এবার আরেকজন!
হ্যা, বখাটেদের অত্যাচারে আরেকজন কিশোরী বেছে নিল আত্নহননের পথ। নাড়াইলের লোহাগাড়ার এইচএসসি পরীক্ষার্থী নাজমুন নাহার বুঝে গিয়েছিল বখাটেদের অত্যাচারের মুখে কেউ তার পাশে এসে দাঁড়াবেনা। উলটো তার পরিবারকেই হয়তো বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হবে। তাই সে শেষ পর্যন্ত বেছে নিল কীটনাশকের বোতল। সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে নিজেই চিরবিদায় নিয়ে চলে গেল ২৫ জানুয়ারী।
কিন্তু তাতে কি কোনো সমাধান হবে?
প্রথম এ ধরনের আলোচিত মৃত্যুর শুরু সিমিকে দিয়ে। এর আগেও প্রচুর এ ধরনের ঘটনা ঘটেছে। কিন্তু ব্যাপকভাবে মানুষ জানলো সিমির আত্নহত্যার পর। ২০০১ সালের ২৩ ডিসেম্বর সমাজের উপর তীব্র অভিমানে নিজের ঘরেই নাজমুন নাহারের মত কীটনাশক পান করে চলে যায় সিমি। অথচ সে মাকে বলেছিল- একদিন শিল্পী জয়নুল আবেদীনকেও ছাড়িয়ে যাবে তার আর্ট। আকাশ ভরা স্বপ্ন নিয়ে আত্মপ্রত্যয়ী সিমি ‘মেয়ে মানুষ’ না হয়ে ‘মানুষ’ হয়ে দাঁড়াতে চেয়েছিল। মাকে আরো বলেছিল- ‘মা আমার কমপক্ষে ১২০ বছর বাঁচতে হবে’। মা বলেছিল- ‘এতবছর বেঁচে কী করবিরে বোকা?’ সিমি উত্তর দিয়েছিল- ‘আহা মা, এতো কাজ! এত কিছু করার আছে, উহু, একশ’ বিশ বছরেও হবেনা!’
মা হেসেছিল মেয়ের বোকার মত কথা শুনে।
কিন্তু মা’র হাসিকে মুছে দিয়ে মাত্র ২২ বছরেই জীবনের সব কাজ ফেলে ছুটি নিয়ে চলে গেছে সিমি।
সিমির পরও কিন্তু থেমে থাকেনি।
চলতেই থাকে বাংলাদেশের এখানে ওখানে বখাটেদের অত্যাচারে মেয়েদের আত্নহত্যার ঘটনা। কিছু নিউজ হয়, কিছু হয়না। মানুষ একধরনের অভ্যস্থ হয়ে যায় যেন! হঠাৎ আবার সবাইকে নাড়া দেয় রুমি। স্কুল ছাত্রী রুমির ফুটফুটে চেহারা যেন পত্রিকার পাতা ভরিয়ে দিচ্ছিল স্নিগ্ধ হাসিতে। কিন্তু তার আগেরদিনই সে হাসি নিভিয়ে দিয়েছে পাড়ার বখাটেরা। প্রতিদিন স্কুলে আসা যাওয়ার পথে রুমিকে টীজ করত ওরা। ভয়ে কেউ কিছু বলেনা ওদেরকে। ওরা স্থানীয় পাড়ার ক্ষমতাবান ব্যাক্তিবর্গের ছেলে। রুমি তাই নিজেই সিঁটিয়ে থাকে ভয়ে। ওদের সাহস বাড়তে বাড়তে রাস্তা থেকে চলে আসে রুমিদের বাসায়। দরজা ভেংগে উঠিয়ে নিয়ে যেতে চায় রুমিকে। রুমি দৌঁড়ে নিজের রুমে গিয়ে দরজায় লক লাগিয়ে চরম সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে। দরজা খুলে তাকে বের করে আনতে আনতেই সব শেষ!
ওরা কেন চলে যায়?
সিমি,রুমি, নাজমুন্নাহারের এ মৃত্যুর মিছিলে নামের সংখ্যা কম নয়। এরা চলে গিয়েছে। কিন্তু পেছনে রেখে গিয়েছে বিশাল এক প্রশ্নবোধন চিহ্ন। কতটা অসহায় বোধ করলে একটা মেয়ে এভাবে নিজের উপর, পরিবারের উপর, সমাজের উপর এবং জীবনের উপর অভিমানে নিজেই চলে যায় চিরতরে? কতটা দূঃখ পেলে তারা নির্দিধায় গলায় ঢেলে দেয় কীটনাশক?
