো

হসন্তকে এক মাত্রা ধরা হবে কিনা এর তর্কে আর

ফাটাবো না চায়ের টেবিল



এখন ক্রমশ আমি চলে যাবো তুমি’-র জগৎ ছেড়ে

আপনি’-র জগতে

কিছু প্রতিরোধ করে, হার মেনে, লিখে দেব

দুটি একটি বইয়ের ভূমিকা

অকস্মাৎ উৎসব-বাড়িতে পূর্ব প্রেমিকার সঙ্গে দেখা হলে

তার হৃষ্টপুষ্ট স্বামীটির সঙ্গে হবে

রাজনীতি নিয়ে আলোচনা



দিন যাবে, এরকমভাবে দিন যাবে!

অথচ একলা দিনে, কেউ নেই, শুয়ে আমি আমি আর

বুকের ওপরে প্রিয় বই

ঠিক যেন কৈশোরে পেরিয়ে আসা রক্তমাখা মরূদ্যান

খেলা করে মাথার ভিতরে

জঙ্গলের সিংহ এক ভাঙা প্রাসাদের কোণে

ল্যাজ আছড়িয়ে তোলে গম্ভীর গর্জন

নদীর প্রাঙ্গণে ওই স্নিগ্ধ ছায়ামূর্তিখানি কার?

ধড়ফড় করে উঠে বসি

কবিতার খাতা খুলে চুপে চাপে লিখে রাখি

গতকালপরশুর কিছু পাগলামি!



* 'কেন লিখি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়।' : আকাশ অম্বর (চতুর্মাত্রিক ব্লগ)



কথা আছে



বহুক্ষণ মুখোমুখি চুপচাপ, একবার চোখ তুলে সেতু

আবার আলাদা দৃষ্টি, টেবিলে রয়েছে শুয়ে

পুরোনো পত্রিকা

প্যান্টের নিচে চটি, ওপাশে শাড়ির পাড়ে

দুটি পা-ই ঢাকা

এপাশে বোতাম খোলা বুক, একদিন না-কামানো দাড়ি

ওপাশে এলো খোঁপা, ব্লাউজের নীচে কিছু

মসৃণ নগ্নতা

বাইরে পায়ের শব্দ, দূরে কাছে কারা যায়

কারা ফিরে আসে

বাতাস আসেনি আজ, রোদ গেছে বিদেশ ভ্রমণে।

আপাতত প্রকৃতির অনুকারী ওরা দুই মানুষ-মানুষী

দু‘খানি চেয়ারে স্তব্ধ, একজন জ্বলে সিগারেট

অন্যজন ঠোঁটে থেকে হাসিটুকু মুছেও মোছে না

আঙুলে চিকচিকে আংটি, চুলের কিনারে একটু ঘুম

ফের চোখ তুলে কিছু স্তব্ধতার বিনিময়,

সময় ভিখারী হয়ে ঘোরে

অথচ সময়ই জানে, কথা আছে, ঢের কথা আছে।



* নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন



নিজের আড়ালে



সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে

মানুষ দেখে না

সে খোঁজে ভ্রমর বিংবা

দিগন্তের মেঘের সংসার

আবার বিরক্ত হয়

কতকাল দেখে না আকাশ

কতকাল নদী বা ঝরনায় আর

দেখে না নিজের মুখ

আবর্জনা, আসবাবে বন্দী হয়ে যায়

সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে

রমনীর কাছে গিয়ে

বারবার হয়েছে কাঙাল

যেমন বাতাসে থাকে সুগন্ধের ঋণ

বহু বছরের স্মৃতি আবার কখন মুছে যায়

অসম্ভব অভিমান খুন করে পরমা নারীকে

অথবা সে অস্ত্র তোলে নিজেরই বুকের দিকে

ঠিক যেন জন্মান্ধ তখন

সুন্দর লুকিয়ে থাকে মানুষের নিজেরই আড়ালে।।



* নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন



যে আমায়



যে আমায় চেনে আমি তাকেই চিনেছি

যে আমায় ভুলে যায়, আমি তার ভুল

গোপন সিন্দুকে খুব যত্নে তুলে রাখি

পুকুরের মরা ঝাঁঝি হাতে নিয়ে বলি,

মনে আছে, জলের সংসার মনে আছে?

যে আমায় চেনে আমি তাকেই চিনেছি!

যে আমায় বলেছিল, একলা থেকো না

আমি তার একাকিত্ব অরণ্যে খুঁজেছি

যে আমায় বলেছিল, অত্যাগসহন

আমি তার ত্রাগ নিয়ে বানিয়েছি শ্লোক

যে আমার বলেছিল, পশুকে মেরো না

আমার পশুত্ব তাকে দিয়েছে পাহারা!

