somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

হাঁটতে হাঁটতে সীমানা পেরিয়ে...

১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৩৮
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :


আমরা দু’জনেই হাঁটছিলাম। তখন দুপুর পেরিয়ে বিকেল নামবে নামবে ভাব। রাস্তাটার নাম জানিনা। ও এসেছে শুধু একদিনের জন্যে। সকালে হাতে রান্না বাংগালী খাবার খাইয়ে দুপুরে এসেছিলাম সিডনীর বিখ্যাত ইন্ডিয়ান রেষ্টুরেন্ট মায়া’তে। খেয়ে ও বললো ‘চলো হেঁটে দেখি। এর আগে যতবার সিডনী এসেছি শুধু হারবার আর অপেরা দেখেছি। এবার রাস্তাঘাট দেখি’। আমি নিজে এখনো সিডনীর রাস্তাঘাট চিনিনা। তারপরও ওর কথায় মায়া থেকে বের হয়ে একদিকে হাঁটা শুরু করলাম।
-তুমি জানো আমি কেনো পাকিস্তান ফিরে গিয়ে বেশীদিন থাকতে পারিনা?
-কেনো?’ বেশ আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞেস করলাম।
-কারন ওয়েষ্টে যে কোনো দেশে আমি রাস্তাঘাটে হেঁটে যে মজা পাই, যেভাবে ইচ্ছামত হাঁটতে পারি, আমার দেশে কখনোই তা পারিনা। একবার করাচীতে……’
ও বলেই যাচ্ছে। কিন্তু ওর কথার ঘোরেই যেনো আমি তখন চলে গেছি চট্রগ্রামে।
-আম্মা একটু হাঁটতে যাই।
-এত ভোরে?!
-হ্যাঁ, মানুষতো ভোরেই হাঁটে।
-দেখো, ছেলেদেরই হাঁটার নিরাপত্তা নাই, তুমি কেমনে হাঁটবা? এতভোরে রাস্তাঘাটে হাইজ্যাকার নেশাখোররা থাকে। যা পাবে ছিনায়ে নিবে। আর কিছু না পেলে ছুরি মেরে দিবে। তারউপর একলা মেয়ে দেখলেতো কথাই নাই।
……………
অথবা কোনো বিকেলে-
-আম্মা, এমনে একটু হাঁটতে বের হই।
-এমনে হাঁটতে যাবা মানে? রাস্তায় কেনো, ছাদে গিয়ে হাঁটো।
-আরে আশ্চর্য্য, ঐ একটুখানি ছাদে হাঁটা যায় নাকি? আর ছাদে গেলে ঐ পাশের কন্সট্রাকশানের কাজ চলতেছে যে বিল্ডিংটাতে ওটার শ্রমিকগুলা তাকায়ে থাকে, শিষ দেয়।
-তাহলে কোথাও যাওয়ার দরকার নাই। রাস্তাঘাটে এমনে এমনে ঘুরবা আর মানুষজন তোমার বাপের নামে বলবে ওনার এত বড় ধিংগী মেয়েটা রাস্তাঘাটে ঘুড়ে বেড়ায়……
…………………

