somewhere in... blog
x
ফোনেটিক ইউনিজয় বিজয়

স্ট্রেঞ্জার

০৯ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৯:০৯
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :

-ইজ দ্যাট আ বুক?
ব্যাগ থেকে জাস্ট অর্ধেক বের করেছি বইটা, ওখানেই স্থির থেকে গেলাম আমি। কানের কাছে বাক্যটা অনেকটা লেগেছে ‘ইজ-দাটা-বু?’ ক’দিন আগে হলেও বাক্যটা ধরতে পারতামনা। কিন্তু এখন ধরতে পারলাম এবং তাতে কোনো খুশী বোধ হলনা। বিরক্ত লাগছে। প্রচন্ড রোদে ঘুর ঘুর করে স্টেশনে ঢুকেছি কিছুক্ষন চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিয়ে পা ছড়িয়ে বসে থাকবো বলে। দেশ থেকে আসার সময় একটাই হ্যান্ড ব্যাগ এনেছিলাম। মেয়েদের ফেন্সি হ্যান্ড ব্যাগ কোনোকালেই আমার পছন্দ না, অতএব আম্মা ঘুরে ঘুরে নিউমার্কেট থেকে এই ব্যাগি-হ্যান্ড-ব্যাগ কিনে দিয়েছিলেন। নয়টা পকেট। আই লভ ইট। বন্ধুরা বলে তোর এই ব্যাগ মুভেবল স্টোর, স্টাপলার থেকে শুরু করে আলপিন, কালারপেন, ছোট টর্চলাইট সব আছে। একটাই সমস্যা, একটার বেশী দুইটা বই ঢুকানো যায়না। মায়ার’র ভিতর দিয়ে হেঁটে আসার সময় চোখে পড়লো দেয়ালে সাজিয়ে রাখা বইটা। অনেকবার অনেকের কাছে শুনেছি এই বইয়ের নাম, কিন্তু পড়া হয়নি আজো। পনেরো ডলার, টাকায় এখনের হিসেবে আটশ’ টাকার কাছাকাছি।কদিন আগের হিসেবে হাজারের কাছাকাছি। বুকে লাগে, তাও লোভ সামলান দায়। অতএব ব্যাগের ভিতর ঠাসাঠাসি করে ঢুকানো। বইটার পৃষ্ঠা বটে যাবে ভেবে বের করে আনছিলাম, তখনি পাশ থেকে প্রশ্নটা উড়ে এল।

কেউ সাঁতার কাটার সময় যদি আরেকজন জিজ্ঞেস করে ‘তুমি কি সাঁতার কাটছো?’ তখন যেমন বিরক্ত লাগে, এখন আমার তেমন লাগলো। ঘুরে তাকিয়ে দেখি সাদা চামড়া। বিরক্তি উঠলো চরমে। ক’দিন ধরে কী যে হয়েছে সাদা চামড়া দেখলেই গা চিড়বিড় করে। শালারা জন্মের আগে তো তোরা এমন কোনো পূন্য করস নাই যে ফার্স্ট ওয়ার্ল্ড কান্ট্রিতে সাদা চামড়া হয়ে জন্মাবি। আমাদের দেশের জরিনাও জন্মের আগে যা ছিলো তোরাও তাই ছিলি। তাহলে জরিনা আর তোদের মধ্যে এত পার্থক্য কেনো হবে? ফালতু প্রশ্ন। জানি। তাও ক’দিন ধরে কেনো যেনো সাদা চামড়া দেখলেই গা চিড়বিড় করে।

অনুভূতিশুন্য গলায় তাই বললাম, ‘ইয়া। আ বুক’।
সাথে সাথে প্রচন্ড উচ্ছাস, ‘আই ক্যান সিইইইই! ইটস দ্য কাইট রানার!’

