somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

জিঘাংসা

১৮ ই জুন, ২০১৭ সকাল ১০:৫৩
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

ঋতু আমাদের স্কুলবান্ধবী। ওর গায়ের রং শ্যামলা, হালকাপাতলা শরীর। ক্লাসে এবং স্কুলে সুন্দরী মেয়ের সংখ্যা নেহায়েত কম ছিল না। কিন্তু ঋতু যেরকম সুন্দরী ছিল, তার বর্ণনা শুধু এভাবেই দেয়া সম্ভব- ও যে-যুবকের দিকে তাকায় সে মুহূর্তে ঘায়েল হয়ে যায়; যে-যুবক ওর দিকে তাকায়, সে সুন্দরত্বের একটা নতুন সংজ্ঞা অনুভব করে।
সপ্তম শ্রেণিতে ওঠার পর আমরা ছেলেমেয়েরা একসাথে ক্লাস করতে শুরু করি। আমাদের চোখের সামনে একটা নতুন ভুবন খুলে গেলো। এতদিন দূর থেকে মেয়েদের দেখেছি, ওদের ওড়না উড়তে দেখেছি; এখন ওরা আমাদের নিশ্বাসের খুব কাছে এসে বাহু ঘেঁষে বসে; ওদের শরীরের ঘ্রাণ পাই; ওরা একটু সামনে ঝুঁকে পড়লে আমরা সারসের মতো ঘাড় উঁচু করে ওদের কামিজের ফাঁক গলিয়ে দৃষ্টি ছুঁড়ে দিই ওদের অতি কচি উদ্ভিন্ন স্তনের দিকে; একঝলক দেখে ফেললে অনির্বচনীয় শান্তি পাই, আর মনের ভিতর নেশা তীব্রতর হতে থাকে- আহা, যদি একটুসখানি ছুঁয়ে দেখা যেতো!
ঋতুর চাহনিতে তীব্র ধার ছিল। যথারীতি ঘায়েল হয়ে গেলাম। আমি খুব বর্ণচোরা আর মুখচোরা। শুধু ভাবি আর মনে মনে ছুঁই। আমি ভীতুর ডিম। ঋতু আমার দিকে তাকালেই আমি চোখ নামিয়ে ফেলি, আর মনে মনে ওর ভিতরে ঢুকে যেতে থাকি। এর চেয়ে আরামপ্রদ ও সহজতর পন্থা আমার জানা ছিল না।
তখন ইঁচড় আরেকটু পেকেছে- ১০ম শ্রেণিতে উঠবার পর একদিন। মেয়েরা ঋতুকে বেঞ্চিতে এককোণে করে রেখেছে, আর ঋতুর মুখমণ্ডল অন্ধকার।
কী হয়েছে! দারুণ করুণ সরস খবর! খবরটা শুনে যতখানি স্তম্ভিত হলাম, তার চেয়ে বহুগুণ কষ্ট পেলাম। ঋতু এমন একটা কাজ করলো! সে আরেকটা ছেলেকে চোখটিপ মারতে পারে, আমি মন খারাপ করবো না। কারো প্রেমে পড়তে পারে, সে কোনো ছেলেকে প্রেমপত্র লিখতে পারে, বা ছেলেরা তাকে- আমি মন খারাপ করবো কোন দোষে! আরেকটা ছেলের হাত ধরাধরি করে সে হাঁটতে পারে দিগম্বর রাস্তায়, সিনেমায় যেতে পারে- হলঘরের অন্ধকারে সাথের ছেলেটা ওর বুকে হাত রাখলে, কিংবা উরুতে, কিংবা চুমু বিনিময় করলে কিছুটা কষ্ট আমার লাগতেই পারে, তাও খুব স্বাভাবিক সমস্যা; কিন্তু ঋতু এ কাজ কীভাবে করলো? ও কারো সাথে হোটেলে রাত কাটিয়েছে, আর রাতভর তাকে সঙ্গম দিয়েছে- আমার কলজে খাবলে কেটে নিয়ে গেলেও কি এতখানি কষ্ট আমি পেতাম?
- না।
আমাদের, অর্থাৎ ছেলেমেয়েদের একচেটিয়া দাবির মুখে ঋতু কাঁদতে কাঁদতে ক্লাসরুম থেকে বেরিয়ে গিয়েছিল।