-এই কী ভাবছো?
ওর হালকা ধাক্কায় চট্রগ্রামের সেই দমবন্ধ ভোর আর বিকেল থেকে একলাফে ফিরে আসি সিডনীর পড়ন্ত দুপুরে।
-উঁহু, কিছুনা। আমার হাঁটতে খুব ভালো লাগছে।’ গায়ের ওভারকোটটার হাতার ভিতর হাত গুটিয়ে আরাম করে হাঁটতে হাঁটতে পিছনের দিনগুলো ম্লান হয়ে আসে।
ও হাসে।
-বলেছি না? এখানে তুমি যে ড্রেসই পড়ো, হাঁটো বা দৌঁড়াও, যা ইচ্ছা, যেভাবে ইচ্ছা করো, কেউ তোমার দিকে ফিরেও তাকাবেনা। বেশ স্বস্তিদায়ক। ইউ ক্যান জাস্ট ফীল ইউরসেলফ, দ্যা ফিলিংস অব বিয়িং সেলফ অনলী, বিয়োন্ড বিয়িং আ গার্ল অর আ বয়।
আমি মাথা নাড়ি।
ও কথা বলেই যায়।
হাঁটতে হাঁটতে কোথায় চলে এসেছি বুঝতে পারছিলাম না। রাস্তাটা বেশ পুরানো। পুরানো, কিন্তু অভিজাত। রাস্তার একপাশে সব ডুপ্লেক্স আর অন্যপাশে বিশাল বিশাল গাছের সারি। উপরে মাথা বাঁকিয়ে তাকালে মনে হয় গাছের ডালগুলো যেনো আকাশ ছুঁয়েছে। ক্যালেন্ডারের পাতায় বসন্ত চলে এলেও শীত এখনো গুঁটিসুঁটি মেরে আছে চারিদিকে। একটা দু’টা গাছের দালে অল্প কিছু ছোট ছোট নতুন পাতা উঁকিঝুঁকি মারছে।
আমার হঠাৎ দাদুর বাড়ির কথা মনে পড়ে।
নতুন ধান গজানো ক্ষেতের মাঝখানের মাটির আইল ধরে দু’হাত ডানার মত ছড়িয়ে দিয়ে দৌঁড় মারতে ইচ্ছা করে, যেনো দৌঁড় দিলেই আমার হাত দু’টো বদলে গিয়ে ডানা হয়ে যাবে, আমি যেনো তখন পাখি হয়ে সবুজ ক্ষেতে ক্ষেতে উড়ে বেড়াবো……
বড্ড বেশী অন্যমনস্ক ছিলাম। হঠাৎ খেয়াল করতে শুনলাম ও বলছে, ‘…… ভাগ হয়ে যাওয়াটাই আসলে স্বাভাবিক ছিলো। কারন দুই দেশের মানুষই এত ডিফরেন্ট! কালচার, ল্যাঙ্গুয়েজ, নেচার… এভরি সিংগল থিঙ্ক।’
পাকিস্তান-বাংলাদেশ ভাগ হয়ে যাওয়ার কথা বলছে বুঝতে পেরে মনযোগী হয়ে মাথা নাড়লাম, ‘হুম’।
-কিন্তু ভাগ হয়ে জাওয়ার প্রক্রিয়াটা ঠিক ছিলনা। ইট ওয়াজ আ ব্লাডি টাইম। তুমি জানো, আমার আব্বা তখন এয়ারফোর্সে। হঠাৎ করে সব বাংলাদেশী অফিসারদেরকে একটা পরিত্যাক্ত ক্যাম্পে গৃহবন্দী করে ফেলা হল। ওখানে অনুমতি ছাড়া কেউ যেতে পারতোনা। কিন্তু আব্বা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করে ওনার বাংগালী কলিগদের সাথে দেখা করতে ক্যাম্পে চলে যেতেন। ইট ওয়াজ আ গ্রেট রিস্ক ফর হিম, ইভেন ফর আস। বাট হি ওয়াজ ফেয়ারলেস টু স্ট্যান্ড এগেইনস্ট দ্যা গভার্নমেন্টস’ ব্লাডি ডিসিশান।’
ও উর্দূ ছেড়ে ইংলিশ বলা শুরু করে।
