নেটের কল্যানে পোষ্ট অফিসের রাস্তা ভুলে গিয়েছি সে অনেকদিন। কিন্তু হঠাত সেদিন প্রয়োজনে যেতে হল। গিয়ে দেখি, বাপরে মাছের বাজারের মত অবস্থা! লম্বা লাইন লেগে আছে ছোট্ট রুমটার গুমোট পরিবেশের মধ্যেই। কিন্তু পোষ্ট অফিসের কর্মচারী নাই!
কোথায়?
টয়লেটে গিয়েছে!
আচ্ছা!
চার মিনিট, সাত মিনিট, দশ মিনিট…… কর্মচারীর দেখা নেই। বিড় বিড় করে অসন্তুষ্ট স্বরে বিরক্তি প্রকাশ করছে কেউ কেউ। কে যেন ভীড়ের ভিতর থেকে বড় গলায় ডাক দিয়ে উঠল- “আপনাদের কর্মচারী কি আজকে আসবে টয়লেট থেকে?”
কাঁচের ওপাশে অন্য যারা কাজ করছিল- একজন পান সাজাচ্ছে সুন্দর করে মুখে দিবে বলে, কেউ আরেকজনের টেবিলের পাশে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে কী যেন পারিবারিক কথা বলে হাসছেন, একজন আবার একধ্যানে কাজ করছেন টেবিলে নাক মুখ গুঁজে, অন্য একজন ঝগড়া লেগেছেন পিয়নের সাথে- কেউ ডাক শুনে ফিরেও তাকাল না!
বিড় বিড় শব্দ বাড়ল।
“ কী ব্যাপার ভাই? কতক্ষন থেকে দাঁড়িয়ে আছি?”
“ লোকটা গেলো কোথায়?!”
অবশেষে তিনি এলেন। মোটা সোটা ছাপোষা কর্মচারী।
ধীরে সুস্থে হেলে দুলে তিনি একজন একজন করে বিদায় করছেন। ঘড়ি দেখলাম। সতের মিনিট গিয়েছে শুধু দাঁড়িয়ে থেকেই। এ লাইন শেষ করে হাতের কাগজ পোষ্ট করতে করতে শিউর আধাঘন্টা যাবে!
বেশী হলে একমিনিটের কাজ আধাঘন্টায়!!
একসময় খেয়াল করলাম আমার সামনে আর একজন। যাক বাবা, এতক্ষনে বাঁচা গেল। কিন্তু একি? কোনো প্রকার আগাম নোটিশ ছাড়াই আমার সামনের ভদ্রলোক এওবং কর্মচারীটি হঠাত করে নিজেদেরকে দেশের সেরা তার্কিক প্রমান করতে উঠে পড়ে লেগে গেলেন!
‘আমি বলেছি সিল মেরে দাও!’ ভদ্রলোকের উত্তপ্ত কন্ঠ।
‘আপনাকে কয়বার বলব চার টাকার জন্যে সিল দেয়ার নিয়ম নেই, আপনি ওখান থেকে দু’টাকার টিকেট লাগান’। বলল কর্মচারীটি।
‘তুমি আমাকে পোষ্ট করা শেখাবা নাকি? বাংলাদেশে নিয়ম নাই এমন কোনো নিয়ম নাই। দাও,সিল দাও!’
আমি হা করে শুনতে লাগলাম! টিকেট লাগাতে বলেছে, লাগিয়ে ফেললেই হয়, এমন করছে কেন ভদ্রলোক। তারউপর কর্মচারিটি ভদ্রলোকের চেয়ে বয়স্ক, তাকে তুমি তুমি করে বলার মানেটা কী?
‘এই যে ভাই, টিকেটটাই লাগিয়ে ফেলুন না!’ পিছন থেকে বললেন একজন।
‘আপনাকে নাক গলাতে হবেনা!’ আগুন ঝরলো যেন ওনার গলা থেকে।‘এই সব সরকারী কেরানী গুলা যতসব ননসেন্স। সবাইকে লাইনে দাঁড় করায়ে রেখে টয়লেটের নাম করে বাইরে থেকে ঘুরে আসছে, এখন আবার সিল মেরে দিয়ে দিবে তাড়াতাড়ি, না টিকেট লাগাতে হবে!’
কর্মচারীটি অপমানিত বোধ করলেন বেশ। কিন্তু ভদ্রলোকের বেশ ভূষার কারনেই হয়তো তেমন জোরালো উত্তর দিতে পারছেন না, তারপরো রেগে গিয়ে বললেন ‘আপনি অনর্থক ঝগড়া করছেন। চারটাকার জন্যে আপনাকে টিকেট লাগাতে হবে সেটাই নিয়ম। আর না লাগালে সরেন! আপনার জন্যে অন্যদের সময় নষ্ট হচ্ছে!’
‘কী?! আমাকে এত বড় অপমান? তুই চিনিস আমাকে?!”
‘সাবধান তুই তোকারি করবেন না! আমি আপনার খাইও না পড়িও না………’
‘থাপ্পড় মেরে দাঁত ফেলে দেব হারামজাদা! তুই সিল লাগাবিনা তোর বাপ লাগাবে! একটা ফোনে তোর চাকরি বের করে দিলে তারপরে বুঝবি কার সাথে কথা বলস বড় গলায়……’
এই সেই!
চিতকার করে গালিগালাজ! অন্যরাও যোগ দিয়েছে ইতিমধ্যে! আমি হাঁ করে তখনো ভদ্রলোককে দেখছি। বয়স চল্লিশের মত হবে। ধোপদূরস্ত কাপড় চোপড় গায়ে। ব্যাক ব্রাশ করা চুল।এদের জন্যে কি ‘ভদ্রলোক’ ছাড়া আলাদা কোনো পরিভাষা আছে? উমম, না থাকলে বাংলা একাডেমীতে রিকোয়েস্ট করতে হবে।
প্রায় মারামারি লেগে যাওয়ার উপক্রম হতেই চারপাশের সবাই মিলে অনেক হাউ কাউয়ের পর দু’জনকেই বাগে আনা গেল। কিন্তু নতজানু হতে হল কর্মচারীটিকেই। অপমানিত লাল মুখে শেষ পর্যন্ত সে নিজেই ভদ্রলোকের খামের উপর টিকেট লাগিয়ে দিল। ভদ্রলোক বিজয়ীর মত বেরিয়ে গেলেন।
আমার হাতের খামটাতে সিল মারার সময় কর্মচারীটি স্বাভাবিকের চে’ একটু বেশী জোরে বাড়ি মারল। আমি বেরিয়ে এলাম।
বাইরে শীতের কড়া রোদ।
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ সকাল ৭:০২

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