ঋতু অনেকদিন ক্লাসে আসে নি; বছর খানেক তো হবেই। আর এ সময়ে আমার ভিতরে নিরন্তর দহন অনুভব করেছি।
এসএসসির কিছু আগে ঋতু চুপি চুপি একটা চিরকুট পাঠিয়েছিল।

‘তুই বললেই আমি পরীক্ষাটা দিতে পারি।
আর খোদার কসম, আমি নির্দোষ।’

ঋতু ভালো ছাত্রী ছিল না কোনোদিনই। এসএসসির রেজাল্টও খুব ভালো হয় নি। পরীক্ষা চলবার সময় ওর সাথে দুয়েকবার চোখাচোখি হয়েছিল- জানি না তখন আমি কোথায় হারিয়ে যেতাম।
এরপর কতদিন চলে গেছে- ঋতুর কথা মনে হলেই গুটিবসন্তের ঘা-গুলো দগদগে হয়ে উঠতো।


চিরতা একদিন বললো, ঋতুর কথা মনে পড়ে? ও আজ ফোন করেছিল।
আমি এক ফুৎকারে উতলা হয়ে পড়লাম। ঋতুকে আমার চাই-ই।
তার ৩দিন পর ঋতুর ফোন।
ঋতুর কণ্ঠস্বর ওর লাবণ্যের মতো মিষ্টি নয় আজকাল! চিরতা ওর চেয়ে ঢের গুছিয়ে কথা বলে, কণ্ঠে অমৃতের মধু।
আমি এলোমেলো হয়ে যাই। সুন্দর গোছানো জীবনে আমার সুখের অন্ত নেই, কিন্তু সেই সুখ ঝকঝকে সাদা পাতার মতো- কোনো আর্ট নেই, বর্ণাক্ষরে কিছু লেখা নেই তাতে। জীবন এতটা রুক্ষ বা নীরস হতে পারে না। আমি এলোমেলো হয়ে যাই।
ঋতুর সাথে কথা চলতে থাকে। অবিরাম। আমি যে কথাটা বলতে চাই সেটা মাথায় রেখে এগোতে থাকি। কিন্তু সেটা বলার উপযুক্ত শব্দগুচ্ছ ও পটভূমি মেলে না। আমি বড্ড এলোমেলো আজকাল। আমি বিভোরে এলোমেলো হয়ে যাই। একদিকে আমার অনাবিল সংসার, অন্যদিকে এক অজানা পৃথিবীর রহস্য আমাকে নিয়ে খেলতে থাকে। আমি দিশেহারা হয়ে যাই।

কথাবার্তা এখনই শেষ হয়ে যাবে, এমন সময়...
‘আচ্ছা শোন!’
‘কী!’
নাহ্, যে কথাটি বলতে চাই পেটের ভিতর সেটা প্রচণ্ড মোচড় দিচ্ছে, কিন্তু মুখ ফুটে তা বের হয় না; বলি অন্য কথা...
‘তোর ছেলেমেয়ে ক’জন?’
‘মেয়ে নাই। এক ছেলে। তোর?’
‘ছেলে নাই। এক মেয়ে। তোর জামাই কী করে?’
‘জানি না।’
ও পাশে ঋতুর একটা দীর্ঘশ্বাসের শব্দ পাই। ঋতু বলে, ‘তোর বউ নাকি খুব সুন্দরী?’
‘খুউব। খুউব। কিন্তু শোন...’
‘কী?’
ঋতুকে বলতে পারি না- আমি তোকে চাই, এখনই। আমি এখন তীব্র কঠিন ও মজবুত; আমি তোকে ভেঙেচুরে গুঁড়ো গুঁড়ো করবো।