আত্নহত্যার ঠিক আগের মূহুর্তে লিখে গিয়েছে সিমি, ‘… যাদের নির্যাতন মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছিল। একজন মেয়েকে রাস্তায় ফেলে রেপ করার চাইতেও নির্মম। এ অপমান সহ্য করে আমার পক্ষে তাই বেঁচে থাকা সম্ভব হলনা……’। আর আত্নহত্যার ঠিক আগের মূহুর্তে রুমি দেখেছে পৃথিবীর একটা মানূষও তাকে বাঁচাতে এগিয়ে আসেনি! সে তার নিজের ঘরে নিজের জন্মদাত্রীর আঁচলের নীচেও নিরাপদ নয়!
এরা কারা যারা এ মৃত্যু মিছিলের জন্যে দায়ী?
এসব বখাটে ছেলেরা কিন্তু বাইরের কেউনা। এরা আমাদের পরিবারেরই সদস্য। হতে পারে আপনার সামনে আপাতভদ্র আপনার ছেলে/ভাইটিই রাস্তায় একটা মেয়ে দেখলে শিষ দিয়ে অশ্লীল ইংগিত করছে, খারাপ কমেন্ট করছে, বা তারচে’ও বেশী কিছু। আপনি কতটুকু জানেন আপনার ছেলেকে? কতটুকু চিনেন আপনার ভাইকে?
আমাদের তাই গভীরভাবে ভাবার সময় এসেছে- কেন ঘটছে এসব?
নৈতিকতা-বিহীন শিক্ষাব্যবস্থা, পুলিশ প্রশাসনের গাফিলতি, এবং পারিবারিক মূল্যবোধের অভাবই মূলতঃ একটা ছেলেকে বখাটে বানাতে সাহায্য করে। যে ছেলে সার্টিফিকেটের ভারে নুয়ে পড়ে, কিন্তু মোরাল ভ্যালু তার মধ্যে নেই, সে শিক্ষিত হতে পারে, কিন্তু সে মানুষ নয়। আর এসব অমানুষেরাই পারে একটা মেয়েকে দিন দিন অমানবিক মানসিক অত্যাচার করে ভেংগে ফেলতে। আমাদের পুলিশ প্রশাসনের কাছে নিরাপত্তা চাইতে গেলে উলটো মেয়ের পরিবারই হয়রানির শিকার হয়। যেমনটা হয়েছে সিমির পরিবার। পুলিশ তখন উলটা বখাটেদের অভিভাবকদের কাছ থেকে টাকা খেয়ে মেয়ের পরিবারকে শাঁসিয়ে যায়। এবং আমাদের পারিবারগুলো আস্তে আস্তে যেন পারিবারিক মূল্যবোধ থেকে হাজার মাইল দূরে চলে যাচ্ছে। এই ক’বছর আগেও মা ছিলেন সন্তানের মাথার উপর বটগাছের মত।তাদের যেন নিজস্ব কোনো জীবনই ছিলনা সন্তান এবং পরিবার ছাড়া। সময় বদলেছে। বদলেছেন আমাদের মায়েরাও। পরিবর্তন খারাপ কিছু নয়, কিন্তু ততক্ষন পর্যন্ত যতক্ষন পর্যন্ত সম্পর্ক ক্ষতিগ্রস্থ না হয়। তাই আপনার যত কাজই থাকুক, আপনার সন্তানকে সময় দিন। আপনার সন্তানের প্রথম বন্ধু হোন আপনি। দেখুন, আপনার সন্তানের বন্ধু কারা। তাকে সৎ বন্ধু বাছাই করতে সাহায্য করুন।
সিমি,রুমি আর নাজমুন্নাহার আমাদেরই বোন বা মেয়ে। আজকে ওরা চলে গিয়েছে। কাল আপনার নিজের মেয়ে বা বোন যাবে। তাই এখনি ঠিক করে নিন সিমিদের মৃত্যুর মিছিলকে এখানেই থামিয়ে দিতে আপনার করনীয় কী।
(যাযাদি- ৯ফেব্রুয়ারী প্রকাশিত)
সর্বশেষ এডিট : ০১ লা জুলাই, ২০০৮ ভোর ৬:৫১

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।


