তুই
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
Tweet
তোর মেইলের দিকে আমি চোখ কুঁচকে তাকিয়ে আছি। লিখেছিস- ‘শুধু তোকে মেইল করার জন্যেই ক্যাফেতে আসলাম’।
ব্যাস, একটা লাইন!
হাসবো নাকি কাঁদবো- ভেবে সিদ্ধান্ত নেয়ার আগেই দৃশ্যটা চোখে ভেসে উঠল। তুই ক্যাফেতে ঢুকছিস, ক্লান্ত আর কেমন যেন অবসন্ন। ঐ একদম ফ্রন্টের আমাদের নির্দিষ্ট কম্পিউটারটা খালিই আছে দেখে বসে গেলি। ক্যাফের ছোকরাটা খাতা নিয়ে এল, তুই সাইন করে দিলি। মেইল খুলে বেশ কিছুক্ষন ভাবলি কী লিখবি। তারপর লিখলি- ‘শুধু তোকে মেইল করার জন্যেই ক্যাফেতে আসলাম’। লিখে কিছুক্ষন ভাবছিস আর কী লিখবি। তারপর হঠাৎ তোর মনে হল- নতুন করে আসলে কিছুই বলার নেই। আমাদের জীবনে নতুন কিছু খুব কমই ঘটে। তুই তাই ভ্রু কুঁচকে উঠে পড়লি তোর ঐ চটের ব্যাগ কাঁধে। ছেলেদের স্টাইলের জুতা ঘষতে ঘষতে তুই যখন বের হয়ে গেলি ক্যাফের ছোকরাটাকে পাঁচ টাকা দিয়ে, তখন পড়ন্ত রোদ। আমি কল্পনায় স্পষ্ট দেখি পড়ন্ত রোদে কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্য ছাড়াই ফুটপাত ধরে হাঁটতে হাঁটতে তুই একটু মুচকি হাসলি।
আচ্ছা তুই এখনো কেনো সেই ছেলেদের স্টাইলের জুতা পড়িস?
এ এক বিরাট রহস্য যা আমি আজো বুঝিনি। বুঝিনি বলে তোকে কম জ্বালাইওনি।
-তুই এই ছেলেদের স্টাইলের জুতা পড়স ক্যান?
-ইচ্ছা।
-আরে ইচ্ছা মিচ্ছা কিচ্ছু না, তুই মনে মনে ঠিকই ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগস্।
-কীসের জন্যে?
-ছেলে হইতে পারস্ নাই তাই।
তুই রাগতে গিয়েও রাগিস্ না। তারপর একটু চুপ থেকে ঐ চোরা হাসি।
-তুই আমাকে রাগাইতে চাইলেই পারবি, এমন মনে করার কোনো কারন আছে নাকি?
আসলেই কোনো কারন নেই। তুই যে ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভুগিস্ না, তা আমার চেয়ে বেশী কেউ জানেনা। তাহলে তুই ঐ জুতা ছাড়িস্ না ক্যান? … কে জানে।
শেষ যখন দেখা হল তখন তুই চাকরিতে ঢুকেছিস। আমি তো শুনে হাঁ। তুই? চাকরি?! কীভাবে সম্ভব? তোর সেই ম্যারম্যারা হাসি- আরে বড় হইছি, এখন কি আর বাপের পকেট থেকে পকেট-মানি নেয়া যায়?
চাকরিতে ঢুকলি ঠিকই, কিন্তু পড়ালেখাটা ধরে রাখলিনা। আমি বই পত্র খিঁচে ধরে পাশ করে বের হয়ে গেলাম, আর তুই, আমার রেজাল্টের দিন বললি- চল, চল, আজকে পেট ভরে খাওয়া চলবে। তুই শালা বিদ্যাসাগর হওয়ার পথে দ্রুত এগুচ্ছিস, এ খুশী রাখি কোথায়!
আমার খুব গায়ে লাগতো এসব কথা।
তুই কি আমাকে গায়েই লাগাতে চাইতিস্?