আমি মাথা নাড়ি। ম্লান হাসি। বলি, ‘আমি নিজেও ব্যাক্তিগতভাবে অনেক পাকিস্তানীকে জানি যারা তখন পাকিস্তান সরকারের অন্যায্য সিদ্ধান্তকে মেনে নেয়নি। কিন্তু আসতে তাতে কিছু আসে যায়না। কারন পাকিস্তান আর্মি আমাদেরকে নির্বিচারে মেরেছে। আমাদের ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে। আমাদের মেয়েদেরকে গনহারে রেপ করেছে। তাই যে কোনো বাংলাদেশী মন থেকে পাকিস্তানীদেরকে ঘৃনা করে।’
ততক্ষনে আমরা সিগন্যালে এসে দাঁড়িয়েছি।
- কিন্তু তুমি নিজেও জানো এই যুদ্ধের পিছনে ইন্ডিয়ার অনেক বড় ষড়যন্ত্র ছিলো’। কিছুটা অসহায়ের মত যেনো শেষ রক্ষা করতে চাইল সে।
- তাতেও আসলে কিছু আসে যায়না। সাধারন মানুষ সাফার করেছে। নিজেদের আত্নীয় স্বজনকে চোখের সামনে মরতে দেখেছে, অথচ ভয়ে কাঁদতে পর্যন্ত পারেনি। তোমার কি মনে হয় এসব আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র- অষড়যন্ত্রে তাদের কিছু আসে যায়? মোটেও না। তাছাড়া ইন্ডিয়া ষড়যন্ত্র করেছে, কিন্তু সেই ষড়যন্ত্র বাস্তবায়িত করেছো তোমরা। সাধারন মানুষ তাই তোমাদেরকেই চিনে।’
ও চুপ করে থাকলো।
আমরা আবার সিগন্যাল পেরিয়ে অন্য একটা পুরাতন রাস্তায় চলে এসেছি। অনেকেই আমাদের মত হাঁটতে বের হয়ে গিয়েছে অনেকদিন পর ঠান্ডার ভিতর হালকা রোদের ওম পেয়ে। সেই সাথে মৃদু বাতাস। বেশ ভালো লাগছে।
- আসলে পাকিস্তানী সরকারের অনেক আগেই বাংলাদেশের কাছে ক্ষমা চাওয়া উচিত ছিলো’। হঠাৎ বলে উঠলো ও।
আমি থমকে দাঁড়ালাম।
ও ফিক করে হেসে ফেললো আমার রিএকশান দেখে। একটু পর বললো- ‘সব পাকিস্তানীরাই বর্বর, রক্তপিপাসু না যেমনটা তোমরা ভাবো। আমার বাবা নিজে ছিলেন যুদ্ধবিরোধী, বিশেষ করে বাংলাদেশের বিরুদ্ধেতো বটেই। আমি নিজেও যে কোনো ধরনের যুদ্ধবিরোধী। পৃথিবীতে একসময় যুদ্ধের প্রয়োজন ছিলো অস্তিত্বরক্ষার খাতিরে। কিন্তু সময়ের পর্যায়ক্রমে সে প্রয়োজন এখন ফুরিয়েছে। যুদ্ধ এখন আদিম ধারনা। আমি একজন পাকিস্তানী হিসেবে ব্যাক্তিগতভাবে তোমার কাছে ক্ষমা চাই ১৯৭১ সালের জন্যে। জানি ক্ষমা চাইলেই সব ঠিক হয়ে যাবেনা। তারপরও এখন ক্ষমা চাওয়া ছাড়া আর কিইবা করতে পারি?’
আমি কী বলবো ভেবে পেলামনা।
একটা সিম্পল ইভিনিং ওয়াক যেনো আমাদের দু’জনকে আমাদের দেশ, সীমানা আর সামাজিক সব শেকল ছিঁড়ে অনেক অনেক দূড়ে নিয়ে এসেছে। খেয়াল করলাম বাতাস আস্তে আস্তে ঠান্ডা হচ্ছে। গায়ের ওভারকোটটা আরো শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বললাম, ‘চলো ফিরে যাই’।

সর্বশেষ এডিট : ১৯ শে সেপ্টেম্বর, ২০০৮ বিকাল ৪:৪৫
২৫টি মন্তব্য ১৬টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×