‘ছিঃ, তোর না বউ আছে! এত সুন্দরী বউ!’
‘গোল্লায় যাক, শুধু একটা দিনের জন্য ভুলে যেতে চাই আমার আর কেউ নেই তুই ছাড়া।’
১০ সেকেন্ডের স্বপ্নের ভিতর তীব্র বাসনায় আমি শাণিত হতে থাকি। ঘুম ভাঙলে সারাক্ষণ ঐ কথাটাই পবনে পবনে ভাসতে থাকে।
‘ঠিক আছে, একবারের বেশি না। আর চিরতাকে বলবি না কিন্তু।’ শেষাবধি ঋতু যেদিন এ কথাটি বললো, হিরোশিমার বিস্ফোরণ ঘটানোর জন্য একচিলতে পারমাণবিক বোমা সঙ্গে নিয়ে ছুটতে থাকলাম।

অবিরাম কড়া নেড়েই যাচ্ছি। নাহ্, কড়া নয়, কলিংবেল টিপছি। চিরতার দরজায় দাঁড়িয়ে। এ বাসায় এর আগে কত এসেছি! চিরতা আমাকে কোনোদিন প্রেম সাধে নি; নির্জন ঘরে যখন ওর ডানায় ডানায় ঘষাঘষি করে কবিতা পড়েছি, মাঝে মাঝে ওর স্তন জুড়ে কিছু লালচে দাগসহ বৃন্ত দেখতে পেতাম- আমার খুব ইচ্ছে হতো, আর ও শুধু কবিতাই বুঝতো; আজ এ বাসায় একটি অনুপম সঙ্গম রচিত হবে। মাত্র একবার। আজ আমি সব ভুলে যাবো- আমার সুন্দরীতমা বউয়ের মুখ আর তার প্রেমামৃতির স্বাদ; আজ সংসারের কথা মনে রাখা পাপ- সংসার মনে রাখলে সঙ্গমের স্বাদই ধ্বংস হয়ে যায়।
কতক্ষণ দাঁড়িয়ে আছি কে জানে! আমি শুধু একমনে বেল টিপেই যাচ্ছি।

...এই যে...

হঠাৎ কে যেন পেছন থেকে গলার স্বর লম্বা করে ডেকে ওঠে। আমি চমকে পেছনে তাকাই। ‘হাহ্‌!’ লোকটাকে দেখেই আমি আত্‌কে উঠি। একটা লোক, আমার দিকে তাকিয়ে মিটিমিটি হাসছে। সে দেয়ালে হেলান দিয়ে পায়ের উপর পা রেখে দাঁড়িয়ে। আমি যেন চুরি করতে এসে ধরা পড়ে গেছি, এমনভাবে তার চোখ কথা বলছে।
- হ্যাঁ, তুমি ঠিকই ভেবেছ। তুমি ধরা পড়ে গেছো।
- কে আপনি?
- আমাকে তুমি চিনো, জিজ্ঞাসা করছো কেন?
- না, আমি ধরা পড়বো কেন?
- শোনো বাছা, ভয় পেয়ো না। নিরানন্দ জীবনে একটু-আধটু এদিক-সেদিক হতেই পারে, তাই না?
- ঠিক না। আপনি যা ভাবছেন আমি সেরকম না।
- নিজকে নিয়ে সবাই ওরকম বড়াই করে। তুমিও তো করতে, তাই না? তোমার সেই বড়াই আজ কোথায় গেলো?
লোকটা অদৃশ্য হাওয়ায় মিলিয়ে যেতেই দরজা খুলে গেলো। আর সলাজ হেসে সামনে এসে দাঁড়ালো ঋতু। কী অদ্ভুত ইল্যুশন! ঋতুদের বাসায় যাবো বলে বেরিয়েছিলাম, অথচ আমি এসেছি চিরতার বাসায়। চিরতার বাসায় ঋতুই বা কখন এলো!
- কেন, তোর তো এ বাসায়ই আসার কথা ছিল। ভুলে গেলি?
কীসব অদ্ভুতুড়ে ব্যাপার ঘটে যাচ্ছে! আমি এলোমেলো হয়ে গেছি! আমার চারপাশে সবাই কি অন্তর্যামী?