গম্ভীর হয়ে বলতাম- দেখ্, পৃথিবীর তাবৎ বই পত্র পড়ে ফেললেও একাডেমিক পড়ালেখা না করলে ফুটা-কড়িও দাম নাই।
তুই-ও তখন গম্ভীর- হ। তোর ঐ ডিগ্রী দিয়ে কোন আকামের কামটা হবে শুনি। মুখ খারাপ করাইস না। মুখে সব বড় বড় কথা, আরে ডিগ্রী নিয়া সবাই খালি নিজের পেটের ধান্ধা করে। এইসব সোশাল ওয়ার্ক মোয়ার্ক-ও ঐ নিজের ক্যারিয়ারেরই সাইড কারিকুলাম। আমারে শিখাইস না বলে দিলাম!
আমার ঝগড়া করতে মন চায়না। মন চায় না, নাকি কথা হাতড়ে পাইনা সেও এক ভাবার বিষয় হতে পারে। যা হোক, এত ভেবে আর কী হবে- এই ভেবে ভাবা হয়না আমার। আমি বরং তোর কথাই ভাবি। এই দেখ, খুঁজে পেতে আমাদের সেই ছোট্টকালের মেয়েবেলার জমানো চিঠি আর কাগজ পত্রের ভিতর থেকে তোর এই কার্ড বের করে এনেছি। তুই হাসছিস? তুই কি হাসবি, আমার নিজেরই এই কার্ড এতদিন পরে আবার পড়ে হাসতে হাসতে চোখে পানি চলে এসেছে! তুই কী লিখেছিস দেখ- “ ২৫ জোড়া বাচ্চাকাচ্চা যেনো তোর সংসার ভরিয়ে রাখে!” হাহাহাহা! মানুষের কল্পনারও তো একটা সীমা আছে। আমার নানীর মরে যাওয়াগুলো বাদ দিলে বাকী থাকে দশ সন্তান। আর দাদীর মরে যাওয়াগুলো বাদ দিলে বাকী থাকে পাঁচ সন্তান। মরেছে প্রচুর। তুইতো দেখি তাদেরকেও ডিংগিয়ে একলাফে পঞ্চাশে!...... আমরা মনে হয় আসলে এমনই ছিলাম তখন। কল্পনার কোনো লাগাম ছিলোনা। অথচ এখন কল্পনা করতেও কী ভীষন ভয় হয়! অবশ্য আমি সেই ছোটবেলা থেকেই ভীতু। তুই ছিলি আমার চে’ ঢের সাহসী। সেই সাহসেই কী এখনো সমাজ আর চারপাশের মানুষগুলোকে বুড়ো আংগুল দেখিয়ে যাচ্ছিস?
সেই ভাল রে, অন্ততঃ কেউ তো পারলো। আমি যে পারিনি। আমি তাই মনে মনে কেউ না জানে মত তোকে নিয়ে গর্ব করি। তুই আমার কত নিষিদ্ধ কাজের গুরু ছিলি। এখন সামাজিক পদমর্যাদায় আমি তোকে ডিংগিয়ে গেলেও, তুই যখন অম্লান বদনে সেই আমাকে না দেখে নির্বিকারে পাশ কাটিয়ে চলে যাস, আমার ভালো লাগে। আমি আবার মনে মনে তোকে স্যালুট করি। তোর চোখের অনেক ভিতরের গভীর শুন্যতার দিকে তাকিয়ে বুঝি এরজন্যে তোকে কম মূল্য দিতে হয়নি, কিন্তু তাতে কী। তুই তো পেরেছিস!
৩১টি মন্তব্য ১০টি উত্তর
আলোচিত ব্লগ
Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ
![]()
প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?
আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন
যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন
বাকি রইলো; কাঁচা কলা

স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন
স্মৃতির নৌকা
কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।
কোন কোন সন্ধ্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

অনুগ্রহ করে অপেক্ষা করুন। ছবি আটো ইন্সার্ট হবে।