দিন গেছে, দিন যায় যমজ চিন্তায়

যে আমায় চেনে আমি তাকেই চিনেছি!



* নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন



স্পর্শটুকু নাও



স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ

ছেঁড়া পৃষ্ঠা উড়ে যায়, না-লেখা পৃষ্ঠাও কিছু ওড়ে

হিমাদ্রি-শিখর থেকে ঝুঁকে-জড়া জলাপ্রপাতের সবই আছে

শুধু যেন শব্দরাশি নেই

স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ

ভোর আনে শালিকেরা, কোকিল ঘুমন্ত, আর

জেগে আছে দেবদারু বন

নীলিমার হিম থেকে খসে যায় রূপের কিরীট

স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ

বেলা গেল, শোনোনি কি ছেলেমানুষীরা কোনো

ভুল করা ডাক?

এপারে মৃত্যুর হাতছাছি আর অন্য পারে

অমরত্ব কঠিন নীরব

‘মনে পড়ে?’ এই ডাক কতকাল, কত শতাব্দীর

জলে ধুয়ে যায় স্মৃতি, কার জল কোন জল

কবেকার উষ্ণ প্রস্রবণ

স্পর্শটুকু নাও আর বাকি সব চুপ।



* নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন



রূপালি মানবী



রূপালি মানবী, সন্ধ্যায় আজ শ্রাবণ ধারায়

ভিজিও না মুখ, রূপালী চক্ষু, বরং বারান্দায় উঠে এসো

ঘরের ভিতরে বেতের চেয়ার, জানলা বন্ধ দরজা বন্ধ

রূপালী মানবী, তালা খুলে নাও, দেয়ালে বোতাম আলো জ্বেলে নাও,

অথবা অন্ধকারেই বসবে, কাচের শার্সি থাকুক বন্ধ

দূর থেকে আজ বৃষ্টি দেখবে, ঘরের ভিতরে বেতের চেয়ার, তালা খুলে

নাও।

চাবি নেই, একি! ভালো করে দ্যাখো হাতব্যাগ, মন

অথবা পায়ের নিচে কার্পেট, কোণ উঁচু করে উঁকি মেরে নাও

চিঠির বাক্সে দ্যাখো একবার, রূপালী মানবী, এত দেরি কেন?

বইরে বৃষ্টি, বিষম বৃষ্টি, ঝড়ের ঝাপটা তোমাকে জড়ায়

তোমার রূপালী চুল খুলে দেয়, চাবি খুঁজে নও-

তোমার রূপালী অসহায় মুখ আমাকে করেছে আরও উৎসুক-

ধাক্ক-মারো না! আপনি হয়তো দরজা খুলবে, পলকা ও তালা

অমন উতলা রূপালী মানবী তোমাকে এখন হওয়া মানায় না

অথবা একলা রয়েছে-বলেই বৃষ্টি তোমাকে কোনো ছলে বলে

ছুঁতে পারবে না, ফিরতে না তুমি বাইরে বিপুল লেলিহান ঝড়ে-

তালা খুলে নাও।

রূপালী মানবী, আজ তুমি ঐ জানলার পাশে বেতের চেয়ারে

একলা এসব আঁধারে অথবা গেয়ালে বোতাম আলো জ্বেলে নাও

ঠান্ডা কাঁচের শার্সিতে রাখো ও রূপালী মুখ, দুই উৎসুক চোখ মেলে দাও।

বাইরে বৃষ্টি, বিষম বৃষ্টি, আজ তুমি ঐ রূপালী শরীরে

বৃষ্টি দেখবে প্রান্তরময়, আকাশ মুচড়ে বৃষ্টির ধারা…

আমি দূরে এক বৃষ্টির নিচে দাঁড়িয়ে রয়েছি, একলা রয়েছি,

ভিজেছে আমার সর্ব শরীর, লোহার শরীর, ভিজুক আজকে

বাজ বিদ্যুৎ একলা দাঁড়িয়ে মানি না, সকাল বিকেল

খরচোখে আমি চেয়ে আছি ঐ জানলার দিকে, কাচের এপাশে

যতই বতাস আঘাত করুক, তবুও তোমার রূপালী চক্ষু-

আজ আমি একা বৃষ্টিতে ভিজে, রূপালী মানবী, দেখবো তোমার

বৃষ্টি না-ভেজা একা বসে থাকা।।



* নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন





এই দৃশ্য



হাঁটুর ওপরে থতনি, তুমি বসে আছো

নীল ডুরে শাড়ী, স্বপ্নে পিঠের ওপরে চুল খোলা

বাতাসে অসংখ্য প্রজাপতি কিংবা সবই অভ্রফুল?

হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো

চোখ দুটি বিখ্যাত সুদূর, পায়ের আঙুলে লাল আভা।

ডান হতে, তর্জনিতে সামান্য কালির দাগ

একটু আগেই লিখছিলে

বাতাসে সুগন্ধ, কোথা যেন শুরু হলো সন্ধ্যারতি

অন্যদেশ থেকে আসে রাত্রি, আজ কিছু দেরি হবে

হাঁটুর ওপরে থুথনি, তুমি বসে আছো

শিল্পের শিরায় আসে উত্তেজনা, শিল্পের দু’চোখে

পোড়ে বাজি

মোহময় মিথ্যেগুলি চঞ্চল দৃষ্টির মতো, জোনাকির মতো উড়ে যায়

কোনোদিন দুঃখ ছিল, সেই কথা মনেও পড়ে না

হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো

সময় থামে না জানি, একদিন তুমি আমি সময়ে জড়াবো

সময় থামে না, একদিন মৃত্যু এসে নিয়ে যাবে

দিগন্ত পেরিয়ে-

নতুন মানুষ এসে গড়ে দেবে নতুন সমাজ

নতুন বাতাস এসে মুছে দেবে পুরোনো নি:শ্বাস,

তবু আজ

হাঁটুর ওপরে থুতনি,তুমি বসে আছো

এই বসে থাকা, এই পেঠের ওপরে খোলা চুল,

আঙুলে কালির দাগ

এই দৃশ্য চিরকাল, এর সঙ্গে অমরতা সখ্য করে নেবে

হাঁটুর ওপরে থুতনি, তুমি বসে আছো..,.



*নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন



ইচ্ছে



কাচের চুড়ি ভাঙার মতন মাঝে মাঝেই ইচ্ছে করে

দুটো চারটে নিয়ম কানুন ভেঙে ফেলি

পায়ের তলায় আছড়ে ফেলি মাথার মুকুট

যাদের পায়ের তলায় আছি, তাদের মাথায় চড়ে বসি

কাঁচের চুড়ি ভাঙার মতই ইচ্ছে করে অবহেলায়

ধর্মতলায় দিন দুপুরে পথের মধ্যে হিসি করি।

ইচ্ছে করে দুপুর রোদে ব্লাক আউটের হুকুম দেবার

ইচ্ছে করে বিবৃতি দিই ভাঁওতা মেলে জনসেবার

ইচ্ছে করে ভাঁওতাবাজ নেতার মুখে চুনকালি দিই।

ইচ্ছে করে অফিস যাবার নাম করে যাই বেলুড় মঠে

ইচ্ছে করে ধর্মাধর্ম নিলাম করি মুর্গীহাটায়

বেলুন কিনি বেলুন ফাটাই, কাঁচের চুড়ি দেখলে ভাঙি

ইচ্ছে করে লণ্ডভণ্ড করি এবার পৃথিবীটাকে

মনুমেন্টের পায়ের কাছে দাঁড়িয়ে বলি

আমার কিছু ভাল্লাগে না।।



*নির্বাচিট কবিতা সমগ্র-৩ : ফারজুল আরেফিন





 

প্রকাশ করা হয়েছে: কবিতাযা কিছু আমার  বিভাগে । সর্বশেষ এডিট : ২৪ শে অক্টোবর, ২০১২ রাত ১০:০৩ | বিষয়বস্তুর স্বত্বাধিকার ও সম্পূর্ণ দায় কেবলমাত্র প্রকাশকারীর...

 


মন্তব্য দেখা না গেলে - CTRL+F5 বাট্ন চাপুন। অথবা ক্যাশ পরিষ্কার করুন। ক্যাশ পরিষ্কার করার জন্য এই লিঙ্ক গুলো দেখুন ফায়ারফক্স, ক্রোম, অপেরা, ইন্টারনেট এক্সপ্লোরার

১৪৪টি মন্তব্য

 

সকল পোস্ট     উপরে যান

সামহোয়‍্যার ইন...ব্লগ বাঁধ ভাঙার আওয়াজ, মাতৃভাষা বাংলায় একটি উন্মুক্ত ও স্বাধীন মত প্রকাশের সুবিধা প্রদানকারী প্ল‍্যাটফমর্। এখানে প্রকাশিত লেখা, মন্তব‍্য, ছবি, অডিও, ভিডিও বা যাবতীয় কার্যকলাপের সম্পূর্ণ দায় শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট প্রকাশকারীর...

 

© সামহোয়্যার ইন...নেট লিমিটেড | ব্যবহারের শর্তাবলী | গোপনীয়তার নীতি | বিজ্ঞাপন