এবার বিরক্তি উবে গিয়ে হাঁ হয়ে তাকিয়ে থাকার পালা। শুধুমাত্র বইয়ের পিছনের ঢাল দেখে বইয়ের নাম বলে দিতে পারা যার তার দ্বারা সম্ভব না। তার হাতের দিকে তাকিয়ে আরো শিউর হলাম। ইয়া মোটা এক বই। নাম দেখলাম ‘এক্সাইল’। আমাকে মাথা নিচু করে বইয়ের নাম দেখতে দেখেই তার উৎসাহ দ্বিগুন হল। বইয়ের থিম নিয়ে বক বক করছে সে, আমি কিছু শুনছি, কিছু শুনছিনা। কারন ছুটা ছুটা বাক্য বুঝতে পারলেও কেউ যখন হড়বড় করে অজি এক্সেন্টে ইংলিশ বলে, সাধ্য নাই কিছু বুঝি। কয়েকটা শব্দ শুধু বুঝলাম, ‘নির্বাসন’ ‘প্রেসিডেন্ট’ ‘ইসরাঈল’ ‘এরাব’ ‘এসসাসিনেটেড’।
তার কথার চে’ তার ড্রেসাপে আমার আগ্রহ বেশী। হাতের নখ আমার মতই দাঁত দিয়ে কাঁমড়ে কাঁটা, যেমন তেমন করে। ব্লন্ড চুল, কিন্তু আউলা ঝাউলা করে কোনোরকম ঝুটি বাঁধা। খুব সাধারন টি-শার্ট আর জিন্স। বুট জুতা রঙ জ্বলে যাওয়া। ঠিক হিপ্পি হিসেবে খাপ খায়না। নিজ থেকেই যেচে-পড়ে কথা বলছে, তার মানে সাদা চামড়ার ঘামান্ডি নাই। জামাকাপড় বলছে নো-চুকুবুকু-ফেন্সি-লেডিস-থিঙ্ক। হাতের মোটা বই আর দুনিয়ার যাবতীয় বই সম্পর্কে ওর নন-স্টপ বকরবকর বলছে ও ফ্রেন্ডলেস। ও তখন ‘দ্য ডটার অব ডেজার্ট’ না কি যেনো একটা বই নিয়ে কথা বলছে।

অনেকটা অভদ্র ভাবেই জিজ্ঞেস করলাম, ‘কী কর তুমি?’
ওর বানের পানির মত কথারা বাঁধা পেয়ে থমকে গেলো। মাথার ঝাকড়া চুল ঝাঁকা মেরে বললো- ‘নাথিং স্পেশাল। লন্ড্রিতে চাকরি করি’।
তারপর আবার সেই ডটার অব ডেজার্ট!
মাথা ঘুরিয়ে স্টেশন-সিলিং থেকে লটকানো স্ক্রিন দেখতে চেষ্টা করছি। আর কতক্ষন আছে ট্রেনের?
‘ইউ হ্যাভ টু মিনিটস মোর’!
থতমত খেয়ে গেলাম। এর মধ্যেই ও আমার গন্তব্য জেনে নিয়েছে। স্ক্রিন দেখছি দেখে আমার ট্রেনের টাইম বলে দিলো।
‘লেম্মি গেসস, ইউ-আ-ফ্রম লেবানন, রাইট?’
সেইম বুলশিট কোশ্চেন। সবাই এই একই কোশ্চেন করে আমাকে। হতে পারে আমার মাথার লেবাননী স্টাইল স্কার্ফের জন্যে, হতে পারে কে-জানে-কিসের-জন্যে। কিন্তু ও আমার উত্তরের জন্যে অপেক্ষা না করেই নেক্সট বকর-বকরে চলে গেছে। ‘আসলে আমি বলতে চাচ্ছি এটা কোনো ব্যাপার না যে তুমি কোথা থেকে বা আমি কোথা থেকে। ব্যাপার হল তুমি আর আমি দু’জনেই মানুষ। …তুমি বই পড়তে ভালবাসো, আমি বই পড়তে ভালবাসো। এই যে তোমার মাথার এক টুকরো কাপড়, এটার মানেই এই না যে তুমি এলিয়েন। …… কিন্তু মানুষ আসলে অনেক কমপ্লিকেটেড। পৃথিবীটাকেও তাই মানুষ কমপ্লিকেটেড করে ফেলেছে। তুমি ‘রুটস’ পড়েছো? পৃথিবীর সব মানুষই আসলে……’

স্টেশনে ট্রেন ঢুকার ভারী আওয়াজে ওর কথা চাপা পড়ে গেলো।
‘ওকে, হেয়ারজ ইউর ট্রেন। ইউ মাস্ট বি গো …… মাই ট্রেইন উড বি হেয়ার সুন। ওকেএএ, সি ইয়া… বা বাই… ভেরী নাইস টু টক টু ইয়া…’

ট্রেন পাঁচ থেকে দশ সেকেন্ডের জন্যে দাঁড়ায় মাত্র। কিছু বলার আগেই দেখলাম ট্রেনের দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, আস্তে আস্তে ওর চেয়ারটা দূরে চলে যাচ্ছে, ও ছোট হতে হতে একসময় বিন্দু হয়ে গেলো এবং তখনই হঠাৎ খেয়াল হল- চমৎকার মেয়েটার নামটাও জানা হলনা!
সর্বশেষ এডিট : ০৯ ই অক্টোবর, ২০০৮ সকাল ৯:১১
৩৩টি মন্তব্য ২২টি উত্তর

