
আমি প্রথম স্কুল চেইঞ্জ করি ক্লাস ফাইভে। স্পষ্ট মনে আছে আমার ভীষন মন খারাপ ছিলো। পুরাতন বন্ধুদেরকে ছেড়ে সম্পূর্ণ অচেনা একটা স্কুলে যাওয়ার ভয়ে আমি গুটিয়ে ছিলাম। নতুন ক্লাসে গিয়ে এক কোণে বসে ছিলাম। কিন্তু ভাগ্য ভালো সেবার ঐ ক্লাসে বেশীরভাগ স্টুডেন্টই নতুন ছিলো। তাই একজন আরেকজনের সাথে মিশে যেতে সময় লাগেনি।
কিন্তু যতবারই আমি নতুন পরিবেশে নতুন ক্লাসে যাই, কেমন যেনো নার্ভাস থাকি।বড় হয়েও তার একবিন্দু ব্যাতিক্রম ঘটেনি। এবং খুব সম্ভব নার্ভাসনেসের কারনেই প্রথম দিন ইউনিতে ঢুকেই হারিয়ে গেলাম। ওরা একটা পেইজ দিয়েছিলো পুরা ইউনি’র নকশা করা। কিন্তু মরার জ্বালা, আমি ম্যাপে কখনোই ডান-বাম বুঝিনা! আর স্টুডেন্ট একেকজনের যে ভাব-ভংগি, জিজ্ঞেস করারও সাহস হচ্ছেনা। নিজে নিজে যখন ঘুরপাক খাচ্ছি, তখনই দূর থেকে দেখি চাংকু মেয়েটা, যার সাথে আমার অফিসে দেখা হয়েছিলো, একই কোর্সে ভর্তি হতে এসেছিলো ও। আমাকে দেখে ও দেখি নিজেই হাত নাড়ে!
ওর নাম লিসা; ইংলিশ নাম। চাংকিশ নাম- ‘ঝিং শু হা’ নাকি ‘শ্যাং ঝি হাং’ এই টাইপের কী যেনো একটা, আমার মনে থাকেনা। যাই হোক, লিসা’র সাহায্যেই মূলত বিল্ডিং ডি খুঁজে বের করা গেলো।
চাইনিজদের অনেক দূর্নাম থাকলেও লিসা আসলেই বেশ ফ্রেন্ডলী।নিজ থেকেই সাহায্য করার জন্যে মুখিয়ে থাকা একটা মেয়ে। ছবিতে দেখুন ও আমার শাল নিয়ে ছবি তোলার জন্যে পোজ দিয়েছে!

দ্বিতীয় ছবিটাতে দেখা যাচ্ছে বিলি, এডা- চাইনিজ দু’জন লিসার দু’পাশে। ওর পিছনে গ্যাব্রিয়েলা কিউবা থেকে এসেছে। আর সাদা ড্রেস পড়া ক্যারোলা স্পেনিশ। একদম পিছনে বসে আছে মাজিদ- ফ্রম বাহরাইন। ছবিতে অনেকেই নেই। যেমন কলম্বিয়ার মেয়ে ‘ওমেইরা’ ভীষন রকম সহজ সরল একটা মেয়ে। ওকে জিজ্ঞেস করেছিলাম কলম্বিয়ার মেয়েদের বাস্তবতা নিয়ে বানানো মুভি ‘মারিয়া- ফুল অব গ্রেস’ কতটা সত্য। ওর সোজা উত্তর- ‘ধ্যুত, অনেক কম দেখাইছে ওরা। মেয়েদের অবস্থা আরো খারাপ! আরে খারাপ হবেনা কেনো, হাতে টাকা নাই, পেটে খাবার নাই, খারাপ না হয়ে উপায় আছে?’
আর্জেন্টিনার মেয়ে ‘ভ্যালেরিয়া’ আমাদের ক্লাসের সবচে’ সাস্থ্যবান। একদিন ক্যান্টিনে দু’জনে একসাথে খাবার কেনার সময় জোর করে ওর বানানা ব্রেড’র দাম দিয়েছি দেখে ও এত অবাক হয়েছিলো যে বার বার জিজ্ঞেস করছিলো- ‘তোমার দেশের সবাই কি এমন বন্ধুবৎসল?’
পরে বাসায় এসে শুনেছি এখানে সবাই, বিশেষ করে মাইগ্রেন্টরা এক সেন্ট খরচ করতেও অনেক চিন্তা করে। এবং চিন্তা করাটাই স্বাভাবিক। সারাদিন কামলা খেটে কামানো টাকা দুইদিনের পরিচিতো ক্লাসমেটকে বানানা ব্রেড খাওয়ানোর জন্যে নিশ্চয়ই না! সে যাই হোক, দেড় ডলারের বানানা ব্রেড’র বিনিময়ে যদি এত ভালো ফ্রেন্ডশীপ পাওয়া যায় তাহলে আমার আপত্তি নেই!
আর স্পেনিশ ছেলে রুবেন একদিন ক্লাসে স্পেনিশ নাচ নেচে পুরো ক্লাসকে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলো!

অন্য সিংগেল ছবিতে দেখা যাচ্ছে টীচার ম্যারিয়েন। আমাদের চারজন টীচারের মধ্যে ম্যারিয়েনকেই আমার সবচে’ ভাল লাগে। কেনো- তার কাহিনী আরেকদিন বলা যাবে। ছবিতে ও আমাদেরকে ওর ছোট মেয়ের নাচ একটিং করে দেখাচ্ছিলো!

নেক্সট ছবিতে দেখুন আরেক চাংকু ক্লাসমেট জিলিনের হাতের লেখা চাইনিজ! অনেক চেষ্টা করেছিলাম কপি করে লিখতে। কিন্তু ওদের এলফেবেটগুলো এত্ত জটিল যে কপি করা অনেকটা অসম্ভব!

লাস্ট ছবিতে যে বেঞ্জটা দেখা যাচ্ছে এটা হচ্ছে ব্রেকে আড্ডা মারার জন্যে আমাদের বেঞ্! আমার খুব প্রিয়ে জায়গা। প্রচন্ড রোদেও বেঞ্জটাতে ছায়া থাকে। প্রায় সময় ক্লাস ব্রেকে ঐ বেঞ্জে পা লম্বা করে দিয়ে চিত হয়ে শুয়ে আকাশ দেখি আর ভাবি- শেষ পর্যন্ত কী যাযাবরই হয়ে গেলাম? কোন দেশে ছিলাম। কোন দেশে গিয়েছিলাম। আবার ধাক্কা খেয়ে এ কোন দেশে চলে এলাম! …… নতুন বন্ধুত্ব, নতুন দেশ, তারপরও রক্তের ভিতর এ কোন পুরাতন টান!
কে জানে!