আমি ঘুরে দাঁড়াই। ‘যাইরে।’ বলেই হরহর করে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসি।

শহরের বাতাস তখন খুব মোলায়েম, বুকে এসে অনন্ত সুখের পরশ বুলিয়ে যায়। এ শহর তো এমন ছিল না! কোথা থেকে এতো সুখ ঝরছে আজ এই প্রচণ্ড দুপুরে!

ঘরে ফিরে এসে স্ত্রীকে একটা তীব্র সঙ্গম দিতে দিতে আবিষ্কার করলাম- আজ আমি একটা লোককে খুন করেছি।

২ এপ্রিল ২০১০



* কালের চিহ্ন (গল্পগ্রন্থ), বইমেলা ২০১৬-এর অন্তর্ভুক্ত

সর্বশেষ এডিট : ১৮ ই জুন, ২০১৭ সকাল ১০:৫৩
৩৯টি মন্তব্য ৩৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

একটু এলোমেলো কথা আর একটু প্রকৃতির ছবি

লিখেছেন ইতি সামিয়া, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ বিকাল ৫:০০



আমি আমার ভাই বোনের বিচ্ছু ছেলে মেয়েদের বলি আমি মরে গেলে খবরদার যেন কাউকে কাঁদতে না দেখি!! যদি কাউরে কাঁদতে দেখি তাইলে তোদের একেকটার খবর আছে!! চড় মেরে দাঁত... ...বাকিটুকু পড়ুন

মাছ কাটা ব্যাটা

লিখেছেন জাহিদ অনিক, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:১৮



আমার গল্পের নায়কের নাম সবুজ। অবুঝ বালকের মতই তার বয়স নয়। সে ভাল ইনকাম করে, অন্তত আমার থেকে বেশি।
কাওরান বাজার আর শেওড়াপাড়া এলাকায় মাছ বাজারে সে মাছ কাটে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

সময়, এক বয়সখেকো রাক্ষস

লিখেছেন সোনাবীজ; অথবা ধুলোবালিছাই, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ সন্ধ্যা ৭:৫৯




আমি যতবার পুরোনো দিনের সিনেমা দেখতে বসি- হার্টথ্রব ওয়াসিম, নায়করাজ রাজ্জাক- অমর সিরাজউদ্দৌলা আনোয়ার হোসেন, এমনকি তারুণ্যে যে এটিএম শামসুজ্জামানকে খুন করতে ইচ্ছে হতো- আর আমার স্বপ্নের অলিভিয়া, কবরী,... ...বাকিটুকু পড়ুন

নায়ক রাজ্জাক এর জন্য এত হা-হুতাশ করার কি আছে?

লিখেছেন রাজীব নুর, ২১ শে আগস্ট, ২০১৭ রাত ১১:৩০



নায়ক রাজ্জাক মারা গেছেন। এতে এতো হা-হুতাশ করার কি আছে? তিনি ৭৫ বছর বয়স পর্যন্ত বেঁচে ছিলেন- এটা অনেক বড় ব্যাপার। ইতিহাসে দেখা যায়- অনেক গুনী মানুষ এত দিন বাঁচেন... ...বাকিটুকু পড়ুন

এ ট্রিবিউট টু লিজেন্ড নায়করাজ রাজ্জাক!!!

লিখেছেন রেজা ঘটক, ২২ শে আগস্ট, ২০১৭ ভোর ৪:৩০



১৯৮৮ সাল। বিএমএ লং কোর্সে পরীক্ষা দিতে খুলনা গেছি। খুলনার জাহানাবাদ ক্যান্টনমেন্টে আমার পরীক্ষা ছিল। আগেই পরিকল্পনা ছিল পরীক্ষা শেষেই বন্ধু আজিজের সাথে ঘুরবো। আজিজের গার্লফ্রেন্ড পড়ে তখন খুলনার সুলতানা... ...বাকিটুকু পড়ুন

×