আপনার মন্তব্য লিখুন

ছবি সংযুক্ত করতে এখানে ড্রাগ করে আনুন অথবা কম্পিউটারের নির্ধারিত স্থান থেকে সংযুক্ত করুন (সর্বোচ্চ ইমেজ সাইজঃ ১০ মেগাবাইট)
Shore O Shore A Hrosho I Dirgho I Hrosho U Dirgho U Ri E OI O OU Ka Kha Ga Gha Uma Cha Chha Ja Jha Yon To TTho Do Dho MurdhonNo TTo Tho DDo DDho No Po Fo Bo Vo Mo Ontoshto Zo Ro Lo Talobyo Sho Murdhonyo So Dontyo So Ho Zukto Kho Doye Bindu Ro Dhoye Bindu Ro Ontosthyo Yo Khondo Tto Uniswor Bisworgo Chondro Bindu A Kar E Kar O Kar Hrosho I Kar Dirgho I Kar Hrosho U Kar Dirgho U Kar Ou Kar Oi Kar Joiner Ro Fola Zo Fola Ref Ri Kar Hoshonto Doi Bo Dari SpaceBar
এই পোস্টটি শেয়ার করতে চাইলে :
আলোচিত ব্লগ

Claude Fable 5: Journey from ANI 2 AGI -প্রযুক্তির ইতিহাসে নতুন এক সন্ধিক্ষণ

লিখেছেন বোকা মানুষ বলতে চায়, ১২ ই জুন, ২০২৬ দুপুর ২:২৭



প্রযুক্তির ইতিহাসে এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যা পরবর্তী কয়েক দশকের গতিপথ নির্ধারণ করে দেয়। ইন্টারনেটের আবির্ভাব, স্মার্টফোন বিপ্লব কিংবা Generative AI-এর উত্থান ছিল তেমনই কিছু ঘটনা। সম্প্রতি Anthropic-এর নতুন Frontier... ...বাকিটুকু পড়ুন

আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?

লিখেছেন স্বপ্নের শঙ্খচিল, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:০৭


আমরা এখন কোথায় আছি, কোথায় যাচ্ছি জানিনা ?



আজ শুক্রবার, ১২/০৬/২০২৬ ইং তারিখ
................................................................
গিয়েছিলাম পাড়ার মসজিদে জুম্মার নামাজ পড়তে ।
সব সময়ই যাই, একটু বয়ান শুনি তারপর খুৎবা শুরু হয়,নামাজ... ...বাকিটুকু পড়ুন

যে যায় লঙ্কায় সে হয় রাবণ

লিখেছেন সৈয়দ কুতুব, ১৩ ই জুন, ২০২৬ রাত ২:৩২


ব্যাংকের সিএসআর বা কর্পোরেট সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি (Corporate Social Responsibility) তহবিল জিনিসটা খাতায় কলমে বড়ই পুণ্যের কাজ। ব্যাংক ব্যবসা করে লাভ করবে, সেই লাভের একটা অংশ সমাজের জন্য আলাদা রাখবে।... ...বাকিটুকু পড়ুন

বাকি রইলো; কাঁচা কলা

লিখেছেন সামছুল আলম কচি, ১৩ ই জুন, ২০২৬ সকাল ১১:৪৭


স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম, স্ল্যা-কুম.....!!
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির অভাবনীয় উন্নতির এ সময়ে; উড়ে এসে জুড়ে বসা, মাথা নষ্ট এ চীজ গুলো আমাদের শিশুদের ব্রেইন ব্লক করে দেয়ার কোনও এক সুদূর প্রসারী প্লানের... ...বাকিটুকু পড়ুন

স্মৃতির নৌকা

লিখেছেন সেজুতি_শিপু, ১৩ ই জুন, ২০২৬ বিকাল ৪:১১


কোন কোনদিন আলোর শৈশবে চোখ মেলে
মাধবীলতার হাসিমুখ সম্ভাষণের ওপাশে স্বচ্ছ আকাশে
এক ঝাঁক কবুতরের ওড়াউড়ি দেখতে দেখতে-
নিজেকে বড় ভাগ্যবান বলে মনে হয়,
চকিতে অপার্থিব আলো যেন ঢুকে পড়ে আত্মায়।

কোন কোন সন্ধ‍্যেয়... ...বাকিটুকু পড়ুন

×